সংসদ নির্বাচন: নির্বাচনী পর্যবেক্ষণ এইভাবে কখনো নিরুৎসাহিত করা হয়নি- বলছেন একটি পর্যবেক্ষণ সংস্থার প্রধান

  • সায়েদুল ইসলাম
  • বিবিসি বাংলা, ঢাকা
পর্যবেক্ষকের হিসাবে ২০০৮ সালের নির্বাচনের তুলনায় এবার অনেক পার্থক্য রয়েছে

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান,

পর্যবেক্ষকের হিসাবে ২০০৮ সালের নির্বাচনের তুলনায় এবার অনেক পার্থক্য রয়েছে

বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এবারের মতো সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ ছিল ২০০৮ সালের নবম সংসদ নির্বাচনে,তবে দেশি বিদেশি মিলিয়ে পর্যবেক্ষণের চিত্রটিতে রয়েছে অনেক পার্থক্য।

২০০৮ সালে বিদেশী পর্যবেক্ষক ছিলেন ৫৯৩ জন। অথচ এবার সেই সংখ্যাটি কুড়িও পেরোয়নি।

দেশীয় পর্যবেক্ষকরা বলছেন, সবকিছু মিলিয়ে তাদের মনে হচ্ছে যেন নির্বাচন কমিশন তাদের পর্যবেক্ষণে নিরুৎসাহিত করার চেষ্টা করছে।

আরো পড়ুন:

জানা গেছে, ১৬টি দেশ ও সংস্থা থেকে ১৭৮জন বিদেশী পর্যবেক্ষক হিসাবে দায়িত্ব পালনের আগ্রহ প্রকাশ করেছিল। তবে এ পর্যন্ত মাত্র ১৬জনের আসার বিষয়টি নিশ্চিত করতে পেরেছে নির্বাচন কমিশন।

নির্বাচন কমিশনের যুগ্ম সচিব এসএম আসাদুজ্জামান জানিয়েছেন, অনেকগুলো দেশ ও সংস্থাকে নির্বাচন পর্যবেক্ষণের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। তবে এখন পর্যন্ত ফেমবোসার (ফোরাম অব ইলেকশন ম্যানেজমেন্ট বডিস অব সাউথ এশিয়া, যার মধ্যে রয়েছে ভারত, আফগানিস্তান, মালদ্বীপ, ভুটান, নেপাল, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা) দেশগুলো থেকে ১৪জন আর কমনওয়েলথ থেকে দুইজন পর্যবেক্ষক আসার বিষয়ে তারা নিশ্চিত হয়েছেন।

ভিডিওর ক্যাপশান,

সংসদ নির্বাচন: তরুণ ভোটারদের আগ্রহ কতটা?

বিদেশী পর্যবেক্ষকের তালিকায় আর কেউ যোগ হবে কিনা, তা জানাতে পারছে না নির্বাচন কমিশন।

দেশীয় পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলো বলছে, সব দলের দেরিতে অংশগ্রহণের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া আর ভিসা জটিলতার কারণে বিদেশী পর্যবেক্ষকদের সংখ্যা কমেছে।

২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচনে বিদেশীদের সংখ্যা ছিলো মাত্র চারজন, যে নির্বাচনে বিএনপিসহ বেশিরভাগ রাজনৈতিক দল অংশ নেয়নি। আর দেশীয় পর্যবেক্ষক ছিলেন ৮ হাজার ৮৭৪জন।

তবে এর আগে ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিদেশী পর্যবেক্ষকের সংখ্যা ছিলো ৫৯৩ জন। দেশীয় পর্যবেক্ষক ছিলেন ১ লাখ ৫৯ হাজার ১১৩জন।

২০০১ সালের নির্বাচনে দেশী পর্যবেক্ষক ছিলেন ২ লাখ ১৮ হাজার এবং বিদেশী পর্যবেক্ষক ছিলেন ২২৫জন।

তবে পর্যবেক্ষক দল আকারে না হলেও, নির্বাচনের দিন নজর রাখবে ঢাকার বিভিন্ন দূতাবাসের কর্মকর্তারা।

ছবির ক্যাপশান,

অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, নির্বাচন কমিশন ও সরকার কি পর্যবেক্ষণকে নিরুৎসাহিত করার চেষ্টা করছে?

