সংসদ নির্বাচন: রামুর বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের ওপর সাম্প্রদায়িক হামলার প্রভাব কতটা পড়বে ভোটে?

  • কাদির কল্লোল
  • বিবিসি বাংলা, ঢাকা
বৌদ্ধ মন্দির।

ছবির উৎস, BBC Bangla

ছবির ক্যাপশান,

সেই সাম্প্রদায়িক হামলায় রামু কেন্দ্রীয় সীমা বিহারের ৩০০ বছরের পুরোনো ভবন আগুনে পুড়ে যায়। এরপর এই নতুন বিহার নির্মাণ করে দেয়া হয়েছে।

বাংলাদেশে কক্সবাজারের রামু উপজেলায় বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের ওপর সাম্প্রদায়িক হামলার ছয় বছর পর এখন সংসদ নির্বাচনে সেই ঘটনা একটা বড় ইস্যু হয়েছে।

২০১২ সালে সেই আক্রমণের ঘটনায় সব রাজনৈতিক দলের স্থানীয় অনেক নেতা কর্মির অংশগ্রহণ ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

রামু এবং কক্সবাজার সদর নিয়ে কক্সবাজার-৩ আসনে ভোটের হিসাব নিকাশে সেই সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনার একটা প্রভাব পড়তে পারে।

রাজনৈতিক দলগুলোকেও এই ইস্যুকে গুরুত্ব দিয়ে প্রচারণা চালাতে হচ্ছে।

ছবির ক্যাপশান,

রামুতে একটি বৌদ্ধ মন্দির

বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মাঝে সেই হামলার ক্ষত এখনও আছে

রামু উপজেলায় একটি বৌদ্ধপল্লীতে তাদের একটি মন্দিরে আমি গিয়েছিলাম।

সেই মন্দিরটিও ২০১২ সালের সাম্প্রদায়িক হামলায় আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়া হয়েছিল।

সেখানে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের কয়েকজনের সাথে কথা হয়, তাদের অনেকে বলেছেন, সামপ্রদায়িক হামলার ঘটনার পর সরকার দ্রুততার সাথে ধ্বংসস্তুপ সরিয়ে নতুন মন্দির নির্মাণ করে দিয়েছে।কিন্তু তাদের মনে যে ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছিল, তা এখনও কাটেনি।

তারা বলেছেন,এবার নির্বাচনে তারা সবদলের কাছে প্রতিশ্রুতি চান, যেনো তাদের ওপর এমন সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনা আর না ঘটে।

আরও পড়ুন:

"ক্ষত চলে গেছে। তবে এরপরও একটু আছে আরকি। জীবনে আমরা যা কল্পনা করি, সেখানে এমন ভয়াবহ হামলার ঘটনার এতদিন পরও আমাদের আতঙ্ক কাটেনি।"

ঐ মন্দির থেকে বেরিয়ে আমি অল্পদূরত্বেই রাখাইনসহ বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের বসবাসের একটি গ্রামে যাই।সেখানে কথা হয় কলেজ ছাত্রী খিং খিং রাখাইন ইমুর সাথে।

তিনি এবার প্রথম ভোট দেবেন। ছয় বছর আগে এই হামলার ঘটনার সময় তিনি স্কুলে পড়তেন। সেই বয়সেই চোখের সামনে তাদের মন্দিরে ভয়াবহ হামলার ঘটনা দেখেছিলেন। তাদের রাখাইনদের বাড়ি ঘরে হামলার আগমুহুর্তে পরিবারের অন্য সদস্যদের সাথে জঙ্গলে পালিয়ে থেকে প্রাণে বেঁচে গিয়েছিলেন।

এই নতুন ভোটার রাখাইন ইমু তাদের বিষয়ে প্রার্থী এবং দলগুলোর প্রতিশ্রুতি দেখে ভোট দেবেন।

"এ ধরণের হামলা আমাদের ওপর যেনো আর না হয়। আমাদের মন্দিরগুলো যাতে সুরক্ষিত থাকে।আমাদের বৌদ্ধ পরিবারগুলো সহ সংখ্যারঘু সবার নিরাপত্তা যাতে নিশ্চিত করা হয়, দলগুলো এবং প্রার্থীদের কাছে আমরা সেই প্রতিশ্রুতি চাই।"

ছবির ক্যাপশান,

রামুতে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের একটি গ্রামে সেই হামলায় বাবা এবং মেয়ে জঙ্গলে পালিয়ে প্রাণ বাঁচিয়েছিলেন

মনের সেই দাগ এখনও কাটছে না কেন?

