বাবরি মসজিদ: প্রাক্তন কংগ্রেস প্রধানমন্ত্রী নরসিমহা রাও কি বাঁচাতে পারতেন এই মসজিদ?

৬ই ডিসেম্বর বাবরি মসজিদের গম্বুজের ওপর হাজার হাজার করসেবক ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption ৬ই ডিসেম্বর বাবরি মসজিদের গম্বুজের ওপর হাজার হাজার করসেবক

১৯৯২ সালের ৬ই ডিসেম্বর ছিল রবিবার।

রবিবার বলেই একটু দেরী করে সেদিন ঘুম থেকে উঠেছিলে তৎকালীন কংগ্রেস প্রধানমন্ত্রী নরসিমহা রাও।

অন্যদিন আগে উঠলেও সেদিন তার ঘুম ভাঙ্গতে সকাল সাতটা বেজে গিয়েছিল।

খবরের কাগজে চোখ বোলানো তার নিত্য অভ্যাস। রোজকার মতোই ৬ই ডিসেম্বরও কাগজ পড়া শেষ করে আধঘন্টা ট্রেড মিলে হেঁটেছিলেন মি. রাও।

তারপরেই প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে গিয়েছিলেন তার ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডা. কে শ্রীনাথ রেড্ডি। পরীক্ষার জন্য প্রধানমন্ত্রীর রক্ত আর মূত্রের নমুনা নেওয়ার সময়ে দুজনে ইংরেজি আর তেলুগু মিশিয়ে কথা বলছিলেন।

ডা. রেড্ডি তারপরে ফিরে গিয়েছিলেন নিজের বাড়িতে। দুপুরে, ১২টা ২০ নাগাদ টেলিভিশন খুলেছিলেন। তখন ছবি দেখানো হচ্ছিল যে হাজারে হাজারে করসেবক বাবরি মসজিদের গম্বুজের ওপরে চড়ে গেছে।

১টা ৫৫ মিনিটে বাবরি মসজিদের প্রথম গম্বুজটা ভেঙ্গে পড়ে।

টিভি দেখতে দেখতেই হঠাৎ ডা. রেড্ডির খেয়াল হয় যে প্রধানমন্ত্রীর তো হৃদযন্ত্রের সমস্যা আছে, বছর দুয়েক আগে একটা হার্টের অপারেশনের পরে রাজনীতি থেকে একরকম অবসরই নিয়ে নিয়েছিলেন মি. রাও।

বিবিসি বাংলায় আরও পড়ুন:

প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ানে বাবরি মসজিদ ভাঙ্গার সেই মুহূর্ত

যেভাবে বাবরি মসজিদ ভাঙ্গার মহড়া দেয়া হয়েছিল

বাবরি মসজিদ ধ্বংসের মামলায় অভিযুক্ত শীর্ষ তিন বিজেপি নেতা

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption প্রাক্তন কংগ্রেস প্রধানমন্ত্রী পি ভি নরসিমহা রাও

বাবরি মসজিদের তৃতীয় গম্বুজটা ভেঙ্গে পড়ছে যখন, ততক্ষণে ডা. রেড্ডি প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে আবারও পৌঁছিয়ে গেছেন তার রক্তচাপ মাপতে।

"আমাকে দেখেই প্রধানমন্ত্রী একটু ক্ষুব্ধ হয়ে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, আপনি আবার কী করতে এসেছেন? আমি বলেছিলাম, একবার পরীক্ষা করে দেখা দরকার আপনাকে। পাশের একটা ছোট ঘরে নিয়ে গিয়ে রক্তচাপ মাপছিলাম। যা সন্দেহ করেছিলাম সেটাই সত্যি হল। ওর পালস রেট বেশ বেশি হয়ে গিয়েছিল, হার্টও বেশ দ্রুত চলছিল। রক্তচাপও বেশি। চোখমুখ লাল হয়ে গিয়েছিল। দেখেই বোঝা যাচ্ছিল যে বেশ উত্তেজিত হয়ে ছিলেন প্রধানমন্ত্রী। আমি 'বিটা ব্লকার'-এর একটা বাড়তি ডোজের ওষুধ দিয়েছিলাম ওকে," জানাচ্ছিলেন ডা. রেড্ডি।

