পঞ্চগড়ে চিতাবাঘটি মারা পড়ার আগের ছবি

ঝোপের মধ্যে আশ্রয় নেয়া চিতাবাঘ। ছবির কপিরাইট ফিরোজ আল সাবাহ
Image caption ঝোপের মধ্যে আশ্রয় নেয়া চিতাবাঘ।

বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের জেলা পঞ্চগড়ে শনিবার একটি চিতাবাঘকে পিটিয়ে মেরে ফেলেছিল সেখানকার স্থানীয় লোকজন। কিন্তু মারা পড়ার আগে বাঘটির শেষ জীবন্ত ছবি ধারণ করতে সমর্থ হয়েছিলেন ফ্রিল্যান্স ফটোগ্রাফার ফিরোজ আল সাবাহ।

শনিবার সকাল ১১:৩০টার দিকে জেলার বোদাপুর উপজেলার বসুনিয়াপাড়া গ্রামে বাঘটিকে দেখতে পান স্থানীয়রা। একটি ঝোপের ভিতর আশ্রয় নিয়েছিলো এটি। খবর পেয়ে জড়ো হয় শত শত গ্রামবাসী।

এরই মধ্যে দুপুর দুইটার দিকে খবর পান মি. ফিরোজ। কিন্তু সপ্তাহখানেক আগেই হঠাৎ করে বাবা হারানো এই ফটোগ্রাফার যেতে চাইলেন না। তিনি ভেবেছিলেন, সীমান্তের ওপার থেকে হয়তো মেছোবাঘ এসেছে।

কিন্তু স্থানীয় একজন বন কর্মকর্তা তাকে চিতাবাঘের বিষয়টি নিশ্চিত করলে আধঘণ্টার মধ্যেই তিনি হাজির হন।

"আমি গিয়ে দেখলাম, তখন মাত্র দুই-একজন পুলিশ সেখানে, যাদের পক্ষে জনগণকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছিলো না," তিনি বলেন।

লাল জ্যাকেটে সেখানে হাজির হওয়ার সাথে সাথে তাকে ঘিরেও আগ্রহ তৈরি হয় মানুষের।

"আমি বাঘটির থেকে ৫-৬ হাত দূরুত্ব থেকে কিছু ছবি তুলি। এসময় দেখছিলাম বাঘটি লেজ নাড়াচ্ছিলো আর গড়গড় করতেছিলো। শিকার এ্যাটাক করার আগে এমন করে এরা।"

তিনি বলেন, "কিন্তু বাঘটি এতই দুর্বল হয়ে পড়েছিল যে সে নড়তে পারছিল না।"

তবু ছবি তুলতে পেরে তার "স্বপ্ন পূরণ" হয়েছে বলে জানান তিনি।

আরো পড়ুন:

বিলুপ্ত হবার পথে বণ্যপ্রাণী চিতা

এর পর কোন প্রাণীটি বিলুপ্ত হতে চলেছে?

যে কিশোরের খেলার সাথী বাঘ প্রজাতির প্রাণী

ছবির কপিরাইট ফিরোজ আল সাবাহ
Image caption পঞ্চগড়ে চিতাবাঘটিকে পিটিয়ে মারার আগের ছবি।

'বাঘের ছবি পেলেন ঠিকই তবে বাবা বিয়োগের পর'

এদিকে ছবি তোলার পর বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে পারেননি মি. ফিরোজ। স্থানীয় লোকজনদের বাঘটিকে না মারার জন্য বোঝাতে ব্যর্থ হয়ে ফিরে যান।

আগের একটা ঘটনা মনে পড়ায় তিনি "ইমোশনাল" হয়ে পড়ছিলেন। এর আগেও তিনি বাঘের ছবি তোলার চেষ্টা করেছিলেন।

তিনি জানান, তিন বছর আগে তিনি শালবাহান বর্ডারের দিকে চিতাবাঘ খুঁজতে গিয়েছিলেন। কিন্তু চার দিন দিন থাকার পরেও বাঘের কোন হদিস পেলেন না তিনি।

"পকেটে টাকাও নেই । তখন আমি স্বাবলম্বী নই । বাবার উপর নির্ভরশীল । বাবাকে দুরু দুরু বুকে ফোন দিলাম ,টাকা চাইলাম । বাবা শুনে রেগে গেলেন , বললেন কি জন্য আছিস ওদিকে ," ফেসবুকে লিখেছেন তিনি।

"আমি বললাম বাঘের ছবি তুলবো । উনি বললেন দেশে বাঘ আছে নাকি ।বাড়ি আয় বলে রেখে দিলেন।"

