ট্রান্সজেন্ডার অধিকারকর্মীর বিরুদ্ধেই কিশোরকে জোর করে হিজড়া বানানোর অভিযোগ

ভারতের সুপ্রিম কোর্ট হিজড়াদের 'তৃতীয় লিঙ্গ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
Image caption ভারতের সুপ্রিম কোর্ট হিজড়াদের 'তৃতীয় লিঙ্গ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে ট্রান্সজেন্ডার বা রূপান্তরকামী মানুষদের অধিকার রক্ষায় সবথেকে পরিচিত মুখ যিনি, তাঁর বিরুদ্ধেই অভিযোগ উঠেছে যে তিনি এক কিশোরকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে 'হিজড়া' বানাতে চেষ্টা করেছিলেন।

যার বিরুদ্ধে এই গুরুতর অভিযোগ উঠেছে, সেই মানবী বন্দ্যোপাধ্যায় ভারতের প্রথম রূপান্তরী নারী যিনি কোনও সরকারী কলেজের প্রিন্সিপাল হয়েছেন।

একই সঙ্গে তিনি পশ্চিমবঙ্গের ট্র্র্যান্সজেন্ডার ডেভেলপমেন্ট বোর্ডের ভাইস-চেয়ারপার্সন।

অভিযোগ উঠেছে যে ওই কিশোরকে 'হিজড়া' সম্প্রদায়ের কাছে পাঠিয়ে দিয়ে গ্রামে গ্রামে তাদের দলের সঙ্গে ঘুরতে একরকম বাধ্য করা হচ্ছিল । কিন্তু একটা সময়ে ওই কিশোরই জানায় যে সে পড়াশোনা করে বড় হতে চায়, এই কাজ সে করবে না।

তারপরে ওই দলেরই এক সদস্যের সহায়তায় সে পালিয়ে একটি সংস্থার কাছে পৌঁছয়, যেখান থেকে পাঁচ দিন পরে তাকে ফেরত পেয়েছে তার পরিবার।

ছেলের কাছ থেকে গোটা ঘটনা জানার পরে পশ্চিমবঙ্গ শিশু অধিকার সুরক্ষা কমিশনে মানবী বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেছে ওই কিশোরের পরিবার।

আরো পড়ুন:

শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ালেন হিজড়া নারী

ভারতের প্রথম তৃতীয় লিঙ্গ কলেজ প্রিন্সিপালের পদত্যাগ

ছবির কপিরাইট Pacific Press
Image caption ভারতে ছাট পূজার সময় হিজড়া সম্প্রদায়ের নাচ-গান

কমিশনের অন্যতম সদস্য, প্রসূন ভৌমিক বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, "আমরা অভিযোগ পেয়েছি। অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা। গোটা বিষয়টা আমাদের চেয়ারপার্সন অনন্যা চক্রবর্তী দেখছেন।"

কমিশনের তরফ থেকে বিস্তারিত তদন্ত করতে তাদের এক প্রতিনিধি তাদের সঙ্গে মঙ্গলবার কথা বলেছে বলে দাবী কিশোরের পরিবারের।

অভিযোগ নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে মানবী বন্দ্যোপাধ্যায়ের মোবাইলে ফোন করলে তার পুত্র অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় পরিচয় দিয়ে এক ব্যক্তি বিবিসির সঙ্গে কথা বলেন, তবে কোনও রকম প্রতিক্রিয়া দিতে তিনি রাজী হন নি।

কী অভিযোগ ওই কিশোরের পরিবারের

মুর্শিদাবাদের ওই কিশোর দ্বাদশ শ্রেণীতে পড়ে এবং স্কুলে তার পরীক্ষা চলছিল। ১৯ নভেম্বর পরীক্ষার পরে ছেলেকে স্কুল থেকে আনতে গিয়ে তার মা জানতে পারেন যে আগেই পরীক্ষার খাতা জমা দিয়ে চলে গেছে সে। তার বাবা মায়ের সন্দেহ হয় যে ছেলে অধ্যাপক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছেই গেছে।

কেন এরকম সন্দেহ হল, জানতে চেয়েছিলাম ওই কিশোরের মায়ের কাছে।

বিবিসি বাংলার অন্যান্য খবর:

মনোনয়নপত্র জমা শেষ: সবার নজর খালেদা, জামায়াতের দিকে

এরশাদ অসুস্থ, সরকারের সাথে আলোচনা করে কে?

