যে আগ্নেয়গিরির কারণে ইন্দোনেশিয়ার সুনামি সেই আনাক ক্রাকাতোয়ার বিবর্তনের ছবি ও ইতিহাস

সুনামিতে নিহতের সংখ্যা বেড়েই চলেছে।

ছবির উৎস, EPA

ছবির ক্যাপশান,

সুনামিতে নিহতের সংখ্যা বেড়েই চলেছে।

ধারণা করা হচ্ছে, আনাক ক্রাকাতোয়া আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের কারণে সৃষ্ট ভূমিধসের ফলে ইন্দোনেশিয়ার উপকূলীয় এলাকায় সুনামি আঘাত করেছে। সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত এতে ২৮২ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রে একজন আগ্নেয়গিরি বিশেষজ্ঞ জেস ফিনিক্স বলছেন, ক্রাকাতোয়া আগ্নেয়গিরিটি এখন একটি নতুন ও বিধ্বংসী যুগে প্রবেশ করেছে। নিচের ছবিগুলোর মাধ্যমে তিনি এই আগ্নেয়গিরিটির বিবর্তনের একটি ইতিহাস তুলে ধরেছেন।

উপরে ক্রাকাতোয়া আগ্নেয়গিরিটির যে স্কেচ দেখা যাচ্ছে সেটি আঁকা হয়েছে ১৮৮৩ সালের বিধ্বংসী এক অগ্ন্যুৎপাতের আগে।

এর নাম আনাক ক্রাকাতোয়া যার অর্থ 'ক্রাকাতোয়ার সন্তান।' এটি গবেষণা করে বিজ্ঞানীরা এই আগ্নেয়গিরি সম্পর্কে অনেক কিছু জানতে পারছেন।

ক্রাকাতোয়া হচ্ছে কোণাকৃতির একটি আগ্নেয়গিরি। এটিকে বলা হয় স্ট্র্যাটোভলকানো।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান,

১৮৮৩ সালের অগ্ন্যুৎপাতের আগে ক্রাকাতোয়া আগ্নেয়গিরিটির আঁকা একটি ছবি।

আরো পড়তে পারেন:

অগ্ন্যুৎপাতের কারণে যে লাভা নির্গত হয় তা স্তরে স্তরে জমা হয়ে এটি তৈরি হয়েছে। এসব স্তর রয়েছে অক্ষত অবস্থায় এবং আকারেও এগুলো বিশাল।

ছবিটিতে দেখা যাচ্ছে, আগ্নেয়গিরিটির পাদদেশে সমুদ্র এবং সেখানে ভাসছে মাছ ধরার নৌকা। আগ্নেয়গিরিটির মুখ দিয়ে সামান্য ধোঁয়ার উদগীরণ দেখা গেলেও, ছবিটি দেখে বোঝা যায় এটি নিয়ে স্থানীয় লোকজনের মধ্যে কোন উদ্বেগ নেই।

তিনি বলছেন, যেসব আগ্নেয়গিরি থেকে অগ্ন্যুৎপাত হচ্ছে না, সেগুলো থেকেও এধরনের ধোঁয়ার উদগীরণকে স্বাভাবিক ঘটনা বলা চলে। আগ্নেয়গিরিটির ভেতরে যে পানি আছে, সেটা উত্তপ্ত হয়ে বাষ্পে পরিণত হচ্ছে এবং পরে সেটা আগ্নেয়গিরির মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসছে।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান,

২০১৮ সালের জুলাই মাসে তোলা আনাক ক্রাকাতোয়া আগ্নেয়গিরির ছবি।

আরো পড়তে পারেন:

ওপরের এই ছবিটি তোলা হয়েছে ২০১৮ সালের জুলাই মাসে। এখানে দেখা যাচ্ছে আনাক ক্রাকাতোয়া থেকে ছোটখাটো অগ্ন্যুৎপাত হচ্ছে। এই উদগীরণের মাত্রা আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের সূচকে শূন্য অথবা এক হিসেবে ধরা হয়।

