বাংলাদেশে সরকারি কর্মকর্তারা সরকারি ইমেইল ব্যবহার করছেন না কেন?

ইন্টারনেট ছবির কপিরাইট EPA
Image caption "ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়লেও, বাড়েনি সচেতনতা"

বাংলাদেশে সরকারি কাজের গোপনীয়তা রক্ষা ও সাইবার নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে সকল সরকারি দাপ্তরিক কাজে gov.bd ডোমেইন যুক্ত ইমেইল ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হলেও সেই নির্দেশনা মানছেন না বেশিরভাগ সরকারি কর্মকর্তা।

অথচ গত বছরের এপ্রিলে সরকারি কাজে জি মেইল, ইয়াহুসহ অন্যান্য ডোমেইনের ইমেইল সেবা ব্যবহার পুরোপুরি নিষিদ্ধ করেছিল সরকার।

সরকারি ডোমেইনযুক্ত ইমেইল ব্যবহারের বিষয়ে মন্ত্রীসভায় একটি খসড়া নীতিমালারও অনুমোদন দেয়া হয়েছিল।

তারপরও গত সপ্তাহে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের একটি চিঠিতে নির্দিষ্ট কয়েকজন শিক্ষকের নাম ও তাদের চাকরি সংশ্লিষ্ট কিছু তথ্য চাওয়া হয় এবং তথ্য পাঠানোর জন্য সেখানে দেয়া হয় একটি ব্যক্তিগত জিমেইল অ্যাকাউন্ট।

Image caption সরকারি দফতরে তথ্য পাঠাতে দেয়া হয়েছে জিমেইল অ্যাকাউন্ট

আরও পড়তে পারেন:

ফেসবুকে অ্যাপ ব্যবহার করে নিজেকে বিপদে ফেলছেন না-তো?

বিশ্বব্যাপী সাইবার হামলার একের পর এক অভিযোগ আসছে রাশিয়ার বিরুদ্ধে

যানবাহনে ইমেইল করলে ‘কাজ হিসেবে গণ্য করা উচিত’

সরকারি ইমেইল থাকা সত্ত্বেও এই ব্যক্তিগত ইমেইল ব্যবহারে সমস্যার কিছু দেখছেন না ওই চিঠিতে স্বাক্ষর করা কর্মকর্তা মোহাম্মদ আব্দুর রউফ।

বিবিসি বাংলাকে তিনি জানান, "সরকারি ওয়েবসাইটে হাজারো ডকুমেন্ট আছে। সেগুলো আরেকজনকে দিয়ে খুঁজতে হয়। যে তথ্যগুলো আমরা চাচ্ছি, সেগুলো লিক হলেও কিছু আসে যায় না। পাবলিকলি এগুলো প্রচার হলেও কোন সমস্যা নাই।"

এতে ঝুঁকির আশঙ্কা আছে?

সরকারি প্রতিটি দফতরের ওয়েবসাইটেও অধিকাংশ কর্মকর্তা কর্মচারীর ইমেইল আইডি হিসেবে তাদের ব্যক্তিগত ইমেইল অ্যাকাউন্ট দিতে দেখা যায়।

এতে যেকোনো সময় বড় ধরনের তথ্য চুরির ঘটনা ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সাইবার ক্রাইম অ্যাওয়ারনেস ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তা এবং প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ তানজিয়া খানম।

"জিমেইল, ইয়াহু এই ডোমেইনগুলো হল বিদেশি থার্ড পার্টি । তাদের ডোমেইনে আদান প্রদান করা সব ইমেইল ওদের ডাটাবেজ বা সার্ভারে জমা হয়ে যায়।এতে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ তথ্যগুলো বাইরে চলে যাচ্ছে। এতে তো ঝুঁকি থাকেই।"

"কিন্তু সবাই যদি সরকারি সার্ভার ব্যবহার করে তাহলে দেশের ভেতরেই তথ্যটা থেকে যাচ্ছে। এটা ওই জিমেইল বা ইয়াহুর চাইতে অনেক নিরাপদ।"

Image caption সরকারি দফতরের ওয়েবসাইটে অধিকাংশ কর্মকর্তা কর্মচারীদের ব্যক্তিগত ইমেইল অ্যাকাউন্ট দেয়া আছে।

এর পেছনে দায়ী কে বা কারা?

