সংসদ নির্বাচন: খবর সংগ্রহ ও পর্যবেক্ষণ নিয়ে উদ্বেগ কতটা যুক্তিযুক্ত

নির্বাচনী খবর সংগ্রহের ক্ষেত্রে নতুন বিধিনিষেধ আসে কীনা তা নিয়ে উদ্বিগ্ন গণমাধ্যম কর্মীরা
Image caption নির্বাচনী খবর সংগ্রহের ক্ষেত্রে নতুন বিধিনিষেধ আসে কীনা তা নিয়ে উদ্বিগ্ন গণমাধ্যম কর্মীরা

বাংলাদেশে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের খবর সংগ্রহ এবং পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রে নতুন বিধি নিষেধ বা কড়াকড়ির মধ্যে পড়তে হবে কিনা তা নিয়ে উদ্বেগ কাটছে না।

নির্বাচনে দেশি বিদেশি সংস্থার পর্যবেক্ষণে করণীয় নিয়ে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা রয়েছে। কিন্তু গণমাধ্যমের জন্য নির্বাচন কমিশনের লিখিত কোনো নীতিমালা নেই। নির্বাচন কমিশন জানাচ্ছে ভোটের আগে পরিপত্র জারি করে স্পষ্ট করা দেয়া হবে যে ভোটের দিন কী করা যাবে আর কী করা যাবে না।

সর্বশেষ তিনটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ভোটকক্ষ এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে কেন্দ্রে ঢুকতে গিয়ে সাংবাদিকরা বাধার মুখে পড়েছেন।

ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি ইলিয়াস হোসেন বলছেন, "এখন পর্যন্ত নির্বাচন কমিশন যা বলছে সেটি পরিষ্কার না। আমার মনে হয় এটা পরিষ্কার করা দরকার। সাংবাদিক যদি আসল চিত্রটা তুলে আনতে না পারে তাহলে পর্যবেক্ষকরাও ব্যবহার করতে পারবে না সাধারণ জনগণও জানতে পারবে না।"

গণমাধ্যম কর্মীদের নির্বাচন কমিশনের ইস্যু করা কার্ড নিয়ে ভোটের খবর সংগ্রহ করতে হয়। সেই কার্ডের পেছনে বিভিন্ন নিয়ম-কানুন লেখা থাকে।

সাধারণত সাংবাদিকরা কার্ড প্রদর্শন করে ভোটকেন্দ্র-বুথ পরিদর্শন করেন, ছবি ধারণ ও তথ্য সংগ্রহ করেন। পোলিং অফিসার, এজেন্টদদের সঙ্গে কথা বলা, ব্যালট পেপার ও ব্যালট বাক্সের ছবি তোলেন। অনেকক্ষেত্রে টেলিভিশনে বুথের ছবি সরাসরি সম্প্রচার করা হয়। এছাড়া ঘণ্টায় ঘণ্টায় কী পরিমাণে ভোট পড়ছে, বা ভোট শেষে গণনার চিত্রও টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচার করার নজির রয়েছে।

বিবিসি বাংলায় আরও পড়ুন:

'গুজব রোধে মোবাইল নেটওয়ার্ক বন্ধ করা হতে পারে'

নির্বাচনী আইন কি স্বতন্ত্র প্রার্থীদের বিপক্ষে যাচ্ছে?

কূটনীতিকদের সাথে বৈঠকে নির্বাচন নিয়ে কী কথা হলো?

Image caption নির্বাচনী বুথ

অনেক সময় সাংবাদিকরা কেন্দ্রে গিয়ে কিছু ক্ষেত্রে অনিয়ম ও জালিয়াতির চিত্রও পান এবং সেটি প্রকাশ করেন। বিগত ৫টি সিটি নির্বাচনের সময় ভোটকেন্দ্র দখল করে জালভোট দেয়ার চিত্রও উঠে এসেছে গণমাধ্যমে। সেই খবর জেনে কিছু কেন্দ্রের ভোট গ্রহণ এবং ভোট গণনা বাতিলেরও নজির রয়েছে।

সাংবাদিকদের উদ্বেগ নিয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার বেগম কবিতা খানম বিবিসিকে বলেন, সাংবাদিকরা প্রিজাইডিং অফিসারের সম্মতি নিয়ে বুথে যেতে পারবে। এমনকি তারা ক্যামেরায় ছবি ধারণ করতে পারবে।

"যেটা আমাদের নীতিমালায় নাই আমরা পরিপত্র দিয়ে সেটা বলে দিব। কিন্তু কোনো লাইভ ব্রডকাস্ট করতে পারবে না বুথের মধ্যে থেকে। আর গোপন কক্ষ তো সবার জন্যই নিষিদ্ধ। প্রিজাইডিং অফিসারের অবশ্যই সম্মতি নিতে হবে ভেতরে ঢুকতে হলে, কক্ষের মধ্যে ঢুকতে হলে। আর ভোট গ্রহণে বিঘ্নতা সৃষ্টি হয় এভাবে কোনো লাইভ দেখাতে পারবে না"।

কিন্তু প্রতি কেন্দ্রে গিয়ে প্রিজাইডিং কর্মকর্তার অনুমতি নেওয়ার বিষয়ে সাংবাদিকদের আপত্তি আছে ।

