বৈবাহিক সম্পর্কের মধ্যে ধর্ষণ: কী বলছেন সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারকারীরা

খবরটি প্রকাশের পর বিবিসি বাংলার সামজিক যোগাযোগ পাতায় অনেক মানুষ নানা ধরণের মন্তব্য করেছেন
Image caption খবরটি প্রকাশের পর বিবিসি বাংলার সামজিক যোগাযোগ পাতায় অনেক মানুষ নানা ধরণের মন্তব্য করেছেন

বৈবাহিক সম্পর্কের মধ্যে ধর্ষণকে জাতিসংঘ ভয়াবহ ধরনের পারিবারিক সহিংসতা বলে মনে করে।

স্বামীর কাছে দিনের পর দিন যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, বাংলাদেশের এমন এক নারী বিবিসির কাছে তার অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়েছেন, যার ফলে তিনি বিচ্ছেদ করতে বাধ্য হন।

তিনি বলেছেন, "যখন তার ইচ্ছে হতো তখনই আমি বিছানায় যেতে বাধ্য হতাম। ঘরে আমার মা থাকতো, ছোট একটা ভাই থাকতো। না বললে সে প্রচণ্ড মারধোর করতো। সে আমার অসুস্থতাও মানত না। আমার যখন পিরিয়ড হতো তখন আমি একটু হাফ ছেড়ে বাঁচতাম। ভাবতাম হয়ত কয়েকটা দিন আমি টর্চারের হাত থেকে বেঁচে যাবো।"

আরো পড়ুন:

স্বামীর হাতে ধর্ষণ: বাংলাদেশে এক নারীর অভিজ্ঞতা

ছবির কপিরাইট Shyadul Islam
Image caption প্রতিবেদনটির সমালোচনা করে কয়েকজনের স্ট্যাটাস

বৈবাহিক সম্পর্কের মধ্যে ধর্ষণ নিয়ে বিবিসি বাংলা রবিবার একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। কিন্তু বিবিসি সামাজিক মাধ্যমে সেই প্রতিবেদনটি শেয়ার করার পর অনেকে পক্ষে বিপক্ষে মন্তব্য করেছেন।

অনেকেই এই প্রতিবেদন এবং বৈবাহিক সম্পর্কে ধর্ষণের বিষয়ে সমালোচনামূলক মন্তব্য করেছেন।

এস আলম মানিক নামের একজন মন্তব্য করেছেন, তাই বলে এটাকে ধর্ষণ বলা হবে? সামাজিক ও ধর্মীয় রীতিতে বিয়ে হবার পর স্বামী/স্ত্রী একে অপরের সাথে থাকবে এটাই চিরাচরিত নিয়ম।এটাতে ধর্ষণ ট্যাগ দেওয়া মানে সামাজিক ও ধর্মীয় ভাবে গড়ে উঠা বিয়ে নামক বন্ধনকে হুমকিতে ফেলে দেওয়া। তবে স্বামীর উচিত বোঝাপড়া করে সহবাস করা, স্ত্রীরও উচিত স্বামীকে সাপোর্ট দেওয়া।

Image caption অনেকে সমালোচনা করলেও, অনেক ফেসবুক ব্যবহারকারী বিষয়টি নিয়ে সচেতনতার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন

যেমন আলামিন প্রধান নামের একজন লিখেছেন, বিবিসির রিপোর্ট দেখে মনে হচ্ছে তারা চায় এদেশে পশ্চিমা সংস্কৃতি চালু হোক।যেখানে মেয়েরা বিয়ে করবে না। ইচ্ছা মতো সবার সাথে অবাধে যৌন মিলন করতে পরবে। এটাই তাদের স্বাধীনতা...? ইচ্ছা মতো পরকীয়া করবে যা পশ্চিমা বিশ্বে আইন দ্বারা বৈধ। তারা চায় সেটা এখানেও চালু হোক। তাদের উদ্দেশ্যে মনে হয় সেটাই।

