বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলা যেভাবে এগিয়েছে

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption মামলায় হাজিরা শেষে আদালত থেকে বেরিয়ে আসার সময় খালেদা জিয়া। (ফাইল ফটো)

বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে যে দুটি দুর্নীতির মামলা নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে, সেগুলোর মধ্যে 'জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট' দুর্নীতি মামলা অন্যতম।

গত ফেব্রুয়ারি মাসে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় আদালতে সাজাপ্রাপ্ত হয়ে খালেদা জিয়া প্রায় আটমাস যাবত কারাগারে আছেন।

খালেদা জিয়া কারাগারে যাবার পর সেপ্টেম্বর মাসে নাজিম উদ্দিন রোডে অবস্থিত পুরাতন কারাগারের ভেতরে আদালতের এজলাস বসানো হয়।

গত ৫ই সেপ্টেম্বর আদালতে এসে খালেদা জিয়া বলেন, তিনি অসুস্থ এবং বারবার আদালতে আসতে পারবেন না।

খালেদা জিয়া আদালতকে বলেন, " বারবার আসতে পারবো না। যত ইচ্ছা সাজা দিয়ে দেন।"

আরো পড়ুন:

খালেদা জিয়ার মাথায় আরো যেসব মামলা ঝুলছে

'আমাকে জোর করে আনা হয়েছে, আর আসবো না'

দুর্নীতি মামলা: কী যুক্তি ছিল পক্ষে-বিপক্ষে?

এক নজরে জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলা

২০১০ সালে জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট-এ অর্থের উৎস নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করে দুর্নীতি দমন কমিশন।

দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর ২০১১ সালের আগস্ট মাসে দুর্নীতি দমন কমিশন জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলাটি দায়ের করে।

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption বকশি বাজারে স্থাপতি বিশেষ আদালত।

মামলা দায়ের করার পর দুর্নীতি দমন কমিশন একজন তদন্তকারী কর্মকর্তা নিয়োগ করে। প্রায় ১৭ মাস তদন্ত শেষে ২০১২ সালের জানুয়ারি মাসে চার্জশীট দাখিল করা হয় আদালতে।

এর পর সেটিকে উচ্চ আদালতে চ্যালেঞ্জ করেন খালেদা জিয়া।

অভিযোগ পত্র দায়ের করার প্রায় ২৬ মাস পরে এ মামলার বিচার কাজ শুরু হয়।

২০১৪ সালের মার্চ মাসে এ মামলার অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার কাজ শুরু হয়।

এরপর মামলার কার্যক্রম স্থগিতে আবেদন জানিয়ে উচ্চ আদালতে যান খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা ।

জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট এবং জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলার বিচারকার্য পরিচালনার জন্য ২০১৪ সালের মে মাসে ঢাকার আলিয়া মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে আদালতের অস্থায়ী এজলাস স্থাপন করা হয়।

এর আগে মহানগর দায়রা জজ আদালতে মামলার কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছিল।

খালেদা জিয়ার আইনজীবী প্যানেলের অন্যতম সদস্য মাসুদ আহমেদ তালুকদার বলেছেন, জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলাটি প্রায় দুই বছরের মতো কার্যক্রম স্থগিত ছিল।

দীর্ঘদিন মামলার কার্যক্রম স্থগিত থাকার পরে আবারো নিম্ন আদালতে বিচারকার্য শুরু হয়।

২০১৬ সালের মার্চ মাসে এ মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ করা হয়। এ মামলায় আদালতে মোট ৩২ জন সাক্ষী হাজির হয়েছিলেন।

ছবির কপিরাইট MUNIR UZ ZAMAN
Image caption খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে ৩০টির বেশি মামলা রয়েছে।

এ মামলায় দুর্নীতি কমিশনের পক্ষে সাক্ষী ছিলেন ১০ জনের বেশি।

এই মামলায় খালেদা জিয়া এবং অন্য অভিযুক্তরা তাদের পক্ষে কোন সাফাই সাক্ষী দেননি।

খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা এ মামলায় সাফাই সাক্ষী না দেবার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

