সংসদ নির্বাচন: সিরাজগঞ্জ-২ আসনে অতীত পরিসংখ্যান বিএনপি'র পক্ষে, কিন্তু আত্মবিশ্বাসী আওয়ামী লীগ

তাঁত শিল্পের মন্দার কারণে অনেকে এই ব্যবসা ছেড়ে অন্য পেশায় যাচ্ছেন ছবির কপিরাইট বিবিসি
Image caption তাঁত শিল্পের মন্দার কারণে অনেকে এই ব্যবসা ছেড়ে অন্য পেশায় যাচ্ছেন

সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলা এবং কামারখন্দের মানুষের অন্যতম পেশা তাঁত শিল্প।

কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে মারাত্মক মন্দায় পড়েছে এই শিল্প। অনেকে এই ব্যবসা ছেড়ে দিয়ে অন্য পেশায় নিজেদের নিযুক্ত করেছেন।

আমি গিয়েছিলাম কামারখন্দ উপজেলায়। সদর উপজেলা থেকে আসার সময় রাস্তার দুই পাশে অসংখ্য তাঁতের কারখানা দেখেছি - যেগুলো এখন বন্ধ।

দীর্ঘদিন যে সেখানে কোন সুতার বুনন হয়নি সেটা বোঝা যায় তাঁতের ওপর জমে থাকা ময়লা আর মাকড়শার জাল দেখলেই ।

কেন হুমকির মুখে তাঁতশিল্প?

কামারখন্দের একজন ব্যবসায়ী কামরুল ইসলাম বলছিলেন কেন তাঁত শিল্পের এই অবস্থা।

তিনি বলছিলেন, "রং এবং সুতার দাম গত কয়েক বছরে অনেক বেড়েছে। যেটা ছাড়া কাপড় তৈরি হবে না। এই বছরে আরো খারাপ।"

"আর এখানে ৫ হাজার তাঁত থাকলে আড়াই হাজার বন্ধ হয়ে গেছে। তাছাড়া চারটা উপজেলায় হাট হয়, সেসবের অবস্থা খুব খারাপ, একটা করে ঈদ যাচ্ছে আর তাঁতের ব্যবসায়ীরা সব ছেড়ে দিয়ে চলে যাচ্ছেন।"

আসন্ন নির্বাচনে সিরাজগঞ্জ ২ আসনের মানুষ তাঁত শিল্পের বর্তমান অবস্থার মত আরো বেশ কিছু স্থানীয় বিষয় বিবেচনা করছেন।

আরো পড়তে পারেন:

তরুণ ভোটারদের প্রধান টার্গেট করবে বিএনপি

গুগল সার্চে বাংলাদেশীরা যাদের বেশি খোঁজ করেছেন

কীভাবে সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করছে রাজনৈতিক দলগুলো

'মুরগির দুনিয়া': কীভাবে পৃথিবীর দখল নিলো এই পাখি

ছবির কপিরাইট বিবিসি
Image caption প্রত্যাশার কথা বলছেন এখানকার মানুষ

প্রার্থীদের কাছে মানুষের প্রত্যাশা কী?

এই আসনের বিভিন্ন সমস্যা এবং প্রত্যাশা নিয়ে কথা বলছিলেন সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার বাজার এলাকার মানুষ।

এখানে স্থানীয় রাজনীতি এবং প্রার্থী সব কিছু্কেই তারা বিবেচনায় রাখছেন।

একজন বলছিলেন, "আমাদের এই এলাকা কৃষিভিত্তিক। এই কৃষি নিয়ে প্রার্থীরা খুব বেশি চিন্তিত না।"

একজন নতুন ভোটার বলছিলেন, "এখানে কোন কল-কারখানা নেই। অনেক ছেলেমেয়ে আছে যারা লেখাপড়া ক'রে এখন বেকার। সেদিকটা খেয়াল করতে হবে প্রার্থীদের।"

আরেকজন বলছিলেন, "কামারখন্দের অনেক এলাকায় গ্যাস নেই। যমুনা ব্রিজ হওয়ার পর, সদরে গ্যাস এসেছে কিন্তু কামারখন্দের অনেক এলাকাতেই নেই। একটা শিল্পকলকারখানা করার জন্য তো গ্যাসের দরকার, সেটা এবারের নির্বাচনে আমাদের প্রত্যাশা।"

সিরাজগঞ্জ-২ আসনে ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থী ২১২১ ভোটে জয়লাভ করে। এর আগে ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থী জয়লাভ করে এই আসনে। ২০১৪ সালের নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেয়নি।

ছবির কপিরাইট বিবিসি
Image caption বেকারত্বের কথা বলছিলেন একজন তরুণ ভোটার

ফলে বর্তমান সংসদ সদস্য ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের।

এখন এই আসনে ভোটার সংখ্যা সাড়ে তিন লাখের বেশি।

এবারের নির্বাচনে যখন বিএনপি অংশ নিচ্ছে তখন আওয়ামী লীগ কীভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছে?

সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার আওয়ামী লীগের সভাপতি হেলাল উদ্দিন বলছিলেন, গত দেড় বছর ধরে তারা স্থানীয়ভাবে শক্তিশালী কমিটি গঠনের কাজ করছেন এই নির্বাচনে জেতার জন্য।

হেলাল উদ্দিন বলছিলেন, "২০০৮ সালে নির্বাচনে আমাদের প্রার্থী ভিত্তিক সাংগঠনিক অবস্থা ভালো ছিল না। সেই নির্বাচনের পরাজয়ের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে আমরা এবারের সাংগঠনিক তৎপরতা চালিয়েছি। আমরা চিহ্নিত করেছি কোন কোন এলাকায় আমাদের সাংগঠনিক অবস্থার দুর্বলতা ছিল। এই আসনে ১৪৩ টি কেন্দ্রে আমরা কমিটি করেছি দুই মাস আগে। "

"আমরা মনে করছি অতীতের যেকোন সময়ের তুলনায় আমরা সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী - যেটা আমাদের জয় এনে দিতে পারবে" - বলছিলেন আওয়ামী লীগের এই নেতা।

একই সাথে এই আসনে ২০১৪ সাল থেকে আওয়ামী লীগ যে উন্নয়নের কাজ করেছে - সেটাকে তারা মানুষের সামনে তুলে ধরবেন বলে জানান তিনি।

আমি এই আসনে ঘুরে মানুষের সাথে কথা বলে যেটা বুঝেছি, সেটা হল এবারে যদি সুষ্ঠু নির্বাচন হয় তাহলে চরম প্রতিযোগিতায় পড়তে হবে সব প্রার্থীকেই।

কারণ এখানকার ভোটারদের মধ্যে দেখা গেছে নির্বাচনকে নিয়ে চরম উৎসাহ-আগ্রহ।

একদিকে রয়েছে বিএনপির একটা সমর্থকগোষ্ঠী, তবে তারা প্রকাশ্যে কোন কথা বলতে চাচ্ছেন না।

আবার অন্যদিকে রয়েছে বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নির্বাচন কেন্দ্রিক শক্ত প্রস্তুতি।

এই অবস্থায় বিএনপির স্থানীয় যে নেতারা রয়েছেন তারা কতটা প্রস্তুত?

সিরাজগঞ্জ জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সাইদুর রহমান বাচ্চু বলছিলেন "সিরাজগঞ্জ দুই আসন বিএনপির আসন। এখানে যদি সুষ্ঠু ভোট হয়, মানুষ যদি শুধু ভোট কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিতে পারে, তাহলে আমাদের জয় নিশ্চিত।"

"কিন্তু দলের পক্ষ থেকে আমরা প্রস্তুতি নিতে পারছি না। কারণ আমাদের যারা সমর্থক তাদেরকে বিভিন্ন ভাবে হুমকি দেয়া হচ্ছে। এখন মানুষ ভোট দিতে পারলে অল্প ভোট না, বিশাল ব্যবধানে বিএনপি জিতবে এবার।"

এর কারণ হিসেবে মি. বাচ্চু বলছিলেন বিএনপি ক্ষমতায় থাকার সময় এলাকায় অনেক উন্নয়নমূলক কাজ করেছে। আর এখন মানুষের যে প্রত্যাশা বা সমস্যাগুলোর কথা বলছে - সেগুলো নির্বাচনে জেতার জন্য বিএনপি বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে।

ছবির কপিরাইট বিবিসি
Image caption কাপড়ের ব্যবসার মন্দার কথা সবার মুখে

ব্যবসা বাণিজ্যের মন্দাভাব কাটিয়ে ওঠাটা এখানকার স্থানীয় মানুষের জন্য একটা বড় উদ্বেগের বিষয়।

এমন আরো স্থানীয় বিষয় এই আসনের মানুষের আলোচনা বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব কিছু ছাপিয়ে স্থানীয় রাজনৈতিক প্রার্থীদের ওপর নজর রাখছেন এখানকার সাধারণ মানুষ।

যদি তাই হয়, তাহলে মারজিনাল সিট বা কম ভোটের ব্যবধানে জয়-পরাজয় নির্ধারণ না হয়ে বরং বড় ব্যবধানে হার জিতের একটা সম্ভাবনা রয়েছে এই আসনে।

এই আসনের প্রার্থীরা হলেন রুমানা মাহমুদ - বিএনপি, মো.হাবিবে মিল্লাত - আওয়ামী লীগ, মো. মহিবুল্লাহ - ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, নবকুমার কর্মকার - বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল।