সংসদ নির্বাচন: নোয়াখালী-৫ আসনে জয়-পরাজয় নির্ভর করছে যেসব বিষয়ের ওপর

সংসদ নির্বাচন ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption নির্বাচনে ভোট দেওয়ার একটি দৃশ্য।

নোয়াখালী-৫ আসনটি কবিরহাট এবং কোম্পানীগঞ্জ এই দুইটি উপজেলা নিয়ে।

গত ২৭ বছর ধরে এ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয় মূলত দুইজন প্রার্থীর মধ্যে---আওয়ামী লীগের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এবং বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ।

১৯৯১ সালে ৫ম সংসদ নির্বাচনের সময় থেকেই হয়ে আসছে এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা। এবারের নির্বাচনেও তার ব্যত্যয় ঘটবে না বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে।

নির্বাচনী মাঠে দুই দল

২০০৮ সালের মতই এবারের নির্বাচনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যেই।

অর্থাৎ যদিও এই আসনে মোট প্রার্থীর সংখ্যা আটজন, মূল লড়াই হবে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির দুই 'হেভিওয়েট' প্রার্থীর মধ্যেই।

উভয় দলই নিজ নিজ কৌশল নিয়ে মাঠে নেমে পড়েছে।

আরো পড়ুন:

দেখে নিন পূর্ববর্তী ফলাফল

‘সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রার’ ইশতেহারের কাটাছেঁড়া

বিএনপি-ঐক্যফ্রন্ট: ইশতেহারে মিল-অমিল কোথায়?

ঐক্যফ্রন্ট ইশতেহারকে 'ফাঁকা বুলি' বলছেন বিশ্লেষক

Image caption মাকসুদা আক্তার হ্যাপী, কোম্পানীগঞ্জ মহিলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক

এক্ষেত্রে ভোটারদের কাছে গত ১০ বছরে আওয়ামী লীগের উন্নয়ন কর্মকান্ডকেই তুলে ধরবে দলটি—যেমনটা বলছিলেন কোম্পানীগঞ্জ মহিলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মাকসুদা আক্তার হ্যাপী।

তার দল পুরোদমে প্রচারণা শুরু করেছে।

"২০০৮ সালে এখানে রাস্তাঘাটের যে অবস্থা ছিল, তার সাথে এখনকার অবস্থা মেলাতে গেলে বলব ১০০ ভাগের একভাগও বিএনপি প্রার্থী করেন নাই। এখানে আপনি কী উন্নয়ন করছেন তা দেখে লোকজন ভোট দেবে। আর নতুন প্রজন্ম তো উন্নয়ন দেখতে পাচ্ছে, তারা সেটা বিবেচনা করবে।"

প্রচারণা শুরু করেছে বিএনপিও। তবে সে কাজে তাদের প্রায়ই বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে বলে অভিযোগ বিএনপি নেতা-কর্মীদের।

প্রচারণায় এ বিষয়টি তুলে ধরা হবে, সেই সঙ্গে গুরুত্ব পাবে দলের কারাবন্দি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার মুক্তির ইস্যু---বলছিলেন স্থানীয় বিএনপি নেত্রী রওশন আক্তার।

"আমাদের নেতাকর্মীদের বাড়িতে থাকতে দিচ্ছে না। এত বছর ক্ষমতায় ছিল তারা, তাদের অত্যাচার, চাঁদাবাজি- মানুষ এসব দেখতেছে। ওদের নেতাকর্মীদের কর্মকান্ড দেখে মানুষ ভোট দেবে।"

তিনি আরো বলেন, "সুষ্ঠু নির্বাচন হলে আমরা ৯০-৯৫ শতাংশ ভোট পেয়ে জিতবো। আর এরই ভোটের মধ্য দিয়েই আমরা খালেদা জিয়াকে মুক্ত করবো।"

দশ বছরে কী পরিবর্তন?

২০০৮ সালের নির্বাচনে মওদুদ আহমদকে মাত্র ১৩শ ৭১ ভোটে হারিয়ে নির্বাচনে জিতেছিলেন ওবায়দুল কাদের।

গত ১০ বছরে স্থানীয়ভাবে রাস্তাঘাটের অনেক উন্নয়ন হয়েছে, সেটা সবাই কমবেশি স্বীকার করেন, কিন্তু নির্বাচনে জেতার জন্য সেটা যথেষ্ঠ কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

কিন্তু এখানকার রাজনীতিতে গত দশ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন কী হয়েছে?

