'ফিসফিসানি' ছেড়ে যখন যৌন নিগ্রহের বিরুদ্ধে সরব ভারতের নারী সাংবাদিকরা

অভিযোগ আসতে শুরু করেছে ভারতের বিভিন্ন সংবাদপত্র গোষ্ঠীর সম্পাদকদের বিরুদ্ধে ছবির কপিরাইট PRAKASH SINGH
Image caption অভিযোগ আসতে শুরু করেছে ভারতের বিভিন্ন সম্পাদকের বিরুদ্ধে

যৌন নির্যাতনের বিরুদ্ধে '#মি টু' ক্যাম্পেনের রেশ এবার বলিউডের পর আছড়ে পড়েছে ভারতের মিডিয়া দুনিয়াতেও।

গত দু-তিনদিনের মধ্যে ভারতে একের পর এক নারী সাংবাদিক তাদের সাবেক সম্পাদক, ব্যুরো চিফ বা উর্ধ্বতন বসের হাতে লাঞ্ছিত হওয়ার অজস্র অভিযোগ সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে সামনে আনতে শুরু করেছেন।

কয়েকটি ক্ষেত্রে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা ক্ষমাও চেয়ে নিয়েছেন, কোথাও আবার সংশ্লিষ্ট সংবাদ প্রতিষ্ঠান অভিযোগের যথাযথ তদন্ত হবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন।

তবে তারপরেও প্রভাবশালী এই সব অভিযুক্তদের আদৌ শাস্তির আওতায় আনা যাবে কি না, পর্যবেক্ষকরা তা নিয়ে সন্দিহান।

বলিউডে অভিনেত্রী তনুশ্রী দত্তর তোলা যৌন লাঞ্ছনার অভিযোগ নিয়ে সারা ভারত যখন তোলপাড়, তখনই দিনতিনেক আগে হায়দ্রাবাদে টাইমস অব ইন্ডিয়ার বর্তমান রেসিডেন্ট এডিটরের বিরুদ্ধে দশ বছর আগে ঘটা একটি যৌন লাঞ্ছনার অভিযোগ তোলেন সাংবাদিক সন্ধ্যা মেনন।

ছবির কপিরাইট ঋতুপর্ণা চ্যাটার্জি
Image caption সোশ্যাল মিডিয়াতে অভিযোগগুলো সংকলনের কাজ করছেন সাংবাদিক অ্যাক্টিভিস্ট ঋতুপর্ণা চ্যাটার্জি

সেই শুরু, তারপর একে একে মুম্বাইতে ডিএনএ-র সাবেক প্রধান সম্পাদক গৌতম অধিকারী, হিন্দুস্তান টাইমসের অন্যতম সম্পাদক প্রশান্ত ঝা-সহ বহু সিনিয়র সাংবাদিকের বিরুদ্ধে একের পর অভিযোগ আসতে শুরু করে ফেসবুক ও টুইটারে।

ভারতে রিপোটার্স উইদাউট বর্ডার্সের প্রতিনিধি, সাংবাদিক ঋতুপর্ণা চ্যাটার্জি বলছিলেন, "এই প্রক্রিয়াটা শুরু হয়েছে কিন্তু বেশ কিছুদিন আগেই। এক বছর আগে একটিভিস্ট রায়া সরকার একটা তালিকা প্রকাশ করেছিলেন ভারতের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে যারা সেক্সুয়াল প্রিডেটর, তাদের নামের। এখন ঠিক সেই জিনিসটাই হচ্ছে মিডিয়ার জগতে।"

"আসলে আমরা সবাই জানি এই জিনিসগুলো বহুদিন ধরে ঘটে চলেছে - কিন্তু জাস্টিস সিস্টেম দিয়ে এর কোনও প্রতিকার হয় না, ভিক্টিমরা কখনওই এই সব নিগ্রহের কোনও সুবিচার পান না। কেসগুলো ধামাচাপা পড়ে যায়, প্রকাশ্যে এ নিয়ে কখনও আলোচনা হয় না - এবং সবচেয়ে বড় কথা আক্রান্তদের কাছে ন্যায় বিচার অধরাই থেকে যায়!"

