সংসদ নির্বাচন: টেকনাফ উখিয়ায় রোহিঙ্গা ইস্যুতে চলছে নির্বাচনী লড়াই

  • কাদির কল্লোল
  • বিবিসি বাংলা, ঢাকা
রোহিঙ্গা

ছবির উৎস, DIBYANGSHU SARKAR

ছবির ক্যাপশান,

বাংলাদেশের টেকনাফ ও উখিয়ায় নির্বাচনী প্রচারণায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে রোহিঙ্গা ইস্যু।

বাংলাদেশে কক্সবাজারের টেকনাফ এবং উখিয়ায় এবার নির্বাচন হবে মূলত রোহিঙ্গা ইস্যুতে।

রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানো অনিশ্চিত হয়ে যাওয়ার বিষয়টি নির্বাচনে অন্যতম ইস্যু হিসেবে সামনে আসছে।

একইসাথে লাখ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর কারণে নির্বাচনের আইন শৃংখলা পরিস্থিতি নিয়েও এক ধরণের সংশয় রয়েছে।

টেকনাফ এবং উখিয়া নিয়ে কক্সবাজার-৪ আসনে ২লাখ ৬৪ হাজার ভোটার রয়েছে।

আরও পড়তে পারেন:

রোহিঙ্গা ইস্যু কেন প্রাধান্য পাচ্ছে ভোটারদের কাছে?

উখিয়ায় কুতুপালং শরণার্থী শিবিরের পাশেই কলেজ শিক্ষার্থী শামসুল আলমের বসতবাড়ি।

সেই গত বছরের অগাষ্টে যখন মিয়ামার থেকে পালিয়ে রোহিঙ্গারা দলে দলে আসতে থাকে, তখন মি: আলম নিজে তাদের বাড়ির আঙিনায় এবং আশে পাশের এলাকায় অসহায় রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছিলেন।

কিন্তু সেই আশ্রয় দীর্ঘ সময় হওয়ায় এখন তাদের স্থানীয় লোকজনের জীবন যাত্রার ওপর একটা চাপ তৈরি হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

সে কারণে তিনি রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর প্রশ্নে প্রার্থী এবং দলগুলোর প্রতিশ্রুতির দিকে নজর রাখছেন।

"প্রথমে মানবতার খাতিরে এদের আশ্রয় প্রশ্রয় দিয়েছিলাম। পরে দেখা যাচ্ছে, এরা এসে আমাদের অনেক ক্ষতি হচ্ছে। অনেক ধরণের সমস্যা, তয়তরকারি থেকে শুরু করে গাড়ি ভাড়া-সবকিছু দ্বিগুণ হয়েছে। রোহিঙ্গারা স্থায়ীভাবে থাকলে আমাদের সমস্যা।"

ছবির ক্যাপশান,

উখিয়ায় কুতুপালং শিবিরের কাছে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে সেবা নিতে তাদের অনেকে ভিড় করছেন

স্থানীয় মানুষ নিজেদের সংখ্যালঘু ভাবছে

টেকনাফ এবং উখিয়ায় স্থানীয় মানুষের সংখ্যা সাড়ে চার লাখের মতো হবে।

তারাই এখন সংখ্যা লঘু হয়ে পড়েছে ১১লাখের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থীর কাছে।

যদিও শরণার্থীদের আইন শৃঙ্খলা রক্ষকারি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে টেকনাফ এবং উখিয়ায় ৩০টি শিবিরে রাখা হয়েছে।

কিন্তু লাখ লাখ শরণার্থীকে সামাল দেয়া সহজ বিষয় নয়।

তারা শিবিরের বাইরে লোকালয়ে এসে সস্তায় শ্রম দিয়ে সেখানকার শ্রমবাজার দখল করে নিয়েছে।

দ্রব্যমূল্যসহ সবক্ষেত্রেই প্রভাব পড়েছে।

স্থানীয় লোকজনের বড় অংশের মাঝে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।

ছবির ক্যাপশান,

টেকনাফের একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ওয়াহিদা বেগম তাঁর একজন সহকর্মীর সাথে।

টেকনাফে একটি সরকারি প্রাথমিক স্কুলের প্রধান শিক্ষক ওয়াহিদা বেগম বলছিলেন, এই ইস্যুতে তারা দলগুলোর কাছে স্পষ্ট অঙ্গীকার চান।

