সংসদ নির্বাচন: বরিশালে ছয়টি আসন কিন্তু সবার দৃষ্টি সদর ও গৌরনদীতে

বরিশাল সদরে চলছে নির্বাচনী প্রচার প্রচারণা।
Image caption বরিশাল সদরে চলছে নির্বাচনী প্রচার প্রচারণা।

বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলীয় জেলা বরিশাল এখন তুমুল নির্বাচনী প্রচারণায় সরগরম হয়ে উঠেছে। প্রচারণার পাশাপাশি কোথাও কোথাও সংঘর্ষের ঘটনায় বাড়ছে উত্তেজনাও।

যদিও প্রায় সব আসনেই প্রচার প্রচারণা বেশি চোখে পড়ছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ দলীয় প্রার্থীদেরই।

তারপরেও আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের পাশাপাশি আলোচনায় রয়েছেন বিএনপি বা জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট মনোনীত প্রার্থীদের নিয়ে।

এমনকি মাঠে তেমন দেখা না গেলেও আওয়ামী লীগের প্রার্থী কিংবা নেতাকর্মীরা তাদের প্রচারে বারবারই তুলে আনছেন বিএনপি মনোনীত প্রার্থীদের প্রসঙ্গ।

Image caption বরিশালে ছয় আসন কিন্তু সবার দৃষ্টি সদর ও গৌরনদীতে

আরও পড়তে পারেন:

রাজশাহীতে নির্বাচনী পরিবেশ 'ভালো', কিন্তু বাইরে?

সাংবাদিকদের চোখে মোটরসাইকেল নিষেধাজ্ঞা

হিন্দু ভোটারদের ঘিরেই নাসিরনগরে যত সমীকরণ

রাজনৈতিক বিবেচনায় গুরুত্বপূর্ণ সদর আসন:

বরিশাল-৫ আসনটিই জেলায় সদর আসন এবং এই অঞ্চলের রাজনীতি এ এলাকাকে কেন্দ্র করেই পরিচালিত হয়।

আসনটিতে ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিএনপির মজিবর রহমান সরওয়ার নির্বাচিত হয়েছিলেন আওয়ামী লীগের জাহিদ ফারুক শামীমকে হারিয়ে। এবারও তারা দুজনই একে অন্যের প্রতিদ্বন্দ্বী।

এর আগে ৯১ ও ৯৬ সালেও বিএনপি প্রার্থী এ আসনে বিজয়ী হয়েছিলেন আর ২০১৪ সালে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় জিতেছিলেন আওয়ামী লীগের প্রয়াত শওকত হোসেন হিরন। তার মৃত্যুর পর তার স্ত্রী জিতেছিলেন উপ নির্বাচনে।

কিন্তু ২০১৪ সাল ছাড়া এ আসনে ১৯৯১ সাল থেকে পরবর্তীতে সব নির্বাচনই এখানে জমজমাট হয়েছিল।

এমনকি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে মেয়র নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী যেমন জিতেছিলেন তেমনি আওয়ামী লীগ আমলে জিতেছিলেন বিএনপির মেয়র প্রার্থী। এবং সেটা সর্বশেষ মেয়র নির্বাচনে।

তবে এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। শহরের আওয়ামী লীগ প্রার্থী জাহিদ ফারুককে সমর্থনে ব্যাপক প্রচার চোখে পড়লেও বিএনপি প্রার্থী মজিবর রহমান সরওয়ারের প্রচার চোখে পড়ছে কমই।

অথচ শহরেই নৌকা প্রতীকে পাশাপাশি অসংখ্য পোস্টার চোখে পড়ে ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী সৈয়দ মোঃ ফয়জুল করিমের।

আসনটিতে আরও প্রার্থী আছেন বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টিও আব্দুস সাত্তার, এনপিপির শামিমা নাসরিন, জাতীয় পার্টির একেএম মুরতজা আবেদীন ও বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির এইচ এম মাসুম বিল্লাহ।

Image caption নির্বাচনী প্রচারণায় আওয়ামী লীগ প্রার্থী।

কি বলছে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি?

