নির্বাচনের পর দেশ কি 'হতাশ গোষ্ঠীর' খপ্পরে?

রোকেয়া লিটা ছবির কপিরাইট রোকেয়া লিটা

বাংলাদেশে এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে অনেকেরই অনেক অভিযোগ ছিল। বরাবরের মতোই ফেসবুকে কেউ কেউ এই নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ এনে ভীষণ সোচ্চার ছিলেন, আবার অনেকেই বিরোধী মন্তব্যগুলোর জবাব দিয়ে নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে দাবি করে সরকারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।

এই দুই গোষ্ঠীর বাইরেও একটি গোষ্ঠী আছে। আমি তাদেরকে বলি 'হতাশ গোষ্ঠী'। তবে শুরুতেই বলা দরকার কেন তারা হতাশ গোষ্ঠী।

আমি তাদের কয়েকজনের সাথে কথা বলে দেখলাম, জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে তাদের মধ্যে কোন আশা-ভরসা নেই।

কে সরকার গঠন করল আর কে সরকার গঠন করল না, বিরোধী দল থাকল কি থাকল না, সেই বিরোধী দলের আদৌ কোন ক্ষমতা আছে নাকি নাম মাত্রই বিরোধীদল, এসব নিয়ে তাদের কোন মাথা ব্যথা নেই।

বিষয়টি এমন নয় যে, এই বিষয়গুলো তাদের কখনও ভাবায়নি। এই হতাশ গোষ্ঠী বিষয়গুলো নিয়ে চিন্তা করতে করতে এখন হাল ছেড়ে দিয়েছে।

তাদের মতে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো সবসময় একই ফর্মুলা অনুসরণ করছে । একবার ক্ষমতায় এলে কীভাবে ক্ষমতায় থেকে যাওয়া যায় তার ফর্মুলা মোটামুটি একই রকম।

বিরোধী দলে থাকলে তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকার চায়, ক্ষমতায় থাকলে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন দেয় এবং এসব নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগও সেই পুরনো ঘটনা।

ছবির কপিরাইট MUNIR UZ ZAMAN
Image caption নির্বাচনে বিজয়ী: ঢাকায় আওয়ামী লীগ সমর্থক বিজয় সমাবেশে যোগ দিতে যাচ্ছেন।

কাজেই, আজকে যদি আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ থেকে থাকে, তো তারা নিশ্চিত যে বিএনপি ক্ষমতায় এলেও একইভাবে ক্ষমতায় থেকে যাওয়ার চেষ্টা চালাবে, একই রকম দুর্নীতি ও লুটপাটের অভিযোগ তাদের বিরুদ্ধেও পাওয়া যাবে।

কোন পরিবর্তন হবে না। কাজেই এসব নিয়ে ভেবে আর সময় নষ্ট করতে চায় না হতাশ গোষ্ঠী। তাদের মতে, যে কোন একটি দল ক্ষমতায় থাকলেই হল।

কিন্তু বিরোধী দল? বিরোধী দলের প্রশ্নেও হতাশ গোষ্ঠী একই রকম নির্বিকার। তবে, বিরোধীদলের ব্যাপারটা এখন আর আগের ফর্মুলায় নেই।

আগে টেলিভিশনে দেখা যেত, সংসদে বিরোধীদল ওয়াক-আউট করছে, তর্ক-বিতর্ক হচ্ছে, এখন আর সেসব দেখা যায় না। দেশে কার্যত কোন বিরোধীদল নেই।

গত সরকারের আমলেও যারা বিরোধী দলের ভূমিকায় থেকেছে তারা আদৌ সত্যিকারের বিরোধীদল কি না তা নিয়ে সাধারণ মানুষ সবসময়ই দ্বিধাগ্রস্ত ছিল। এবারের চিত্র তো আরও পরিষ্কার।