কেন নির্বাচন করছেন না ড. কামাল হোসেন

ছবির কপিরাইট .
Image caption মানবী বন্দ্যোপাধ্যায়

"এর আগেও ৫ সেপ্টেম্বর আমার ছেলেকে নিয়ে গিয়েছিলেন মানবী বন্দ্যোপাধ্যায়ের পুত্র। তাই দ্বিতীয়বারও আমাদের সন্দেহ হয় যে নিশ্চই ওখানেই আবার নিয়ে গেছে ছেলেকে। তবে থানায় অভিযোগ জানাতে গেলে পুলিশ বলে যেহেতু নির্দিষ্টভাবে জানা নেই যে ছেলে কোথায়, তাই কেউ বা কারা অপহরণ করেছে, সেটাই অভিযোগে লিখেছিলাম," বলছিলেন ওই কিশোরের মা।

ওই কিশোরের পরিবার বলছে, ১৯ নভেম্বর রাতেই তারা নদীয়ার কৃষ্ণনগর উইমেনস কলেজে, যেখানকার প্রিন্সিপাল মানবী বন্দ্যোপাধ্যায়, সেখানে গিয়ে দেখা করেন মিসেস বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে। কিন্তু তিনি জানিয়েছিলেন যে ওদের ছেলে কোথায় সেটা ওর জানা নেই।

"অনেক কান্নাকাটি করার পরে মানবী ম্যাডাম শুধু বলেন, ছেলে হারিয়ে গেছে তো আমি কী করব! কলকাতার পি জি হাসপাতালে খোঁজ করুন। তারপরে আমরা কৃষ্ণনগর থানাতেও গিয়েছিলাম। আমাদের কাছে তখন ছেলেকে খোঁজার আর ফিরে পাওয়ার তাগিদটা বেশি ছিল," জানাচ্ছিলেন ওই কিশোরের মা।

পাঁচ দিন পরে একটা ফোন করে তাকে জানানো হয় যে আরেক রূপান্তরকামী তিস্তা দাসের একটি সংস্থাতে পৌঁছিয়েছে ছেলে। সেখান থেকে একমাত্র সন্তানকে ফিরিয়ে আনেন বাবা মা।

ছেলের কাছ থেকে জানতে পারেন কী হয়েছিল ওই পাঁচ দিন।

Image caption রঞ্জিতা সিনহা

"ছেলে ফিরে আসার পরে তার কাছ থেকে জানতে পারি যে অঞ্জলি নামের এক তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তির কাছে তাকে দিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তাকে ছেঁড়া-ফাটা নাইটি পরিয়ে গ্রামে গ্রামে হিজড়াদের দলের সঙ্গে ঘুরে পেশা করতে বলা হয়েছিল।"

"আমার ছেলে প্রতিবাদ জানায়, বলে সে পড়াশোনা করতে চায়, ওই কাজ সে কেন করবে। ওই দলেরই অন্য একজনের সাহায্যে সে একটি সংস্থার কাছে পৌঁছয়, যেটি চালান এক রূপান্তরকামী। তারাই আমাদের খবর দেয়," - জানালেন কিশোরের মা।

ছেলের কাছ গোটা ঘটনা জানার পরে পশ্চিমবঙ্গ শিশু অধিকার সুরক্ষা কমিশনে লিখিত অভিযোগ জানিয়েছে ওই কিশোরের পরিবার, যেখানে মানবী বন্দ্যোপাধ্যায়ের নামেই সরাসরি অভিযোগ করা হয়েছে।

কিশোরের মা বলছেন, "আমার ছেলে কখনই রূপান্তরকামী নয়। সে পুরুষ হয়েই জন্মিয়েছে, সেইভাবেই বড় হতে চায়। তার স্বপ্ন আছে বড় হবে, পাঁচ জনের একজন হয়ে উঠবে। মানবী বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে ওর ফেসবুকে পরিচয়। তারপরে ফোনেও কথা বলত, যেটা আমরা পরে জানতে পারি। আমার ধারণা কোনওভাবে ছেলের ব্রেনওয়াশ করা হয়েছিল।"

এই ঘটনায় রূপান্তরকামীদের মধ্যেও হয়েছে প্রতিক্রিয়া।

ট্র্যান্সজেন্ডার বোর্ডের আরেক সদস্য এবং রূপান্তরকামীদের নিয়ে একটি সংগঠন চালানো রঞ্জিতা সিনহা বিবিসিকে বলেছেন, "অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। এটা তো রীতিমতো পাচারের অভিযোগ! এছাড়া প্রতারণাও করা হয়েছে ওই কিশোরের সঙ্গে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে তার কঠোর শাস্তি হওয়া উচিত।"

আপনার ডিভাইস মিডিয়া প্লেব্যাক সমর্থন করে না
ভারতে ৫০ লাখ ট্রান্সজেন্ডার বেঁচে আছেন যেভাবে

সম্পর্কিত বিষয়