ভারতে রাজনৈতিক কারণে প্যাঁচার ওপর নির্যাতন ও হত্যা

ভারতীয় ঈগল বা হুতোম পেঁচা ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption ভারতীয় হুতোম-পেঁচা বড় আকারের লম্বা কান প্রজাতির পেঁচা যা দেখা যায় ভারতীয় উপমহাদেশে

ভারতে নির্বাচনের সময় কর্তৃপক্ষ ভোটারদের মন জয় করার বা তাদের ভোট কেনার জন্য বিভিন্ন ধরনের 'উপহার সামগ্রী' বিতরণ করার ব্যাপারে আগ্রহী থাকে।

এবারে ভারতে স্থানীয় নির্বাচনের আগে কর্নাটক রাজ্যের কর্মকর্তারা সচেষ্ট পদক্ষেপ নিচ্ছে যাতে তাদের রাজ্য থেকে প্যাঁচা প্রতিবেশী তেলেঙ্গানা রাজ্যে পাচার হয়ে না যায়। তেলেঙ্গানায় স্থানীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে শুক্রবার।

তেলেঙ্গানার সীমান্ত এলাকার সিদাম থেকে ইতিমধ্যেই প্যাঁচা পাচারের দায়ে ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা তদন্ত কর্মকর্তাদের বলেছে প্যাঁচার ''বাজার দর'' এখন খুবই চড়া।

কিন্তু ভারতে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনে বেআইনিভাবে প্যাঁচা রাখা এবং প্যাঁচা নিয়ে বাণিজ্য অপরাধ।

যাদুটোনা

কিন্তু এক্ষেত্রে যেটা অস্বাভাবিক সেটা হল এখানে ঠিক নির্বাচনী ''উপহার সামগ্রী'' হিসাবে প্যাঁচা মূল্যবান হয়ে ওঠেনি। একজন পুলিশ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার বিবিসি হিন্দিকে সেরকম তথ্যই দিয়েছেন।

ওই কর্মকর্তা বলেছেন, ''প্যাঁচার শরীরের কোন কোন অংশ প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর জন্য দুর্ভাগ্য বয়ে আনবে বলে স্থানীয়ভাবে বিশ্বাস করা হয়।''

৭ই ডিসেম্বর বিধানসভার ১১৯টি আসনের জন্য ভোটাররা ভোট দেবেন।

বিবিসি বাংলায় আরও পড়ুন:

৪০ বছরে বন্যপ্রাণী কমেছে প্রায় ৬০ শতাংশ

বাঘ-সিংহ বা জিরাফ কি একদিন বিলুপ্ত হয়ে যাবে?

অস্তিত্ব সংকটে বাঘ

ছবির কপিরাইট karnataka police
Image caption স্থানীয় কুসংস্কার অনুযায়ী প্যাঁচা প্রতিদ্বন্দ্বীর পরাজয় নিশ্চিত করতে পারে

কর্নাটক বনবিভাগের কর্মকর্তা রামকৃষ্ণ ইয়াদব বলছেন, ''সন্দেহভাজনরা জানিয়েছে তেলেঙ্গানার এক ব্যক্তি তাদর সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগ করে বলেছে একজন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর ওপর যাদুটোনা করার জন্য প্যাঁচা দরকার।''

''প্রতিদ্বন্দ্বী শিবিরে ত্রাস সৃষ্টির জন্য প্যাঁচা ব্যবহারের প্রচলন রয়েছে। নির্বাচনের বাজারে প্যাঁচার নাম শুনলে বিরোধী শিবিরে ধারণা জন্মায় যে কেউ তাদের ওপর যাদুটোনা ও তুকতাক করছে। এতে করে তাদের মনোবলও ভেঙে পড়ে," বলছেন মি. ইয়াদব।

আরেকজন পুলিশ কর্মকর্তা, প্রচার মাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার অনুমতি যার নেই, তিনি অবশ্য বিবিসি হিন্দিকে বলেছেন, ''সন্দেহভাজন পাচারকারী ব্যক্তি বা পাচারের ব্যবস্থা করে যারা তাদের সঙ্গে কোন রাজনীতিকের সরাসরি যোগাযোগ প্রমাণ করা একেবারেই দু:সাধ্য একটা ব্যাপার।''

''আমরা কখনই বের করতে পারি না যে আসলেই কোন রাজনীতিক নিজে এসব যাদুটোনা করতে চান নাকি তার শিবিরের কেউ তার হয়ে এসব আয়োজন করে থাকে।''

চড়া চাহিদা

ভারতে ৩০টি ভিন্ন প্রজাতির প্যাঁচা রয়েছে। এদের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় দুটি প্রজাতি হল ভারতীয় হুতোম-প্যাঁচা এবং লক্ষ্মী প্যাঁচা। অবৈধ এসব বাণিজ্যের জন্য এই দুধরনের প্যাঁচার চাহিদা সবচেয়ে বেশি। কুসংস্কারমূলক আচার ও যাদুটোনা, তুকতাকের জন্য এই দুধরনের প্যাঁচা বিক্রি হয় সবচেয়ে বেশি।

