ভারতের দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়: 'আমি কেন হিন্দু নই' বইটি পাঠ্যক্রম থেকে বাদ পড়ছে কেন?

দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়
Image caption দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়: হিন্দুত্ব বিরোধী বই বাদ দেয়া হচ্ছে

ভারতের দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় তাদের পাঠ্যক্রম থেকে কয়েকটি বই বাদ দিতে চলেছে।

ওই বইগুলি পরিচিতভাবেই 'হিন্দুত্ব-বিরোধী'। এরমধ্যে তিনটি বইয়েরই রচয়িতা দলিত-চিন্তাবিদ কাঞ্ছা ইলাইয়া। বইগুলির মধ্যে রয়েছে তাঁর লেখা 'হোয়াই আই অ্যাম নট আ হিন্দু' বা 'কেন আমি হিন্দু নই' বইটিও।

দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে তাদের পাঠ্যক্রম নতুন ভাবে তৈরী করতে চলেছে। তারই অঙ্গ হিসাবে দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের এম এ ক্লাসের ছাত্রছাত্রীদের পড়তে বলা হয়, এমন চারটি বই তালিকা থেকে সরিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে ওই বিশ্ববিদ্যালয়।

এই বইগুলির মধ্যে রয়েছে দলিত লেখক, অধ্যাপক কাঞ্ছা ইলাইয়ার লেখা তিনটি বই - 'হোয়াই আই অ্যাম নট আ হিন্দু', 'বুদ্ধিজম - চ্যালেঞ্জ টু ব্রাহ্মিনিজম' এবং 'পোস্ট-হিন্দু ইন্ডিয়া'।

এছাড়াও ক্রিস্টোফার জেফারলেটের লেখা 'মিলিশিয়াজ অফ হিন্দুত্ব' বইটিকেও পাঠ্যক্রম থেকে বাদ দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

দিন কয়েক আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্ট্যান্ডিং কমিটি অন অ্যাকাডেমিক ম্যাটার্স-এর বৈঠকেই ওই চারটি বই নিয়ে প্রশ্ন তোলেন কয়েকজন সদস্য।

ওই কমিটির সদস্য অধ্যাপক গীতা ভাট বিবিসিকে বলছিলেন কেন তাঁরা এই চারটি বইকে বাদ দিতে চাইছেন

মিজ ভাটের কথায়, "বইগুলি নিয়ে আপত্তির মূল কারণ হল : এগুলোর মধ্যে যথেষ্ট গবেষণালব্ধ উপাদান নেই, তথ্যেরও অভাব রয়েছে। এইসব বইগুলি ছাত্রছাত্রীদের পড়ানোটা অ্যাকাডেমিক দিক থেকে বিচার করলে অনুচিত। তাদের মধ্যে ভেদাভেদের মনোভাব তৈরী হবে।"

অধ্যাপক গীতা ভাট আরও ব্যাখ্যা করছিলেন, 'হোয়াই আই অ্যাম নট আ হিন্দু' বইটিতে কাঞ্ছা ইলাইয়া লিখেছেন, 'গেরুয়া ঝান্ডা আর কপালে তিলক আমার কাছে পীড়াদায়ক', কোথাও লিখেছেন 'হিন্দুত্ববাদী শক্তি মুসলমান আর খ্রীস্টানদের ঘৃণা করে'।

অধ্যাপক গীতা ভাট মনে করেন, এগুলো কাঞ্ছা ইলাইয়ার নিজের মতামত - এগুলো লেখার পেছনে কোনও যুক্তি বা গবেষণালব্ধ জ্ঞান নেই।

Image caption অধ্যাপক কাঞ্ছা ইলাইয়া

দীর্ঘদিন পাঠ্যক্রমে থাকা তাঁর বইগুলি বাদ দেওয়ার ব্যাপারে কী বলছেন অধ্যাপক কাঞ্ছা ইলাইয়া?

কাঞ্ছা ইলাইয়া বলেন, "আমার ওইসব বইগুলি শুধু দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে যে পড়ানো হচ্ছে অনেকদিন ধরে, তা নয়। দেশের সেরা বিশ্ববিদ্যালয় - জে এন ইউ থেকে শুরু করে অনেক নামী-দামী পশ্চিমা বিশ্ববিদ্যালয়তেও এগুলো পড়ানো হয়।"

"বইগুলিতে আসলে বিজেপি-আর এস এসের দর্শনকে চ্যালেঞ্জ জানানো হয়েছে, সেইজন্যই এখন তাঁর বইগুলোকে পাঠক্রম থেকে বাদ দেওয়া হচ্ছে। মতামতের বহুত্ব না থাক, সেটাই চায় বিজেপি," বলছিলেন কাঞ্ছা ইলাইয়া।

বিজেপি নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই যে শিক্ষাক্ষেত্রে নিজেদের মত চালাতে চাইছে তারা, সেটাই বলছিলেন কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ অমল মুখোপাধ্যায়।

তাঁর কথায়, "যে কোনও ধরণের মতামত প্রকাশের আর সেগুলো পড়ার স্বাধীনতার নামই তো গণতন্ত্র। কোনও বিশ্ববিদ্যালয় কেন কোনও বিশেষ বই বাতিল করবে? গত ৫০ বছরে এ ঘটনা কখনও হয় নি, যা এখন শুরু হয়েছে বিজেপি আসার পর থেকে। তারা সব ক্ষেত্রে সেই সব লোক বেছে বেছে নিয়োগ করছে, যারা তাদের হিন্দুত্ববাদের স্বপক্ষে সওয়াল করবে। এটা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক, অবাঞ্ছনীয়।"

অধ্যাপক গীতা ভাট এবং ওই কমিটির আরেক সদস্য অধ্যাপক হংসরাজ সুমন যদিও এইসব অভিযোগ খন্ডন করছেন।

তারা দুজনেই বলছেন, ওই কয়েকটি বই পাঠ্যক্রম থেকে বাদ দেওয়ার জন্য বাইরে থেকে কোনও চাপ আসে নি। বিশ্ববিদ্যালয় সম্পূর্ণ স্বায়ত্বশাসিত সংস্থা- তারা নিজেরাই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এই ব্যাপারে।