সংসদ নির্বাচন: সিরাজগঞ্জের চৌহালি, বেলকুচির উন্নয়ন নাকি রাজনীতি কোনটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ

প্রতিদিন এভাবেই চৌহালি থেকে বেলকুচি যান এখানকার মানুষ ছবির কপিরাইট বিবিসি
Image caption প্রতিদিন এভাবেই চৌহালি থেকে বেলকুচি যান এখানকার মানুষ

আমি গিয়েছিলাম চৌহালি উপজেলায় যমুনা নদীর পারে। বিশাল এই নদীর অপর প্রান্তে বেলকুচি উপজেলায় যাওয়ার জন্য কয়েকটি নৌকা প্রস্তুত।

এ পাড়ের মানুষ ওই পাড়ে প্রতিদিন এভাবেই নদীপথে যাতায়াত করেন। সময় লাগে প্রায় দুই ঘন্টা।

সিরাজগঞ্জ-৫ নম্বর আসনটি যে দুটি উপজেলা নিয়ে গঠিত তাদের ভৌগলিক অবস্থানটা অদ্ভুত।

একটি যমুনা নদীর পশ্চিম দিকে অন্যটি পূর্বপাশে। বলতে গেলে যমুনা নদীর মধ্যে চরাঞ্চল এলাকা চৌহালি।

আসন্ন নির্বাচন নিয়ে কী প্রত্যাশা এই উপজেলার মানুষের?

উপজেলার প্রধান বাজার খুব ছোট। এখানেই একটা চায়ের দোকানে বসে কথা বলছিলাম কয়েকজনের সাথে।

একজন বলছিলেন "এই ডিজিটাল সময়ে এসে বিদ্যুত নেই আমাদের এখানে। তো বাকি উন্নয়ন কিভাবে হবে?"

আরেকজন বলছিলেন "বেলকুচির সাথে আমাদের যাতায়াত খুব অসুবিধা। হয় নৌকা নাহলে সড়কে । দুটাই আমাদের জন্য সমস্যা"

একজন নারী বলছিলেন "গ্যাস নেই , হাসপাতাল নেই, ভাল কলেজ পর্যন্ত নেই"।

এখানে মাদক আর বেকারের সমস্যা অনেক সেটার কথা বলেছেন অনেকে।

এখানকার মানুষের প্রত্যাশা একেবারেই স্থানীয় এবং এই বিষয়গুলোকে যে প্রার্থী সমাধান করবেন তার দিকেই ভোটের পাল্লা ভারী হবে।

এই আসনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের বেশিরভাগ বেলকুচি উপজেলা কেন্দ্রীক। তাই আমার গন্তব্য বেলকুচি উপজেলা।

ছবির কপিরাইট বিবিসি
Image caption চৌহালির অনেক স্থানে বিদ্যুত নেই, চলছে সোলার পা্ওয়ার

রাস্তাঘাটের বেহাল দশার কথা বলেছেন আমার কাছে অনেকে।

সিরাজগঞ্জ সদর দিয়ে সড়ক পথে বেলকুচির দিকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার আমি গিয়েছি। রাস্তার চরম বেহাল অবস্থা আমার চোখেও পড়েছে।

সরু রাস্তা, খানাখন্দে ভরা। রাস্তার দুইপাশ দিয়ে বড় বড় গাড়ী চলাচল করছে। যেকোন সময় দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে।

সিরাজগঞ্জ-৫ আসন আরও একটি কারণে ব্যতিক্রম তার কারণ রাজনীতি।

২০০৮ সালের নির্বাচনে সারা বাংলাদেশে সবচেয়ে কম ভোটের ব্যবধানে যে আসনে জয় পরাজয় নিশ্চিত হয় সেটি এই আসন।

মাত্র ২৫২ আসনের ভোটের ব্যবধানে বিএনপি প্রার্থীকে হারিয়ে জিতে যায় আওয়ামী লীগ প্রার্থী।

এই সিটটা মারজিনাল হওয়ার পেছনে কারণ কি ছিল? ৫ আসনের মানুষের সাথে কথা বলে জানা যাচ্ছে এই আসনটি বিএনপি এবং জামায়াত সমর্থিত একটি এলাকা।

তবে ২০০৮ সালে ভৌগলিক কিছু কাটা-ছেঁড়ার কারণে এই আসনের ভোট বিভক্ত হয়ে যায়।

বিষয়টা ব্যাখা করছিলেন স্থানিয় সাংবাদিক গোলাম মোস্তফা রুবেল।

ছবির কপিরাইট বিবিসি
Image caption স্থানীয় উন্নয়নের না হওয়াতে হতাশা প্রকাশ করেছেন অনেকে