বলা হয়ে থাকে এই আসনের ভোটররা অনেক বেশি রাজনীতি সচেতন।

প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ এই আসন থেকে নির্বাচন করার কারণেই তাদের কাছে স্থানীয় ইস্যুর চেয়ে জাতীয় রাজনীতির ইস্যুগুলো বেশি প্রাধান্য পায়।

কবিরহাটের একজন ব্যবসায়ী নেতা বলছিলেন, গত দশ বছরে সেখানকার সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি হয়েছে নারী ভোটারের সংখ্যা এবং ভোট দেওয়ার হার বেড়েছে।

"২০০৮ সালে গ্রামের যে কেন্দ্রে মাত্র চল্লিশ থেকে পয়তাল্লিশ জন মহিলা ভোট দিতে আসতো, এখন সেই কেন্দ্রে এই সংখ্যা চারশো-সাড়ে চারশো হয়ে গেছে। আগে যেটা বলা হত সুইং ভোটার, এখনসেটা এখানে হয়ে গেছে নারী ও নতুন ভোটার।"

এই আসনে মোট ভোটার তিন লক্ষ ৩১ হাজার ৭৩৫, এর মধ্যে নতুন ভোটারের সংখ্যা প্রায় ৭০ হাজার।

কোম্পানীগঞ্জ এবং কবিরহাটের মানুষের মূল পেশা ব্যবসা, আর স্থানীয় পুরুষদের বড় অংশটি প্রবাসী।

যে কারণে প্রায় সমান-সংখ্যক নারী ও পুরুষ ভোটার তালিকাভুক্ত থাকার পরেও, স্থানীয় মানুষেরা জানালেন নারী ভোটারের সংখ্যা বেশি।

তবে, গত দশ বছর ধরে স্থানীয় রাজনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের প্রভাব এবং দুর্নীতি—এই বিষয়গুলোও নির্বাচনে বড় ভূমিকা রাখবে।

অনেক বছর যাবৎ নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করছেন তাজউদ্দিন শাহীন, তিনি উপজেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সাধারণ সম্পাদক।

তিনি বলছিলেন "বর্তমান সরকার মাদকের বিরুদ্ধে যে শক্ত অবস্থান নিয়েছে, সেটাতে মানুষ খুশী। কিন্তু মাদকের মত যদি দুর্নীতি বন্ধেও শক্ত একটা অবস্থান নিত, তাহলে মানুষ খুশী হত। কিন্তু সেটা এখানে দেখা যায়নি।"

Image caption কোম্পানীগঞ্জ বিএনপির একজন নেতা রওশন আক্তার

ভোটের পরিবেশ নিয়ে চিন্তা

এসব বিষয়ের বাইরে নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের প্রভাব বিস্তারের এক ধরণের আশংকা রয়েছে স্থানীয়দের অনেকের মধ্যে।

ইতোমধ্যেই বিরোধীরা অভিযোগ করেছেন, তাদের মামলা দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে এবং ভোটারদের প্রভাবিত করা হচ্ছে।

স্থানীয় সাংবাদিক ইকবাল হোসেন বলছিলেন "স্থানীয় ভোটারদের মধ্যে, বিশেষ করে বিরোধীদের মধ্যে আশংকা তৈরি হয়েছে যে তারা নির্বিঘ্নে ভোটকেন্দ্রে যেতে পারবে কিনা বা ভোট দিতে পারবে কিনা। ফলে সেই শংকা যদি দূর করা না যায়, তাহলে সুষ্ঠু নির্বাচন হবে না।"

"জনপ্রিয়তার বিচারে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি দুই দলের প্রার্থীই সমান জনপ্রিয়। কিন্তু নারী ও নতুন ভোটারদের ভোটই এই নির্বাচনে জয়-পরাজয় নির্ধারণ করবে বলে মনে হয়।"

মজার ব্যপার হলো কোম্পানীগঞ্জ ও কবিরহাটের মানুষের মধ্যে একটা ধারণা আছে তাদের আসনে যে প্রার্থী জেতে, তার দল সরকার গঠন করে।

নোয়াখালী-৫ আসনে অন্যান্য প্রতীক নিয়ে যারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন

১. মমতাজ বেগম---বাংলাদেশ ন্যাশনালিষ্ট ফ্রন্ট---টেলিভিশন

২. মোহাম্মদ সামছুদ্দোহা--- ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশ---চেয়ার

৩. আবু নাছের---ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ---হাতপাখা

৪. মোঃ সাইফুল ইসলাম---জাতীয় পাটি---লাঙ্গল

৫. সিরাজ উল্যাহ---বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ---মই

৬. গাজী মোঃ জুলফিকার হায়দার---স্বতন্ত্র---আপেল

সংসদ নির্বাচনের ফলাফল: ১৯৯১-২০১৪ (বিজয়ী এবং নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী)

২০১৪ ২০০৮ ২০০১ ১৯৯৬ ১৯৯১
বিএনপি ১৪০ ১১৬ ১৯৩ ৩০
আওয়ামী লীগ ৮৮ ১৪৬ ৬২ ২৩০ ২৩৪
জাতীয় পার্টি ৩৫ ২৭ ৩৪
Others logo