লম্বা চুল, দাড়ি, নীল চোখ - যীশু আসলে দেখতে কেমন ছিলেন?

যীশুকে প্রায়ই চিত্রিত করা হয় লম্বা চুল ও দাড়ি দিয়ে ছবির কপিরাইট Thinkstock
Image caption যীশুকে প্রায়ই চিত্রিত করা হয় লম্বা চুল ও দাড়ি দিয়ে

সবাই জানেন যীশু দেখতে কেমন ছিলেন। পশ্চিমা চিত্রকলায় সবচেয়ে বেশি আঁকা হয়েছে তার ছবি। ফলে সবারই পরিচিত তার চেহারা - লম্বা চুল, দাড়ি, লম্বা হাতাওয়ালা আলখাল্লা (সাধারণত: সাদা), আর একটি চাদর বা শাল (সাধারণত: নীল)।

কিন্তু আসলেই কি যীশু এরকম দেখতে ছিলেন?

সম্ভবত: না।

প্রকৃতপক্ষে যীশুর যে চেহারার সাথে আমরা পরিচিত তার উৎস বাইজান্টাইন যুগে - চতুর্থ শতাব্দী বা তার পরবর্তী কালে।

এবং বাইজান্টাইন যুগের এই যীশুর চেহারা সম্পূর্ণই প্রতীকী। এর কোন ঐতিহাসিক নির্ভুলতা নেই।

এগুলো মূলত আঁকা হয়েছিল সিংহাসনে বসা একজন সম্রাটের চিত্রকল্পকে ভিত্তি করে - যেমনটা আমরা রোমের সান্তা পুডেনজিয়ানা গীর্জার বেদীতে দেখি।

ছবির কপিরাইট Alamy
Image caption যীশুর মাথার চার পাশে যে জ্যোতি - তা ক্লাসিকাল যুগের শিল্পকলা থেকে আসা। সূর্যের দেবতা এ্যাপোলো বা সল ইনভিক্টাসের ছবিতে দেখা যেতো এই আলোর প্রভা, পরে তা যীশুর ছবিতে যোগ করা হয় - তার স্বর্গীয় প্রকৃতি বোঝাতে।

সম্রাটের মতো দেখতে যীশু

এখানে দেখা যাচ্ছে যীশুর পরনে সোনালী টোগা (প্রাচীন রোমান পোশাক), তাকে চিত্রিত করা হয়েছে সারা বিশ্বের শাসক হিসেবে।

তার সাথে অনেক মিল আছে সিংহাসনে বসা লম্বা চুলদাড়িওয়ালা অলিম্পিয়ান দেবরাজ জিউসের সাথে।

এই প্রতিমূর্তি সে যুগে এতই পরিচিত ছিল যে রোমান সম্রাট অগাস্টাস একই স্টাইলে তার নিজের একটি মূর্তি তৈরি করিয়েছিলেন - অবশ্য তাতে তার দেবতাদের মত লম্বা চুলদাড়ি ছিল না।

ছবির কপিরাইট Alamy/Getty Images
Image caption ফিডিয়াসের তৈরি অলিম্পিয়ান জিউস, পাশে সম্রাট অগাস্টাসের মূর্তি

বাইজান্টাইন শিল্পীরা যীশুখ্রীষ্টকে স্বর্গীয় ক্ষমতাসম্পন্ন মহাবিশ্বের রাজা হিসেবে দেখাতে চেয়েছিলেন। তাই তারা তাঁকে তৈরি করেন দেবরাজ জিউসের এক তরুণতর সংস্করণ হিসেবে।

কালক্রমে সেই স্বর্গীয় আদলে সৃষ্ট যীশুর চেহারা কিছুটা পরিবর্তিত হয়ে অনেকটা হিপিদের মত এক নতুন রূপ পায়।

সেটাই হয়ে দাঁড়ায় কল্পিত যীশুর চেহারার স্ট্যান্ডার্ড মডেল।

কিন্তু আসল যীশু কি এরকমই দেখতে ছিলেন?

ছবির কপিরাইট Alamy
Image caption 'জেসাস ক্রাইস্ট সুপারস্টার' নামে অপেরার পোস্টার

তার আসল চেহারা তাহলে কেমন ছিল?

