ঘরের কাজ যেভাবে বদলে দিল বদমেজাজী পুরুষকে

সন্তান, বাবা ছবির কপিরাইট Elaine Jung
Image caption ৩২ বছর বয়সী জন পিয়েরের বাস রুয়ান্ডার পূর্বাঞ্চলে মুউলিরে গ্রামে

মুহোযা জন পিয়েরে একসময় তার স্ত্রী'কে শারীরিকভাবে নির্যাতন করতো।

স্ত্রীকে তিনি শুধুমাত্র সন্তান ভরণপোষণের উপলক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করতেন।

"আমি আমার বাবার উদাহরণ অনুসরণ করছিলাম; তিনি কখনও ঘরের কোনো কাজ করতেন না।"

পিয়েরে বলেন, "আমি কখনো ঘরে ফিরে যদি দেখতাম কোনো কাজ অসম্পূর্ণ রয়েছে, আমি আমার স্ত্রীকে বকাঝকা করতাম এবং তাকে প্রহারও করতাম।"

কিন্তু হঠাৎ অবস্থার পরিবর্তন হয় যখন পিয়েরে রান্না করতে শিখলেন।

"পুরুষ মানুষ ঘরের কাজ করে না' - পুরুষদের মধ্যে বিদ্যমান সনাতন এই মানসিকতা পরিবর্তন করতে অভিনব একটি প্রকল্প পরিচালনা করছে রুয়ান্ডার একটি সংস্থা।

এই প্রকল্পের অধীনে সন্তান লালন পালন এবং গৃহস্থালির দেখাশোনা সংক্রান্ত কিছু বিষয়েও শিক্ষাদান করা হয় স্থানীয় পুরুষদের।

আরো পড়তে পারেন:

সীমা ও হৃদয়ের জীবন বদলে দিয়েছেন যে ফটোগ্রাফার

বাংলাদেশ সামরিক বাহিনীর কী ধরণের সরঞ্জাম আছে?

এরশাদ অসুস্থ, সরকারের সাথে আলোচনা করে কে?

'তাদের কান্না আমি কখনোই ভুলবো না'

ছবির কপিরাইট Elaine Jung
Image caption জন পিয়েরে এবং তার স্ত্রী ১০ বছর ধরে বিবাহিত

এই উদ্যোগটি রুয়ান্ডার পূর্বাঞ্চলের মুউলিরে গ্রামে তৃণমূল পর্যায়ে পরিচালিত হওয়া একটি সামাজিক সংস্কারমূলক প্রকল্পের অংশ।

রুয়ান্ডার পুরুষদের ঘরের কাজ করতে শেখানোর এই প্রকল্প হাতে নেয়ার মাধ্যমে দেশের ভেতরে পারিবারিক সহিংসতার হার কমানোর প্রচেষ্টা বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে সফলতা পাচ্ছে বলে সাম্প্রতিক গবেষণায় উঠে এসেছে।

মানসিকতার পরিবর্তন

'বান্দেবেরেহো' নামের ঐ প্রকল্পটির স্বেচ্ছাসেবীরা জন পিয়েরে'কে এমন কিছু কাজ করতে শিখিয়েছে যেগুলো তিনি আগে মনে করতেন যে শুধু নারীদের কাজ।

"এখন আমি জানি কীভাবে রান্না করতে হয় এবং বাচ্চাদের কাপড় পরিষ্কার করতে হয়।"

তবে জন পিয়েরে'র মানসিকতায় পরিবর্তন আনাটা কিন্তু সহজ ছিল না।

জন পিয়েরে'র বন্ধুবান্ধব ও পরিবারের সদস্যরা যখন জানতে পারলো যে তিনি ঘরের কাজ করা শিখতে যাচ্ছেন তখন তাকে সবাই তিরস্কার করেছিল।

"আমার পরিবারের সদস্য আর বন্ধুরা ধারণা করেছিল যে নিশ্চয়ই আমার স্ত্রী আমাকে জাদু করেছে। তারা আমাকে বলে, আসল পুরুষ কখনো রান্নার জন্য লাকড়ি যোগাড় করে না বা খাবার তৈরি করে না।"

কিন্তু জন পিয়েরে যখন দেখলেন তার এই শিক্ষায় তার পরিবার দারুণভাবে উপকৃত হচ্ছে, তিনি তখন সেসব কথায় কান দেননি।