নরসিমহা রাওয়ের ব্যক্তিগত চিকিৎসক আরও বলছিলেন, "প্রধানমন্ত্রী যতক্ষণ না কিছুটা স্বাভাবিক হচ্ছেন, ততক্ষণ ওখানেই ছিলাম আমি। ডাক্তাররা মানুষের চেহারা দেখে কিছু বিষয় আন্দাজ করে নিতে পারে। এবং একটা কথা আছে, দা বডি ডাজ নট লাই, শরীর মিথ্যা কথা বলে না। সেদিন মি. রাওকে দেখে মনে হয় নি যে বাবরি মসজিদ ধ্বংসের ট্র্যাজেডির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী কোনওভাবে গোপন সমঝোতা করেছিলেন।"

ছবির কপিরাইট Hay House
Image caption অর্জুন সিং-এর আত্মজীবনী

শোনা যায়, ডাক্তার চলে যাওয়ার পরে প্রধানমন্ত্রী একটা ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিয়েছিলেন। সন্ধ্যে ছটায় নিজের বাসভবনে মন্ত্রিসভার বৈঠক ডাকেন তিনি।

সেই সময়েকার খুবই সিনিয়ার কংগ্রেস নেতা ও রাও মন্ত্রিসভায় মানব সম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রী অর্জুন সিং তার আত্মজীবনী ''আ গ্রেইন অফ স্যান্ড ইন দা আওয়ার গ্লাস অফ টাইম''-এ মন্ত্রিসভার ওই বৈঠকের বর্ণনা লিখে গেছেন।

"পুরো বৈঠকে নরসিমহা রাওয়ের মুখ দিয়ে একটাও শব্দ বেরয় নি। সকলের নজর সি. কে. জাফর শরিফের দিকে ঘুরে গিয়েছিল, যিনি সেসময় ছিলেন রেলমন্ত্রী । সকলেই যেন মি. শরিফকে বলতে চাইছিল, আপনিই কিছু একটা করুন। তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, এই ঘটনার জন্য দেশ, সরকার আর কংগ্রেস পার্টিকে বড় মাসুল গুনতে হবে। মাখনলাল ফোতেদার (কেন্দ্রীয় মন্ত্রী) তখনই কেঁদে ফেলেছিলেন। কিন্তু পাথরের মূর্তির মতো নিশ্চুপ ছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরসিমহা রাও," আত্মজীবনীতে লিখেছিলেন প্রয়াত কংগ্রেস হেভিওয়েট নেতা অর্জুন সিং।

ছবির কপিরাইট FOTEDAR FAMILY
Image caption নরসিমহা রাও-এর মন্ত্রিসভায় মন্ত্রী ছিলেন মাখনলাল ফোতেদার

অন্তত একটা গম্বুজ রক্ষা করুন

যখন বাবরি মসজিদ ধীরে ধীরে ভেঙ্গে ফেলা হচ্ছিল, সেই সময়ে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী মাখনলাল ফোতেদার ফোন করেছিলেন নরসিমহা রাওকে।

বারবার অনুরোধ করেছিলেন, 'দ্রুত কিছু একটা ব্যবস্থা নিন'।

মি. ফোতেদার তার আত্মকথা 'দা চিনার লিভস'-এ লিখেছেন, "আমি প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ করেছিলাম বিমানবাহিনীকে নামাতে। ফৈজাবাদ শহরে বিমানবাহিনীর যে কয়েকটা চেতক হেলিকপ্টার ছিল, তা থেকে করসেবকদের ওপরে কাঁদুনে গ্যাসের গোলা ছোঁড়ার নির্দেশ দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলাম। মি. রাও বলেছিলেন, 'এটা আমি কী করে করব?' আমি তাকে জানিয়েছিলাম, এরকম জরুরি পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় সরকার যে কোনও সিদ্ধান্ত নিতে পারে, সেই ক্ষমতা রয়েছে সরকারের। একরকম কাতর আর্জি জানিয়ে বলেছিলাম, রাও সাহেব- ধ্বংসের হাত থেকে অন্তত একটা গম্বুজ তো বাঁচান! সেই গম্বুজটাকে আমরা একটা কাঁচের ঘরে রেখে ভারতের মানুষকে যাতে বলতে পারি বাবরি মসজিদ রক্ষা করতে আমরা সবরকম চেষ্টা করেছিলাম। বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পরে প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, ফোতেদারজী, আমি আপনাকে কিছুক্ষণ পরে ফোন করব।"

