দূর নিয়ন্ত্রিত লালবাতি ঢাকার কতটা কাজে লাগবে?

ঢাকার যানজট ছবির কপিরাইট Barcroft Media
Image caption ঢাকার যানজট

যানজটের শহর বলে পরিচিত বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকাতে ট্র্যাফিক সামলাতে দূরনিয়ন্ত্রিত (রিমোট কন্ট্রোলড) সিগনালিং ব্যবস্থা চালু হয়ে যাচ্ছে বেশ কতগুলো গুরুত্বপূর্ণ মোড় বা ইন্টারসেকশনে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন কর্তৃপক্ষ অন্তত ছ'টি পুরোপুরি তৈরি হওয়া এ ধরনের সিগনাল বাতি মেট্টোপলিটান পুলিশের ট্র্যাফিক বিভাগের হাতে তুলে দিচ্ছে এ সপ্তাহেই।

এই রিমোট কন্ট্রোলড সিগনালিংয়ের মূল বিশেষত্ব হল, একটা ক্রসিংয়ের কোন দিকে যানবাহনের চাপ কত - সেই অনুযায়ী দূর থেকেই স্থির করা হবে, লাল বা সবুজ বাতির মেয়াদ কোনদিকে কতটা হবে।

ফলে ডিজিটাল ডিসপ্লে-তে দেখেই গাড়ির চালকরা বুঝতে পারবেন ওই সিগনালে তাকে ঠিক কতটা সময় অপেক্ষা করতে হবে।

তা ছাড়া সাবেকি ট্র্যাফিক সিগনালে যেমন আগে থেকেই ঠিক করা থাকত কোনদিকে লালবাতি কতক্ষণ থাকবে, এখানে তা হবে না - বরং দিনের কোন সময়ে কোন দিকে যানবাহনের চাপ কত সেটা বুঝে 'রিয়াল টাইমে' সেই মেয়াদটা নিয়ন্ত্রণ করা যাবে।

আরো পড়ুন:

নিরাপদ সড়ক: ঢাকার ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় কোন পরিবর্তন এসেছে?

পাঠ্যবইয়ে ট্রাফিক নিয়মের পাঠ কতটা আছে?

ছবির কপিরাইট Vladimir Smirnov
Image caption রাশিয়াতে একটি ডিজিটাল সিগনালিং ব্যবস্থা

আমাদের পেজে আরও পড়ুন:

ঢাকায় ছেলের মৃতদেহ নিয়ে বাবা আত্মসমর্পণ করলো - যা জানা যাচ্ছে

সংসদ নির্বাচন: বিএনপির তৃণমূলের নেতা কর্মীরা কেন পুরোদমে সক্রিয় হতে পারছে না

আখলাক মামলার তদন্তের জেরেই কি খুন পুলিশকর্তা?

কিন্তু যেটা কোটি টাকার প্রশ্ন, তা হল ঢাকা এই ধরনের ব্যবস্থার সঙ্গে কতটা অভ্যস্ত হতে পারবে?

ট্র্যাফিক সিগনালে যদি ব্যাটন হাতে পুলিশকর্মীরা না-থাকেন, তার পরেও কি শহরের চালকরা শুধু ডিজিটাল ইশারায় সিগনালের নিয়মকানুন মেনে চলবেন?

"এটা আসলে নির্ভর করবে রিমোট কন্ট্রোলড সিস্টেম কত নিখুঁতভাবে কাজ করবে তার ওপর", বলছিলেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) নগর পরিকল্পনা বিভাগের প্রধান আফসানা হক।

ড: হকের কথায়, "চালকরা যদি দেখেন যে ডিসপ্লেতে দেখাচ্ছে তাদের ১২০ সেকেন্ড অপেক্ষা করতে হবে - এবং ঠিক দুমিনিটের মাথাতেই গাড়ির চাকা চলতে শুরু করল, তাহলে তারা সেটা সানন্দে মেনে নেবেন। কিন্তু তা যদি না-হয় তখন তারা কিন্তু ধৈর্য রাখবেন না, একটা বড় গন্ডগোল বেঁধে যাবে।"

ছবির কপিরাইট বুয়েট
Image caption বুয়েটের নগর পরিকল্পনা বিভাগের প্রধান আফসানা হক

তবে পরিবহন বিশেষজ্ঞ ড: এস এম সালেহউদ্দিন এখনই অতটা আশাবাদী হতে রাজি নন - কারণ তিনি মনে করেন ঢাকায় তীব্র যানজটের পেছনে মূল কারণটা হল যথেষ্ঠ পরিমাণে রাস্তার অভাব।

"দেখুন, একটা আধুনিক শহরে মোট জমির অন্তত পঁচিশ বা তিরিশ শতাংশ রাস্তা থাকার প্রয়োজন। সেই জায়গায় আমাদের ঢাকাতে আছে মাত্র ৯ থেকে ১০ শতাংশ - ফলে এই যানজটের সমস্যা থেকে পরিত্রাণ পাওয়া খুবই মুশকিল", বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।

