নিরাপদ সড়ক: রাস্তার দায় কার - গাড়ি চালক না মালিক?

রোকেয়া লিটা ছবির কপিরাইট রোকেয়া লিটা

আগে সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলো এলেই ভাবতাম, আজ রাস্তায় জ্যাম কম থাকবে, বাসে যাত্রী কম থাকবে, তাই আজ বাসে করে অফিসে যাওয়া যেতেই পারে। আমার অনুমান ঠিকই হতো, বাসে যাত্রী কম থাকতো, কিন্তু বাস এমন ধীরগতিতে চলতো যে মনে হতো বাসের কন্ডাকটর পারলে মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে যাত্রী ডেকে বাসে তুলে আনে।

এই অহেতুক দেরি করার কারণ নিশ্চয়ই আর্থিক ক্ষতি - বাসে যাত্রী কম উঠলে বাস মালিকের আর্থিক ক্ষতি হবে, এমনটাই ধারণা ছিল আমার। তবে সাথে সাথেই আবার মনে হতো, বাস মালিকের জন্য চালক, কন্ডাকটরের এত দরদ যে এভাবে থেমে থেকে যাত্রী ডেকে ডেকে বাস ভর্তি করার চেষ্টা করছে!

ভেবে অবাক হতাম, চালকরা এইভাবে গাড়ি চালানোর এত ধৈর্য পায় কীভাবে?

বেশ কয়েক বছর পরে আমি আমার প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে পেয়েছি। বাসায় নতুন একজন গৃহপরিচারিকা যোগ দিয়েছে। তার স্বামী আগে বাসের হেলপারি করতো, এখন সে বাস চালায়। তার কাছেই জানতে পারলাম, বাস মালিকদের সাথে চালকদের চুক্তি থাকে।

একটি বাস কোন একটি নির্দিষ্ট গন্তব্যে যাবে এবং আসবে, তার জন্য একটি টাকার অংক নির্ধারণ করে দেয়া হয়, হতে পারে এটা ১৫০০ টাকা বা ২০০০ টাকা অথবা তারও বেশি বা কম।

অর্থাৎ, বাসে কজন যাত্রী উঠল বা নামল তা বাস মালিকের দেখার বিষয় নয়। প্রতি ট্রিপের জন্য ওই নির্ধারিত অংকের টাকা চালক দিবে তার বাস মালিককে। চালক তো নিজের ক্ষতি করে বাস চালাবে না, বরং কিছুটা লাভ করার চেষ্টা করবে।

আরো পড়তে পারেন:

মেয়ের জন্য বাবা ভাড়া করেছেন যে মা

দিনের বেলায় নাইটি পরা নিষেধ ভারতের যে গ্রামে

ছবির কপিরাইট NurPhoto
Image caption ঢাকার বাস পরিবহন: অল্প বয়স থেকে 'হেলপারি'।

যার ফলে যাত্রীদের মনে হবে বাসে জায়গা নাই তারপরও চালক বাস থামিয়ে যাত্রী নিচ্ছে কেন বা রাস্তায় যাত্রী নাই, তবুও চালক সামনে এগোচ্ছ না কেন বা কন্ডাকটর কি বাসা থেকে যাত্রী ডেকে এনে বাসে উঠাতে চাইছে নাকি?

আসলে আমাদের পরিবহন সেক্টরের খুঁটিনাটি বিষয়গুলো আমাদের জানা দরকার। আমরা ক'জন জানি যে একজন চালক প্রতিদিন গড়ে তিন ঘণ্টাও ঘুমাতে পারে না?

আমার বাসার ওই গৃহপরিচারিকার স্বামী নাকি ভোরে আজান দেয়ার আগেই ঘর থেকে বের হয়, কারণ তাকে সকাল ৬টার বাসটা চালাতে হবে। সে বাসায় ফেরে বেশিরভাগ সময়ই রাত একটা বা দেড়টার দিকে। নিশ্চয়ই সে বাসায় এসেই ঘুমিয়ে পড়ে না। খাওয়া, ফ্রেশ হওয়া, সংসারের খোঁজ-খবর নেয়ার জন্য তার দেড়-দুই ঘণ্টা যাবেই।

তাহলে চালকের ঘুমানোর সময় কই? আর একজন চালক যদি দিনে তিন ঘণ্টাও ঠিক মতো না ঘুমায়, তবে সে বাস দুর্ঘটনা ঘটাবে না তো কে ঘটাবে?

যে কোন সড়ক দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে আমরা প্রথমেই চালককে দোষারোপ করি। আসলে দোষ তো পুরো সিস্টেমের যা চালকের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়।

গণপরিবহন চালানো যদি আর দশটা চাকরির মতো হতো এবং এর একটি নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা থাকতো, তাহলে নিশ্চয়ই এত বেশি দুর্ঘটনা ঘটত না। কারণ অন্যান্য পেশার মতোই, চালকেরও চাকরি হারানোর ভয় থাকতো।

আরো পড়তে পারেন:

ঘরের বাইরে নারী কেন এত প্রশ্নের মুখে?

ভারতের শ্রম বাজার থেকে নারীরা কেন উধাও?

