থাইল্যান্ডের গুহা অভিযান: কী ঘটেছে তারপরে?

এই ছবিতে ফুটবল কোচের সঙ্গে গুহায় আটকে পড়া কয়েকজন কিশোরকে দেখা যাচ্ছে ছবির কপিরাইট FACEBOOK/EKATOL
Image caption এই ছবিতে ফুটবল কোচের সঙ্গে গুহায় আটকে পড়া কয়েকজন কিশোরকে দেখা যাচ্ছে

এ বছরের জুন এবং জুলাই মাসের তিন সপ্তাহ জুড়ে থাইল্যান্ডের একটি গুহায় ১২জন কিশোর ফুটবলার এবং তাদের কোচের আটকে পড়া, রোমাঞ্চকর উদ্ধার অভিযানের খবর সারা বিশ্বের নজর কেড়েছিল। থাইল্যান্ডের মায়ে সাই এলাকায় সেই উদ্ধার অভিযানের পরে কী ঘটেছে? সেটাই জানতে গিয়েছিলেন বিবিসির সংবাদদাতা।

জুলাই মাসে গুহার ভেতরের পানি বের করার জন্য বড়সড় সেচ কার্যক্রম শুরু করেছিল কর্তৃপক্ষ। তখন ঘণ্টায় কয়েক মিলিয়ন লিটার পানি বের করে ফেলা হয়, যে পানিতে আশেপাশের ফল আর সবজির ক্ষেত ডুবে গিয়েছিল।

যাদের ক্ষেতখামার ডুবে গিয়েছিল, তাদের একজন ছিলেন আনারস চাষি আরচাউন মোপোআকু, সেখানকার পাহাড়ি একটি গোত্রের বাসিন্দা।

তবে সেজন্য তিনি কোন অভিযোগ করেননি, বরং বেশ কিছুদিনের জন্য ক্ষেতখামারের কাজ বন্ধ করে রাখেন এবং বাঁশ কেটে উদ্ধার অভিযানে অংশ নেয়া সেনাবাহিনীকে সহায়তা করেন।

আরো পড়ুন:

থাই গুহা: সবাইকে কিভাবে উদ্ধার করা হল?

থাইল্যান্ডের গুহা থেকে বাবা-মায়ের কাছে চিঠি

গুহা থেকে উদ্ধার শিশুরা জনসম্মুখে এসে যা জানালো

থাই কিশোরদের উদ্ধারের পর কিছু প্রশ্ন এবং তার জবাব

Image caption আনারস চাষ স্থগিত রেখে এখন কমলা বিক্রি করছেন আরচাউন মোপোআকু

এখনো আরচাউনের আনারস বাগান অনাবাদী রয়ে গেছে। তবে এখন তিনি গুহায় যাবার পথের পাশে পর্যটকদের কাছে কমলা বিক্রি করেন। কারণ পাঁচ মাস পরে সেই গুহাটি থাইল্যান্ডের সবচেয়ে দর্শনীয় স্থানগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছে।

তিনি বলছেন, আনারস বিক্রির চেয়ে কমলা বিক্রি তাকে অনেক বেশি লাভ এনে দিয়েছে।

''উদ্ধার অভিযানের আগে এই এলাকাটি ছিল বেশ নিরিবিলি। শুধুমাত্র একবার কয়েকজন বিদেশী পর্যটক এখানকার গুহা দেখতে এসেছিল। কিন্তু উদ্ধারের ওই ঘটনার পর অনেক বেশি মানুষ আসছে আর আমার মতো পাহাড়ের মানুষজনের অনেক উন্নতি করছে।''

শুধু তিনি একা নন, পথের পাশে ফুল বিক্রি করা হচ্ছে, গ্রিল করা মাংসের খাবার তৈরি হচ্ছে, স্যুভেনিরের দোকান বসেছে, আর বিশেষ করে লটারির টিকেটও বিক্রি হচ্ছে।

গুহার আগে আগে একটি প্লাস্টিক চেয়ারে বসে পার্কের একজন রেঞ্জার দর্শনার্থীদের সংখ্যার হিসাব রাখছেন। আগে প্রতিদিন ১০ থেকে ২০ জন দর্শনার্থী আসতেন। এখন প্রতিদিন ৬০০০ হাজারের বেশি দর্শনার্থী আসছে।

তাদের বেশিরভাগই থাইল্যান্ডের বাসিন্দা, যারা দেশের নানা প্রান্ত থেকে এই গুহা দেখতে আসছেন।