মোঃ জামিল রেজা নামের একজন লিখেছেন, আরেকটা নতুন টার্ম তৈরি করা হচ্ছে সমাজকে অস্থিতিশীল করার জন্য এবং ডিভোর্সের সংখ্যা বাড়ানোর জন্য।আর টার্ম টা হচ্ছে "বৈবাহিক ধর্ষণ"।

Image caption সূর্য মনির ফেসবুক স্ট্যাটাস

সামিরা বিনতে হোসেইন নামের একটি আইডি থেকে মন্তব্য করা হয়েছে, এসব কুফা, কুরুচিপূর্ণ, অশিক্ষনীয়, বাদাইম্মা, আজাইরা, আজে-বাজে, ফালতু মার্কা নিউজ না দিয়ে ভাল, গঠনমূলক, শিক্ষণীয়, উপকারী নিউজ দেয়ার জন্য এডমিনকে বিনীত অনুরোধ করছি।

জিসান ভুঁইয়া নামের একজন লিখেছেন, বিবাহিত স্ত্রী এর সাথে যদি চাহিদামত যৌন মিলন না করতে পারে তাহলে একজন পুরুষ কোথায় যাবে?

মোহাম্মদ ইউসুফ নামের একজন ফেসবুক ব্যবহারকারীর মন্তব্য, বিয়ে করে বউকে শোকেসে রেখে দিলে কেমন হবে?

বিবিসির পাতায় আসা বেশিরভাগ ব্যক্তিই এরকম নেতিবাচক মন্তব্য করেছেন।

বিষয়টি নিয়ে কাজ করেন এমন নারী অধিকার কর্মীরা বলছেন, স্বামী দ্বারাও যে ধর্ষণ সম্ভব সেটি বাংলাদেশে সামাজিকভাবেও একটি অদ্ভুত ধারনা বলে বিবেচিত হয়। তাছাড়া, বাংলাদেশের কোন আইনেই বৈবাহিক সম্পর্কের মধ্যে ধর্ষণ বিষয়টি অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত নয়।

সমাজবিজ্ঞানী মাহবুবা নাসরিন বলছেন, ''বাংলাদেশে এখনো সামাজিক সাংস্কৃতিক দিক থেকে 'বৈবাহিক ধর্ষণ' বিষয়টার সঙ্গে বেশিরভাগ মানুষ পরিচিত না। বিশেষ করে মেয়েদের যে মানসিক একটি ব্যাপার আছে, সেটা নিয়ে বাংলাদেশে খুব একটা আলোচনা হয় না, সেই সচেতনতাও নেই।''

তিনি বলছেন, প্রাপ্তবয়স্ক দুইজন নর-নারীর সম্পর্ক সম্মতির ভিত্তিতেই হওয়া উচিত। যেকোনো বিষয়ে জবরদস্তি বা জোর খাটানো সহিংসতার মধ্যেই পড়ে।

Image caption সাদিয়া খাতুন মনে করেন, স্বামীর ডাকে স্ত্রী সাড়া দেওয়া উচিত, তবে স্বামীকেও স্ত্রীর মানসিক দিকে লক্ষ্য রাখা উচিত

এর ফলে অনেক সময় মেয়েদের মানসিক অনেক সমস্যা তৈরি হয়, অনেকে চিকিৎসকের কাছেও যান বলে তিনি জানান।

তবে নারী অধিকারের পক্ষেও মন্তব্য করেছেন কেউ কেউ।

চৌধুরী তানভীর আহমেদ রিটু টুইট করেছেন, এর বিরুদ্ধে আমাদের সবার এগিয়ে আসার এখনি সময় এবং বৈবাহিক ধর্ষণ বন্ধ করা উচিত। বিবিসি বাংলা এ নিয়ে প্রতিবেদন করেছে দেখে খুব ভালো লাগছে।