আমরা পা থেকে মাথা পর্যন্ত সবই পরীক্ষা করে দেখি।

মাথা এবং চুল

প্রথম যুগের খ্রীস্টানরা যীশুকে স্বর্গীয় শাসক হিসেবে চিত্রিত করতেন না।

তারা তাকে দেখাতেন একজন স্বাভাবিক মানুষের মতোই, ছোট চুলওয়ালা, এবং দাড়িবিহীন।

ছবির কপিরাইট Yale Collections/Public Domain
Image caption যীশুর সবচেয়ে পুরোনো ছবি। তৃতীয় শতকের প্রথমদিকে ইউফ্রেটিস নদীর পারে দুরা-ইউরোপোস নামের ধ্বংসপ্রাপ্ত শহরের একটি চার্চে পাওয়া।

তবে সম্ভবত একজন পরিব্রাজক সাধু হিসেবে যীশু হয়তো দাড়ি রেখেছিলেন, এ কারণেই তার নাপিতের কাছে যাওয়া হতো না।

তখনকার দিনে একজন দার্শনিককে চেনা যেতো তার উস্কোখুস্কো চেহারা-পোশাক আর দাড়ি দেখে। অন্যদিকে প্রথম শতাব্দীর গ্রেকো-রোমান বিশ্বে দাড়ি কামানো এবং ছোট চুল রাখাটা ছিল আবশ্যিক ।

লম্বা চুল-দাড়ি ছিল দেবতাদের জিনিস, পুরুষদের ফ্যাশন নয়। এমনকি সে যুগে দার্শনিকরাও ছোট চুল রাখতেন।

তখনকার দিনে একজন ইহুদিকেও দাড়ি দিয়ে চেনা যেতো না।

ইহুদিদের ওপর নির্যাতনকারীদের একটা সমস্যা ছিল তাদের চেনা - কারণ তারা ছিল অন্য সবার মতোই দেখতে । তবে ৭০ খ্রীস্টাব্দে জেরুসালেম দখলের পর রোমের মুদ্রায় যে ইহুদিদের দেখা যায়, তাতে বন্দীদের মুখে দাড়ি আছে।

ছবির কপিরাইট CNG Coins
Image caption রোমের জেরুসালেম দখলের পর ছাড়া মুদ্রা

যীশু যে একজন ইহুদি (জুডিয়ান) ছিলেন, এটা বহুবার নানাভাবে উল্লিখিত হয়েছে।

কাজেই এমন হতে পারে যে যীশুর হয়তো তেমনি ছোট দাড়ি ছিল, তবে তাঁর চুল হয়তো খুব একটা লম্বা ছিল না।

তাঁর বেশি লম্বা চুল বা দাড়ি থাকলে অনেকে হয়তো মনে করতেন যে যীশু নাজিরাইট শপথ নিয়েছেন - যখন ইহুদিরা একটা সময় পর্যন্ত মদ খেতেন না বা চুল কাটতেন না। সেই সময় পার হলে জেরুসালেমের মন্দিরে গিয়ে বিশেষ অনুষ্ঠান করে মাথা কামাতেন।

যীশু কখনো এটা করেন নি। কারণ তাকে প্রায়ই মদ্যপানরত অবস্থায় পাবার বর্ণনা আছে।

ম্যাথিউ-এর সুসমাচারে অনুচ্ছেদ ১১তে উল্লেখ আছে যে তার সমালোচকরা অভিযোগ করছেন যে যীশু খুব বেশি মদ খেতেন।

যীশুর কাপড়চোপড়

সে সময় ধনী লোকেরা তাদের উচ্চ পদমর্যাদা দেখাতে লম্বা আলখাল্লা পরতেন। যীশু হয়তো এরকম কাপড় পরতেন না - কারণ তিনি এধরণের লোকদের থেকে সতর্ক থাকতে উপদেশ দিয়েছেন।

সাধারণত সে সময় পুরুষরা হাটু পর্যন্ত লম্বা 'চিতন' পরতেন, মেয়েরা পরতেন গোড়ালি পর্যন্ত লম্বা পোশাক। যীশু এর ওপর একটা হিমেশন বা শাল পরতেন -যার বর্ণনা পাওয়া যায়।