মহানগর বিএনপির সহসভাপতি মহসিন মন্টু বলছেন গণ-গ্রেপ্তার আতঙ্কে গাঢাকা দিতে বাধ্য হয়েছেন তার দলের নেতাকর্মীরা।

"বাধার কারণে সভা সমাবেশ করা যাচ্ছেনা। পোস্টারগুলো ছিঁড়ে ফেলা হচ্ছে। এমনকি পোস্টার লাগাতে গেলে হুমকি দেয়া হচ্ছে"।

তিনি বলেন, "সেনাবাহিনী নামলে এবং লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড হলে পরিস্থিতি পাল্টে যাবে"।

তবে মহানগর আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ সভাপতি আফজালুল করিম বলছেন বিএনপির অভিযোগ সত্যি নয় কারণ প্রতিদিনই তাদের প্রচারণার ছবি প্রকাশিত হচ্ছে।

মিস্টার করিম বলেন গ্রেফতারের বিষয়ে তাদের কোন বক্তব্য নেই কারণ এটি আইন-শৃঙ্খলা সম্পর্কিত বিষয়।

"যাদের ধরা হচ্ছে তারা একাধিক মামলার আসামী"।

Image caption ধানের শীষের পক্ষে চলছে প্রচারণা।

আসনটির ইস্যু কি?

শহীদুল ইসলাম নামে একজন দোকানী এ প্রশ্নের উত্তরে বলেন, "এখানে ইস্যু রাজনীতি"।

তার মতে আসনটি বিএনপি ও আওয়ামী লীগের জন্য মর্যাদার আসন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

আর সে কারণেই কেউ কাউকে ছাড় দিতে নারাজ এবার।

এ আসনে ভোটারদের সাথে কথা বলে পরিস্থিতি বোঝা মুশকিল তবে অনেকেই বলছেন শহরের রাস্তাঘাট প্রশস্ত করা দরকার, বেকারত্ব অনেক তীব্র আর শিল্প কারখানা না থাকায় কর্মসংস্থান বাড়ছেনা।

তবে তরুণ ভোটার অনেকের মধ্যেই ভোট সঠিক ভাবে হবে কি-না তা নিয়ে উদ্বেগ আছে।

তারিন তাসনিম জুঁই নামে একজন নতুন ভোটার বলছিলেন, "এবার ভোট দিবো এবং এটি নিয়ে আমি খুবই উচ্ছ্বসিত। তাই চাই ভোটটা যেন ঠিক মতো হয়"।

জান্নাতুল ফেরদৌস কানিজ বলেন, "আমরা যেন ভোট দিয়ে বলতে পারি যিনি নির্বাচিত হয়েছেন তিনি আমাদের ভোটেই হয়েছেন।"

ভোটারদের অনেকেই জানিয়েছেন ভোট নিয়ে এমন উদ্বেগ আছে অনেকের মধ্যেই আর এর কারণ হল চলতি বছরেই হওয়া সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন।

যে নির্বাচনে ব্যাপক ভোট কারচুপির অভিযোগ উঠেছিল।

তরুণদের একজন অপূর্ব কুমার বলছিলেন, "সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনের কারণেই আমরা উদ্বিগ্ন"।

Image caption বরিশাল এখন তুমুল নির্বাচনী প্রচারণায় সরগরম

'ইলেকশন যেমন অওয়ার অইবে'

সদরের বাইরে জেলার যে আসনটি নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে সেটি হল বরিশাল-১।

গৌরনদী ও আগৈলঝাড়া নিয়ে গঠিত এ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী সাবেক চীফ হুইপ আবুল হাসনাত আব্দুল্লাহ।

মিস্টার আব্দুল্লাহর ছেলে সাদিক আব্দুল্লাহ্ই বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের এখনকার মেয়র এবং গত জুলাইয়ের যে নির্বাচনে জিতে তিনি মেয়র হয়েছেন সে নির্বাচন নিয়েই ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ উঠেছিল।

যদিও তিনি ও আওয়ামী লীগ তা বরাবরই প্রত্যাখ্যান করেছেন।

আর বিএনপির প্রার্থী সাবেক সংসদ সদস্য জহির উদ্দিন স্বপন, যিনি দলটির সংস্কারপন্থী অংশটির সাথে গিয়েছিলেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে। পরে অনেকদিন নিষ্ক্রিয় থেকে সম্প্রতি বিএনপিতে ফিরে এসে তিনি সক্রিয় হয়েছেন।

কিন্তু এবার মনোনয়নপত্র দাখিলের পর থেকে নিজের এলাকায় এসে ঘর থেকেই বের হতে পারছেননা বলে দাবী করছেন তিনি।

সোমবার বিকেলে গৌরনদীর সরিকল নামে একটি গ্রামে তার নিজের বাসায় বসে বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, "আমাকেই হুমকি দেয়া হচ্ছে। নেতাকর্মীদের ওপর গণহারে মারধর চলছে। মিছিলে হামলা হচ্ছে। এসব কারণে বের হতে পারছিনা"।

জহির উদ্দিন স্বপন বলেন সেনাবাহিনী নামার পর পরিস্থিতি পাল্টাবে বলে আশা করছেন তিনি।