ছবির কপিরাইট NurPhoto
Image caption শ্রমিকের বিক্ষোভ: বাস চালক দেশের শত্রু নয়, সেবক।

এখন যেভাবে চলছে তাতে তো চাকরি হারানোর ভয় নেই, বরং একটা ব্যবসায়িক মনোভাব তৈরি হয়েছে। মালিককে একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা দিয়ে নিজে যত কামানো যায় ততই লাভ। ফলে এই ধান্দাই কিন্তু ৫০ আসনের বাসে ৭০ জন নিতে বা যাত্রী বাড়ানোর জন্য যেখানে সেখানে বাস থামাতে উৎসাহিত করছে।

যেহেতু চালকের নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টার কথা মাথায় রাখা হচ্ছে না, ফলে ওই একই চালক ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছে। দেখার কেউ নেই, মালিকের তো চুক্তি অনুযায়ী টাকা এলেই হলো, চালক কয় ঘণ্টা বাস চালালো তা দেখার দরকার নেই তার।

এই যদি হয় গণপরিবহনের ভেতরকার চিত্র, তবে সড়ক দুর্ঘটনার দায় কখনই চালকের একার নয়। এতে পরিবহন মালিকেরই দায় সবচে বেশি। কিন্তু নতুন যে সড়ক পরিবহন আইনের কথা শুনছিলাম তাতে এই বিষয়গুলো কতটুকু গুরুত্ব পেয়েছে?

বেশিরভাগ বিধিবিধান গুলোই তো চালকের জন্য। পরিবহন মালিকদের জন্য বিধিবিধান কই? এতে সাধারণ মানুষের স্বার্থ সংরক্ষিত হয়েছে কতটুকু?

সিঙ্গাপুর-মালয়েশিয়ায় বাসযাত্রীদের জন্য বীমা করা থাকে যাতে কোন দুর্ঘটনা ঘটলে পরিবহন মালিকের পক্ষ থেকে তার ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা যায়। বাংলাদেশে কই এসব কোন কিছু আছে বলে তো শুনি না। তো মালিক আর দুর্ঘটনা রোধে চালকের কর্মঘণ্টার দিকে নজর দিবেন কেন?

ছবির কপিরাইট NurPhoto
Image caption বাসে অতিরিক্ত যাত্রী নেয়া ঢাকার নিত্য দিনের ঘটনা।

দুর্ঘটনা ঘটলেও তো যাত্রী তেড়ে আসে চালককে মারতে। পরিবহন মালিকরা তো আছেন বেশ আরামে। সত্যি বলতে কী, এই পুরো ব্যবস্থাটার পরিবর্তন বা উন্নয়ন না ঘটিয়ে কেবল চালকের জন্য দু-চারটা আইন করে অবস্থার উন্নয়ন করা সম্ভব নয়।

বরং এসব আইন পরিস্থিতিকে আরো বিপদজনক করে তোলে, এবং চালক ও যাত্রীকে পরস্পরবিরোধী অবস্থানে নিয়ে যায়। চালক হয়ে ওঠে যাত্রীর শত্রু আর যাত্রী হয়ে ওঠে চালকের কাছে গিনিপিগ।

গণপরিবহণে সবার আগে এই চুক্তিভিত্তিক ড্রাইভিং বন্ধের ব্যবস্থা নিতে হবে। ড্রাইভিংকে পেশা হিসেবে নিতে হবে। বিদেশে গাড়ি চালানো একটি সম্মানজনক পেশা।

আমি সিঙ্গাপুর-মালয়েশিয়ায় দেখেছি, ড্রাইভারকে বলা হয় ক্যাপটেন। আমাদের পাশের বাসায় এমনই একজন ক্যাপটেন থাকতো। বাসের ড্রাইভার বলে তাকে বা তার পরিবারকে অসম্মান করার কথা কারো মাথাতেই আসতো না।

আমাদের দেশে খুব সম্ভবত ঘনঘন দুর্ঘটনার কারণে চালকদের সবসময়ই নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখা হয়, সম্মান করার তো প্রশ্নই ওঠে না। কেন হচ্ছে না এমন? কারণ আমাদের সিস্টেমে সমস্যা। আর কিছু নয়।

ক'দিন আগে উবারে করে বাসায় ফিরছিলাম। উবারের চালকের সাথে কথা হলো, সে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। লেখাপড়ার পাশাপাশি বাড়তি আয় করছে গাড়ি চালিয়ে। বাংলাদেশে যদি উন্নত মানের বাস আনা হয়, বাস চালককে আর দশটা পেশার মতোই সুযোগ-সুবিধা দেয়া হয়, তাহলে নিশ্চয়ই পেশা হিসেবে ড্রাইভিংও জনপ্রিয়তা পাবে। প্রয়োজন শুধু কাঠামোটা মজবুত করে গড়ে তোলা।

অর্থাৎ এখন যেভাবে চলছে একেবারেই তার উল্টোটা করতে হবে। পুরো গণপরিবহন খাতকে তিন-চারটি বড় বড় কোম্পানির অধীনে দিয়ে দিতে হবে। চালকদের চাকুরিভিত্তিক নিয়োগ দিতে হবে। বাসে যাত্রী কম উঠুক আর বেশি উঠুক তাতে যেন বাস চালকের কোন মাথা ব্যথা না থাকে, সে যেন মাস শেষ বেতনটা ঠিক মতো বুঝে পায়।

চালকের একমাত্র মাথাব্যথার কারণ হবে ট্রাফিক আইন মেনে নিরাপদে গাড়ি চালানো।