মুশকিল হলো, এই হতাশ গোষ্ঠী ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না, সংসদে নামমাত্র বিরোধী দল বা শক্তিশালী বিরোধীদল থাকা না থাকায় তাদের আদৌ কিছু যায় আসে কি না। এটা নিয়ে তাদের উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত কিনা।

বিষয়টা বোঝার জন্য চলুন, ছোট্ট একটা উদাহরণ বিশ্লেষণ করি।

ছবির কপিরাইট MUNIR UZ ZAMAN
Image caption কারচুপির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ: ঢাকায় বামপন্থী নেতা-কর্মীরা নির্বাচনকে প্রত্যাখ্যান করে বিক্ষোভ করে।

একসময় দেশে অ্যাপ ভিত্তিক পরিবহন ব্যবস্থা উবার ছিল না, পাঠাও ছিল না, ওভাইও ছিল না। তখন সিএনজি চালিত অটোরিকশার বেশ দাপট ছিল। দুশো টাকার ভাড়া তারা চারশো টাকা চেয়ে বসতো। উপায় না দেখে, মানুষ চারশো টাকা খরচ করেই সিএনজি অটোরিকশায় চেপে বসতো।

কিন্তু উবার বা পাঠাও আসার পরে সিএনজি অটোরিকশা এখন আর আগের মতো স্বেচ্ছাচারিতা করতে পারছে না। যাত্রী না পেয়ে, তারাও এখন নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে অ্যাপের মাধ্যমে চলাচল করতে চাইছে।

গণতন্ত্রের বিষয়টাও কিন্তু একই রকম। শক্তিশালী বিরোধীদল না থাকলে সরকারি দল যা ইচ্ছে তাই করার সাহস পায়, কারণ, তাদের সমালোচনা করার বা বিপক্ষে অবস্থান নেয়ার কেউ থাকে না।

ব্রিটিশ পার্লামেন্টের কথাই ধরা যাক না কেন।

এই তো কদিন আগেই ব্রিটিশ পার্লামেন্টে ২৩০ ভোটের বিশাল ব্যবধানে প্রধানমন্ত্রী টেরিজা মে'র ব্রেক্সিট চুক্তি নাকচ হয়ে গেল।

এই চুক্তির বিরুদ্ধে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা তো ভোট দিয়েছেনই, এমন কি প্রধানমন্ত্রী টেরিজা মে'র নিজের দল কনজারভেটিভ পার্টিরও ১১৮ জন এমপি এই চুক্তির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন।

শক্তিশালী বিরোধীদল বা বিরোধিতাকারী আছে বলেই কিন্তু প্রধানমন্ত্রী টেরিজা মে যা চাচ্ছিলেন তা করতে পারলেন না।

এবার বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের দিকে তাকাই।

ছবির কপিরাইট DANIEL LEAL-OLIVAS
Image caption ব্রেক্সিটের পথে?: ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টেরিজা মে পার্লামেন্ট যাবার জন্য গাড়িতে উঠছেন।

গতবারের সংসদে বেশ কিছু বিতর্কিত আইন পাশ হয়েছে, তার মধ্যে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন অন্যতম। সংসদের বাইরে এই আইনের বিরুদ্ধে অনেক সমালোচনা হলেও সংসদে এই আইনের বিরোধিতাকারী তেমন কেউ ছিল না বললেই চলে।

গত সংসদে নামমাত্র একটি বিরোধী দল ছিল বটে, কিন্তু তাদেরকে এসব বিষয়ে মাথা ঘামাতে বা সরকারের কোন কার্যকলাপের বিরোধিতা করতে খুব একটা দেখা যায়নি। সংসদ মূলত প্রাণহীন একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছিল।

কেননা, মন্ত্রীসভায় সরকারী দল যা করার সিদ্ধান্ত নিচ্ছিল তা নির্বিঘ্নে সংসদে পাশ হয়ে যাচ্ছিল। মন্ত্রী সভায় যা সিদ্ধান্ত হচ্ছে সংসদে গিয়ে তা পাশ নাও হতে পারে এমন আশংকা কারও মনেই ছিল না।