তিনি বলছিলেন "চৌহালি ভেঙ্গে সেই সময় অর্ধেক চলে যায় ৭ আসনে , অর্ধেক আসে ৫ আসনে। আবার আরেকটা আসন কামারখন্দ সেটা চলে আসে সিরাজগঞ্জ ২ আসনে। এর ফলে বিএনপি এবং জামায়াতের যে একত্রিত ভোট সেটা কয়েকটা আসনে চলে যায়।"

"আবার ঐ সময় আ্ওয়ামী লীগের প্রার্থী যিনি ছিলেন তিনি ভালো প্রচার-প্রচারণা চালিয়েছিলেন। সব মিলিয়ে বিএনপি জামায়াতের ভোট একদিকে, আর আওয়ামীগের ভোট আরেকদিকে- এইভাবে খুব হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে খুব কম ব্যবধানে জয় পায় আওয়ামী লীগ"।

এবারের নির্বাচনে বিএনপি থেকে প্রার্থী হয়েছেন আমিরুল ইসলাম খান আলীম। আর একজন প্রার্থী দাঁড়িয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে যিনি ঐ এলাকায় জামায়াত ইসলামের নেতা।

সে ক্ষেত্রে বিএনপির ভোট ব্যাংক আগের তুলনায় কিছুটা দুর্বল মনে হবে ।

বেলকুচি উপজেলার বিএনপির সাবেক সভাপতি গোলাম আজমের কাছে জানতে চেয়েছিলাম (স্থানিয় বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির যুগ্ম আহবায়ক) এইবারের নির্বাচনে তার দল জনগণের প্রত্যাশা এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে কীভাবে মোকাবিলা করবে ?

মি. আজম বলছিলেন "প্রথমত আমাদের যে প্রার্থী তিনি বেলকুচির মানুষ। আওয়ামী লীগের প্রার্থী এই আসনের না। সেদিক থেকে আমরা এগিয়ে থাকবো। তাছাড়া ১০ বছরে যে এলাকার বেহাল দশা সেটা আমরা তুলে ধরবো, রাস্তা নেই, বিদ্যুত নেই, গ্যাস নেই এসব তারা করতে পারে নি।"

"আমরা প্রতিশ্রুতি দেব যাতে করে আমরা নির্বাচনে জিততে পারি। সুষ্ঠু ভোট হলে এটা আর মার্জিনাল সিট হবে না এই আসনে।"

ছবির কপিরাইট বিবিসি
Image caption প্রত্যন্ত অঞ্চলে এখনো রাস্তা নেই

সিরাজগঞ্জ ৫ আসনে এবারে ভোটার সংখ্যা তিন লাখ ৪০ হাজারের কাছাকাছি। এখানে বেলকুচিতে রয়েছে প্রায় দুই লাখের বেশি ভোটার।

আওয়ামী লীগ থেকে এই আসনের প্রার্থী আব্দুল মমিন মন্ডল। স্থানীয় আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদক ফজলুল হক সরকার বলছিলেন তারা ইতোমধ্যে তাদের উন্নয়নের বিষয়কে সামনে নিয়ে এসে প্রার্থীদের কাছে যাচ্ছেন।

মি. সরকার বলছিলেন "এই আসনে কেন্দ্র আছে ৮২টা। প্রতিটা কেন্দ্রে আমরা কমিটি করেছি। এই কমিটির মাধ্যমে আমরা ভোটারদের কাছে আমাদের বার্তা পৌঁছে দিচ্ছি। সভা, সমাবেশ, পথসভা, মিছিল এসব কিছুর মাধ্যমে আমরা সাংগাঠনিকভাবে প্রস্তুত আছি"।

সিরাজগঞ্জ ৫ আসনের মানুষের স্থানীয় উন্নয়নের কথা বার বার বলেছেন।

তারা হতাশা প্রকাশ করে বলেছেন প্রতিবার উন্নয়নের আশায় তারা ভোট দেন কিন্তু অবস্থার কোন পরিবর্তন হয় না।

এবারের নির্বাচনে যদি স্থানীয় রাজনীতিবীদরা এই উন্নয়নের বিষয়টি ধরে কাজ করতে পারেন সেটাই 'গেম চেঞ্জার' বা নির্বাচনের ফলাফলে পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা তৈরি করবে।

এই আসনের অপর প্রার্থীরা হলেন আলী আলম- স্বতন্ত্র, মুহিদুল ইসলাম-ইসলামি আন্দোলন ঐক্যজোট, মোক্তার হোসেন-জাতিয় পার্টি, লোকমান হোসেন- ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, আব্দুর নূর-বাংলাদেশ বিপ্লবী ওর্য়াকার্স পার্টি।