নিউজিল্যান্ডের সৈকতে আটকে পড়া ১৪৫ তিমি: 'তাদের কান্না আমি কখনোই ভুলবো না'

সমুদ্রের অগভীর পানিতে আটকে থাকা তিমি ছবির কপিরাইট Liz Carlson
Image caption সমুদ্রের অগভীর পানিতে আটকে থাকা তিমি

''এটা ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ রাত,'' এভাবেই লিজ কার্লসন বর্ণনা করছিলেন, যখন তিনি দেখতে পান নিউজিল্যান্ডের একটি প্রত্যন্ত সৈকতে ১৪৫টি তিমি আটকে পড়ে মারা যেতে বসেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের এই ভ্রমণ বিষয়ক ব্লগার একজন বন্ধুর সঙ্গে নিউজিল্যান্ডের রাকিউরা অথবা স্টুয়ার্ট দ্বীপে ট্রেকিং করছিলেন বা পায়ে হেঁটে ভ্রমণ করছিলেন।

লম্বা যে সৈকতটি হওয়ার কথা অনেকটা মরুভূমির মতো, সেখানেই তারা দেখতে পেলেন অনেকগুলো জীবনের বেঁচে থাকার কঠিন লড়াই।

আরো পড়ুন:

১৭ দিন পর মৃত শাবককে বিদায় জানালো তিমি

বিক্ষোভের মুখে কবর থেকে তিমি উত্তোলন

কুয়াকাটা সৈকতের তিমিটির কংকাল সংরক্ষণের চেষ্টা

কুয়াকাটা সৈকতের তিমিটির কংকাল সংরক্ষণের চেষ্টা

ছবির কপিরাইট Liz Carlson
Image caption ''এটা ছিল হতবাক হয়ে যাওয়ার মতো একটি মুহূর্ত,'' তিমিগুলোর আটকে থাকা দেখে বলছেন লিজ কার্লসন

''এটা ছিল হতবাক হয়ে যাওয়ার মতো একটি মুহূর্ত,'' তিনি বিবিসিকে বলছেন, ''আমরা সন্ধ্যার দিকে সৈকতে এসে দেখতে পেলাম, অগভীর পানিতে কিছু যেন আটকে আছে।''

''যখন আমরা বুঝতে পারলাম এগুলো তিমি, তখন সবকিছু ফেলে রেখে তাদের কাছে ছুটে গেলাম।''

তিনি এর আগে বুনো অবস্থায় তিমি দেখতে পেয়েছেন। "তবে এরকম কিছুর জন্য কখনো প্রস্তুত ছিলাম না। এটা ছিল ভয়াবহ একটা ব্যাপার।''

এটা একটি ছিল ভয়াবহ ব্যাপার।

এই দু'জন তাৎক্ষণিকভাবে তিমিগুলোকে খানিকটা সহায়তার চেষ্টা করেন। তারা সেগুলোকে ঠেলে গভীর পানিতে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন।

''কিন্তু খুব তাড়াতাড়ি বোঝা গেল, এখানে আপনার আসলে করার কিছু নেই।"

তিনি বলছিলেন, "এগুলো বিশাল আকারের প্রাণী। তারা একজন আরেকজনের উদ্দেশ্যে কাঁদছিল, কথা বলছিল - পরস্পরকে ছোঁয়ার চেষ্টা করছিল। কিন্তু তাদের সাহায্য করার কোন উপায় ছিল না।''

বিবিসি বাংলার অন্যান্য খবর:

এরশাদ অসুস্থ, সরকারের সাথে আলোচনা করে কে?

কে এই নতুন টেস্ট ক্রিকেটার সাদমান

মনোনয়নপত্র জমা শেষ: সবার নজর খালেদা, জামায়াতের দিকে

হুয়াওয়ে মোবাইল কোম্পানির বিরুদ্ধে আপত্তি কেন?

