সাকিব আল হাসান: কন্যা আলাইনা 'সবচেয়ে বড় গিফট আল্লাহর তরফ থেকে'

মাগুরায় ফয়সাল নামেই পরিচিত সাকিব আল হাসান
Image caption মাগুরায় ফয়সাল নামেই পরিচিত সাকিব আল হাসান

আঙুলের ইনজুরিতে এই মূহুর্তে ক্রিকেট থেকে দূরে বাংলাদেশ ও বিশ্বের অন্যতম সেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান। সময়টা উপভোগ করতে গিয়েছিলেন তাঁর সবচেয়ে পছন্দের জায়গা জন্মভূমি মাগুরায়। সেখানেই তাঁর সঙ্গে ক্রিকেট ও ক্রিকেটের বাইরে ব্যক্তিগত নানা বিষয় নিয়ে একান্তে কথা হয় বিবিসি বাংলার।

প্রথম সাক্ষাৎ

প্রথমবার মাগুরায় পা রাখলেও সাকিব আল হাসানের বাড়ির ঠিকানা পেতে কোন অসুবিধাই হল না। সাকিবের দেয়া নির্ধারিত সময়ের আগেই পৌঁছে যাই তার বাড়িতে।

বাইরে কোন নামফলক না থাকায় অবাক হলেও ভেতরে ঢুকে সাদামাটা তিনতলা বাড়িতে ঘুরতে ঘুরতে বিস্ময়ের ঘোরও কাটতে থাকে।

সাকিবের আটপৌরে উঠানে ততক্ষণে ভিড় জমতে শুরু করেছে ভক্তদের। কিছু আছে সাহায্যপ্রার্থী, কেউবা সুদূর গোপালগঞ্জ বা আরো দূর থেকে এসেছেন শুধুই একঝলক দেখতে। খানিকক্ষণ পরেই সদর দরজা দিয়ে প্রবেশ করে সাকিব আল হাসানের গাড়ি।

জিন্স ও কালো পাঞ্জাবীতে তিনি নামতেই শুরু হয় ভক্তদের সেলফি। দূর থেকেই তার চিরচেনা লাজুক হাসির সম্ভাষণ মেলে।

আমাদের ক্যামেরাও তখন রোলিং। দেখছিলাম কি ধৈর্য্য নিয়ে হাসিমুখে সবার আবদার মেটাচ্ছেন, কথা শুনছেন, বলছেন! তবে যে সবাই বলে সাকিব অল্পভাষী, অর্ন্তমুখী, সহজে মিশতে পারেন না! আলাপটাও তবে এখান থেকেই শুরু করা যাক।

"আসলে যারা জানেনা তাদের একটা পারসেপশন থাকবেই, তবে আমি কিন্তু প্রচুর আড্ডা দেই। বন্ধুদের সাথে অনেক সময় কাটানো হয়, হয়তো সবার সামনে গিয়ে আড্ডা দেইনা, আমরা আসলে নিজেদের মতো করে সময়-সুযোগ তৈরী করে নিই," বলছিলেন সাকিব।

"আর এই ভক্তদের ব্যাপারটি আমি খুব এনজয় করি। হয়তো অনেকে একসাথে ঘিরে ধরলে বিড়ম্বনা লাগে, এছাড়া এসব আমাকে সবসময় ইন্সপায়ার করে আরো ভালো খেলতে।''

ছবির কপিরাইট Shakib Al Hasan
Image caption ছোটবেলায় ফুটবলের সাথেই বেশি সখ্য ছিল সাকিবের

১২-১২-১২

গত ছয় বছরে সাকিবের জীবনে বদল এসেছে অনেক। তাঁর জন্য এখন বছরের শেষভাগটা জীবনের সবচেয়ে গূরুত্বপূর্ণ সময়। তবে নিজের বিবাহবার্ষিকী ১২ই ডিসেম্বরের চেয়ে বেশি অপেক্ষায় থাকেন ৮ই নভেম্বরের জন্য। সেদিন যে তাঁর রাজকন্যার পৃথিবীতে আসার দিন!

"এটা সবচেয়ে বড় গিফট আল্লাহর তরফ থেকে। আগে অনেকেই বলতো বাবা হওয়াটা অন্যরকম অনুভূতি, আমার বাবাও বলেছে, আমি তখন বুঝতাম না, কিন্তু এখন বুঝি!"