বিবিসি বাংলায় আরও পড়ুন:

আবার আরেকটি ৯২ হবে নাতো? আতঙ্কে অযোধ্যা

মন্দির চেয়ে অযোধ্যায় লাখ হিন্দু, মুসলিমদের আতঙ্ক

রামকে নিয়ে আবার এত তোড়জোড় কেন বিজেপির

মন্দির না মসজিদ: কী চায় অযোধ্যার বাসিন্দারা?

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি শঙ্কর দয়াল শর্মা

রাষ্ট্রপতি শঙ্করদয়াল শর্মাও ফোনে কেঁদে ফেলেছিলেন

ইন্দিরা গান্ধির অত্যন্ত আস্থাভাজন কংগ্রেস নেতা মাখনলাল ফোতেদার আরও লিখেছেন, "প্রধানমন্ত্রীর অকর্মণ্যতায় ভীষণ নিরাশ হয়ে পরেছিলাম আমি। রাষ্ট্রপতি শঙ্কর দয়াল শর্মাকে ফোন করে তার সঙ্গে দেখা করার সময় চাই আমি। তিনি আমাকে বিকেল সাড়ে পাঁচটা নাগাদ দেখা করতে বলেন। আমি যখন রাষ্ট্রপতি ভবনে যাওয়ার জন্য বাড়ি থেকে বেরচ্ছি, তখন প্রধানমন্ত্রীর ফোন এল। বলা হল সন্ধ্যে ছটায় মন্ত্রিসভার বৈঠক ডাকা হয়েছে। তা সত্ত্বেও আমি রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করতে গেলাম। আমাকে দেখেই রাষ্ট্রপতি শিশুর মতো কেঁদে ফেললেন। বললেন, 'পি ভি [প্রধানমন্ত্রী পি ভি নরসিমহা রাও] এটা কী করল?' আমি রাষ্ট্রপতিকে বললাম, রেডিও আর টিভির মাধ্যমে দেশবাসীর উদ্দেশ্যে তিনি কিছু বলুন। তিনি রাজি হয়ে গেলেন, কিন্তু রাষ্ট্রপতির তথ্য উপদেষ্টা তাকে জানান যে এর জন্য প্রধানমন্ত্রীর অনুমতি লাগবে, আর আমার সন্দেহ ছিল যে প্রধানমন্ত্রী আদৌ সেই অনুমতি দেবেন কী না!"

সরাসরি রাও-ই দায়ী

মাখনলাল ফোতেদার আত্মজীবনীতে আরও লিখেছেন, "আমি মন্ত্রিসভার বৈঠকে ১৫-২০ মিনিট দেরিতে ঢুকেছিলাম। সবাই দেখি নিশ্চুপ। আমি একটু কটাক্ষ করেই বলেছিলাম, 'কী, কারও মুখেই যে দেখি কোনও কথা নেই!' মাধবরাও সিন্ধিয়া মন্তব্য করেছিলেন, 'ফোতেদারজী আপনি কি জানেন না যে বাবরি মসজিদ ভেঙ্গে দেওয়া হয়েছে?' আমি প্রধানমন্ত্রীর দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করেছিলাম, 'রাও সাহেব, এটা কি সত্যি ঘটনা?' প্রধানমন্ত্রী আমার চোখের দিকে তাকাতে পারেন নি সেদিন। ক্যাবিনেট সচিব আমার প্রশ্নের জবাব দিয়েছিলেন। আমি সব ক্যাবিনেট মন্ত্রীদের সামনেই বলেছিলাম, এরজন্য সরাসরি মি. রাও-ই দায়ী। আমার সেই কথারও কোনও জবাব দেন নি প্রধানমন্ত্রী।"

বাবরি মসজিদ ধ্বংসের ঘটনার পর মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেছিলেন মাখনলাল ফোতেদার।