ছবির কপিরাইট Alamy
Image caption ক্রিট দ্বীপে পাওয়া ফ্রেস্কো: শিল্পীর কল্পনায় যাই থাকুক, ঐতিহাসিক যীশুর নীল চোখ থাকার সম্ভাবনা খুবই কম।

এই শালের মান, আকার এবং রং থেকে পরিধানকারীর ক্ষমতা এবং সম্মান বোঝা যেতো।

সন্ত মার্ক যীশুকে বর্ণনা করেছেন রং-না-করা সাধারণ কাপড় পরা সাধারণ মানুষ হিসেবে।

যীশুর জুতো

সে যুগে সবাই চপ্পল বা স্যান্ডাল পরতো। সেগুলো ছিল খুবই সহজ কায়দায় বানানো।

এর তলা বা 'সোল'টা ছিল কয়েক স্তর চামড়া জোড়া দিয়ে বানানো, আর ওপরের দিকটা চামড়ার সরু ফিতে দিয়ে তৈরি হতো। যীশুও হয়তো এরকম চপ্পলই পরতেন।

ছবির কপিরাইট Gabi Laron
Image caption যীশুর যুগের চামড়ার স্যান্ডেল

যীশুর মুখের গড়ন কেমন ছিল?

যীশু যে একজন ইহুদি ছিলেন তা বহুভাবে সে সময়ের অনেকে উল্লেখ করেছেন। তাঁর ধর্মপ্রচারক হিসেবে যাত্রা শুরু করার সময় বয়েস ছিল ৩০-এর মতো।

সে যুগের ইহুদিরা কেমন দেখতে ছিলেন?

বিবিসি'র একটি প্রামাণ্যচিত্রের জন্য ২০০১ সালে যীশুর মুখের একটি আনুমানিক প্রতিরূপ তৈরি করেন নৃতত্ববিদ এডওয়ার্ড নীভ। গালীলী অঞ্চলে পাওয়া একটি মাথার খুলির ওপর ভিত্তি করে এটা তৈরি করেন তিনি । তবে তিনি দাবি করেন নি যে যীশু এরকমই দেখতে ছিলেন।

তিনি শুধু একটা ধারণা দেবার চেষ্টা করেন যে সে যুগে ওই এলাকার লোকেরা সাধারণভাবে দেখতে কেমন ছিলেন।

কারণ যীশু যে ব্যতিক্রমী চেহারার কেউ ছিলেন এটা কেউই বলেন নি।

তাঁর নীল চোখ ছিল এমন সম্ভাবনাও খুব কম।

Image caption বিবিসি প্রামাণ্যচিত্রের জন্য কম্পিউটারে তৈরি যীশুর কল্পিত চেহারা

যীশু ঠিক কেমন দেখতে ছিলেন - তার হয়তো সবচেয়ে কাছাকাছি ধারণা পাওয়া সম্ভব দুরা-ইউরোপোসে তৃতীয় শতকের সিনাগগে নবী মুসার ছবি থেকে।

কারণ গ্রেকো-রোমান যুগে একজন ইহুদি সন্তের চেহারার কেমন ছিল - তার ধারণা এখানে পাওয়া যায়।

এখানে নবী মুসার ছোট চুল, ছোট দাড়ি, খাটো হাতের হাঁটু-অবধি আলখাল্লা, হিমেশন বা শাল - সবকিছু মিলিয়ে বলা যায় - তার চেহারার সাথে ঐতিহাসিক যীশুর মিল থাকার সম্ভাবনা বাইজান্টাইন যুগের যীশুর ছবির চাইতে অনেক বেশি।

ছবির কপিরাইট Alamy
Image caption সমুদ ভাগ করে লোহিত সাগর পাড়ি দিচ্ছেন নবী মুসা
ছবির কপিরাইট Alamy
Image caption নীল পাড়ওয়ালা শাল ও খাটো আলখাল্লা পরা যীশু

জোয়ান টেলর: লন্ডনের কিংস কলেজে খ্রীষ্টধর্মের উৎস এবং দ্বিতীয় মন্দিরের যুগের ইহুদিধর্ম বিষয়ক অধ্যাপক, এবং লেখক।

সম্পর্কিত বিষয়