একটি আগ্নেয়গিরি থেকে যে পরিমাণে পদার্থ নির্গত হয় - তার মাত্রার উপর ভিত্তি করে এই সূচক নির্ধারণ করা হয়। খুব সাধারণ অগ্ন্যুৎপাতের বেলায় এর মাত্রা থাকে শূন্য অথবা এক। এর উদাহরণ হাইওয়াইন আগ্নেয়গিরি। আর মাত্রা আট হলে তাকে ধরা হয় বিধ্বংসী অগ্ন্যুৎপাত। এর উদাহরণ হিসেবে প্রায় সাড়ে ছ'লাখ বছর আগে ইয়েলোস্টোন আগ্নেয়গিরিতে অগ্ন্যুৎপাতের কথা বলা হয়ে থাকে।

বিজ্ঞানী জেস ফিনিস্ক বলছেন, শূন্য থেকে এক মাত্রার অগ্ন্যুৎপাত প্রায়শই ঘটতে পারে। হয়তো দেখা গেল প্রতিদিনই সেখান থেকে উদগীরণ হচ্ছে, কিন্তু বড় ধরনের কোন বিস্ফোরণ ঘটছে না - এরকমও হতে পারে।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান,

এই ছবিটি তোলা হয়েছে ২০১৮ সালের জুলাই মাসে।

উপরের এই ছবিটিও তোলা হয়েছে ২০১৮ সালের জুলাই মাসে। এখানে আমরা দেখতে পাচ্ছি আনাক ক্রাকাতোয়ার শীর্ষে তার জ্বালামুখ দিয়ে উজ্জ্বল এবং উত্তপ্ত লাভা নির্গত হচ্ছে।

ছবির তীব্র উজ্জ্বলতা দেখে বোঝা যায় নির্গত লাভা অত্যন্ত গরম। তারপর এগুলো যখন ধীরে ধীরে ঠাণ্ডা হয়ে আসবে তখন এসব ধীরে ধীরে কালো রঙে পরিণত হবে।

একে বলে 'ম্যাগমা' যা ঠাণ্ডা হয়ে কালো কালো কয়লার অঙ্গারে পরিণত হতে পারে। এগুলো লাভার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশ যার নাম লাপিল্লি। আর এর বড় বড় টুকরোকে বলা হয় লাভা বোম্ব।

এর সবগুলোই মানুষের জন্যে বিপদজনক। লাভা বোম্ব আগ্নেয়গিরির চূড়া থেকে কয়েকশ মিটার দূর পর্যন্ত প্রবাহিত হতে পারে।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান,

২০১৮ সালের অগাস্ট মাসে তোলা আনাক ক্রাকাতোয়া।

আকাশ থেকে এই ছবিটি তোলা হয়েছে ২০১৮ সালের অগাস্ট মাসে। এতে আগ্নেয়গিরিটিকে মনে হচ্ছে ছোট্ট একটি দ্বীপের মতো এবং আগ্নেয়গিরি থেকে নির্গত পদার্থ দিয়ে দ্বীপটি ঢাকা পড়ে গেছে।

অন্য তিনটি দ্বীপের মোটামুটি মাঝখানে এই আনাক ক্রাকাতোয়া। এগুলোকে এই আগ্নেয়গিরিটির সীমান্তও বলা যেতে পারে।

১৮৮৩ সালের অগ্ন্যুৎপাতের কারণে ক্রাকাতোয়ার কাঠামোতে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটেছিল। ভেঙে পড়া কাঠামো থেকে সেখানে তখন তৈরি হয় আনাক ক্রাকাতোয়া। ১৯৩০ সালে সমুদ্রের পানির স্তর ফুঁড়ে এটি বেরিয়ে এসেছে।

এই ছবিতেও সামান্য পরিমাণে ধোঁয়ার উদগীরণ দেখা যাচ্ছে।

ছবির উৎস, EPA

ছবির ক্যাপশান,

২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তোলা আনাক ক্রাকাতোয়ার ছবি।

