সংসদ নির্বাচন: হিন্দু ভোটারদের ঘিরেই নাসিরনগরে যত সমীকরণ

  • আকবর হোসেন
  • বিবিসি বাংলা, ঢাকা
নাসিরনগর

ছবির উৎস, বিবিসি বাংলা

ছবির ক্যাপশান,

নির্বাচনের সময় একটি স্পর্শকাতর এলাকা হিসেবে পরিচিতি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নাসিরনগর উপজেলা।

নাসিরনগর উপজেলা সদরে যাবার মূল রাস্তাটির দুপাশে বিভিন্ন হিন্দু বাড়িতে যে আক্রমণ হয়েছিল সেটির চিহ্ন এখন আর নেই।

তবে হিন্দুদের মনে যে গভীর ক্ষত তৈরি হয়েছে সেটি তাদের সাথে কথা বললেই বোঝা যায়।

বাংলাদেশের ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নাসিরনগর উপজেলায় বিপুল সংখ্যক হিন্দু জনগোষ্ঠীর বসবাস।

নাসিরনগর উপজেলা নিয়ে গঠিত ব্রাহ্মণবাড়িয়া ১ আসনটিতে নির্বাচনী জয়-পরাজয়ের ক্ষেত্রে হিন্দু ভোটাররা সবসময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

দুই বছর আগে ফেসবুকের একটি ছবির মাধ্যমে ইসলাম অবমাননার অভিযোগ তুলে প্রায় একশ হিন্দু মন্দির ও বাড়িঘরে হামলা, অগ্নিসংযোগ এবং লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে।

আরও পড়তে পারেন:

অভিযোগ উঠেছিল, স্থানীয় আওয়ামী লীগের কিছু নেতাও সে সহিংসতার সাথে জড়িত। এবারের নির্বাচনে সেই হামলার কোন প্রভাব কি পড়বে?

দুই বছর আগে স্থানীয় তরুণ রাজীব দে'র বাড়িতে ব্যাপক হামলা চালানো হয়েছিল।

তিনি বলছিলেন, আওয়ামী লীগের উপরেই তাদের আস্থা।

" আমরা হিন্দু সমাজ বিষয়টা বুঝতে পারছি," বলছিলেন মি: দে।

নাসিরনগরে যত হিন্দুর সাথে কথা হয়েছে, তাদের কেউ ভোট নিয়ে কোন রাখ-ঢাক করছেন না।

বেশ পরিষ্কারভাবেই জানিয়ে দিচ্ছেন যে নৌকা মার্কা হবে তাদের একমাত্র পছন্দ।

হিন্দুদের অনেকে মনে করেন, দুই বছর আগের সে হামলার সাথে স্থানীয় আওয়ামী লীগের কিছু ব্যক্তির নাম আসলেও মূল ঘটনা অন্য জায়গায়।

তাদের ভাষ্য অনুযায়ী আওয়ামী লীগের প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক শক্তিও এর পেছনে কাজ করেছে।

তখনকার হামলার ঘটনায় যিনি মোট আটটি মামলা হয়েছিল।

মূল মামলাটির যিনি বাদী, তিনি স্থানীয় মন্দির কমিটির দায়িত্বে আছেন।

তিনি এখন আওয়ামী লীগ প্রার্থীর নির্বাচনী প্রচারণা কমিটিতে কাজ করছেন।

স্থানীয় বাসিন্দা সুরমা চৌধুরী জানালেন, নিরাপত্তার বিষয়টি তাদের কাছে মুখ্য।

"আমরা এখানেই বসবাস করতে চাই। আমরা নিরাপদে বসবাস করতে চাই," বলেন সুরমা চৌধুরী।

ছবির উৎস, বিবিসি বাংলা

ছবির ক্যাপশান,

বিএনপি প্রার্থীর নির্বাচনী প্রচার

হিন্দুরা যেমন তাদের নিরাপত্তার বিষয়টিকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছেন, তেমনি মুসলিম ভোটাররা এলাকার রাস্তাঘাট, ব্রিজ-কালভার্ট কিংবা অবকাঠামোর উন্নয়নকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। সেটির গুরুত্ব অবশ্য হিন্দু ভোটাররাও দিচ্ছেন।

কিন্তু অনেকের মনে প্রশ্ন জেগেছে যে ঠিক মতো ভোট দেয়া যাবে কি না?