"এটা আসলে এমন একটা ফিলিংস বলে বোঝানো সম্ভব নয়। ওর কাছে আসলেই আমার সব ক্লান্তি দূর হয়ে যায়।''

বাবার গন্ধ পেয়েই বুঝি দোতলার জানালা গলে হাত বাড়িয়ে দিয়ে হাঁকডাক শুরু হয়ে যায় আলাইনা হাসান অব্রির "বাবাই... বাবাই.."।

বাবা নিচ থেকে মুখ তুলে আমাদের সাথে ব্যস্ততার কথা বলেন, কিন্তু মেয়ে কি আর মানতে চায়! অবশেষে দৃশ্যপটে আবির্ভাব অব্রির মা, সাকিবের স্ত্রী উম্মে আহমেদ শিশিরের। আমাদের কথার মোড়ও ঘুরে যায়। পরিবারকে কতটা সময় দেন বাংলাদেশের প্রাণ?

"চেষ্টা করি খেলার বাইরে যতোটা সম্ভব সময় দেয়ার। মাঝে মাঝে অভিযোগ বা হতাশা আসে। কিন্তু আমরা দুজনই অ্যাডজাস্ট করি। তবে আমি না থাকলে ও খুব খারাপ ফিল করে, মিস করে, এটা বুঝতে পারি।''

ছবির কপিরাইট Shakib Al Hasan Facebook Page
Image caption আলাইনা হাসান অব্রি ও উম্মে আহমেদ শিশির

লাইফের বেস্ট সময়

সাকিব প্রসঙ্গ আসলেই উঠে আসে তাঁর সবকিছুতে স্বাভাবিক থাকা ও বাস্তববাদী মানসিকতার কথা। আবেগী বাঙালি চরিত্রের বিপরীতে সাকিবের এটা কি একেবারেই সহজাত নাকি তৈরী করা?

সাকিবের ভাষায় এটা তার ভেতরে ছোটবেলা থেকেই, কিন্তু আবিষ্কার হয় বিকেএসপিতে যাবার পরে।

"ওখানকার টাফ সিচুয়েশন, ওয়ে অব লিভিং, আমাকে আসলে তৈরী করেছে। দেখেন আমার ব্যাচে ৩০ জনের মতো ছিলাম, তাঁদের মধ্যে একমাত্র আমি এই জায়গা পর্যন্ত আসতে পেরেছি, সেটা হয়তো আমি বাস্তববাদী বলেই। আর আমি যেরকম মধ্যবিত্ত সাধারণ ঘর থেকে উঠে এসেছি তাতে আসলে এছাড়া আর উপায়ও ছিলনা।''

বিকেএসপির প্রসঙ্গ উঠতেই যেন হুট করে টাইম মেশিন ট্রাভেলে চলে যান ৩১ বছরে পা রাখা সাকিব আল হাসান। কথার দুয়ার খুলে বসেন।

"বিকেএসপিতে এত স্মৃতি যে তা দিয়ে রীতিমতো বই লেখা যাবে। শুরুতে প্রথমবার বাসার বাইরে ফ্যামিলি ছেড়ে খানিকটা কঠিন মনে হয়েছে, কিন্তু এরপর নতুন বন্ধু পেয়ে যেতেই সব অসুবিধা দূর হয়ে যায়। আমার লাইফের বেস্ট সময় ছিল এটা।''

হারতে রাজি নই

আমরা ২০১৮ এর মাগুরা থেকে আরো পেছনে যেতে চাই। টাইম মেশিনটা এবার স্থির করি স্কুলপড়ুয়া হাফপ্যান্ট পরিহিত সাকিবের উপর।

স্কুলের বাইরে যে সুযোগ পেলেই কখনো ফুটবলের পেছনে তো আবার কখনো ব্যাট-বলের সাথে ছুটছে, আর শীতের কুয়াশা ভেদ করে প্রায়ই দেখা মেলে ব্যাডমিন্টনের র‍্যাকেট হাতে। বাবা মাশরুর রেজা ছিলেন পেশাদার ফুটবলার, ছেলেকেও সেই পথেই তৈরী করছিলেন।

কিন্তু বাংলাদেশ ১৯৯৭ সালে আইসিসি ট্রফি জিতলে বদলে যায় দৃশ্যপট।

"আমি আসলে ফুটবলার না ক্রিকেটার হব এমন কোন পরিকল্পনা নিয়ে এগুইনি। মিডল ক্লাস ফ্যামিলির যেমন চিন্তা পড়াশোনা দিয়েই কিছু করা। তবে আমি খেলতে পছন্দ করতাম, সব খেলাই সিরিয়াসলি নিতাম, কখনো হারতে চাইতাম না।"