"রিমোট ট্র্যাফিক সিগনাল প্রথম প্রথম কিছুটা স্বস্তি দেবে, শহরের কোনও কোনও জায়গায় যাতায়াত হয়তো একটু মসৃণও হতে পারে - কিন্তু আমার ধারণা অল্প দিনের মধ্যেই পরিস্থিতি আবার যে-কে-সেই হয়ে দাঁড়াবে।

"তার কারণ একটাই, ঢাকার রাস্তায় প্রতিদিন যে পরিমাণে নতুন গাড়ি যোগ হচ্ছে সেই তুলনায় রাস্তা বাড়ছে না এক ইঞ্চিও। কাজেই সিগনাল অ্যানালগই হোক বা ডিজিটাল, তাতে মূল সমস্যাটার খুব একটা কিছু সুরাহা হবে না", বলছিলেন ড: সালেহউদ্দিন।

ছবির কপিরাইট NurPhoto
Image caption ঢাকায় যানবাহনের গতি কম, তার একটা কারণ রিকশা

ঢাকার ট্র্যাফিক সমস্যা নিরসনে যে কমিটি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে তাদের প্রতিবেদন জমা দিয়েছে, তিনি তার অন্যতম সদস্যও বটে।

ওই কমিটি তাদের রিপোর্টে জোর দিয়েছে শহরে বাস চলাচল ব্যবস্থাপনায় সংস্কার আনার ওপর, কারণ তারা দেখেছেন ঢাকায় যানজট সৃষ্টির পেছনে প্রধান কারণ হল বাসগুলো কোনও নিয়মকানুন মেনে চলে না।

"কিংবা ধরুন গাজীপুর থেকে শুরু করে একই রুটে ৩৫টা কোম্পানির বাস ঢাকাতে চলছে, মুনাফার জন্য তারা একে অন্যের সঙ্গে জঘন্য কম্পিটিশনে মেতে আছে।"

"গাড়িগুলোও হয়তো ড্রাইভারদের কাছে লিজ দেওয়া। তারা নিজেদের বাড়তি লাভের আশায় একই রুটে, একই সময়ে গুঁতোগুঁতি করছেন - বিপজ্জনকভাবে যাত্রী তুলছেন বা ওভারটেক করছেন। রিমোট কন্ট্রোলড সিগনাল কীভাবে তাদের সামলাবে?" রীতিমতো আক্ষেপের সুরেই বলেন ড: সালেহউদ্দিন।

ছবির কপিরাইট NurPhoto
Image caption রিমোট কন্ট্রোলড ট্য্যাফিক সিগনাল (ফাইল চিত্র)

শহরের যে সব মোড়ে রিমোট কন্ট্রোলড সিগনালিং চালু হচ্ছে, সেখানে ডিজিটাল লালবাতির পাশাপাশি ট্র্যাফিক পুলিশও যান চলাচল তদারকির জন্য মোতায়েন থাকবে কি না তা অবশ্য এখনও স্পষ্ট নয়।

কিন্তু বুয়েটের অধ্যাপক আফসানা হক মনে করছেন, "পুলিশের লাঠির ভয় না-থাকলেও ঢাকার গাড়ি চালকরা ট্র্যাফিক সিগনালের নিয়ম মেনে চলার জন্য প্রস্তুত কি না, এটা একটা দেখার মতো বিষয় হবে।"

"আমরা প্ল্যানিংয়ের ভাষায় একটা কথা বলি, কোনও প্রকল্প ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া হলে সেটা কিছুতেই কাজ করবে না। কিন্তু যদি সেখানকার মানুষের বিহেভারিয়াল প্যাটার্ন (ব্যবহার বা আচরণ) অনুযায়ী সেই প্রকল্পের নকশা করা হয় তাহলেই তা কেবল ফলপ্রসূ হতে পারে।"

ছবির কপিরাইট NurPhoto
Image caption প্রবল যানজটে ঢাকায় রোগীকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়াও একটা বিড়ম্বনা

"ফলে আমার মনে হয়, বার্লিনে যে ট্র্যাফিক সিগনালিং সিস্টেম কাজ করবে, হুবুহু একই ধরনের সিস্টেম ঢাকাতে ব্যর্থও হতে পারে।"

"কিন্তু ঢাকার প্রয়োজন-পরিস্থিতি অনুযায়ী সেটাকে ইম্প্রোভাইজ করা গেলে হয়তো এটা হিট-ও করে যেতে পারে", হাসতে হাসতেই যোগ করেন তিনি।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা যাচ্ছে, এ সপ্তাহের মধ্যেই শহরের কদম চত্বর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হল, মৎস্য ভবন, কাকরাইল মসজিদ, হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল ও শাহবাগ - এই ছটি ইন্টারসেকশনে রিমোট কনট্রোলড সিগনালিং চালু হচ্ছে।

কিন্তু এই আধুনিক ও নতুন ব্যবস্থা রাজধানীর যানজট নিরসনে ও ট্র্যাফিক চলাচলকে মসৃণ করতে কতটা সাহায্য করবে, তার কোনও স্পষ্ট উত্তর এখনও জানা নেই!

সম্পর্কিত বিষয়