"রোহিঙ্গাদের কারণে আমাদের জীবনে অনেক বেশি প্রভাব পড়েছে।সেটা হচ্ছে, প্রথমে দ্রব্যমূল্য বেড়ে গেছে।গাড়িভাড়া বলেন, সবখানেই কিন্তু অনেক প্রভাব পড়েছে।"

ওয়াহিদা বেগম তাঁর ক্ষোভ ধরে রাখতে পারলেন না। তিনি বললেন, "রোহিঙ্গাদের কারণে আমাদের জীবনযাত্রার মানটা একবারে নিম্নমানের হয়ে গেছে।আমরা সংখ্যালঘু হয়ে যাচ্ছি।আমরা অঙ্গীকার চাই, রোহিঙ্গারা তাদের দেশ বর্মাতেই চলে যাক।"

সহানুভূতিও আছে অনেকের মাঝে

আমি টেকনাফে একটি রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরের কাছে সীমান্তবর্তী একটি গ্রামে গিয়েছিলাম।

নাফ নদী পারি দিয়ে মিয়ানমার থেকে নির্যাতিত রোহিঙ্গারা প্রথমে এই গ্রামে এসে আশ্রয় পেয়েছিল। গ্রামটির মানুষ তাদের তাদের বাড়ির উঠান, স্কুল এবং খালি জায়গাসহ সর্বত্রই রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছিলেন।

সেই গ্রামের মানুষ অনেকের সাথে কথা বলেছি, তারা কিন্তু এখনও রোহিঙ্গাদের প্রতি সহানুভূতিশীল।

তাদের বক্তব্য হচ্ছে, রোহিঙ্গাদের কারণে স্থানীয় লোকজনের কিছুটা ক্ষতি হচ্ছে। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে স্থানীয় লোকজনকেও ত্রাণ সহায়তাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সাহায্য করা হয়েছে।

তবে মানবিক কারণে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়ার ব্যাপারে স্থানীয় লোকজনের মধ্যে কোন মতপার্তক্য নেই।

তাদের আশ্রয় যে দীর্ঘস্থায়ী হয়ে যাচ্ছে, মিয়ানমারে তাদের ফেরত পাঠানোর বিষয়টি যে অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে, এর প্রভাব নিয়েই স্থানীয় লোকজনের মাঝে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

ফলে তারা তাদের উদ্বেগের বিষয়ে বক্তব্য চান প্রার্থী এবং দলগুলোর কাছে।

ছবির ক্যাপশান,

কুতুপালং এ রোহিঙ্গা শরণার্থীদের শিবির

দলগুলো বা প্রার্থীরা কতটা গুরুত্ব দিচ্ছেন?

প্রধান দুই দল আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি প্রার্থীর সমর্থনে গণসংযোগ, সমাবেশ সহ নির্বাচনী প্রচারণায় ঘুরে ফিরে রোহিঙ্গা ইস্যুতেই বক্তব্য আসছে।

বর্তমান সংসদ সদস্য আব্দুর রহমান বদি বিভিন্ন বিষয়ে সমালোচনা এবং বিতর্কের কারণে এবার মনোনয়ন পাননি।

তবে তাঁর স্ত্রী শাহীন আকতার আওয়ামী লীগের প্রার্থী হয়েছেন।

তাঁর পক্ষে দলটির স্থানীয় একজন নেতা মো: শাহ আলম বলছিলেন, মানবিক কারণে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়ার বিষয়টি সারাবিশ্বে প্রশংসা পেয়েছে। এই বিষয়গুলোর সাথে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর সরকারের উদ্যোগের কথাও তারা ভোটারের কাছে নিয়ে যাচ্ছেন।

"এটা ছোট ইস্যু নয়, অনেক বড় একটা ইস্যু।১১লাখের বেশি মানুষকে লালন করা সহজ কথা নয়।এই মানবিক বিষয়গুলো আমরা তুলে ধরছি।রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর চেষ্টাতো সরকার করছে।নির্বাচনের পর নতুন সরকার সেই চেষ্টা এগিয়ে নেবে।এই বিষয়টিও আমরা ভোটারদের কাছে তুলে ধরছি।"

আর বিএনপি প্রার্থী শাহজাহান চৌধুরীর প্রতিশ্রুতির অগ্রাধিকারের তালিকাতেই আছে শরণার্থীদের দ্রুত ফেরত পাঠানোর বিষয়।

দলটির স্থানীয় নেতা সরওয়ার জাহান চৌধুরী বলছিলেন, ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু করতে না পেরে সরকার ব্যর্থ হয়েছে বলে তারা মনে করেন। এটাই তাদের মুল বক্তব্য।

