মুম্বাই হামলার ১০ বছর: ষড়যন্ত্রকারীদের বিচারে বিদেশি রাষ্ট্রগুলো কী করেছে

২৬/১১র রাতে দাউ দাউ করে জ্বলছে মুম্বাইয়ের আইকনিক তাজ হোটেল ছবির কপিরাইট PAL PILLAI
Image caption ২৬/১১র রাতে দাউ দাউ করে জ্বলছে মুম্বাইয়ের আইকনিক তাজ হোটেল

ভারতের বাণিজ্যিক রাজধানী মুম্বাইকে প্রায় চারদিন ধরে স্তব্ধ করে রেখেছিল ২৬/১১-এর যে ভয়াবহ জঙ্গি হামলা, তার দশ বছর পূর্ণ হচ্ছে আজ সোমবার।

কোলাবার সমুদ্রতটে ডিঙি নৌকায় করে এসে নামা জনা-দশেক জঙ্গি মুম্বাইয়ের নানা জায়গায় গুলি-বোমা-গ্রেনেড দিয়ে যে হত্যা-লীলা চালিয়েছিল, তাতে মারা যান কম করে ১৬৪ জন।

এদের মধ্যে অন্তত ৩০জনই বিদেশি - যার মধ্যে আমেরিকা, ইসরায়েল, জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ফ্রান্স প্রত্যেক দেশেরই একাধিক নাগরিক ছিলেন।

পাশ্চাত্যের পর্যটকরা যে ওই হামলার অন্যতম নিশানা ছিলেন তাতে কোনও সন্দেহ নেই - কিন্তু এই হামলার ষড়যন্ত্রকারীদের বিচারের কাঠগড়ায় আনতে এই বিদেশি রাষ্ট্রগুলো কতদূর কী করেছে?

২০০৮ সালের ২৬ নভেম্বর মুম্বাইতে নজিরবিহীন জঙ্গি হামলায় যারা নিহত হয়েছিলেন, তাদের মধ্যে ভারত ছাড়াও আরও অন্তত ১৬টি রাষ্ট্রের নাগরিকরা ছিলেন - যেগুলোর প্রায় সবই পশ্চিমা দুনিয়ার দেশ।

গুরুতর জখম হয়েছিলেন আরও অন্তত সাতটি দেশের নাগরিকরা।

এদের প্রায় সবাই ছিলেন তাজমহল প্যালেস হোটেল বা নরিম্যান পয়েন্টে ওবেরয় হোটেলের অতিথি - কিংবা তারা খেতে এসেছিলেন কোলাবার লিওপোল্ড ক্যাফে রেস্তোরাঁয়।

২৬/১১ নামে পরিচিত এই হামলার দশম বর্ষপূর্তিতে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পিও এই হামলাকে বর্বরোচিত বলে বর্ণনা করে ঘোষণা করেছেন, ওই ষড়যন্ত্রকারীদের গ্রেফতার করা যাবে এমন কোনও তথ্য দিতে পারলে ৫০ লক্ষ ডলারের ইনাম মিলবে।

কিন্তু এই ধরনের প্রতীকী কিছু ঘোষণা ছাড়া বিদেশি রাষ্ট্রগুলো এই হামলার ক্লোজারের জন্য আসলে তেমন কিছুই করেনি - বলছিলেন দিল্লিতে দ্য ইকোনমিক টাইমস পত্রিকার ফরেন অ্যাফেয়ার্সের সিনিয়র এডিটর দীপাঞ্জন রায়চৌধুরী।

তার কথায়, "তবু আমেরিকা হামলার ঠিক পর পরই কিছু তথ্য শেয়ার করেছিল, যাতে নির্দিষ্টভাবে জানা গিয়েছিল কোন লোকেশন থেকে হামলা চালানো হয়েছিল, বা ঠিক কোথা থেকে গাইড করা হচ্ছিল জঙ্গিদের।"

"হামলা চলাকালীন রিয়াল টাইম গোয়েন্দা তথ্য শেয়ার করেছিল ইসরায়েল ও তাদের গোয়েন্দা বাহিনী মোসাদ। পরে তারা বেশ সক্রিয়ভাবে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার প্রস্তুতি ও কাউন্টার টেররজিমের ক্ষেত্রেও অনেক সাহায্য করেছে।

"কিন্তু এই ধরনের কিছু সহযোগিতা বা ভারত-মার্কিন, ভারত-ইসরায়েল যৌথ বিবৃতি ছাড়া সত্যিকারের কোনও অ্যাকশন কিন্তু একেবারেই হয়নি। ওসামা বিন লাদেনকে ধরতে যে ধরনের মার্কিন তৎপরতা ছিল তার ছিটেফোঁটাও এক্ষেত্রে চোখে পড়েনি - যদিও অন্তত ছ'জন আমেরিকান নাগরিক ২৬/১১ হামলায় মারা গিয়েছিলেন।"

