সংসদ নির্বাচন: হলফনামার সম্পদের বিবরণী কী কাজে লাগে - ভুল তথ্যের শাস্তি কী?

সংসদ নির্বাচনে ভোট দেওয়ার ছবি। ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption ত্রিশে ডিসেম্বর সংসদ নির্বাচন হবে বাংলাদেশে।

বাংলাদেশে নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য মনোনয়নপত্র দাখিলের সময় প্রার্থীদের একটি হলফনামা দাখিল করতে হয় যেখানে প্রার্থীদের সম্পর্কে ব্যক্তিগত ও আর্থিক বিষয়াদি নিয়ে সুনির্দিষ্ট কিছু তথ্য থাকে।

সাধারণ মনোনয়নপত্র দাখিলের পরপরই সংশ্লিষ্ট নির্বাচন অফিসগুলো থেকে এগুলো সংগ্রহ করা যায় এবং এর উদ্দেশ্য ছিলো - যাতে ভোটাররা তাদের ভোট দেয়ার আগেই প্রার্থী সম্পর্কে একটি ধারণা পেতে পারেন।

এমনকি পরে এগুলো নির্বাচন কমিশন বা ইসি'র ওয়েবসাইটেও প্রকাশ করা হয় যাতে যে কেউ চাইলেই এটি দেখতে পারে।

নির্বাচন কমিশনের হিসেব অনুযায়ী, এবারেও সারাদেশের তিনশ আসনের বিপরীতে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন ৩,০৫৬ জন প্রার্থী।

পরে যাচাই বাছাইয়ে তাদের মধ্যে ৭৮৬ জনের মনোনয়নপত্র ঋণ খেলাপসহ নানা অভিযোগে বাতিল করেছেন রিটার্নিং অফিসাররা।

আরো পড়ুন:

প্রার্থীদের হলফনামা যাচাই-বাছাই করা হয় যেভাবে

রাঙ্গা জাপা মহাসচিব: কেন সরানো হলো হাওলাদারকে?

জিনগত পরিবর্তন-ঘটানো মানবশিশু তৈরি করা কি উচিত?

'উরু-দেখানো ছবি': মন্দিরে ঢুকতে চাওয়া নারী আটক

ছবির কপিরাইট ফেসবুক থেকে সংগৃহীত
Image caption অনেক প্রার্থীর হলফনামায় স্ত্রীর অনেক সম্পদ উল্লেখ থাকাকে কেন্দ্র ফেসবুকে এসব পোস্ট দিচ্ছেন অনেকে।

কিন্তু হলফনামায় ভুল তথ্য দিলে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়?

নির্বাচন কমিশনের সচিব এম হেলালুদ্দিন বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, প্রার্থীদের দেয়া এসব হলফনামা তারা বা নির্বাচন কমিশন যাচাই বাছাই করেনা।

"হলফনামা আমরা যাচাই বাছাই করিনা। কিন্তু দুর্নীতি দমন কমিশন বা দুদক যদি মনে করে বাছাইয়ের প্রয়োজন আছে কিংবা যে আয়কর রিটার্নগুলো তারা দেন তার সাথে সম্পৃক্ত বিষয়গুলো তারা দেখতে পারে।"

কিন্তু হলফনামায় ভুল তথ্য থাকলে সে বিষয়ে কিছু করা হয় কি-না - এমন প্রশ্নের জবাবে নির্বাচন কমিশন কমিশন সচিব বলেন, সেটিও তারা যাচাই করেননা।

"ভুল তথ্য থাকলে আমরা নির্বাচন কমিশন যাচাই করবোনা। দুদক বা আয়কর বিভাগ চাইলে এটা যাচাই বাছাই করতে পারে।"

Image caption কমিশন বলছে হলফনামা তারা যাচাই করে দেখেনা।

আইন কী বলছে - ভুল তথ্যের শাস্তি আছে?

অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বিবিসি বাংলাকে বলছেন, যে শপথ আইনে কেউ যদি শপথ করে কোনো মিথ্যা বলে সেটাই একটা অপরাধ।

তিনি বলেন, "হলফনামায় তো এফিডেভিট করেই আটটি তথ্য দেয়া হচ্ছে। সেখানে ভুল থাকলে এবং সেটি ভুল প্রমাণিত হলে এটি তো শাস্তিযোগ্য অপরাধ।"

তবে এ সম্পর্কিত আইন বা শাস্তির বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের সাথে কথা বলার পরামর্শ দিয়েছেন।

কমিশনের সচিব অবশ্য জানিয়েছেন যে, তারা এগুলো যাচাই করেই দেখেননা।

তবে একজন কর্মকর্তা বলছেন, "ভুল তথ্য পেলে কমিশন চাইলে প্রার্থিতাই বাতিল করে দিতে পারে।"

আইনজীবী মনজিল মোরশেদ বলছেন, তাৎক্ষনিকভাবে নির্বাচন কমিশনের পক্ষে সব প্রার্থীর সব তথ্য যাচাই করে দেখা অসম্ভব।

এমনকি পরেও এতো প্রার্থীর সব তথ্য পরীক্ষা করে দেখতে লম্বা সময়ের প্রয়োজন।

"কিন্তু কেউ কারও বিরুদ্ধে আবেদন করলে এবং সেটি বিবেচনায় নিয়ে ভুল তথ্য প্রমাণিত হলে ইসি প্রার্থিতা বাতিল করে দিতে পারে।"

ছবির কপিরাইট নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইট
Image caption হলফনামার একটি অংশের নমুনা

দুদক ও রাজস্ব বোর্ড কী বলছে?

দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ গত ২৭শে নভেম্বর প্রার্থীদের নির্বাচন কমিশনে দাখিল করা হলফনামায় সম্পদের মিথ্যা তথ্য না দেয়ার জন্য প্রার্থীদের প্রতি আহবান জানিয়েছিলেন।

সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে তিনি বলেছিলেন, নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে হলফনামায় সম্পদের তথ্যে প্রকাশের পর তা পর্যালোচনা করে মিথ্যা তথ্য পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

তিনি বলেন, "মানুষ দুর্নীতি বন্ধ চায়। জনপ্রতিনিধিরা নিষ্ঠাবান হবেন - এটাই মানুষ চায়। এর প্রথম ধাপ হচ্ছে সৎভাবে নিষ্ঠার সাথে সম্পদের হিসাব নির্বাচন কমিশনের আইন অনুযায়ী দাখিল করবেন।"

দুদক চেয়ারম্যান বলেন হলফনামায় অবৈধ সম্পদের কোনো বিষয় থাকলে সেটি দুদকের তফসিলভু্ক্ত, তাই মনোনয়নপত্র দাখিলকারী প্রার্থীদের সম্পদ বিবরণী দুদক পর্যবেক্ষণ করবে বলেও জানান তিনি।

এখন আর নতুন করে এ বিষয়ে কমিশনের কেউ কিছু বলতে রাজী হননি।

একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, হলফনামায় নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে প্রকাশের পরপরই এ বিষয়টি নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের কাজের সুযোগ তৈরি হবে।

অন্যদিকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের একজন সদস্য বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন, "নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আমরা কোনো কাজ করছিনা।"

"এ ধরনের কোনো নির্দেশনাও আমাদের নেই। তবে দেশের কোথাও যে কোনো আর্থিক অসঙ্গতির বিষয়ে কাজ করার এখতিয়ার রাজস্ব বোর্ড বা আয়কর বিভাগের আছে।"

ছবির কপিরাইট ফেসবুক থেকে নেয়া
Image caption প্রার্থীদের স্ত্রীদের অনেকের বিপুল সম্পদের প্রতিক্রিয়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এসব পোস্ট দেখা যাচ্ছে।

হলফনামায় কোন কোন তথ্য থাকে?

নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইট নবম ও দশম সংসদ নির্বাচনের প্রার্থীদের হলফনামা এখনো দেয়া আছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে প্রার্থীকে তার হলফনামায় নীচের আটটি বিষয়ে কিছু তথ্য দিতে হয়।

১. শিক্ষাগত যোগ্যতা

২. বর্তমানে ফৌজদারী মামলার আসামী কি-না

৩. অতীতে ফৌজদারী মামলার আসামী কি-না

৪. পেশার বিবরণী

৫. প্রার্থীর নিজের ও তার ওপর নির্ভরশীলদের আয়ের উৎস/উৎসসমূহ

৬. প্রার্থীর ও তার ওপর নির্ভরশীলদের এবং তার স্ত্রী বা স্বামীর সম্পদ ও দায়ের বিবরণী (যেখানে অস্থাবর, স্থাবর সম্পদ দায় এসব তথ্য )

৭. এর আগে সংসদ সদস্য ছিলো কি-না (হইলে ভোটারদের দেয়া প্রতিশ্রুতি ও এর কি পরিমাণ অর্জন সম্ভব হয়েছিলো তার বিবরণ)

৮.ঋণ সংক্রান্ত তথ্যাবলী

ছবির কপিরাইট MUNIR UZ ZAMAN
Image caption হলফনামায় ভুল বা অসত্য তথ্য শাস্তিযোগ্য বলছেন আইনজীবীরা

কেন হলফনামা নিতে এতো আলোচনা?

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীদের দেয়া হলফনামার ভিত্তিতে নানা ধরণের সংবাদ প্রকাশ হচ্ছে বাংলাদেশের গণমাধ্যমে।

সেখানে অনেকের আর্থিক অবস্থা কিংবা সম্পদের বিবরণ নিয়ে নানা ধরণের আলোচনা হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।

কারণ দেশে আর্থিকভাবে বিত্তবান হিসেবে পরিচিত বেশ কয়েকজন প্রার্থী হলফনামায় তাদের চেয়ে তাদের স্ত্রীদের সম্পদ অনেক বেশি দেখিয়েছেন।

সিনিয়র রাজনীতিকদের কেউ কেউ হলফনামায় বলেছেন তার বাড়ি গাড়ি নাই।

এসব নানা ধরণের তথ্য দিয়ে নানা ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য কিংবা পোস্ট আসছে ফেসবুক সহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।

বিবিসি বাংলায় আরো পড়তে পারেন:

প্রার্থীদের হলফনামা কতটা বিশ্বাসযোগ্য ?

মনোনয়ন বাতিল হলো যেসব আলোচিত প্রার্থীদের