নাসিরগরের এক বাসিন্দা বলেন, "আমরা নিজের ভোটটা কী আমি নিজে দিতে পারমু কি না - এ রকম পরিস্থিতি আছে কি না?"

ব্রাহ্মণবাড়িয়া ১ আসনটিতে বিএনপি কখনোই জিততে পারেনি।

১৯৯৬ সাল থেকে টানা তিনবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন আওয়ামী লীগের সায়েদুল হক, যিনি মন্ত্রীও হয়েছিলেন।

নাসিরনগরে হিন্দুদের কাছে সায়েদুল হকের ভালো জনপ্রিয়তা ছিল।

ছবির উৎস, বিবিসি বাংলা

ছবির ক্যাপশান,

আওয়ামী লীগ প্রার্থীর নির্বাচনী প্রচার।

এর মূল কারণ হচ্ছে, স্থানীয় হাওড় জেলেদের কাছে নামমাত্র মূল্যে ইজারার ব্যবস্থা করা।

নাসিরনগরের হিন্দুদের প্রায় ৯০ শতাংশই জেলে পরিবার।

এছাড়া সংসদ সদস্য থাকার সময় মি: হক সবসময় হিন্দুদের নিরাপত্তা এবং অধিকারের ব্যাপারে ভূমিকা রেখেছেন।

সায়েদুল হকের মৃত্যুর পর এবারে এ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী বিএম ফরহাদ হোসেন সংগ্রাম।

অন্যদিকে বিএনপির প্রার্থী এস এ কে একরামুজ্জামান।

হিন্দুদের সব ভোট নৌকা মার্কায় যাবে এমন কথা বিশ্বাস করতে চান না নাসিরনগর উপজেলা বিএনপির একজন নেতা সৈয়দ আবু সারোয়ার।

তিনি বলেন, এ আসনে বিএনপি কখনোই জয়লাভ করতে পারেনি কারণ, বিগত নির্বাচনগুলোতে বিএনপির ভেতরেই দলীয় কোন্দল ছিল। এবার সে পরিস্থিতি নেই বলে তিনি উল্লেখ করেন।

নাসিরনগর উপজেলা আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক লতিফ হোসেন মনে করেন, হিন্দুদের উপর হামলার ঘটনাটি একটি চক্রান্ত ছিল। এবং সে ঘটনা থেকে তারা শিক্ষাও নিয়েছেন।

"হিন্দু-মুসলমানের যে ভ্রাতৃত্ব এবং সম্প্রীতি, সেটা আবারো ফিরে আসছে। ঐ টা থেকে আমরা একটা শিক্ষা লাভ করছি। সেটা হইল - উত্তেজনার বশবর্তী হয়ে কিছু কইরো না, আরেকটা হইলো না বুঝে না জেনে কিছু কইরো না," বলেন মি: হোসেন।

ছবির উৎস, বিবিসি বাংলা

এ আসনে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর জয়ের ব্যাপারে মি: হোসেনের মনে কোন সন্দেহ নেই।

২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সায়েদুল হক প্রায় ১৪ হাজার ভোটের ব্যবধানে জয়লাভ করেছেন।

নাসিরনগরের আওয়ামী লীগ নেতারা এ আসনে নৌকার বিজয়ের ব্যাপারে শতভাগ আশাবাদী।

অন্যদিকে বিএনপি নেতারা বলছেন তাদের ভাষায় হিন্দুদের ভোট কিছুটা এদিক-সেদিক হলে প্রথমবারের মতো এ আসনে তারা সাফল্য লাভ করলেও করতে পারে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ আসন থেকে মোট ৬ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তারা হলেন, আওয়ামী লীগের হয়ে নৌকা প্রতীকে বদরুদ্দোজা মোঃ: ফরহাদ হোসেন, বিএনপি থেকে ধানের শীষ প্রতীকে এস এ কে একরামুজ্জামান, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি-বিজেপির হয়ে গরুর গাড়ি প্রতীকে মোঃ: ফায়েজুল হক, ইসলামী ঐক্যজোট থেকে মিনার প্রতীকে আবুল কাসেম মোহাম্মদ আশরাফুল হক, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের থেকে মোমবাতি প্রতীকে মোঃ ইসলাম উদ্দিন এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের হয়ে হাতপাখা প্রতীকে হুসেইন আহমদ।