সিনিয়ার সাংবাদিক ও কলামিস্ট কুলদীপ নায়ার আত্মজীবনী 'বিয়ন্ড দা লাইন্সে' লিখেছেন, "আমার কাছে খবর ছিল যে বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পেছনে রাওয়েরও একটা ভূমিকা ছিল। যখন করসেবকরা একের পর এক গম্বুজ ভেঙ্গে ফেলছে, সেই সময়ে তিনি নিজের বাসভবনে পুজো করছিলেন। মসজিদের শেষ পাথরটা ভেঙ্গে দেওয়ার পরে তিনি পুজো শেষ করে ওঠেন।"

কিন্তু নরসিমহা রাওয়ের ওপরে লেখা বহুল চর্চিত বই 'হাফ লায়ন'-এর লেখক বিনয় সীতাপতি এই বিষয়ে মি. রাওকে ক্লিনচিটই দিয়েছেন।

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption পি ভি নরসিমহা রাও

রাওয়ের মন্ত্রিসভার সদস্যরা তার পতন চাইতেন

মি. সীতাপতি বিবিসিকে বলছিলেন, "১৯৯২ এর নভেম্বর মাসে আসলে দুটো জিনিস ধ্বংস করার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। একটা তো বাবরি মসজিদ ভেঙ্গে ফেলা, আর অন্যটা স্বয়ং নরসিমহা রাওকে ধ্বংস করার। সংঘ পরিবার চাইছিল বাবরি মসজিদ ভেঙ্গে ফেলতে আর কংগ্রেস দলের মধ্যে তার প্রতিদ্বন্দ্বীরা স্বয়ং নরসিমহা রাওকেই শেষ করে দিতে চাইছিল। মি. রাও জানতেন যে বাবরি মসজিদ ভাঙ্গা হোক বা না হোক, দলের মধ্যে তার বিরোধীরা সাত নম্বর রেস কোর্স রোডের প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন থেকে তিনি প্রস্থান করুন, এমনটাই চাইবেন। ৯২-এর নভেম্বর মাসে রাজনৈতিক বিষয়ের ক্যাবিনেট কমিটি বা সিসিপিএ-র অন্তত ৫টা বৈঠক ডাকা হয়েছিল। একজন কংগ্রেস নেতাও ওই বৈঠকগুলোতে পরামর্শ দেন নি যে কল্যাণ সিংকে [উত্তরপ্রদেশের সেই সময়কার বিজেপি-র মুখ্যমন্ত্রী] বরখাস্ত করে দেওয়া হোক।"

"রাওয়ের অফিসারেরা তাকে পরামর্শ দিচ্ছিলেন যে, কোনও রাজ্যে আইন শৃঙ্খলা ভেঙ্গে পড়ার পরে সেই রাজ্য সরকারকে ভেঙ্গে দেওয়া যায়, কিন্তু আইন শৃঙ্খলা ভেঙ্গে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে, এরকম পরিস্থিতিতে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া যায় না। আর বাবরি মসজিদ ভেঙ্গে পড়ার সময়ে মি. রাও পুজো করছিলেন বলে যেটা বলা হয়, কুলদীপ নায়ার কি নিজে সেখানে হাজির ছিলেন? মি. নায়ার দাবি করেন যে এ তথ্য নাকি তাকে দিয়েছিলেন সমাজবাদী নেতা মধু লিমায়ে, যিনি আবার এই তথ্য জানতে পেরেছিলেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে কর্মরত মি. লিমায়ের এক সোর্সের কাছ থেকে। সেই সোর্সের নাম কেউই কখনও বলেন নি," জানাচ্ছিলেন মি. সীতাপতি।

রামজন্মভূমি ইস্যুটা কি বিজেপি-র কাছ থেকে কেড়ে নিতে চেয়েছিলেন নরসিমহা রাও?