তিনি বলেন তার সন্তানদের সাথে তার সম্পর্ক ভালো হয়েছে এবং তার স্ত্রী এখন কলার ব্যবসা শুরু করেছেন, যার ফলে তাদের পরিবারের অর্থনৈতিক সচ্ছলতা বৃদ্ধি পেয়েছে; তারা তাদের ঘর বড় করেছেন।

"আমার স্ত্রী এখন নিজের সুবিধা-মতো ব্যবসা করে এবং ঘরের কাজও করে, যার ফলে আমাদের পরিবার আগের চেয়ে অনেক ভাল অবস্থানে পৌঁছেছে। আগে আমার ধারণা ছিল স্ত্রীকে সবসময় ঘরে থাকতে হবে, যা এখন পাল্টেছে।"

অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা অর্জন

জন পিয়েরে'র স্ত্রী মুসাবিমানা ডেলফিন বলেন আগে তার স্বাধীনতা ছিল সামান্য এবং তার দিন পার হতো ভয়ে ভয়ে।

"কখনো আমার নিজেকে শুধু একজন শ্রমিক মনে হতো যে কিনা কোনো বেতনও পায় না।"

মিজ ডেলফিন বলেন, "আমি কখনো চিন্তা করিনি যে একজন নারীর নিজের হাতে টাকা থাকতে পারে। কারণ ঘরের কাজ শেষ করে টাকা উপার্জন করার মত কাজ করার সময়ই কখনো ছিল না আমার হাতে।"

"স্বামী ঘরের কাজে সাহায্য করার পর থেকে আমার হাতে অনেক সময় ও স্বাধীনতা রয়েছে।"

এই প্রকল্পটির মূল পরিকল্পনাটি করা হয় ল্যাটিন আমেরিকায়। পিতৃত্বের দায়িত্ব সম্পর্কে মানুষকে অবগত করতে প্রচারণা চালায়, এমন একটি সংস্থা 'মেনকেয়ার' এই প্রকল্পটির উদ্যোগ নিয়েছিল।

'মেনকেয়ার'এর বিশ্বাস, শিশুদের দায়িত্ব এবং ঘরের কাজের অন্তত ৫০ শতাংশ পুরুষরা সম্পন্ন না করলে সত্যিকার অর্থে সমতা অর্জন করা সম্ভব না।

ছবির কপিরাইট Elaine Jung
Image caption 'বান্দেবেরেহো' প্রকল্পের মাধ্যমে জন পিয়েরে শিখেছেন কীভাবে ঘরের কাজ করতে হয়

এই প্রকল্প অংশ নেয়া দম্পতিদের তথ্য যাচাই করে দেখা যায়, প্রকল্পে অংশ নেয়ার দুই বছরের মধ্যে পুরুষ সঙ্গীদের কাছ থেকে সহিংসতার সম্ভাবনা অনেকাংশে কমে আসে।

তবে প্রকল্পে অংশ নেয়া পুরুষদের সঙ্গীদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য বিবেচনা করে জানা যায় যে, এখনো প্রতি তিনজন নারীর একজন পারিবারিক সহিংসতার শিকার হচ্ছেন।

রুয়ান্ডার পুরুষ সম্পদ অধিদপ্তর, যাদের পৃষ্ঠপোষকতা ও পরিচালনায় এই প্রকল্পটি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সম্পন্ন হয়েছে, তারা চায় এই 'বান্দেবেরেহো' প্রকল্প আরো বেশি করে ছড়িয়ে পড়ুক রুয়ান্ডায়।

জন পিয়েরে আর মুসাবিমানা ডেলফিন মনে করেন এই প্রকল্পে অংশগ্রহণের মাধ্যমে শুধু তাদের পরিবারই উপকৃত হয়নি, তাদের পুরো সম্প্রদায় উপকৃত হয়েছে।

"আমাদের সম্প্রদায়ে যখন গুরুত্বপূর্ণ কোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার প্রয়োজন হয়, তখন আমাদের মতামত জানতে চাওয়া হয়। আমাদের মতামতকে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয় কারণ আমাদের পরিবারে কোনো অভ্যন্তরীণ সমস্যা নেই", বলেন পিয়েরে।

"আর নিজেদের মধ্যে বোঝাপড়ার কথা না বললেই নয়; বিয়ের দশ বছর পর আমরা এখন আমাদের হানিমুনে আছি।"

সম্পর্কিত বিষয়