এরপরও ব্যক্তিগত ইমেইলের ব্যবহার বন্ধ না হওয়ার পেছনে সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীদের সদিচ্ছা ও সচেতনতার অভাবকে দায়ী করছেন জন প্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব ফয়েজ আহমেদ।

তিনি বলেন, "নতুন প্রযুক্তির প্রতি মানুষ এখনও অভ্যস্থ হয়ে ওঠেনি। এজন্য হয়তো সময় লাগছে। তবে সরকারি কাজে সরকারি ডোমেইনই ব্যবহার করতে হবে। তারপরও কেউ ব্যক্তিগত ইমেইল ব্যবহার করলে জন প্রশাসন মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ব্যবস্থা নেয়া হবে।"

তবে সরকারি দফতরের অনেক কর্মকর্তা জানান তারা ওই প্রজ্ঞাপনের ব্যাপারে কিছুই জানেন না। কিন্তু এভাবে কিছু জানি না বলে কেউ দায় এড়াতে পারবে না বলে সতর্ক করেছেন মিস্টার আহমেদ।

তিনি বলেন, "সচিবালয়ের নির্দেশনায় সব বলা আছে। তারপরও যারা বলবে এ বিষয়ে তারা কিছু জানেনা, তাদের ছাড় দেয়া হবে না। দায় তাদেরকে নিতেই হবে। এছাড়া সুপারভাইজিং অথরিটিও রেসপন্সিবল হবেন।"

Image caption ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলক।

কি বললেন তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী:

সরকারি এই ইমেইলের কাঠামো প্রস্তুত করেছে বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল (বিসিসি)।

এই ইমেইল কাঠামোটি জিমেইল বা ইয়াহুর মতোই যথেষ্ট দ্রুত, আধুনিক ও ইউজার ফ্রেন্ডলি বলে জানিয়েছেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলক।

তারপরও সরকারি ইমেইলের ব্যবহারকে আরও সহজ করতে কিছু পরিকল্পনা হাতে নেয়ার কথা জানান তিনি।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, " আমরা চেষ্টা করছি সরকারি সফটওয়্যারগুলো এমনভাবে ডিজাইন করতে যেন সেগুলো ইউজার ফ্রেন্ডলি হয়। সবাই যেন নিজেদের স্মার্টফোনেও এই ইমেইলের অ্যাকসেস পায়।"

এতে শিগগিরই দেশের সব সরকারি দফতরে সরকারি ডোমেইনের ইমেইল ব্যবহার শতভাগ নিশ্চিত করা যাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

ছবির কপিরাইট সংগৃহীত ছবির স্ক্রিনশট
Image caption চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যক্তিগত বিজ্ঞপ্তি পাঠাতে ব্যবহার হয়েছে সরকারি ইমেইল অ্যাকাউন্ট।

প্রজ্ঞাপনে কি বলা হয়েছিল?

সরকারি ও প্রজ্ঞাপনে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সরকারি ইমেইলের পাসওয়ার্ড অন্য কাউকে না জানানো, ছয় মাসে অন্তত একবার পাসওয়ার্ড পরিবর্তন, ইমেইলের মাধ্যমে ব্যক্তিগত, আপত্তিকর বা আক্রমণাত্মক কন্টেন্ট আদান প্রদান না করা ইত্যাদি আরও নানা বিষয়ে নির্দেশনা দেয়া হয়।

তারপরও তথ্যের এই নিরাপত্তার বিষয়টি পুরোপুরি কর্মকর্তা কর্মচারীদের সচেতনতার ওপর নির্ভর করে বলে জানিয়েছেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী মোস্তফা জব্বার।

তিনি বলেন, "তথ্যের নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ বলেই একে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। এ নিয়ে প্রযুক্তিগত ও আইনী কাঠামো রয়েছে, সেই কাঠামোয় কোন সমস্যা হলে আমরা খতিয়ে দেখবো, কিন্তু এর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে প্রশাসনকে।"