উপরের এই ছবিটি তোলা হয়েছে ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে যা আগের ছবিগুলো থেকে একেবারেই আলাদা। এটি দেখে বোঝা যাচ্ছে যে সেখানে একেবারে ভিন্ন রকমের পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

এখানে দেখা যাচ্ছে বাদামী রঙের পদার্থ নির্গত হচ্ছে এবং এর ফলে তিনটি সীমান্ত দ্বীপের একটি ঢাকা পড়ে গেছে। এখানে তাপের সঞ্চালনও দেখা যাচ্ছে।

এরকম উদগীরণের ফলে বিমান চলাচল বিঘ্নিত হয়। মানব স্বাস্থ্যের জন্যেও এটা ক্ষতিকর। কারণ এখানে পাথরের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণা থাকে। নিশ্বাসের সাথে এসব কণা মানব দেহে ঢুকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

পাথরের এসব কণার ওজনের কারণে বাড়িঘরও ধসে পড়তে পারে।

ছবির উৎস, Reuters

ছবির ক্যাপশান,

২০১৮ সালের ২৩শে ডিসেম্বরে তোলা ছবি।

এই ছবিটি তোলা হয়েছে ২০১৮ সালের ২৩শে ডিসেম্বর। আনাক ক্রাকাতোয়ার এখনকার ছবির সাথে এর বড় ধরনের ভিন্নতা রয়েছে।

বিধ্বংসী অগ্ন্যুৎপাতের কারণে এর কোণ ঢাকা পড়ে গেছে। এখানে নির্গত পদার্থগুলোর মধ্যে রয়েছে অত্যন্ত গরম ম্যাগমা, গ্যাস। প্রচণ্ড তাপের কারণে পানি বাষ্প হয়ে ওপরের দিকে ছড়িয়ে পড়ছে।

আনাক ক্রাকাতোয়া যেহেতু পানি দিয়ে পরিবেষ্টিত, সেকারণে এই আগ্নেয়গিরির চারপাশের পানি নির্গত পদার্থের সংস্পর্শে আসার ফলে সেখানে প্রচুর বাষ্প তৈরি হয়। এবং দেখে মনে হয় যে সেখানে ভয়াবহ রকমের অগ্ন্যুৎপাতের ঘটনা ঘটেছে।

ছবির উৎস, Reuters

ছবির ক্যাপশান,

২০১৮ সালের ২৩শে ডিসেম্বরে তোলা ছবি।

আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের কারণে বজ্রপাতেরও সৃষ্টি হতে পারে। ২০১৮ সালের ২৩শে ডিসেম্বরে তোলা আনাক ক্রাকাতোয়ার এই ছবিটিতেও এরকম বজ্রপাত হতে দেখা যাচ্ছে।

পাথরের কণার মধ্যে সংঘর্ষ, আগ্নেয়গিরির ছাই এবং পানির কারণে সেখানে বিদ্যুৎ তৈরি হতে পারে।

অগ্ন্যুৎপাতের পরিণতি অনেক রকমের হতে পারে। কখনো সেটা সীমিত থাকে স্থানীয় পর্যায়ে, কখনো সেটা আঞ্চলিক পর্যায়েও ছড়িয়ে পড়ে আবার কখনও সেটা হয়ে যায় সারা বিশ্বের খবর।

আনাক ক্রাকাোয়াতে যে অগ্ন্যুৎপাতের ঘটনা ঘটলো তার ফলে সৃষ্টি হয়েছে বিধ্বংসী সুনামির।

এখনও পর্যন্ত যেসব তথ্য পাওয়া যাচ্ছে তাতে মনে হচ্ছে, আনাক ক্রাকাতোয়ার কিছু অংশ ভেঙে পড়লে জাভা দ্বীপের পশ্চিম প্রান্তে সুনামির ঢেউ আঘাত হেনেছে।

ধারণা করা হচ্ছে, পাথর ছিটকে পড়ার কারণে এই সুনামির সৃষ্টি হয়েছে।