'' এই মুহূর্তে থাম লুয়াঙ্গের মতো আর কোন আকর্ষণীয় এলাকা আশেপাশে নেই,''বলছেন একটি ম্যাগাজিনের প্রকাশক ও টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব ডামরন পুট্টান, যিনি গুহাটি দেখতে এসেছেন। যখন ওই ঘটনা ঘটে, তখন তিনি ইউরোপ ভ্রমণে গিয়ে দেখতে পান, সেখানেও সেটি কতটা মনোযোগ কেড়েছে।

''উদ্ধারের ওই অভিযানের আগে এই গুহাগুলির কথা আমি জানতাই না।'' বলছেন ভ্যানিসা আচাকুলভিসুট। ''কিন্তু ওয়াইল্ড বোয়ারস ফুটবল টিমের সব খবর পড়ার পর এখানে এসে আমি নিজের চোখে দেখতে বাধ্য হয়েছি।''

Image caption কোচ একাপল চান্থাওং এবং উদ্ধারকারী মিকো পাসির আবার দেখা হয়েছে

গুহার ওপরের পাহাড়ি এলাকাটির নামকরণ হয়েছে পুরাকাহিনীর নাঙ নোন নামের একজন রাজকুমারীর নামে, যিনি নিষিদ্ধ প্রেমের জের ধরে আত্মহত্যা করেন, যার ঘুমন্ত চেহারার আদলেই এই পাহাড়ি এলাকাটি গঠিত হয়েছে বলে লোককাহিনী প্রচলিত আছে। এসব গুহাকে ঐতিহ্যগতভাবে রহস্যময় শক্তির উৎস বলে থাইল্যান্ডে মনে করা হয়।

গুহার প্রবেশ পথের কাছাকাছি নাঙ নোনের একটি মন্দির রয়েছে, যেখানে লোকজন তার জন্য নানা উৎসর্গ করে থাকে। কিন্তু সেই আলোচিত উদ্ধার অভিযান যেন তার জন্যও সুভাগ্য বয়ে এনেছে।

যেসব দর্শনার্থীরা গুহাটি দেখতে আসছেন, সবাই ফুল নিয়ে এসে নাঙ নোনের মন্দিরে ছোটখাটো প্রার্থনাও করে যাচ্ছেন।

লটারি কেনার জন্য এই জায়গাটিও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বেশিরভাগ মানুষের কাছে জনপ্রিয় নম্বরটি হচ্ছে ১৩, কারণ এই গুহাটি ১২টি কিশোর আর তাদের কোচ মিলে ১৩জন আটকা পড়েছিলেন।

Image caption অভিযানের সময় মারা যাওয়া ডুবুরি সামান গুনানের একটি মূর্তি উম্মোচন করে উদ্ধার হওয়া কিশোররা

এখন এখানে আরো একটি প্রার্থনার কেন্দ্র তৈরি হয়েছে। সেটি হলো তিন মিটার উচ্চতায় ডুবুরি সামান গুনানের একটি ব্রোঞ্জ মূর্তি, যিনি ওই কিশোরদের উদ্ধার অভিযানে গিয়ে মারা যান।

যে স্থানে দাড়িয়ে সাংবাদিকরা ওই ঘটনাটি প্রচার করেছেন, সেখানে এখন একটি জাদুঘর তৈরির কাজ চলছে।

উদ্ধার হওয়ার পর দ্বিতীয় বারের মতো ওই স্থানে এসেছিলেন কিশোর এবং তাদের কোচ একাপল চান্থাওং, যিনি ১৭ দিন ধরে মেডিটেশন এবং নানাভাবে কিশোরদের চাঙা করে রেখেছিলেন।

সে সময় তাদের উদ্ধার অভিযানে অংশ নেয়া কয়েকজন উদ্ধারকারীও এসেছিলেন স্থানটি আবার দেখতে। তাদের মধ্যে আছেন আমেরিকান জোশ মরিস, ফিনিশ ডুবুরি মিকো পাসি, ব্রিটিশ গুহা বিশেষজ্ঞ ভের্ন আন্সওয়ার্থ।

থাইল্যান্ডের সরকার এই কিশোরদের ব্যাপারে বেশ রক্ষণশীল। এই কিশোরদের যেকোনো জনসংযোগের ক্ষেত্রে সবসময়ে সঙ্গে শিশু কল্যাণ কর্মকর্তা থাকেন। কেউ যদি এই কিশোরদের সাক্ষাৎকার নিতে চায়, তাহলে অন্তত কয়েক সপ্তাহ ধরে দুইটি কমিটির পর্যবেক্ষণের মধ্য দিয়ে প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। কর্মকর্তাদের অনুমতি ছাড়া কারো সঙ্গে কথা না বলার জন্য তাদের পরিবারকেও নিষেধ করে দেয়া হয়েছে।