তবে ভারতে মিডিয়া হাউসগুলো এতটাই শক্তিশালী যে তার বড় বড় নামগুলো এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরেই রয়ে যাচ্ছে বলে মনে করছেন ভারতে বিবিসির উইমেন্স ও সোশ্যাল অ্যাফেয়ার্স এডিটর গীতা পান্ডে।

তার কথায়, "দুএকটা মাঝারি মাপের নাম ছাড়া সত্যিকারের বড় নামগুলো কিন্তু খুব একটা এখনও আসেনি - মানে ভারতীয় সাংবাদিকতার যারা হার্ভি ওয়াইনস্টাইন, তাদের এখনও আমরা পাইনি।"

ছবির কপিরাইট প্রশান্ত ঝা
Image caption অভিযোগ ওঠার পর হিন্দুস্তান টাইমসের রাজনৈতিক সম্পাদকের পদ থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন প্রশান্ত ঝা

"এরা অসম্ভব ক্ষমতাশালী, অনেক কিছু করতে পারেন। কিন্তু বহুদিন ধরে নানা নিউজরুমে আমরা যে জল্পনাগুলো শুনেছি, সেই নামগুলো কোথায়?"

সাংবাদিক-অ্যাক্টিভিস্ট ঋতুপর্ণা চ্যাটার্জি এই অভিযোগগুলো সংকলন করে সোশ্যাল মিডিয়াতে গুছিয়ে পোস্ট করছেন। তিনি কিন্তু বিশ্বাস করেন, অচিরেই আরও নাম আসবে - এবং সাংবাদিকতার রাঘব বোয়ালরাও হয়তো বাদ যাবেন না।

"এখন কিন্তু শত শত মেয়েরা এগিয়ে আসছেন। আমাকে রোজ প্রচুর মেয়ে ডিএম বা প্রাইভেট মেসেজ করে বলছেন, আমারও কিন্তু একটা 'স্টোরি' আছে। প্লিজ একটু শুনবেন? আমরা ধৈর্য ধরে সেই সব গল্পই শুনছি, তারপর সব দিকে আঁটঘাট বেঁধে সেগুলো অভিযোগের আকারে প্রকাশ করছি।"

"আসলে কি জানেন, মিডিয়াই বলুন বা হলিউড-বলিউড-বিজ্ঞাপন কিংবা কমেডির দুনিয়া - মেয়েদের চিরকালই একটা 'হুইসপার নেটওয়ার্ক' থাকে। যেখানে তারা পরস্পরকে চিরকাল সতর্ক করে এসেছে অমুক লোকটা কিন্তু সুবিধার নয়, অমুকের সঙ্গে আমার অভিজ্ঞতা খুব খারাপ।"

"কিন্তু এখন সেই ওয়ার্নিং নেটওয়ার্কের বাইরে বেরিয়ে এসে তারা রীতিমতো অভিযোগ পেশ করছে, তাও সেটা অভিযুক্তের নাম করে। আমি সেগুলোই লিপিবদ্ধ করছি। আর এই যে একসঙ্গে এত মেয়ে সাহসে ভর করে মুখ খুলছে, সেটা অবশ্যই একটা সাঙ্ঘাতিক ব্যাপার!", বলছিলেন ঋতুপর্ণা চ্যাটার্জি।

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption বলিউডেও যৌন নিগ্রহের অভিযোগের মুখে পড়েছেন অভিনেতা নানা পাটেকর

কিন্তু এই সব অভিযোগ কি শেষ পর্যন্ত আইনের কাঠগড়ায় পৌঁছাতে পারবে?

গীতা পান্ডে এখনও খুব একটা আশাবাদী নন। তিনি জানাচ্ছেন, "গত কয়েকদিনে কিন্তু আমরা এটাও দেখেছি অভিযুক্তরা যখন ভয় দেখাচ্ছেন বা আইনি পদক্ষেপের হুমকি দিচ্ছেন, বহু টুইট মুছেও ফেলা হয়েছে।"

"যে সব অভিযোগের ক্ষেত্রে সাক্ষী আছে, স্ক্রিনশট বা অন্য প্রমাণ আছে সেগুলো অন্য কথা - কিন্তু যেখানে বিষয়টা শুধু আমার বক্তব্য বনাম তোমার বক্তব্য, সেখানে আমি নিশ্চিত নই কতটা কী করা যাবে। ভারত আমেরিকা নয়, এখানকার পিতৃতান্ত্রিক সমাজে আদৌ কি এই অভিযুক্তদের কোনও সাজা হবে?"

তবে আইন-আদালত হয়তো পরের পদক্ষেপ - তার আগে ভারতের একের পর এক মহিলা সাংবাদিক এখন তাদের নির্যাতনকারীদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াচ্ছেন।

আর প্রায় সব ক্ষেত্রেই সেটা নিজের ও অভিযুক্তর নামধাম প্রকাশ করে, যে জিনিস ভারতে আগে কখনও দেখা যায়নি।