বাংলাদেশে বিএনপির সাথে কিছু দলের 'বৃহত্তর ঐক্য' আটকে আছে যে কারণে

বিএনপির এক সমাবেশ খালেদা জিয়ার পোস্টার নিয়ে এসেছেন দলের কর্মী ও সমর্থকরা। ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption বিএনপির এক সমাবেশ খালেদা জিয়ার পোস্টার নিয়ে এসেছেন দলের কর্মী ও সমর্থকরা।

বাংলাদেশে বিরোধী রাজনৈতিক দল বিএনপি এবং কয়েকটি দলের মধ্যে বৃহত্তর ঐক্যের ক্ষেত্রে নির্বাচন সম্পর্কিত ৫ দফা দাবিতে ঐকমত্য হলেও কয়েকটি বিষয়ে এখনও মীমাংসা হয়নি।

এই ঐক্য প্রক্রিয়ার একটি দল বিকল্প ধারার নেতারা বলেছেন, নির্বাচনে বিজয়ী হলে ক্ষমতার ভারসাম্য আনা অর্থাৎ কোনো একক দলের হাতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত না হওয়ার বিষয়কে তারা ঐক্যের অন্যতম মৌলিক ইস্যু হিসেবে দেখছেন এবং সেই প্রশ্নে এখনও তারা কোনো ধরনের ফয়সালায় আসতে পারেননি।

বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করেন, বিএনপি এবং অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন বিকল্পধারার মধ্যে আস্থার অভাবের কারণে বৃহত্তর ঐক্যের ক্ষেত্রে জটিলতা কাটছে না।

একারণে নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে এলেও তারা ঐক্যবদ্ধভাবে কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নামতে পারছে না।

সংসদ ভেঙ্গে দিয়ে সরকারের পদত্যাগ এবং নিরপেক্ষ সরকার প্রতিষ্ঠাসহ ৫ দফা দাবিতে বিএনপি, বিকল্পধারা এবং ড: কামাল হোসেনের গণফোরামসহ ঐক্য প্রক্রিয়ার অন্য দলগুলোর মধ্যে কোনো মতপার্থক্য নেই।

রোববার দলগুলোর নেতাদের এক বৈঠক থেকে তাদের সেই ঐকমত্যে পৌঁছানোর বিষয়টি নিশ্চিত করে তা ঘোষণা করা হয়েছে। তবে বিএনপি তাদের নেত্রী খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিকে বৃহত্তর ঐক্যের ব্যানারে নির্বাচনের অন্যতম একটা শর্ত হিসেবে আনতে চেয়েছিল।

ছবির কপিরাইট BBC Bangla
Image caption বি চৌধুরী, ড. কামাল হোসেন, আর আসম আবদুর রবের মত নেতারা আছেন যুক্তফ্রন্টে। (ফাইল ফটো)

আরো পড়তে পারেন:

'ফিসফিসানি' ছেড়ে যখন সরব নারী সাংবাদিকরা

বাংলাদেশে এখনও কি চিঠি লিখে মানুষ?

চীনে শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিরা কেন গুম হয়ে যাচ্ছে

অন্য দলগুলো বিষয়টিকে নির্বাচনী শর্ত হিসেবে আনতে রাজি নয়। তারা গ্রেফতার থাকা সব রাজনৈতিক নেতা কর্মীর মুক্তি এবং মামলা প্রত্যাহার চায়।

কিন্তু নির্বাচনে বিজয়ী হলে ক্ষমতার ভাগাভাগি কিভাবে হবে- সেই প্রশ্ন এখনও বৃহত্তর ঐক্যের জন্য অন্যতম বাধা হয়ে রয়েছে।

বিকল্প ধারার অন্যতম নেতা মাহি বি চৌধুরী বলেছেন, এখনও মৌলিক বিষয় বা লক্ষ্য ঠিক করা সম্ভব হয়নি।

"বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি নিশ্চয়ই বিএনপির সুনির্দিষ্ট আলাদা একটি দাবি। আমাদের দাবি আমরা বলেছি, যে সব রাজনীতিকের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে, আমরা তাদের সকলের মুক্তি চাই।"

মাহি বি চৌধুরী আরও বলেছেন, নির্বাচনের ব্যাপারে সরকারের কাছে তারা যে পাঁচ দফা দাবি দিয়েছে, সেগুলোর সাথে বিএনপির অধিকাংশ দাবি হুবহু মিলে গেছে। তবে জাতীয় ঐক্য গঠনের জন্য যা দরকার তা এখনো বাকি আছে।

''আমরা যে ভারসাম্যের বাংলাদেশ চাই, সেবিষয়ে এখনও একমত হওয়া যায় নি,'' তিনি বলেন।

''বিএনপিকে এককভাবে ক্ষমতায় নেয়ার জন্য এই জাতীয় ঐক্য হচ্ছে না। আমরা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির ঐক্য চাই,'' মিঃ চৌধুরী বলেন।