"যারা রোহিঙ্গা এবং যারা আমরা স্থানীয় আছি,তাদের মধ্যে ভিতরে ভিতরে কিন্তু একটা বিভাজন সৃষ্টি হয়ে গেছে।এই রোহিঙ্গাদের তাদের অধিকার নিয়ে তাদের দেশে ফেরত পাঠাবো। এটি একটি অন্যতম ইস্যু হিসেবে আমরা আমাদের নির্বাচনী ইশতেহারে দিয়েছি স্থানীয়ভাবে।"

ছবির ক্যাপশান,

বাংলাদেশের নির্বাচনে রোহিঙ্গারা যাতে কোনভাবে জড়িত না হয়, শিবিরগুলোর ইমামদের মাধ্যমে সেই বক্তব্য তুলে ধরা হচ্ছে

নির্বাচনের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির প্রশ্নেও রোহিঙ্গা শরণার্থীরা ইস্যু হয়েছে

ভোটের দিনে আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির ক্ষেত্রে রোহিঙ্গারা কোন সমস্যা তৈরি করতে পারে কিনা, সেই প্রশ্নও অনেকে তুলছেন।

টেকনাফের একজন সমাজসেবক অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী সংশয় প্রকাশ করে বলেছেন, "নির্বাচনে এদের দ্বারা আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিও হতে পারে।অবনতি হতে পারে মানে, ভোটের দিনে এরা গোপনে জাল ভোট দিতে যেতে পারে।এরা সন্ত্রাসী কর্মকান্ডেও জড়িত হতে পার্ কারণ এদের মাঝে সন্ত্রাসী গ্রুপও আছে।"

অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী আরও বলেছেন, "রোহিঙ্গারা অন্যদের দ্বারা ব্যবহারও হতে পারে।ভোটের সময়তো পক্ষ প্রতিপক্ষ সবাইতো এই সুযোগ নেয়ার চেষ্টা করতে পারে।"

স্থানীয় প্রশাসন এবং সেখানে দায়িত্বপালনকারি সেনাবাহিনীর কর্মকর্তারাও আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরগুলোর নেতাদের সাথে ইতিমধ্যেই কয়েকদফা বৈঠক করেছে।

শিবিরগুলোতে নজারদারি বাড়ানো হয়েছে।

নির্বাচন কমিশন ইতিমধ্যে ভোটের আগে ও পরে রোহিঙ্গাদের শিবিরের বাইরে যাওয়া-আসা নিষিদ্ধ করেছে।

ছবির ক্যাপশান,

টেকনাফ এবং উখিয়ায় ৩০টি শিবিরে ১১লাখের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী রয়েছে

রোহিঙ্গাদের একজন নেতা মোহাম্মদ নূর বলছিলেন, বাংলাদেশের নির্বাচনে রোহিঙ্গারা যাতে কোনভাবে জড়িত না হয়, শিবিরগুলোর মসজিদে মসজিদে সেই বক্তব্য তুলে ধরা হচ্ছে।

"এরমধ্যে জিওসি আমাদের বিভিন্ন ক্যাম্পের চেয়ারম্যান এবং রোহিঙ্গা নেতাদের নিয়ে বৈঠক করেন।সেখানে আমাদের বলে দেয়া হয়েছে,আমাদের রোহিঙ্গারা নির্বাচনের আগে শিবিরের বাইরে অন্য কোথাও যাইতে পারবে না।কোন মিছিলে কেউ যাইতে পারবে না। বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনের সাথে আপনাদের কোন সম্পৃক্ততা নাই।ক্যাম্পে সবাইকে এগুলো বলে দিতে বলেছে ঐ বৈঠক থাকি।"

"এসব আমরা শিবিরগুলার মসজিদে মসজিদে ইমাম সাহেবের দ্বারা বার বার বলে দিচ্ছি।"

আওয়ামী লীগ, বিএনপির বাইরে অন্য দলগুলোর প্রচারণাতেও রোহিঙ্গা ইস্যু অগ্রাধিকার পাচ্ছে।

এই আসনে অন্য প্রার্থীরা হলেন, জাতীয় পার্টির আবুল মনজুর, ইসলামী আন্দোলনের মোহাম্মদ শোয়াইব, ইসলামী ঐক্যজোটের রবিউল হোছাইন এবং মুসলিম লীগের সাইফুদ্দিন খালেদ।