Image caption গুহাটিতে প্রবেশের মুখটি এখন বন্ধ করে রাখা হয়েছে

ব্রিটিশ গুহা বিশেষজ্ঞ ভের্ন আন্সওয়ার্থ বলছেন, ''আমার জন্য এখনো এই জায়গাটি বেশ আবেগের জায়গা।অনেকেই মনে করেন, তেরজনের মধ্যে তেরজনকেই জীবিত উদ্ধার করে আনতে পারাটা অলৌকিক একটা ব্যাপার।''

''আমার ধারণা, সারা পৃথিবীর মানুষ একটি খারাপ ফলাফলের ধারণা করছিল। কিন্তু আমরা কখনো হাল ছাড়িনি। ডুবুরিরা যা করেছেন, তা হচ্ছে অসাধারণ ধৈর্য আর অবিশ্বাস্য কৃতিত্ব।

তিনি বলছেন, পুরো ঘটনার জন্য ওই কিশোর বা তাদের কোচকে কেউ দোষ দেয়নি, আসলে তাদের ভাগ্যটাই খারাপ ছিল।

''এটা আমিও হতে পারতাম।'' তিনি বলছেন, কারণ একদিন পরেই তিনি গুহার ভেতরে যাবার পরিকল্পনা করছিলেন।

সেদিন অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের কারণে গুহার ভেতরে পানির মাত্রা হঠাৎ করেই বেড়ে যায় এবং কিশোর ও তাদের কোচ গুহার ভেতর আটকে পরে।

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption গুহার ভেতর আটকে থাকার সময় কিশোরদের ছবি

ওই ঘটনা কি কিশোরদের জীবন বদলে গিয়েছে?

ভের্ন বলছেন, ''তারা সবাই ভালো নির্দেশনা পেয়েছে, তাদের ভালোভাবে দেখভাল করা হচ্ছে। আমি এটাকে ঠিক স্বাভাবিক জীবন বলবো না- কারণ তাদের সারা পৃথিবী জুড়ে ঘুরে বেড়াতে হচ্ছে। তবে তারা সবাই আবার স্কুলেও যেতে শুরু করেছে।''

তাদের প্রধান কোচ নোপ্পারাট কান্তাওয়াঙ বলছেন, গুহার ওই ঘটনার আগে তারা যেমন ফুটবলের কঠোর প্রশিক্ষণ করতো, এখনো সেরকম প্রশিক্ষণ নিতে শুরু করেছে। হারানো ওজন তারা ফিরে পেতে শুরু করেছে। এমনটি ম্যানচেস্টার সিটির একটি প্রশিক্ষণ দল এসে তাদের ফুটবলের প্রশিক্ষণও দিয়েছে।

তাদের ওই উদ্ধার অভিযানের ওপর ভিত্তি করে অন্তত তিনটি চলচ্চিত্রের কাজ শুরু হয়েছে। 'দি কেভ' নামের প্রথম চলচ্চিত্রটির চিত্র ধারণের কাজ শেষ হয়েছে। ভার্ন এবং অন্য ডুবুরিরা আশা করছেন, গুহা এবং জাদুঘরটির মাধ্যমে আশেপাশের ভূচিত্রের নানা অনুষঙ্গ সম্পর্কে মানুষকে জানানো হবে।

মায়ে সাইয়ের শীর্ষ কর্মকর্তা সোমসাক কানাখাম মনে করেন, গুহাটি কেন্দ্র করে এই এলাকায় অতিরিক্ত আয় এবং ব্যবসার সুযোগে দরিদ্র মানুষজন উপকৃত হবে।

তবে তিনি খানিকটা উদ্বিগ্নতাও বোধ করেন এই কারণে যে, অতিরিক্ত মানুষজন এবং গাড়ির চাপ সামলাতে এখানকার অবকাঠামোর উন্নয়ন করারও জরুরি।

এখন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসাবে তিনি ভাবছেন যে, কিভাবে আশেপাশের অন্য আকর্ষণীয় জায়গাগুলোকে পর্যটকদের কাছে তুলে ধরা যায়। কারণ একসময়ে হয়তো উদ্ধার অভিযানের এই আকর্ষণ ফিকে হয়ে আসতে শুরু করবে এবং হয়তো তখন পর্যটকদের সংখ্যাও কমে যেতে শুরু করবে।

আপনার ডিভাইস মিডিয়া প্লেব্যাক সমর্থন করে না
গুহা থেকে উদ্ধারের সময় অজ্ঞান করা হয়েছিলো থাই কিশোরদের?

সম্পর্কিত বিষয়