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ইন্দিরা গান্ধি সেন্টার অফ আর্টস-এর প্রধান রাম বাহাদুর রায় বলছেন, "১৯৯১ সালে যখন বোঝা যেতে লাগল যে বাবরি মসজিদের বিপদ বাড়ছে, তখনও তিনি কোনও ব্যবস্থা নেন নি। মি. রাওয়ের প্রেস উপদেষ্টা পি ভি আর কে প্রসাদ একটা বইতে লিখেছেন যে কীভাবে মসজিদটা ভেঙ্গে যেতে দিয়েছিলেন নরসিমহা রাও। বাবরি ধ্বংসের পরে তিনজন খুব সিনিয়ার সাংবাদিক-সম্পাদক দেখা করতে গিয়েছিলেন মি. রাওয়ের সঙ্গে। তারা হলেন নিখিল চক্রবর্তী, প্রভাষ যোশী আর আর কে মিশ্র। আমিও তাদের সঙ্গে ছিলাম। ওই সিনিয়ার সাংবাদিক-সম্পাদকরা মি. রাওয়ের কাছে একটাই বিষয় জানতে চেয়েছিলেন, যে তিনি কেন এটা হতে দিলেন! সকলের কথা শোনার পরে মি. রাও বলেছিলেন, 'আপনাদের কী মনে হয় আমি রাজনীতি বুঝি না?"

রাম বাহাদুর রায় আরও বলছেন, "নরসিমহা রাওয়ের ওই কথাটার অর্থ আমার কাছে এটাই, যে তিনি মনে করেছিলেন যদি সত্যিই বাবরি মসজিদ ভেঙ্গে ফেলা হয়, তাহলে বিজেপি আর কখনই মন্দির নিয়ে রাজনীতি করতে পারবে না। চিরকালের মতো তাদের হাত থেকে এই ইস্যুটা চলে যাবে। মনে হয় এই জন্যই তিনি মসজিদ রক্ষার জন্য কোনও ব্যবস্থা নেন নি। আমার মনে হয়, বিজেপি-র সঙ্গে কোনও ষড়যন্ত্র করে নয়, অথবা কোনও ভুল চিন্তার কারণেও নয়, রাজনৈতিকভাবে বিজেপির কাছ থেকে যাতে এই ইস্যুটা কেড়ে নেওয়া যায়, সেজন্যই তিনি নিশ্চুপ ছিলেন। তার প্রত্যেকটা পদক্ষেপ এমন ছিল যাতে বাবরি মসজিদ ধ্বংস হয়ে যায়।"

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption মসজিদ রক্ষার জন্য মি. রাও কোন ব্যবস্থা নেন নি বলে অভিযোগ

রাজনৈতিক মিসক্যালকুলেশন

নরসিমহা রাওয়ের এই পদক্ষেপকে বড়জোড় রাজনৈতিক অঙ্কের একটা ভুল বলে মনে করেন মি. রাওয়ের কাছের মানুষ, সাংবাদিক কল্যানী শঙ্কর।

"আদভানিবাণী আর বাজপেয়ী তাকে ভরসা দিয়েছিলেন যে মসজিদের কোনও ক্ষতি হবে না। সুপ্রিম কোর্ট কেন্দ্রীয় সরকারকে রিসিভার হিসাবে নিয়োগ করতে চায় নি। এটা তো রাজ্যের অধিকার যে তারা সেখানে নিরাপত্তাবাহিনীকে পাঠাবে কী না! কল্যাণ সিং তো অযোধ্যায় নিরাপত্তাবাহিনী পাঠাতেই দেন নি সেদিন," বলছিলেন কল্যানী শঙ্কর।

প্রখ্যাত সাংবাদিক সঈদ নাকভির কাছে জানতে চেয়েছিলাম, যে সত্যিই কি নরসিমহা রাওয়ের পদক্ষেপগুলোকে রাজনৈতিক অঙ্কের ভুল বলা চলে বা 'এরর অফ জাজমেন্ট'?

মি. নাকভি বলছিলেন, "রাওয়ের সঙ্গে কী তাহলে তার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীরও ভুল হয়েছিল? সন্ধ্যেবেলায় ভারত সরকারের পদস্থ অফিসারেরা তো কপালে তিলক কেটে ঘুরছিলেন, যেন তারা ওই ঘটনা সেলিব্রেট করছেন! এগুলোকে কী বলবেন?"

