সংসদ নির্বাচন: চট্টগ্রামের যে সেতু ধরে ভোটারদের সাথে সেতু গড়ার চেষ্টায় প্রার্থীরা

  • ফয়সাল তিতুমীর
  • বিবিসি বাংলা
চট্টগ্রাম কালুরঘাট সেতুর ভগ্নদশা।
ছবির ক্যাপশান,

চট্টগ্রাম কালুরঘাট সেতুর ভগ্নদশা।

বোয়ালখালী-চাঁন্দগাও মিলে চট্টগ্রাম-৮ আসন। আর এই আসনে ভোটের হিসেব-নিকেশ সম্ভবত অনেকটাই নির্ভর করছে একটি মাত্র সেতুকে ঘিরে - অন্তত এলাকার লোকজন এমনটাই মনে করেন।

কালুরঘাট সেতু - এর উপর দিয়ে হাঁটতে হয় খুব সাবধানে। সংকীর্ণ এই সেতুতে একটা প্রাইভেট কার বা ট্রাক ঢুকলে পাশ দিয়ে মানুষ চলাই দায় বলে এলাকাবাসীর অভিযোগ।

আমাদের পাশ দিয়ে যাওয়া একটা সিএনজি অটোরিকশা থেকে হঠাৎই একটি কয়েন ঝনঝন করে সেতুতে পড়ে।

আমি সেটা তুলে নিয়ে ফেরত দিতেই পয়সার মালিক অনুরোধ করলেন আমি যেন সেটা নদীতে ছুঁড়ে দিই।

যে কর্ণফুলীর প্রতি এই এলাকার মানুষের এত অগাধ ভক্তি আর ভালোবাসা, আজ সেই কর্ণফুলীই যেন তাদের জন্য অনেকটা কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে । কারণ এই নদী পারাপারের ব্রিজটি ঘিরে মানুষের দুর্দশার শেষ নেই।

আরও পড়তে পারেন:

ছবির ক্যাপশান,

যেকোন সময় বড় ধরণের দুর্ঘটনার ঝুঁকিতে রয়েছে সেতুটি।

চট্টগ্রামে-৮ আসনে মোট ভোটার চার লাখ ৭৫ হাজার ৯৮৮। এর মধ্যে বোয়ালখালী উপজেলায় ১ লাখ ৬৪ হাজার, যেটি কর্ণফুলীর নদীর অপরপাড়ে।

আর এইসব ভোটারের চট্টগ্রামের সাথে যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম এই কালুরঘাট রেলসেতু।

চট্টগ্রাম নগরীর ১০ কিলোমিটারের মধ্যেই বোয়ালখালী। কিন্তু সেতুটি একমুখী হওয়ায় ৪০ মিনিটের এই রাস্তা পাড়ি দিতে এই এলাকার মানুষদের কখনো কখনো ঘণ্টা তিনেকও লেগে যায়।

তাই এখানে নতুন একটি সেতু নির্মাণের দাবী দীর্ঘদিনের। প্রস্তাব-প্রতিশ্রুতিও দেয়া হয়েছে অনেক।

কিন্তু এবার একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ভোটাররা এমন প্রতিশ্রুতি শুনতে চাইছেন যে এটি বাস্তবায়ন করা হবে।

ছবির ক্যাপশান,

সংকীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ এই সেতুতেই চলাচল করতে হচ্ছে অসংখ্য মানুষকে।

তাই ভোটের আগে তাঁরা যেমন হিসেব কষছেন সেতু নির্মাণের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন কে করবেন সেটার, তেমনি প্রার্থীদেরও প্রতিশ্রুতি একটাই - নির্বাচিত হলে প্রথম কাজ নতুন সেতু নির্মাণ।

এই আসনে প্রার্থী মোট নয় জন। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোট থেকে মইনউদ্দিন খান বাদল ২০০৮ সাল থেকেই এই এলাকার নির্বাচিত সাংসদ। বিএনপি থেকে প্রার্থী হয়েছেন আবু সুফিয়ান।

এছাড়া ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্টের এস এম ইকবাল হোসেন, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির বাপন দাশ গুপ্ত, ইসলামী আন্দোলনের ডা. মো: ফরিদ খাঁন, কমিউনিস্ট পার্টির সেহাব উদ্দীন, ইসলামী ফ্রন্টের শেহাব উদ্দিন মুহাম্মদ আবদুস সামাদ নির্বাচন করছেন। স্বতন্ত্র প্রার্থী দুজন হলেন এমদাদুল হক ও হাসান মাহমুদ চৌধুরী।

নির্বাচন ঘিরে যেমন নতুন করে আশায় বুক বাঁধছেন অনেকে, তেমনি অনেক ভোটারেরই ক্ষোভ-হতাশার অন্ত নেই।

এমন একজন মোহাম্মদ মিজান। গাড়ির অপেক্ষায় না থেকে হেঁটেই সেতু পার হয়ে এপারে আসছিলেন তিনি।

"আমাদের মেইন হল সেতু। আর কিছু না, আমাদের টাকা দেয়ার জন্য বলছি না, শুধু সেতুটা দেয়ার জন্য বলছি" - পরিস্কার করেই বললেন তিনি।

ছবির ক্যাপশান,

দিনে চারবার সেতুটির উপর দিয়ে যাত্রীবাহী ও মালবাহী ট্রেন চলাচল করে। তখন সব ধরণের অন্য যান চলাচল বন্ধ থাকে।