তবুও দোষীদের বিচারের কাঠগড়ায় আনতে প্রথম দিকে বিদেশি রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে কিছুটা গরজ ছিল, যেটা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে একেবারেই থিতিয়ে গেছে - মনে করছেন ভারতের রাজধানীতে কূটনৈতিক বিশ্লেষক দেবীরূপা মিত্র।

আপনার ডিভাইস মিডিয়া প্লেব্যাক সমর্থন করে না
'গোলি'র জন্ম যেভাবে হলো

আরো পড়তে পারেন:

দাঙ্গা-সহিংসতার তান্ডব কেন বারবার মুম্বাইতেই?

কোন কোন বিবেচনায় প্রার্থী বাছাই: বিবিসির চোখে

নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড কতটা আছে?

বিশ্বে একদিনে খুন হয় যতো নারী

মিস মিত্র বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, "যেসব দেশের নাগরিক ওই হামলায় হতাহত হয়েছিলেন তারা প্রথমদিকে নিজেদের মধ্যে অনেক যৌথ বৈঠক করেছেন, একটা সমন্বয় রেখে কাজ করেছেন - যাতে ভারতের সঙ্গে কথা বলা যায় এবং পাকিস্তানের ওপর সম্মিলিত চাপ দেওয়া যায়।"

"কিন্তু এই দেশগুলো কীভাবে ভারত ও পাকিস্তানের সঙ্গে ডিল করবে, সে ব্যাপারে তাদের প্রত্যেকেরই নিজস্ব এজেন্ডা ও স্বার্থ আছে - তাই কিছুদিনের মধ্যেই সেই সম্মিলিত উদ্যোগ স্তব্ধ হয়ে গেছে। ফলে এখন ব্যাপারটা যেন অনেকটাই বিজনেস অ্যাজ ইউজুয়াল।"

"আর পাকিস্তানও দেখিয়ে দিয়েছে এই ধরনের আন্তর্জাতিক চাপ তারা অনায়াসে সামলাতে পারে - চাপ বাড়লে কিছুদিনের জন্য হয়তো তারা অভিযুক্তদের আটক করল, আবার চাপ কমলেই তারা তাদের নীরবে ছেড়ে দিল!" বলছিলেন দেবীরূপা মিত্র।

এই হামলার জন্য ভারত যে পাকিস্তান-ভিত্তিক লস্কর-ই-তইবা ও তার প্রধান হাফিজ সঈদকে আগাগোড়া দায়ী করে এসেছে, আসলে কোনও আন্তর্জাতিক চাপই আজ পর্যন্ত তাদের কেশাগ্র স্পর্শ করতে পারেনি।

ছবির কপিরাইট Reuters
Image caption হামলায় যুক্ত জঙ্গিদের মধ্যে মাত্র একজন - পাকিস্তানি নাগরিক আজমল কাসভ জীবিত ধরা পড়েছিলেন, পরে ভারতের আদালত যাকে ফাঁসির সাজা দেয়।

দীপাঞ্জন রায়চৌধুরীর কথায়, "জাতিসংঘে কিছু প্রস্তাব একটা সময় পাস হয়েছিল, কিন্তু পাকিস্তানের ওপর তার কোনও প্রভাবই পড়েনি। কারণ আমরা দেখেছি হাফিজ সঈদ নিজের সংগঠনের নাম বদলে সেটাকে একটা রাজনৈতিক দলে পরিণত করে ফেলেছেন।"

"আর রাজনৈতিক দল হয়ে মেইনস্ট্রিমে ঢুকে পড়ার পর তারা অনেক বেশি ইমিউনিটিও ভোগ করছেন। ফলে ফুটবলের ভাষায় যাকে বলে ডজ করা, সেভাবেই তারা গত দশ বছর ধরে আইনের নাগাল থেকে পালিয়ে বেড়িয়েছেন। আর ভিক্টিমরা গত দশ বছরে সেভাবে বিচার কিন্তু প্রায় কিছুই পাননি বলতে গেলে!" বলছিলেন মি রায়চৌধুরী।

সেই হামলায় যুক্ত জঙ্গিদের মধ্যে মাত্র একজন - পাকিস্তানি নাগরিক আজমল কাসভ জীবিত ধরা পড়েছিলেন, পরে ভারতের আদালত যাকে ফাঁসির সাজা দেয়।

কিন্তু সেই হামলার নকশা যারা করেছিলেন তারা আজও রয়ে গেছেন ধরাছোঁয়ার বাইরেই - ভারত কিংবা বাকি ১৬টি দেশ সেখানে আজও রয়ে গেছে অসহায় বা উদাসীন দর্শকের ভূমিকাতেই!

সম্পর্কিত বিষয়