নির্বাচনে বিদেশী পর্যবেক্ষকের সংখ্যা কম হওয়ার কি কারণ?

ইউরোপীয় ইউনিয়ন আগেই জানিয়ে দিয়েছে, এবারের নির্বাচনে তারা পর্যবেক্ষক পাঠাবে না। তারা এই নির্বাচন বা ফলাফল নিয়ে কোন মন্তব্যও করবে না।

ব্যাংকক ভিত্তিক আন্তর্জাতিক নির্বাচন পর্যবেক্ষণ সংখ্যা এশিয়ান নেটওয়ার্ক ফর ফ্রি ইলেকশন (এনফ্রেল) তাদের ৩২জন প্রতিনিধি পাঠানোর কথা জানিয়েছিল। তবে যথাসময়ে ছাড়পত্র ও ভিসা না দেয়ায় তাদের সংগঠনগুলোও নির্বাচন পর্যবেক্ষণ না করার কথা জানিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট একটি বিবৃতিতে জানিয়েছে, বাংলাদেশ সরকার সহযোগিতা না করায় এনফ্রেল নির্বাচন পর্যবেক্ষণের সিদ্ধান্ত বাতিল করতে বাধ্য হয়েছে। ব্যাংকক ভিত্তিক হলেও এই সংস্থাটিকে অর্থায়ন করে থাকে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ইন্সটিটিউট।

দেশীয় কয়েকটি পর্যবেক্ষণ সংস্থায় আর্থিক সহায়তা করলেও সরকারি পর্যবেক্ষক পাচ্ছে না যুক্তরাজ্য, সুইডেন, নরওয়ে বা ডেনমার্ক।

বাংলাদেশের ইলেকশন ওয়ার্কিং গ্রুপের চেয়ারপার্সন আব্দুল আউয়াল অবশ্য বলছেন, ''উন্নত দেশগুলোর অর্থায়নের ক্ষেত্রে ফোকাস চেঞ্জ হয়েছে। আমাদের এখানেও গত কয়েকবছর ধরে গর্ভন্যান্স জাতীয় খাতে তহবিল কমে আসছে। নির্বাচন পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রেও বৈশ্বিক ক্ষেত্রেই ট্রেন্ডটিও কমতির দিকে।''

''এছাড়া আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় যে ঘাটতি আছে, সে কথা তো আমরা সকলেই জানি।''

বাংলাদেশের নির্বাচন পর্যবেক্ষকরা বলছেন, শুধুমাত্র বিদেশী পর্যবেক্ষকদের নিয়ে আলাদাভাবে কোন কড়াকড়ির কথা বলা না হলেও, অনুমতি বা ভিসা না দেয়ার মাধ্যমে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, চাইলেও অনেকে নির্বাচন পর্যবেক্ষণে আসতে পারছেন না।

বিবিসি বাংলার অন্যান্য খবর:

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান,

নির্বাচন কমিশন বলছে যে তারা একটি নির্বাচন সুষ্ঠু করার জন্য যে ধরণের পদক্ষেপ নেয়ার দরকার তার সবই নিচ্ছেন

নির্বাচনী পর্যবেক্ষণ সংস্থা ব্রতীর প্রধান নির্বাহী শারমীন মুরশিদ বলছেন, ''একটি কারণ হচ্ছে নির্বাচন কমিশনের পলিসি এক ধরণের অন্তরায় হচ্ছে। পর্যবেক্ষণ করা নিয়ে কড়াকড়ি কতগুলো নিয়মকানুন জারি করেছে, যেটা আগে কখনো ঘটেনি। অনেকেই অনুমতি পাচ্ছে না। অনুমতি পাচ্ছেন তো তাদের ভিসা দেয়া হচ্ছে না। সবমিলিয়ে তাদের আচরণে বুঝতে পারছি, তারা একটি কড়া নজর রাখছে। আনুষ্ঠানিকভাবে না বললেও পর্যবেক্ষকদের যেন নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে।''