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি

অনভিজ্ঞ মানুষকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল

ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি তার আত্মজীবনী 'দা টার্বুলেন্ট টাইমস'এ লিখেছেন, "বাবরি মসজিদকে ভেঙ্গে পড়ার হাত থেকে রক্ষা না করতে পারাটা পি ভি-র সব থেকে বড় ব্যর্থতা। অন্যান্য দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার দায়িত্বটা তার দেওয়া উচিত ছিল নারায়ন দত তিওয়ারীর মতো সিনিয়ার, অভিজ্ঞ নেতাদের। সেসময় পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনকারী মি: মুখার্জি লিখেছেন এমন মানুষকে এই কাজের ভার দেওয়া উচিত ছিল, যারা উত্তরপ্রদেশের রাজনীতিটা বোঝেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী এস বি চহ্বান আলাপ-আলোচনার জন্য সক্ষম ছিলেন ঠিকই, কিন্তু উদ্ভূত পরিস্থিতিটা তিনি আঁচ করতে পারেন নি। রঙ্গরাজন কুমারমঙ্গলমও যথেষ্ট সততার সঙ্গেই কাজ করেছিলেন, তবে তার বয়স কম, অভিজ্ঞতাও খুব একটা ছিল না যখন তিনি প্রথমবার স্বরাষ্ট্র দপ্তরের প্রতিমন্ত্রী হয়েছিলেন।"

"পরে, একটা সময়ে যখন নরসিমহা রাওয়ের সঙ্গে আমার আলাদা করে দেখা হয়, তখন বেশ কড়া কথা শুনিয়েছিলাম আমি। বলেছিলাম, 'আপনার আশপাশে কি এমন কেউ ছিল না যে বিপদ কীভাবে এগিয়ে আসছে, সেটার ব্যাপারে আপনাকে সতর্ক করবে? আপনি কি ধারণা করতে পারেন নি বাবরি মসজিদ ভেঙ্গে গেলে সারা পৃথিবীতে কীরকম প্রতিক্রিয়া হবে? মুসলমানদের মনে যে আঘাত লেগেছে, তার জন্য এখন তো অন্তত কিছু একটা পদক্ষেপ নিন আপনি! এতকিছু বলার পরেও বরাবরের মতোই নরসিমহা রাওয়ের ভাবের কোনও পরিবর্তন হল না। কয়েক দশক একসঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা আছে, তাই ওকে জানি ভাল করেই। চেহারা দেখার দরকার ছিল না আমার। ওর দু:খ আর নিরাশা স্পষ্টতই সেদিন টের পেয়েছিলাম আমি," লিখেছেন প্রণব মুখার্জী।

অর্জুন সিংয়ের ভূমিকাও প্রশ্নের উর্দ্ধে ছিল না

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption অর্জুন সিং

গোটা ঘটনায় অর্জুন সিংয়ের যা ভূমিকা ছিল, তা নিয়েও অনেক প্রশ্ন উঠেছে।

মাখনলাল ফোতেদার আত্মজীবনীতে লিখেছেন, "অর্জুন সিং খুব ভাল করেই জানতেন যে ৬ই ডিসেম্বর একটা বড় কিছু হতে চলেছে। তা স্বত্ত্বেও তিনি রাজধানী দিল্লি ছেড়ে পাঞ্জাবে চলে গিয়েছিলেন। পরে তিনি জানিয়েছিলেন সেখানে যাওয়ার কর্মসূচি আগে থেকেই করা ছিল। আমার মনে হয় ৬ তারিখ সন্ধ্যেবেলার মন্ত্রিসভার বৈঠকে তার অনুপস্থিতি আর পরে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করা নিয়ে তার দ্বিধা রাজনৈতিভাবে তার অনেক ক্ষতি করেছে। অর্জুন সিংয়ের মুখ ঘুরিয়ে নেওয়া আর মন্ত্রিসভার নিশ্চুপ হয়ে থাকা, বিশেষ করে উত্তর ভারতের নেতাদের চুপ করে থাকাটা, হিন্দি বলয়ের মুসলমানদের থেকে কংগ্রেসকে অনেকটই দূরে সরিয়ে দিল।"

বিবিসি বাংলায় আরও পড়তে পারেন:

এরশাদের পতন: পর্দার আড়ালে যা ঘটেছিল

অরিত্রির আত্মহত্যা: ভিকারুননিসার শ্রেণিশিক্ষক গ্রেপ্তার

মেয়েরা নিঃসঙ্গতার শিকার হয় বেশি: গবেষণা

সম্পর্কিত বিষয়