Image caption নির্বাচন কমিশনার কবিতা খানম বলছেন কোনো লাইভ ব্রডকাস্ট করা যাবে না বুথের মধ্যে থেকে

বাধ্যতামূলক অনুমতির বিরোধিতা করে রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি বলছেন, "নির্বাচনের আগেই কমিশন কার্ড দিয়ে থাকে- ওটাই তো অনুমতি। এরপরে আবার কেন্দ্রে গিয়ে যদি অনুমতি নেয়ার সরকারি প্রক্রিয়ার মধ্যে পড়তে হয় তাহলে আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় যেতে হয়! নির্দিষ্ট একটা টাইমে ভোট পড়ছে -নির্বাচন হচ্ছে। কিন্তু ঘটনা বা দুর্ঘটনা যদি ঘটে সেটি কম সময়ের মধ্যে, এখানে যদি আপনাকে প্রক্রিয়া মানতে হয় তাহলে আপনি খবর সংগ্রহ করতে পারবেন না।"

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের খবর সংগ্রহ নিয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে নির্বাচন কমিশনে দুই দফা আলোচনা হয়েছে। সেখানেও প্রিজাইডিং কর্মকর্তার অনুমতির প্রসঙ্গ আসলে তার বিরোধিতা করা হয়েছিল গণমাধ্যমকর্মীদের পক্ষ থেকে।

এদিকে গণমাধ্যমে খবরের পাশাপাশি নির্বাচন কতটা অবাধ ও সুষ্ঠু হচ্ছে সেটি উঠে আসে দেশি বিদেশি পর্যবেক্ষণে। দেশি বিদেশি পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রে কমিশনে নীতিমালা থাকলেও সম্প্রতি নির্বাচন কমিশন ব্রিফিং করে পর্যবেক্ষকদের কিছু মৌখিক নির্দেশনা দিয়েছেন।

Image caption ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি ইলিয়াস হোসেন

সে নির্দেশনায় কমিশন সচিব ভোটকেন্দ্রে মোবাইল ফোন না নেয়া, ছবি না তোলা এবং গণমাধ্যমে কথা বলতে নিষেধাজ্ঞার নির্দেশনা দিয়েছিলেন। তিনি এমনও বলেছিলেন যে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে পর্যবেক্ষণ করতে হবে।

কমিশন সচিবের এসব নির্দেশনা নিয়ে বিতর্ক ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়।

ফেমার সভাপতি মুনিরা খান বলেন, "ব্রিফিংয়ের ভাষায় সবার মধ্যে একটা কনফিউশন (বিভ্রান্তি) হয়েছে। যে কারণে এটা মিডিয়াতে এত আলোচনায় এসে পড়েছে। এবং সবাই একই বিষয়ে আলোচনা করছে যে এভাবে তাহলে কীভাবে পর্যবেক্ষণ হবে? আমি বিদেশে অনেক জায়গায় ইলেকশন দেখেছি। আমরা কিন্তু তৎক্ষণাৎ কথা বলেছি। যদি আপনি কথা বলতে না দেন তাহলে কিন্তু একটা সন্দেহ থাকে, কিছু না হলেও একটা সন্দেহ থাকে যে এখানে কী হচ্ছে? কেন বলতে দেয়া হচ্ছে না?"

তবে পর্যবেক্ষণ বিতর্ক নিয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার কবিতা খানম জানান পর্যবেক্ষকরা মোবাইল ফোন সঙ্গে নিতে পারবেন, তবে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Image caption ফেমা সভাপতি মুনিরা খান

"উদ্বেগ বা উৎকণ্ঠা থাকার কোনো কারণ নাই যেহেতু একটা নীতিমালা আছে এবং নীতিমালাটিই অনুসরণ করতে হবে। স্থানীয় পর্যবেক্ষকদের এবং বিদেশি পর্যবেক্ষকদেরও করতে হবে। এই নীতিমালার পরেও প্রশ্ন উঠছে যে পর্যবেক্ষকরা মোবাইল ব্যবহার করতে পারবে কিনা বা ক্যামেরা ব্যবহার করতে পারবে কিনা? এখন পর্যবেক্ষকরা ক্যামেরায় ছবি তুলতে পারবে। পরিপত্র আমরা দিব রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে যে কেন্দ্রে এবং কক্ষে তারা থাকতে পারবে। তবে সেখানে অবস্থানটা দীর্ঘ সময় হবে না। মোবাইল অবশ্যই বহন করতে পারবে," বলছেন কবিতা খানম।

গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নে দলীয় সরকারের অধীনে বাংলাদেশে এবারের নির্বাচনকে গণমাধ্যম এবং পর্যবেক্ষকদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। যদিও ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবার সংসদ নির্বাচন পর্যবেক্ষণে আসছে না।

আর কমিশনের নিয়মে কড়াকড়ির কারণে দেশীয় কিছু নামকরা সংস্থাও এবার নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করতে পারছে না।

বিবিসি বাংলায় আরও পড়ুন:

কারা 'হ্যাক' করছেন নিজেদের শরীর, আর কেন?

এরশাদের পতন: পর্দার আড়ালে যা ঘটেছিল

পাকিস্তানে সামাজিক নাটক করার লড়াই কতটা কঠিন ছিল