তিনি জানান, সে সমস্ত বিষয়ে এখনও আলোচনা চলছে। আনুষ্ঠানিক ঐক্য প্রক্রিয়ার জন্য এখনও ''আমাদের বহুদূর যেতে হবে।"

তবে খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবি বা বিএনপির অন্যান্য ইস্যুতে গণফোরাম, মাহমুদুর রহমান মান্নার নাগরিক ঐক্য বা আ স ম আব্দুর রবের জেএসডি'র মতপার্থক্য সেভাবে নাই। বিএনপি এখন বিকল্প ধারার সাথে দূরত্ব কমিয়ে আনার চেষ্টা করছে।

ছবির কপিরাইট BBC Bangla
Image caption ঢাকায় বিএনপির সাম্প্রতিক একটি সমাবেশ।

আরো পড়তে পারেন:

প্রিয়াঙ্কাকে নিয়ে মন্তব্য করায় আলোচনায় রাষ্ট্রপতি

সরকারের সমর্থনেই কোটা ফিরিয়ে আনার আন্দোলন?

নির্বাচনকে সামনে রেখে অবশ্য এই দলগুলোর সকলের কৌশলগত স্বার্থ রয়েছে। ছোট দলগুলোর নেতাদের বড় দলের সাথে থেকে ভাগাভাগির মাধ্যমে নির্বাচনী আসন প্রয়োজন। আর ছোট দলগুলোর ভোট বা আসন না থাকলেও বিএনপি তাদের সাথে রাখতে চাইছে।

বিএনপি দেখাতে চাইছে, সরকারবিরোধী দলগুলো এক অবস্থানে এসেছে। দলটির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমেদ বলেছেন, ঐক্য প্রক্রিয়া এখন একটি ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েছে বলে তারা মনে করছেন।

"পাঁচ দফা দাবি, তার সাথে বেগম খালেদা জিয়াসহ সকল রাজনৈতিক নেতা কর্মীর মুক্তি এবং মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে আমরা সবাই একমত হয়েছি। এর ওপর ভিত্তি করেই আমরা পরবর্তী কর্মসূচি গ্রহণ করবো।"

একইসাথে মি: আহমেদ বলেছেন, "এটা যুগপৎ আন্দোলন হবে নাকি একসাথে সবাই মিলে করবো এই বিষয়টা নিয়ে আমরা এখনও কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে আসি নাই। আমরা আলোচনা করছি।"

কিন্তু এই ঐক্য প্রক্রিয়া এখনও অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে বলে বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করছেন।

যেহেতু বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া দুর্নীতির মামলায় সাজা নিয়ে বন্দী রয়েছেন। আরেক শীর্ষ নেতা তারেক রহমান বিদেশে রয়েছেন এবং তার বিরুদ্ধে ২১শে অগাস্টে আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলার মামলায় এখন রায় হতে যাচ্ছে, ফলে তাদের বাদ দিয়ে বিএনপিকে এখন নির্বাচন নিয়ে ভাবতে হচ্ছে।

ছবির কপিরাইট BBC Bangla
Image caption রাষ্ট্রবিজ্ঞানী দিলারা চৌধুরী

এমন প্রেক্ষাপটে নির্বাচনে বিজয়ী হলে বৃহত্তর ঐক্যের শরিকদের মাঝে ক্ষমতার ভাগাভাগি কীভাবে হবে, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী কে হবেন, এই প্রশ্নেই মূল সমস্যা বলে বলে বিশ্লেষকরা বলছেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী বলেছেন, বিএনপি এবং বিকল্পধারার মাঝে আস্থার সমস্যাও রয়েছে।

"এই জাতীয় বিষয় তো অনেক আলোচনার মধ্য দিয়ে এগুতে হয়। বিশেষ করে কে প্রধানমন্ত্রী হবেন এই বিষয়ে। এটাতো একটা বিশাল ইস্যু। এব্যাপারে মতৈক্যের জন্য তো সময়ের দরকার।"

তিনি আরও বলেছেন, নির্বাচনের আগে সময় খুব বেশি নেই কিন্তু এই বিষয়টি ঐক্য প্রক্রিয়ার জন্য একটা অন্যতম সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

"বিকল্পধারা এবং বিএনপি- দুই দলের মধ্যেই একে অপরের প্রতি আস্থার অভাব আছে। ফলে বিশাল একটা অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। যতক্ষণ পর্যন্ত এটা দূর না হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত তারা তো কোনো কর্মসূচি দিতে পারছে না।"

বিএনপি এবং অন্যদলগুলোর নেতারাও বলছেন যে, ন্যূনতম ৫ দফা দাবিতে এক মঞ্চ থেকে কর্মসূচি দেওয়া হবে কিনা, সেটিই তারা এখনও ঠিক করতে পারেননি। তারপরও বিএনপি খুব শীঘ্রই সমস্যাগুলো সমাধানের ব্যাপারে আশাবাদী।