এ মামলার অনেক বিষয় খালেদা জিয়া এবং অন্য অভিযুক্তদের তরফ থেকে উচ্চ আদালতে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে।

আদালত পরিবর্তনের জন্যও আবেদন করা হয়েছিল। কিন্তু সেসব আবেদন খারিজ হয়ে যায়।

দুর্নীতি দমন কমিশনের আইনজীবী খুরশিদ আলম বলেছেন, মামলা তদন্ত কাজ এবং আদালত পরিবর্তনসহ নানা বিষয় চ্যালেঞ্জ করে অভিযুক্তদের তরফ থেকে ৩০ বারের বেশি উচ্চ আদালতে আবেদন করা হয়েছে।

"দুর্নীতির মামলায় প্রত্যেকবারই সময়ের দরখাস্ত পড়ে। সেটা হাইকোর্টে হোক কিংবা সুপ্রিম কোর্টে। এভাবে সময়ক্ষেপণ হয়েছে," খুরশীদ আলম।

মামলার অভিযোগে কী বলা হয়েছে?

দুর্নীতি দমন কমিশনের মামলায় বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী থাকার সময় খালেদা জিয়া তার রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্টের জন্য অর্থ সংগ্রহ করেছেন।

ট্রাস্টের নামে অবৈধভাবে তিন কোটি ১৫ লাখ টাকা লেনদেন করা হয়েছে বলে মামালার অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। এ টাকার কোন উৎস তারা দেখাতে পারেননি বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

এ মামলায় খালেদা জিয়া ছাড়াও অন্য অভিযুক্তরা হলেন- খালেদা জিয়ার সাবেক রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী, তৎকালীন ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের মেয়র সাদেক হোসেন খোকার একান্ত সচিব মনিরুল ইসলাম খান এবং হারিস চৌধুরীর একান্ত সচিব জিয়াউল ইসলাম মুন্না।

হারিস চৌধুরী ছাড়া বাকি সবাই বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন।

দুর্নীতি দমন কমিশন অনুসন্ধানের মাধ্যমে জানতে পারে যে খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট গঠন করে।

সেটির ট্রাস্টি ছিল খালেদা জিয়ার দুই ছেলে। সে ট্রাস্টের জন্য বিভিন্ন উৎস থেকে টাকা সংগ্রহ করা হলেও সেটি দাতব্য কাজে খরচ করা হয়নি।

জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট ফান্ডে প্রায় আট কোটি টাকা জমা হয়েছিল।

এর মধ্যে বিএনপির দলীয় ফান্ড থেকে যে টাকা এসেছে সেটি দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্তে বাদ দেয়া হয়েছে।

বাকি তিন কোটি ১৫ লাখ টাকার কোন উৎস তারা দেখাতে পারেননি বলে অভিযোগ করা হয়েছে আদালতে।

মামলার অভিযোগ বলা হয়েছে, এ টাকা যারা জোগাড় করেছেন তাদের মধ্যে মূল ব্যক্তি হলেন হারিস চৌধুরী।

এ টাকা জোগাড় করার জন্য হারিস চৌধুরী তার একান্ত সচিব জিয়াউল ইসলাম মুন্নাকে ব্যবহার করেছেন।

এছাড়া তৎকালীন ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের মেয়র সাদেক হোসেন খোকার এপিএস মনিরুল ইসলাম খানকে এ কাজে ব্যবহার করা হয়েছে বলে মামলার অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে।

মামলায় খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে সেসব অভিযোগ আনা হয়েছে সেগুলোকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য-প্রণোদিত বলে বর্ণনা করেছেন তার আইনজীবীরা।

তারা বরাবরই বলেছেন, ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় খালেদা জিয়া কোন প্রভাব খাটিয়ে জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্টের জন্য অর্থ জোগাড় করেন নি।

বিএনপি নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের সহায়তায় এই ট্রাস্ট ফান্ড গড়ে উঠেছে বলে আইনজীবীরা আদালতে যুক্তি প্রদান করেছেন।