দিনে চারবার যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল করে এর উপর দিয়ে। এছাড়া মালবাহী ট্রেন তো আছেই। ট্রেন চলার সময় অন্য সব ধরণের যান চলাচল বন্ধ থাকে এখানে। বাকি সময়টা গাড়ির চাপ বুঝে যেকোন একপাশ থেকে খোলা রাখা হয়।

এ কাজে ইজারাদারদের সহায়তা করেন দুপাশে থাকা রেলওয়ের গেটম্যানরাই।

"কখনো ১৫ মিনিট পরপর গাড়ি ছাড়া হয়, আবার কখনো একপাশে এক-দেড়ঘণ্টাও বন্ধ থাকে," জানাচ্ছিলেন ইজারাদার তারেক।

তিনি বলেন, "শুক্রবারে তো গজব পড়ে যায়। হাজার হাজার মানুষ আর গাড়ি আসে। যানজটে এই ব্রিজের উপরও নামাজ পড়তে হয়।"

আর রেলওয়ের গেটম্যান মাহফুজ বললেন, ছোটখাট দুর্ঘটনা ঘটে প্রায়ই।

আমাদের চোখের সামনেই এক বাইক রেলে স্লিপ করে নিয়ন্ত্রণ হারালো। তাকে তুলতে সাহায্য করবার পর মাহফুজ বললেন এমনটা অহরহ ঘটে। প্রায়ই পথচারীর পায়ের উপর উঠে যায় গাড়ির চাকা।

সকালে বেশিরভাগে চাকুরীজীবী আর শিক্ষার্থীদের ভিড় সেতুর দুপাশে।

ছবির ক্যাপশান,

সেতুটির বিভিন্ন স্থানে বড় ধরণের ফাটল দেখা যায়।

যাদের গাড়ি মিলছে ও সময়মতো ছাড়ছে তারা সেটাকে কপাল বলে মনে করছেন। আর পথচারীর চলাচল নিষিদ্ধ হলেও এক রকম ছুটতে ছুটতেই ৮৬০ মিটার দীর্ঘ এই সেতুটি পাড়ি দিচ্ছেন অনেকে।

মেডিকেলের শিক্ষার্থী মাহিনও ছুটছিলেন। একটু থেমে বললেন, "এটা কখন পড়ে যাবে কেউ বলতে পারে না। দেখতে পারেন, ভেঙে গেছে অনেক জায়গায়। তারপরও আমাদের কোন উপায় নেই।"

এদের প্রত্যেককেই হাতে অতিরিক্ত সময় নিয়ে বের হতে হন। কিন্তু অসুস্থ বা জরুরী সেবার ক্ষেত্রে দুর্দশার সীমা থাকে না।

সেতুর দাবী নিয়ে আন্দোলন করতে করতেই স্থানীয়দের নিয়ে গড়ে উঠেছে বোয়ালখালী কালুরঘাট সেতু বাস্তবায়ন কমিটি।

মানববন্ধন, সমাবেশের পাশাপাশি এখানে সার্ভেও করেছেন তারা।

চট্টগ্রাম ইউনিভার্সিটি অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি (চুয়েট)-এর এক গবেষণায় উঠে আসে ১৯৩০ সালে ব্রিটিশদের হাতে নির্মিত এই ব্রিজটি মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে গেছে আরো ৩০ বছর আগেই।

বোয়ালখালীর মানুষ যেমন চট্টগ্রাম যেতে এই সেতুর ওপর নির্ভরশীল, তেমনি চাঁন্দগাঁও আর চট্টগ্রাম শহরের অন্য এলাকার লোকজনকে নদীর অপরপাড়ে কাজেকর্মে যেতে এই সেতু পার হতে হয়।

"পুরো চট্টগ্রামেই এটা সবচেয়ে বড় নির্বাচনী ইস্যু," বলছিলেন এই আন্দোলন কমিটির সদস্য সচিব রমেন দাশগুপ্ত।

তিনি বলেন, "একটা নতুন সেতু হলে, আর ওপাশে যদি রাস্তা নির্মাণ হয় বান্দরবান পর্যন্ত, তাহলে পুরো দক্ষিণ চট্টগ্রামের চেহারাই পাল্টে যাবে। বোয়ালখালীতে প্রচুর মিল-ফ্যাক্টরি থাকায় শুধু যাতায়াত নয়, এর অর্থনৈতিক গুরুত্ব অনেক।"

চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত রেল প্রকল্প গৃহীত হওয়ায় এই সেতুটি এখন অনিবার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করছেন তিনি।

ছবির ক্যাপশান,

সেতুটির মেয়াদ চলে গিয়েছে ৩০ বছর আগেই।

তাই এটার দ্রুত বাস্তবায়ন চান বোয়ালখালীর মানুষ। নতুন ভোটার জাহিদুল ইসলাম বলছিলেন, সব দল একতাবদ্ধ হলেই কেবল ব্রিজটা পাওয়া সম্ভব।

১৯৯১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত আসনটি ছিল বিএনপির নিয়ন্ত্রণে। এই আসন থেকে নির্বাচিত হয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রীও হন মোর্শেদ খান।

২০০৮ সালে জাসদের মইন উদ্দীন খান বাদল এখানে বিএনপির কর্তৃত্বের অবসান ঘটান। ২০১৪ সালেও মহাজোটের প্রার্থী হিসেবে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন।

তবে সেতুর বিষয়টি দু'বার একনেকে উঠলেও শেষ পর্যন্ত আর আলোর মুখ দেখেনি।