"১৯৯৭ সালের পর ক্রিকেটের হাওয়া লাগে। তখন দেখা যেতো যে শুক্রবার বিকালে সবাই টিভিতে বাংলা সিনেমা দেখছে, কিন্তু আমি গিয়ে সবাইকে খেলার জন্য ডেকে আনতাম। আমি কিন্তু অনুর্ধ্ব ১৯ দলে খেলা পর্যন্তও ভাবিনি যে কখনো জাতীয় দলে খেলবো বা আমাকে খেলতেই হবে। এমনটা ভাবলে হয়তো ক্রিকেটার হতে পারতাম না, সেটা প্রেশার হয়ে যায়।"

"জাতীয় দলে দুই বছর খেলার পর ভাবলাম যে, ঠিক আছে, এটাকে এখন প্রফেশন হিসেবে নেয়া যায়। আমি তো এখন দেখি ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে কেমন প্রেশার শিক্ষার্থীদের। তারা ধরে নেয়, এটাই হতে হবে। আর এটাই বাড়তি চাপ।"

সাকিব আরো বললেন, "আমি জীবনে কখনো ফিক্সড করিনি কোনকিছু। আমার যে অপশনগুলো ছিল, সবগুলো চেষ্টা করেছি। আমি আলাইনাকেও কোনকিছু চাপিয়ে দিতে চাইনা। শুধু ভালো মানুষ করতে চাই।"

ছবির কপিরাইট Shakib Al Hasan Facebook Page
Image caption হাজার ব্যস্ত থাকলেও পরিবারকে সময় দিতে ভোলেন না সাকিব

ততক্ষণে টাইম মেশিন থেকে বর্তমানে আমরা। নিজের বাড়ির পেছনে বাগানমতো জায়গায় নিয়ে গিয়ে আফসোস করেন সাকিব।

"জানেন এখানে এত বাড়ি-ঘর ছিলনা, খোলা মাঠ ছিল। বিদ্যুতের খুটিতে স্টাম্প বানিয়ে খেলতাম। কলা, মুরগী, বাজি রেখে খেলা হত।''

আমরা হাসি আটকাতে পারিনা। সাকিব সিরিয়াস ভঙ্গিতে বলে চলেন, "এখানে খেলার প্রভাব কিন্তু এখনো রয়ে গেছে আমার মধ্যে। কারণ ছোটবেলায় যখন খেলতাম তখন হয়তো ও পাশে জোরে মারা যাবে না, বল হারিয়ে যাবে বা ঐ বাড়িতে গেলে বল আর ফেরত পাবো না, তাই অনেক শট খেলতাম না।"

"এ কারণে আমার কিন্তু এখনো কিছু শটে দুর্বলতা আছে। আবার কিছু শট যে ভালো খেলি, সেটাও এখানে খেলার কারণেই।''

কি, সাকিবের গল্পের সাথে নিজের শৈশবের মিল খুঁজে পাচ্ছেন?

ঝটপট প্রশ্ন, চটপট উত্তর

প্রিয় খাবার: দেশি সব খাবার খাই, শুধু পটল ছাড়া, ওটার বিচি ভালো লাগে না।

পছন্দের পোশাক: আরামদায়ক যেকোন কিছু; যেমন - পাঞ্জাবী। আর কিছুদিন আগে ফটোশ্যূটে প্রথমবার লুঙ্গি পরে মনে হয়েছে এটাও আরামদায়ক পোশাক।

পছন্দের জায়গা: মাগুরা। নিজের রুম।

প্রতিপক্ষ ব্যাটসম্যান হিসেবে কঠিন: সবাইকে আউট করেছি, শুধু (ক্রিস) গেইল ছাড়া।

বোলার হিসেবে প্রতিপক্ষ: নির্দিষ্ট কেউ নেই, উইকেটের উপর নির্ভর করে।

রেগে গেলে: আগে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারতাম না, কিন্তু এখন পারি। একটু সময় নেই, ভাবি - তেমন রিঅ্যাক্ট করি না।

Image caption বয়সের সাথে পরিণত হয়েছেন সাকিব আল হাসান

যেখান থেকে শুরু

সাকিবের আতিথেয়তায় মধ্যাহ্নভোজ শেষে আমরা বেরিয়ে পড়ি তাঁর শহর মাগুরা আবিষ্কারে।

প্রথম শ্রেণী থেকে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত পড়া তাঁর মডেল স্কুল মাঠে গিয়ে দেখা মেলে পরবর্তী প্রজন্মের সাকিব হবার চেষ্টা। সাকিবের অন্যতম প্রিয় শিক্ষক শফিকুল ইসলামও বলছিলেন এই শিশু কিশোররা কিভাবে তাকে আইডল মেনে বড় হচ্ছে।