Image caption বরিশালে ছয় আসন কিন্তু সবার দৃষ্টি সদর ও গৌরনদীতে

তবে তার এসব অভিযোগ মানতে রাজী নন প্রতিদ্বন্দ্বী আবুল হাসনাত আব্দুল্লাহর প্রধান সমন্বয়ক গৌরনদীর মেয়র হারিছুর রহমান হারিছ।

মিস্টার রহমান বলেন, "বিএনপি ২০০১ সালের নির্বাচনের পর এ এলাকায় যে নির্যাতন করেছিলো সেজন্য তারা এখন মানুষের কাছে যেতে পারছেনা"।

তবে দল দুটির নেতারা যাই বলুন স্থানীয় ভোটারদের অনেকেই নির্বাচন বিষয়ে কোন মন্তব্য করতে রাজী হননি।

সোমবার বিকেলেই জহির উদ্দিন স্বপনের বাড়ির কাছেই সড়কে বিপুল সংখ্যক নৌকা সমর্থককে লাঠিসোটা হাতে দেখা গেছে।

যদিও হারিছুর রহমান বলছেন তারা বিএনপিকে কোন বাধা দিচ্ছেনা।

স্থানীয় একটি মার্কেটের সামনে মোহাম্মদ মনোয়ার নামের একজন ভোটার বলেন এখানে ভয়ে আসলে অনেকে নির্বাচন নিয়ে কথাই বলতে চাননা।

তবে এই ভয় কিসের সে প্রশ্নের উত্তর দিতে রাজী হননি তিনি।

যদিও আরেকজন ভোটার বলেন, "যখন যে সরকার ক্ষমতায় থাকে এখানে সব তারাই নিয়ন্ত্রণ করে। তাই বোঝাই যায় কেমন হবে নির্বাচন"।

Image caption বরিশাল-১ আসনের আওয়ামী লীগ প্রার্থী আবুল হাসনাত আবদুল্লাহর প্রধান সমন্বয়ক গৌরনদীর পৌর মেয়র হারিসুর রহমান হারিস।

অন্য আসনগুলোর কি অবস্থা?

বরিশাল-২ আসনে আওয়ামী লীগের মোঃ শাহ আলম ও বিএনপির সরফুদ্দিন আহমেদ সান্টুসহ সাতজন প্রার্থী রয়েছেন।

সোমবারও দুই প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে।

আওয়ামী লীগের একটি নির্বাচনী ক্যাম্পে বিএনপি প্রার্থী সরফুদ্দিন আহমেদ সান্টুর নেতৃত্বে হামলা ও গুলি হয়েছে বলে বিবিসি বাংলাকে অভিযোগ করেছেন আওয়ামী লীগ প্রার্থীর ঘনিষ্ঠ যুবলীগ নেতা মনিরুল ইসলাম মিঠু।

সরফুদ্দিন আহমেদ সান্টু জানিয়েছেন তার ওপর হামলা হয়েছে আর সে কারণেই আত্মরক্ষার্থে ফাঁকা গুলি করেছেন তিনি।

বরিশাল-৩ আসনে বর্তমান এমপি ওয়ার্কার্স পার্টির টিপু সুলতান মহাজোট প্রার্থী।

আবার ওয়ার্কার্স পার্টির আরেকজন নেতা আতিকুর রহমানও নির্বাচন করছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে।

অন্যদিকে জাতীয় পার্টির সাবেক এমপি গোলাম কিবরিয়া টিপুও রয়েছেন মাঠে, যিনি ২০০৮ সালে মহাজোট প্রার্থী হিসেবে এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন।

Image caption বরিশাল-১ এর বিএনপি প্রার্থী জহিরুদ্দিন স্বপন।

এ আসনে আওয়ামী লীগের নিজস্ব কোন নেতা প্রার্থী হননি বরং এই তিনজন দলটির নানা দল-উপদলের সমর্থন পাচ্ছেন।

ওদিকে বিএনপি থেকে প্রার্থী হয়েছেন সুপ্রীম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি জয়নুল আবেদীন।

বরিশাল -৪ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী বর্তমান এমপি পংকজ নাথ ও বিএনপি জোটের জে এম নূরুর রহমানসহ মোট প্রার্থী সাতজন।

ছবির কপিরাইট Getty Images

মিস্টার রহমান নাগরিক ঐক্যের নেতা ছিলেন। তবে নির্বাচনী প্রচারে এসে একবার হামলার শিকার হওয়ার পর থেকে তিনি আর এলাকায় নেই।

আর বরিশাল-৬ আসনে আওয়ামী লীগ জোটের প্রার্থী হয়েছেন জাতীয় পার্টির নাসরিন জাহান আমিন। অন্যদিকে এখানে বিএনপির প্রার্থী হলেন আবুল হোসেন খান।

এ আসনে প্রচার প্রচারণা তুলনামূলক শান্তিপূর্ণভাবেই চলছে।