তিনি বলছেন, ''নির্বাচন পর্যবেক্ষণ এইভাবে কখনো নিরুৎসাহিত করা হয়নি। এটা একটা নতুন প্রবণতা আমরা এবার দেখতে পাচ্ছি এবং উপলদ্ধি করছি। দ্বিতীয়ত নিবাচন পর্যবেক্ষণের ফান্ড কিন্তু নেই বললে চলে। আন্তর্জাতিক নীতিও বদলে গেছে।''

''পুরো চিত্রটা যে বার্তাটা আমাদের দিচ্ছে, সেটা হচ্ছে নির্বাচন কমিশন পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রে খুব একটা উৎসাহ দেয়া হচ্ছে না। তাহলে প্রশ্ন জাগবে কেন? তাহলে কি নির্বাচন কমিশন তার অনিয়মগুলো বা তার দুর্বলতাগুলো স্পষ্ট করতে চাইছে না? আমাদের কি কিছু সংশয়ের জায়গা তৈরি হয়েছে নির্বাচনকে ঘিরে? '' বলছেন শারমীন মুরশিদ।

ছবির উৎস, MUNIR UZ ZAMAN

ছবির ক্যাপশান,

২০০৮ সালের নির্বাচনে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক উপস্থিত ছিলেন (ফাইল ছবি)

কমেছে দেশীয় পর্যবেক্ষকের সংখ্যাও

এবার বিদেশী পর্যবেক্ষকের সংখ্যা যেমন কমেছে, দেশীয় পর্যবেক্ষকের সংখ্যাও অনেক কম।

নির্বাচন কমিশন সচিবালয় থেকে জানা যাচ্ছে, এ পর্যন্ত ২৫ হাজার ৯২০জন দেশীয় পর্যবেক্ষকের তালিকা অনুমোদন করেছে নির্বাচন কমিশন। এই সংখ্যা ২০০৮ সালের নির্বাচনে অংশ নেয়া পর্যবেক্ষকদের ছয়ভাগের একভাগ কম।

এদের মধ্যে ইলেকশন ওয়ার্কিং গ্রুপের ১৫ হাজার পর্যবেক্ষক রয়েছেন। তবে ইসির অনুমোদন পেলেও তাকে পর্যবেক্ষণের বিষয়ে পুরোপুরি নিশ্চয়তা মেলেনি।

এসব দেশীয় পর্যবেক্ষক সংস্থার অনেকগুলো প্রকল্পে অর্থায়ন করছে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র বা সুইজারল্যান্ড।

ইলেকশন ওয়ার্কিং গ্রুপের চেয়ারপার্সন আব্দুল আউয়াল বিবিসি নিউজ বাংলাকে বলেছেন, ''আমরা ১৫ হাজার পর্যবেক্ষকের অনুমোদন পেয়েছি। তবে যেহেতু এসব প্রকল্পে বিদেশি অর্থায়নের বিষয় রয়েছে, তাই সেটা ছাড় করাতে তাই এনজিও ব্যুরোর ছাড়পত্র লাগবে। কিন্তু আজ পর্যন্ত আমরা সেই ছাড়পত্র পাইনি।''

তিনি বলছেন, নির্বাচনের কাজ করার জন্য অনেক প্রস্তুতি এবং প্রশিক্ষণের ব্যাপার রয়েছে। তাই আগামী দুইদিনের মধ্যে এসব ছাড়পত্র না পেলে হয়তো আমাদের পক্ষেও কাজ করা সম্ভব হবে না।