মুসলমানদের ধর্মীয়গ্রন্থ কোরান অবমাননা করে ফেসবুকে ছবি পোস্ট করার অভিযোগ তুলে রামুতে ১৪টি বৌদ্ধমন্দিরে অগ্নিসংযোগ এবং তাদের বাড়ি ঘরে হামলা করা হয়েছিল।

এনিয়ে ১৯টি মামলার কোনটিই বিচারের পর্যায়ে যায়নি।

কক্সবাজার বৌদ্ধ সংরক্ষণ পরিষদের নেতা প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষ বলছিলেন, হামলার সেই ঘটনা সাম্প্রদায়িক হলেও এর সাথে দলগুলোর স্থানীয়দের জড়িত থাকার বিষয় বিভিন্ন তদন্ত উঠে আসে।এটি তাদের মনে বেশি দাগ কেটেছিল বলে তিনি উল্লেখ করেছেন।

"যে হামলাতে দলমত নির্বিশেষ কিন্তু অংশগ্রহণ ছিল। এটা পরবর্তীতে প্রমাণ হয়েছে এভাবে যে, সরকারি, বেসরকারি এবং বিচারবিভাগীয় তদন্ত যে গুলো হয়েছে, সব তদন্তেই সকল দলের মানুষের অংশগ্রহণের তালিকা উঠে এসেছে। অর্থ্যাৎ নির্দিষ্ট কোন দলয়ি চিন্তা থেকে হয়েছে, সেটা আমরা মনে করি না। কিন্তু এটি খুবই খারাপ দৃষ্টান্ত।"

রামু উপজেলা শহরেই কেন্দ্রীয় সীমা মহাবিহারে গিয়ে দেখি, সেখানে নতুন করে মন্দির তৈরি করে দিয়েছে সরকার।

কিন্তু সেখানে একজন ভিক্ষু বলছিলেন, ৩০০বছরের পুরোনো বিহার তারা সেই হামলায় হারিয়েছেন।

আগুনে পুড়ে যাওয়া সেই বিহারের ধ্বাংসাবশেষ এখনও চোখ পড়ে।

তবে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মানুষ অন্যান্যবারের মতো এবারও তাদের ভোটের অধিকার প্রয়োগ করতে চান। ঐ রামু কেন্দ্রীয় সীমা মহাবিহারের প্রধান ভিক্ষু সত্যপ্রিয় মহাথের বলছিলেন, তারা ভোট দেয়ার শান্তিপূর্ণ পরিবেশ চান।

"বৌদ্ধ সম্প্রদায় আমরা এদেশে আছি, আমরা এদেশে থাকবো। এদেশ আমাদের জন্মভূমি, আমাদের মাতৃভূমি। আমরা শান্তি চাই। আমরা চাই, শান্তিপূর্ণভাবে নির্বাচন হোক।"

ছবির ক্যাপশান,

সত্যপ্রিয় মহাথের, প্রধানভিক্ষু, রামু কেন্দ্রীয় সীমাবিহার।

অন্য সংখ্যালঘুদের উপরও প্রভাব পড়তে পারে

রামু এবং কক্সবাজার শহর মিলিয়ে এই সংসদীয় আসনে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের ২০ হাজারের মতো ভোট আছে। এর ১৫ হাজার ভোটারেরই বসবাস রামুতে।

আসনটিতে মোট চার লাখের বেশি ভোটের মাঝে ঐ সংখ্যা বড় কিছু নয়।

কিন্তু সেই হামলার ঘটনা এই ভোটে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের পাশাপাশি অন্য সংখ্যালঘুদেরও প্রভাবিত করতে পারে।

কারণ সংখ্যালঘুদের সকলেই তাদের নিরাপত্তার প্রশ্নে নিশ্চয়তা চায়।এলাকা ঘুরে এমন ধারণা পাওয়া যায়।

রামু সরকারি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ আব্দুল হক মনে করেন, এই আসনে বৌদ্ধ এবং হিন্দু মিলিয়ে সংখ্যালঘুদের ২৩ শতাংশের বড় অংকের ভোটের ব্যাপারে দলগুলোর বিশেষ করে প্রধান দুই দলের বিবেচনায় নেয়া উচিত।

ছবির ক্যাপশান,

রামুতে একটি বৌদ্ধ মন্দিরে শত বছরের পুরোনো ঘন্টা

দলগুলো এবং প্রার্থীরা কি কৌশল নিচ্ছে?

সংখ্যলঘুদের ভোটকে নিজেদের ভোট ব্যাংক হিসেবে ধরে রাখতে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রার্থী সাইমুম সরওয়ার তাদের নিরাপত্তার নিশ্চিত করার বিষয়কে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন।

তিনি বলেছেন, "রামুর মানুষ সম্প্রীতির জায়গায় এসে আবার দাঁড়িয়েছে।আগামী নির্বাচন হবে সম্প্রীতির পক্ষেই, রামুবাসীর নির্বাচন।"

আর ছয় বছর আগের হামলার সেই ঘটনাকে ইস্যু করে সংখ্যালঘুদের ভোটব্যাংকে অবস্থান তৈরির চেষ্টা রয়েছে বিরোধী দল বিএনপির প্রার্থী লুৎফুর রহমান প্রচারণায়।

তিনি বলছিলেন, "বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মানুষের মনে যে চির ধরেছে, সেটা উপশম হয়েছে কিনা জানিনা।আমরা চেষ্টা করছি আস্থায় নিতে। তাদের আশ্বাস দিচ্ছি।"

প্রধান দুই দল ছাড়া আরও তিনজন প্রার্থী, জাতীয় পার্টির মফিজুর রহমান, ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী মোহাম্মদ আমিন এবং বিএনএফ এর মো: হাছন, তাদের প্রচারণাতেও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বিষয়কে গুরুত্ব দিতে হচ্ছে।