আমরা দেখতে যাই, যেই মাঠ সাকিব আল হাসানকে তৈরী করেছে সেই মাগুরা জেলা স্টেডিয়াম। সেখানেও তাকে নিয়ে রীতিমতো কাড়াকাড়ি।

সাকিবের প্রথম কোচ সৈয়দ সাদ্দাম হোসেন গোর্কি বলছিলেন এখানে সাকিবের প্রথম অনুশীলনে আসা, পেস বল করা, তারপর স্পিনার হয়ে ওঠার গল্প। "আমি যখন বললাম তুমি স্পিন বল কর, তখন ঐটুকু বয়সে ও আমাকে প্রশ্ন করলো আমি কেন পেস না করে স্পিন করবো?"

"আমি অবাক হয়ে তাকে বললাম - কারণ তোমার বাঁহাত ছোট, পেসাররা টল ফিগার হয়। ও পরদিন থেকে স্পিন করা শুরু করে এবং ওকে কিছু শেখানোর আগেই আমি দেখলাম তার সহজাত প্রতিভা আছে।''

সাকিবও বলছিলেন এই মাঠে তাঁর প্রথম আনুষ্ঠানিক ক্রিকেট ম্যাচের কথা, ১ বলে ১ রানে নট আউট আর প্রথম বলেই উইকেট পাওয়ার কথা তিনি ভুলতে পারবেন না কখনোই।

এবার তবে বিদায়

"কাজ শেষ হলে মাগুরার স্পেশাল চপ খাওয়াবো'' - সাকিবের এ আমন্ত্রণ ফেরানোর সাধ্য নেই। তাইতো সন্ধ্যা হতেই আবার হাজির হয়ে যাই কেশব মোড়। তিনতলার একেবারে উপরে সাকিবের বন্ধুদের ভিড়। মুড়ি, চপ, চানাচুর আর মিষ্টির আয়োজন চলছে।

ততক্ষণে আমরা ঢুঁ মারি জন্মদাত্রী শিরিন রেজার ড্রয়িংরুমে। পুরনো অ্যালবাম নিয়ে স্মৃতির ঝাঁপি খুলে বসেন তিনি।

"ওর হাতে সারাক্ষণ বল থাকতো। আমি খাওয়াতাম, ও বল দেয়ালে ছুড়ে মারতো, পড়ার সময়ও হাতে বল। এমনিতে খুব শান্ত, কিন্তু খেলার সময় দুরন্তপনার শেষ থাকতো না। ওর বাবা অনেক বকাবকি করেছে।

"একদিন তো পরীক্ষার আগে ও খেলতে চলে গেছে। এরপর যখন আসছে আমি রাগ করে ব্যাট কেটে ফেলি। ও মন খারাপ করে পরীক্ষা দিতে চলে যায়। এরপর এসে শুধু বলে তুমি ব্যাট না কেটে আমাকে মারতা।''

আরো কিছু গোপন তথ্য হয়তো পাওয়া যেতো কিন্তু সাকিব এসে দেন হানা।

Image caption বন্ধুমহলে সাকিব আল হাসান

আমরা এবার হাজির হই বন্ধু মহলে। সমানে চলতে থাকে খাওয়া, আড্ডা, খুনসুটি। জানতে চাই ক্রিকেট নিয়ে আলোচনা হয়না?

"তেমন একটা না, শুধু যেদিন খেলা থাকে সেদিন হয়তো হয়'' - বলেন বন্ধুদের একজন। আমরা তাঁদের নিপাট আড্ডায় আর অনাহুত হয়ে থাকতে চাইনা।

আরেকবার ছবি তোলার পর্ব সেরে যখন মাগুরার অন্ধকার চিরে বিদায় নেই, তখন কানের মধ্যে মিস্টার অলরাউন্ডারের একটা কথাই বাজতে থাকে, "আমি কোন পার্সোনাল টার্গেট সেট করি না, দেশের জন্য অবদান রাখতে চাই, কখনো ভাবিনি আমাকে নাম্বার ওয়ান হতে হবে, শুধু ভালো খেলতে চেয়েছি, বাকি অর্জন সব অটোমেটিক হয়ে গেছে।''

আরো পড়তে পারেন: ক্রিকেটার সাকিব আইসক্রিম কিনতে যাবেন কিভাবে?

আপনার ডিভাইস মিডিয়া প্লেব্যাক সমর্থন করে না
মাগুরায় নিজ বাড়ির সামনে সাকিব আল হাসান

সাকিব আল হাসানের পুরো সাক্ষাৎকারটি বিবিসি বাংলার ইউটিউব চ্যানেল পাওয়া যাবে।