ওদিকে, সংসদে এমপিদের অনুপস্থিতিও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে ঘটেছে যার ফলশ্রুতিতে সংসদে কোরাম সংকট ঘটেছে।

বেসরকারি সংস্থা ট্রান্সপ্যারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে দশম সংসদের ১৪তম থেকে ১৮তম অধিবেশনে প্রতি কার্যদিবসে গড়ে ৩০ মিনিট করে কোরাম সংকটের কারণে অপচয় হয়েছে যার অর্থমূল্য ১২৫ কোটি টাকা।

সংসদে ন্যুনতম ৬০ জন সদস্য উপস্থিত না থাকলে এই কোরাম সংকট ঘটে থাকে। আর এটা হওয়াই তো স্বাভাবিক। কেননা, এমপিরা সংসদে না গেলে তো কোন কিছু আটকে থাকছে না, সরকারী দল এতটাই সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে যে বিনা বিরোধিতায় সব বিল পাশ হয়ে যাচ্ছে।

ছবির কপিরাইট MUNIR UZ ZAMAN
Image caption জাতীয় সংসদ ভবন: নিয়মিত কোরাম সংকটে কাজ ব্যাহত হয়।

আর ওদিকে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের দিকে তাকান, সেখানে এমপিরা সংসদে তাদের উপস্থিতিকে এতটাই গুরুত্ব দেন যে, ব্রেক্সিট ইস্যু নিয়ে ভোটাভুটিতে অংশ নেয়ার জন্য একজন এমপি গর্ভের সন্তান জন্মদানের জন্য তার সি-সেকশনের দিন পিছিয়ে দিয়েছিলেন।

তিনি সরকারী দলেরও এমপি নন, তিনি ব্রিটিশ পার্লামেন্টে বিরোধীদল লেবার পার্টির এমপি টিউলিপ সিদ্দিক।

এটাও ঠিক যে, বাংলাদেশের সংসদে বিরোধীদল বলতে আর তেমন কিছুই যে থাকছে না তার দায় এককভাবে সরকারী দলের নয়। কেননা, পরপর দুবার দলীয় সরকারের অধীনে আওয়ামী লীগ যেভাবে সংসদ নির্বাচন করল, একই চেষ্টা এর আগে বিএনপিও করেছে।

তখন কিন্তু বিরোধীদল হিসেবে আওয়ামী লীগ তা শক্তভাবে প্রতিরোধ করেছে, আর বিএনপি ঠিক সেই জায়গাতেই ব্যর্থ হয়েছে।

আরও পরিতাপের বিষয় হলো, বেশ কয়েক বছর ধরেই দেখা যাচ্ছে, ছোট-বড় দলগুলো মিলে জোট গঠন করছে, এরপর নির্বাচন হচ্ছে এবং সরকারও গঠিত হচ্ছে।

কিন্তু ছোট দলগুলো বড়দের সাথে এমনভাবে মিশে যাচ্ছে যেন তাদের আর আলাদা কোনো নীতি নেই, যেই দলের সাথে জোট করছে সেই দল যা করছে তাতেই তাদের অকুণ্ঠ সমর্থন।

ছোট ছোট দলগুলো জোটবদ্ধ হতে গিয়ে নিজেদের স্বকীয়তা হারাচ্ছে। ফলে বড় দলগুলো সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হয়ে উঠছে। এটা নিঃসন্দেহে গণতন্ত্রের জন্য অশনি সংকেত।

গণতন্ত্র ছেলের হাতের মোয়া নয় যে, কেউ আপনার হাতে তুলে দেবে। গণতন্ত্র অর্জন করতে হবে এবং তা ধরে রাখার জন্য লড়াইটা চালিয়ে যেতে হবে।