ছবির কপিরাইট Julian Ripoll
Image caption সৈকতে আটকে থাকা একটি তিমি

যখন এই তিমিগুলোকে কোনভাবেই তারা সাহায্য করতে পারছিলেন না, তখন অনেকটা বেপরোয়া ভাবে তারা সাহায্যের অন্য কোন উপায় খুঁজতে শুরু করেন।

নিউজিল্যান্ডের দক্ষিণ উপকূলে স্টুয়ার্ট দ্বীপটি খুবই প্রত্যন্ত একটি দ্বীপ, তার মধ্যে যে সৈকতে তারা হাঁটছিলেন, সেটি আরো প্রত্যন্ত।

এই যুগল গত দুইদিনে এখানে আর কোন পথচারীকে দেখতে পাননি, কিন্তু তারা জানতেন, প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরত্বে একটি ট্রেকার্স হাট আছে, যেখানে হয়তো কয়েকজন সংরক্ষণ কর্মীকে পাওয়া যেতে পারে।

যদিও মোবাইল ফোনের কোন নেটওয়ার্ক নেই, তবে তাদের আশা, সেখানে হয়তো একটি রেডিও থাকতে পারে। লিজের বন্ধু, জুলিয়ান রিপোল সাহায্যের জন্য ওই হাটের উদ্দেশ্যে রওনা হলেন।

'আমার হৃদয় পুরোপুরি ভেঙ্গে গেলো'

সৈকতে মৃত্যুর মুখে থাকা অনেক তিমির সামনে তখন একা লিজ কার্লসন।

''আমি কখনোই তাদের কান্না ভুলবো না, যখন আমি তাদের সঙ্গে, তাদের পাশে পানিতে বসে ছিলাম, তখন তারা যেভাবে আমাকে দেখছিল, যেভাবে বেপরোয়া হয়ে তারা সাঁতার কাটার চেষ্টা করছিল অথচ তাদের ওজন তাদেরকে বালুর আরো গভীরে গেঁথে ফেলছিল,'' ইন্সটাগ্রামে তিনি লিখেছেন

''আমার হৃদয় পুরোপুরি ভেঙ্গে গিয়েছিল।''

ছবির কপিরাইট Liz Carlson
Image caption নিউজিল্যান্ডে এর আগেও সৈকতে তিমি আটকে পড়ার ঘটনা ঘটেছে

তখন ৩০ বছরের লিজ একটি শিশু তিমি দেখতে পান এবং সেটিকে ঠেলে গভীর পানিতে পাঠানোর চেষ্টা করেন। বড় তিমিগুলো নড়ানো একেবারেই সম্ভব না হলেও, ছোট এই তিমিটাকে তিনি গভীর পানিতে পাঠাতে সক্ষম হন।

''শিশুটিকে গভীর পানিতে পাঠানোর জন্য আমার সর্বশক্তি খাটাতে হলো। কিন্তু এরপরেও সে চলে না গিয়ে সৈকতের কাছাকাছি সাঁতার কাটতে লাগলো,'' তিনি বিবিসিকে বলছেন।

''জুলিয়ান যাবার পর, আমি শুধুমাত্র শিশু তিমিটির সঙ্গে সৈকতে বসে রইলাম।''

''আপনি এই প্রাণীগুলোর ভয়ের ব্যাপারটি অনুভব করতে পারবেন। তারা আপনার দিকে তাকিয়ে আছে, আপনাকে দেখছে, তাদের চোখগুলো অনেকটা মানুষের চোখের মতো।''

ছবির কপিরাইট DOC
Image caption নিউজিল্যান্ডের সৈকতে আটকে থাকা তিমি

পরের কয়েক ঘণ্টায় অপেক্ষা করা ছাড়া তাদের আর কিছু করার ছিল না।

''আমি জানতাম, তাদের মৃত্যু ঠেকানোর হয়তো কেনা উপায় নেই,'' ইন্সটাগ্রামে লিখেছেন লিজ।, ''বালুতে আমার গোড়ালি ডুবিয়ে হতাশায় ডুবে ছিলাম, কাঁদছিলাম, আর আমার পেছনে অসংখ্য তিমি মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল।''

'তাদের চোখে অশ্রু'