বাতিরুল হক সরদার লিখেছেন, ইচ্ছার বিরুদ্ধে সেক্স করাকেই ধর্ষণ বলে তা হউক স্বামী বা অন্য কেউ । বিয়ে করা মানে তা নয় যে যা ইচ্ছা তাই করবে । আমাদের দেশের অনেকেই তা বুঝতে পারেন না আবার আইনও নেই । সুতরাং নতুন আইন করতে হবে এবং মানুষকে সচেতন করতে হবে ।

তার এই মন্তব্যে ৮৭জন লাইক দিয়েছেন। হাবিবা আক্তার নামের একজন সংক্ষেপে লিখেছেন, ধন্যবাদ স্যার।

ছবির কপিরাইট NURPHOTO
Image caption ধর্ষণের প্রতিবাদে বিক্ষোভ

সূর্য মনি নামের একজন লিখেছেন,এখানে অনেক লোক কমেন্ট করেছেন কেউই আর ভাল মন্তব্য করেন নাই, শুধু আপনি একজন ভাল মন্তব্য করলেন, আপনাদের মত মানুষ যেদিন আমাদের সমাজে সংখ্যায় বেশি হবে সেইদিন আমাদের দেশটাই পাল্টে যাবে।

রিও আকরাম মন্তব্য করেছেন, ইচ্ছার বিরুদ্ধে যদি ধর্ষণ হয় তাহলে ইচ্ছার বিরুদ্ধে গায়ে হাত দেওয়াও শ্লীলতাহানির। বাস বা ট্রেনে কেউ কোনো মহিলার গায়ে ইচ্ছের বিরুদ্ধে হাত দিলে সেটা শীলতাহানির কেস হতে পারে কিন্তু কেউ ওয়াইফ বা হাসব্যান্ডের গায়ে তার ইচ্ছের বিরুদ্ধে হাত দিলে সেটাও শ্লীলতাহানি !!

বৈবাহিক সম্পর্কের মধ্যে ধর্ষণের বিষয়ে বাংলাদেশে কোন আইন নেই। বাংলাদেশে নারী অধিকার নিয়ে কাজ করে এমন সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন যাবত বিষয়টিকে পারিবারিক সহিংসতা হিসেবে স্বীকৃতির জন্যে আন্দোলন করেছে।

তবে নারীদের এই অমর্যাদা বা সহিংসতার ব্যাপারে এখনো সামাজিক পরিবর্তনের কোন ইঙ্গিত দেখতে পাচ্ছেন না এই সমাজবিজ্ঞানী।

Image caption সমাজবিজ্ঞানী মাহবুবা নাসরিন বলছেন, ''বাংলাদেশে এখনো সামাজিক সাংস্কৃতিক দিক থেকে 'বৈবাহিক ধর্ষণ' বিষয়টার সঙ্গে বেশিরভাগ মানুষ পরিচিত না।

সমাজবিজ্ঞানী অধ্যাপক মাহবুবা নাসরিন বলছেন, তাত্ত্বিক দিক দিয়ে শ্রেণীকক্ষে বা লেখালেখিতে এই বিষয়টি নিয়ে কথা হলেও, বাংলাদেশে সামাজিকভাবে এখনো এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয় না। সুতরাং পাল্টানোর মতো পরিবেশ বা আলোচনা, সচেতনতা এখনো তৈরি হয়নি।

"পাল্টাবে না, সেটা আমি বলবো না। যত বেশি আলোচনা হবে, সচেতনতা বাড়বে, তখনি সবাই বুঝতে শুরু করবে যে, বিবাহিত হলেও সম্মতি ছাড়া একটি মেয়ের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক করা যায়না"।

বিবিসি বাংলার অন্যান্য খবর:

লোনা পানি কীভাবে গর্ভপাত ঘটাচ্ছে নারীদের

রাজনীতি নিয়ে মাশরাফির ব্যাখ্যায় আলোচনার ঝড়

ইউক্রেনের জাহাজ জব্দ করলো রাশিয়া, উত্তেজনা চরমে

বিপর্যয়ে পড়েছে পৃথিবীর 'ফুসফুস'