তিনি জানাচ্ছেন, "বাসায় আব্বু বলতেছিল তোকে বাঘের ছবি তুলতে হলে আফ্রিকার জংগলে যেতে হবে । এদিক কি আর এসব আছে । আমি বললাম যাবো একদিন।"

"কিন্তু পঞ্চগড়ে বাঘের ছবি একদিন পেয়ে যেতেও পারি । আজ পেয়ে গেলাম এমন অবস্থায় যখন বাবা নেই , এটা ভেবেই বুকফেটে কান্না আসছিল।"

তিনি আরো লিখেছেন: আমার ছবির সবচেয়ে বড় ভক্ত ছিলেন আমার বাবা। ছবি দেখতে বসতেন আমার পাশে। এক সাথে অনেক বার ছবি তুলতেও গেছি।

কোথা থেকে এলো চিতাবাঘ?

সীমান্তবর্তী দেশ ভারত থেকে দলছুট হয়ে চিতাবাঘটি পঞ্চগড়ে ঢুকে পড়ে বলে মনে করছেন দিনাজপুর বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবদুর রহমান।

জেলার বোদা উপজেলার ঝলই শালশিরি ইউনিয়নের বসুনিয়াপাড়ায় লোকজন দেখতে পেয়ে ধাওয়া দেয়।

পরে স্থানীয় একটি পুকুর বাড়ির ঝোপে আশ্রয় নিয়েছিল বাঘটি।

ছবির কপিরাইট ফিরোজ আল সাবাহ
Image caption পঞ্চগড়ে ঝোপের মাঝে আশ্রয় নেয়া চিতাবাঘটি।

'আন্তরিকতা থাকলেও ছিল না দক্ষতা'

খবর পেয়ে দুপুরের মধ্যে পুলিশ, বনবিভাগ ও অন্যান্য সরকারি কর্মকর্তারা হাজির হন। চিতাবাঘটিকে দেখতে আসার ঢল নামে আশেপাশের গ্রামগুলো থেকে।

শুরু থেকেই মানুষজন বাঘটিকে ধাওয়া করে মারতে চাচ্ছিলো বলে জানান বন কর্মকর্তা মি. রহমান।

এসময় পুলিশ জনতাকে শান্ত করার চেষ্টা করছিলো, বলছেন তিনি।

"চিতাবাঘটিকে ধরার জন্য ঢাকা থেকে ভেট আসার কথা ছিল। কিন্তু সানসেটের (সূর্যাস্তের) পর মব (উত্তেজিত জনতা) অশান্ত হয়ে উঠে সংঘবদ্ধ আক্রমণ চালায়," তিনি জানান।

তিনি বলেন, আধ কিলোমিটারের মধ্যে ঘিরে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয় চিতাবাঘটিকে।

এ প্রসঙ্গে ফটোগ্রাফার সাবাহ বলেন, "আন্তরিকতা থাকলেও বাঘটিকে ধরে ফেলার মত ক্যাপাসিটি (দক্ষতা) ছিল না বন বিভাগের।"

"মনে হয়েছে তারা মানুষজনকে বাঁচাতে গিয়েছিলেন, বাঘটিকে নয়," বলেন তিনি।

এদিকে, পর্যাপ্ত দক্ষ জনবল ও যন্ত্রপাতির অভাবও রয়েছে বন বিভাগের, এমনটাই জানালেন বন কর্মকর্তা মি. রহমান।

তিনি জনগণের সচেতনার বিষয়টিও গুরুত্ব দেন।

ছবির কপিরাইট ফিরোজ আল সাবাহ
Image caption পিটিয়ে মারা আগে চিতাবাঘটি।

কী করা হবে চিতাবাঘটির লাশ?

ঘটনাস্থল থেকে চিতাবাঘটির লাশ উদ্ধার করে বোদা থানায় রাখা হয়। এ ঘটনায় একটি জেনারেল ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে বলে জানান মি. রহমান।

সেখান থেকে দিনাজপুরের বন বিভাগের অফিসে চামড়া ছাড়ানোর প্রক্রিয়া শেষ করে বন অধিদপ্তরে পাঠানো হবে।

তিন-চার মাস পর কঙ্কালটি জাদুঘরে পাঠানো হবে বলে তিনি বিবিসি বাংলাকে জানান।

আপনার ডিভাইস মিডিয়া প্লেব্যাক সমর্থন করে না
চিতাবাঘ, ভালুক, আর হায়েনার আশ্রয় যার বাড়ি