কয়েক ঘণ্টা পরে জুলিয়ান একদল রেঞ্জারকে সঙ্গে নিয়ে ফিরে এলো। তারা পুরো পরিস্থিতিটা পর্যবেক্ষণ করতে সক্ষম হলেন, কিন্তু রাত নেমে আসার কারণে তাদের তখন কিছু করার ছিল না।

তখনো বেশিরভাগ তিমি সাগরের ঢেউয়ের মধ্যে ছিল এবং স্রোতও বাড়ছিল। তাই লিজ এবং জুলিয়ান যখন তাদের ক্যাম্প সাইটে ফিরে এলেন, তখন তাদের মধ্যে আশা কাজ করছিল যে, হয়তো কয়েকটি তিমি সাগরে ফিরে যেতে সক্ষম হবে।

ছবির কপিরাইট Julian Ripoll
Image caption সৈকতে আটকে পড়ে মারা যাওয়া একটি তিমি

কিন্তু পরদিন সকালে তারা এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হলেন, যা আরো ভয়াবহ।

তখন স্রোত কমে গেছে এবং তিমিগুলো শুকনো বালুর ওপর আটকে রয়েছে। কয়েকটি এর মধ্যেই মারা গেছে এবং অন্যগুলো সৈকতে সূর্যের আলোয় কষ্ট পাচ্ছে।

''তাদের চোখে ছিল অশ্রু'' লিজ বলছেন, ''দেখে মনে হচ্ছিল, তারা কাঁদছে এবং তারা দুঃখের শব্দ করছিল।''

এটা পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল যে, একটি তিমিকেও হয়তো বাঁচানো যাবে না।

ছবির কপিরাইট Julian Ripoll
Image caption কেন তিমিগুলো সৈকতে এসে আটকে পড়ে, তা নিয়ে এখনো পরিষ্কার নন বিজ্ঞানীরা

একটি তিমিকে সরাতে অন্তত পাঁচজন ব্যক্তির সহায়তা দরকার হয়। কিন্তু দ্বীপ এবং সৈকতটি এতোটাই প্রত্যন্ত যে, সময়মত কোন সাহায্য পাওয়ার আশা নেই। পুরো দ্বীপটিতে মাত্র কয়েকশো ব্যক্তি বসবাস করে।

সুতরাং রেঞ্জারদের এমন সিদ্ধান্ত নিতে হল, যাকে তারা বলেন 'হৃদয় ভাঙ্গা সিদ্ধান্ত'।

তখন একমাত্র বিকল্প হল, এই তিমিগুলোকে দীর্ঘমেয়াদি আর কষ্টকর মৃত্যুর পথে ফেলে যাওয়া।

নিউজিল্যান্ডের সংরক্ষণ দপ্তর বলছে, এর মানে হল তারা যেখানে আছে, সেখানে ফেলে যাওয়া এবং প্রকৃতিতে তার নিয়ম মতো কাজ করতে দেয়া।

সংস্থাটি বলছে, এটা পরিষ্কার নয়, তিমিগুলো কেন এভাবে সৈকতে আটকে পড়েছিল। কোন একটি তিমির সৈকতে আটকে পড়া নিউজিল্যান্ডে নতুন নয়, কিন্তু এভাবে দলবেঁধে সৈকতে আটকে পড়ার ঘটনা বেশ দুর্লভ।

এটা হয়তো বিভ্রান্তি হয়ে অগভীর পানিতে চলে এসেছিল এবং সৈকতে আটকে পড়ে।

পাইলট তিমি সামাজিকতার কারণে বেশ পরিচিত। সুতরাং এমন হতে পারে, যখন একটি তিমি দিক ভুল করে সৈকতে এসে আটকে পড়ে, অন্য তিমিগুলো হয়তো তাদের উদ্ধার করতে এসে নিজেরাও বিপদে পড়েছিল।

আপনার ডিভাইস মিডিয়া প্লেব্যাক সমর্থন করে না
সমুদ্রের তলে তিমিরা যেভাবে একসঙ্গে হয়

সম্পর্কিত বিষয়