ভারতের বন্যপ্রাণী পাচার রোধকারী সংস্থা ট্রাফিক ইণ্ডিয়ার প্রধান ড: সাকেত বাদোলা বিবিসি হিন্দিকে বলেছেন প্যাঁচার অবৈধ বাণিজ্য কত ব্যাপক মাত্রায় হয় তা বলা কঠিন। এই সংস্থা বৈধ ও অবৈধ দুপথেই বন্যপ্রাণীর ব্যবসার ওপর নজরদারি করে।

তবে ড: বাদোলা বলছেন, ''আমরা যেসব তথ্য ও পরিসংখ্যান পেয়েছি তার ওপর নির্ভর করে এটা স্পষ্ট বলতে পারি - প্যাঁচা পাচারের ব্যবসা একটা বিরাট ব্যবসা। উত্তর ভারতে প্যাঁচার চাহিদা প্রচুর এবং দক্ষিণ ভারতও পেছিয়ে নেই। যারা তন্ত্র সাধনা করে তা ব্যাপকভাবে প্যাঁচা ব্যবহার করে।

ছবির কপিরাইট karnakata forest dept
Image caption বনভিাগের কর্মকর্তা রামকৃষ্ণ ইয়াদব বলছেন যাদুটোনা ও তুকতাকের জন্য প্যাঁচার বহুল ব্যবহার রয়েছে

আবরার আহমেদ নামে এক গবেষক তার রিপোর্টে বলেছেন যাদুটো ও তুকতাকের জন্য প্যাঁচার শরীরের ৩৯টি অংশ ব্যবহারের নজির তারা পেয়েছেন।

পায়ের নখ, রক্ত এবং ঠোঁট

আবরার আহমেদের গবেষণা পরিচালনা করেছেন গবেষক ড: আসাদ রেহমানি, যিনি বোম্বে ন্যাচারাল হিস্ট্রি সোসাইটির সাবেক পরিচালক তিনি বিবিসি হিন্দিকে বলছেন, ''এলাকা ভেদে প্যাঁচার পায়ের নখ, রক্ত ও ঠোঁট ব্যবহারের নানা নজির তারা পেয়েছেন।"

'' অনেক এলাকাতেই প্যাঁচাকে অশুভ বলে মনে করা হয় কারণ পেঁচা অন্ধকারের জীব এবং থাকে পোড়ো বাড়ির আনাচে কানাচে। কাজেই মানুষ বিশ্বাস করে ওই প্যাঁচাই এসব বাড়ির জন্য অমঙ্গল ডেকে এনেছে এবং বাড়িগুলো ভগ্নদশায় পরিণত হয়েছে, যার নেহাতই অমূলক।

ডাব্লিউ ডাব্লিউ এফ ট্রাফিকের শরৎ বাবু বলছেন এসব যাদুটোনা বা তুকতাকের জন্য প্যাঁচাকে রীতমত নির্যাতন করা হয়।

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption লরিস প্রজাতির বানরও অবৈধ ব্যবসায় ব্যবহার হয়

মি: বাবু দেখেছেন এসব আচার পালনের সময় প্যাঁচার চোখে পিন ফোটানো হয় বা তাদের ডানা ভেঙে দেওয়া হয়।

"কেউ যদি চায় তার প্রতিপক্ষ নির্বাচনে হারুক, তাহলে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর জামা মরা প্যাঁচার শরীরে বেঁধে প্যাঁচাকে প্রতিপক্ষের বাড়ির সামনে ফেলে দিয়ে আসা হয়। এর জন্য বেশ চড়া দাম হাঁকে যারা কাজটা করে।"

এসব কুসংস্কারের জন্য বানর এবং কাছিমও ব্যবহার করার চল রয়েছে।

বিশ্বের অনেক দেশে প্যাঁচাকে জ্ঞানী পাখি হিসাবে দেখা হলেও ভারতে কাউকে প্যাঁচার সঙ্গে তুলনা করার মানে হল তাকে ছোট করা বা অপমান করা।

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption বিশ্বের অনেক দেশে প্যাঁচা জ্ঞানী পাখি

কিন্তু পরিবেশের জন্য প্যাঁচার প্রয়োজন রয়েছে বলে বলছেন মি. রেহমানি।

"প্যাঁচা ধেড়ে ইঁদুর খায়, সাপ, খায়। কোন কোন প্রজাতির প্যাঁচা পরিবেশের জন্য উপকারী।''

তবে তিনি বলছেন দু:খের বিষয় এধরনের কুসংস্কারের খপ্পড়ে পড়ে প্যাঁচা ক্রমশ বিলুপ্ত হতে বসেছে। প্যাঁচার প্রজনন প্রক্রিয়াও খুব শ্লথ। বড় প্যাঁচা বছরে - কখনও কখনও দুবছরে একটি কি দুটি বাচ্চা দেয়। ফলে তাদের সংখ্যাবৃদ্ধির হারও খুবই কম।

বিবিসি বাংলায় আরও পড়ুন:

পদ্মা নদীর শাখায় কুমির এলো কীভাবে?

'প্রতিদিন আমি ধর্ষণের শিকার হয়েছি'

বাবরি মসজিদ ধ্বংসের জন্য নরসিমহা রাওয়ের দায় কতটা?

সম্পর্কিত বিষয়