নিরাপদ সড়ক: প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন কতদূর?

সড়ক ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption ঢাকায় বাসের চাপায় দুজন স্কুল ছাত্র নিহত হবার ঘটনাকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছিল নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলন।

ঢাকার মিরপুর ১ নম্বর গোল চক্কর থেকে নীলক্ষেত পর্যন্ত রাস্তা প্রায় ১০ কিলোমিটার। ঢাকা শহরের যে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা আছে এটি তার মধ্যে অন্যতম। কিন্তু এ রাস্তার বিভিন্ন জায়গায় চরম বিশৃঙ্খলা আর নৈরাজ্য চোখে পড়ার মতো।

নীলক্ষেত যাবার উদ্দেশ্যে মিরপুর এক নম্বর গোল চক্কর থেকে একটি বাসে উঠলাম।

মিরপুর এক নম্বর গোল চক্করে বাসগুলো এলোমেলো করে রাস্তার মাঝখানেই দাঁড়ানো।

রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে একের পর এক যাত্রী তুলছে বাসগুলো।

গাদা-গাদি আর ঠাসাঠাসি অবস্থা। কিছুক্ষণ পর-পর চালক এমনভাবে ব্রেক কষছিলেন যে ভেতরে যাত্রীদের দুমড়ে-মুচড়ে যাবার মতো অবস্থা।

মিরপুর ১ নম্বর থেকে সায়েন্স ল্যাবরেটরি পর্যন্ত দূরত্বে এ বাসটি কমপক্ষে ১৮ বার বিভিন্ন স্থান থেকে যাত্রী উঠা-নামা করেছে।

শুধু প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন 'গণভবন'-এর সামনের রাস্তাটুকু ছাড়া বাকি কোথাও বাস থামিয়ে যাত্রী উঠানামা করতে দ্বিধা করেনি চালক এবং তার সহযোগী।

লক্কড়-ঝক্কর এ বাসটি চালানো দেখে মনে হয়েছে এই বুঝি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে অন্য গাড়ির উপরে উঠে যাবে।

এবার আসা যাক ফুটপাতের কথায়। ১০ কিলোমিটার এ রাস্তার পাশের ফুটপাতে অনেক জায়গায় হাঁটা দায়।

কোথাও কোথাও ফুটপাতের অস্তিত্বই নেই। অনেক জায়গায় মানুষের মল-মূত্রের কারণে ফুটপাতে হাঁটা একবারেই অসম্ভব।

আবার একটি বড় অংশ রয়েছে হকারদের দখলে। ফলে মিরপুর রোডে অধিকাংশ জায়গায় মানুষ ফুটপাত বাদ দিয়ে রাস্তার উপর দিয়ে হাঁটছে।

আরও পড়তে পারেন:

নিরাপদ সড়ক আন্দোলন: দুর্ঘটনা কমেছে না বেড়েছে?

সড়ক দুর্ঘটনা: যে কারণে ড্রাইভাররা এত বেপরোয়া

লিফট দুর্ঘটনা থেকে আতঙ্ক: আসলে কতটা উদ্বেগজনক?

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যেখানে-সেখানে রাস্তা পার হওয়া ঢাকার একটি পরিচিত দৃশ্য।

মিরপুর ১ নম্বর গোল চক্কর থেকে নীলক্ষেত পর্যন্ত ১০ কিলোমিটার রাস্তায় ১০টি ফুট ওভারব্রিজ আছে।

কিন্তু এসব ওভারব্রিজ ব্যবহার করেন না অধিকাংশ পথচারী। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যত্রতত্র রাস্তা পার হওয়া সাধারণ ঘটনা।

২০১৮ সালের আগস্ট মাসের শুরুতে নিরাপদ সড়কের দাবিতে যে ব্যাপক ছাত্র বিক্ষোভ তৈরি হয়েছিল তার ছয়মাস পরেও পরিস্থিতির কোন বদল হয়নি।

সে বিক্ষোভ শান্ত করতে সরকারের দিক থেকে নানা প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল। কিন্তু সেগুলোর অধিকাংশই বাস্তবায়ন হয়নি।

২০১৮ সালের আগস্ট মাসের মাঝামাঝি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে 'গভর্নেন্স ইনোভেশন ইউনিট'-এর সভায় সড়কে শৃঙ্খলা আনার জন্য বেশ কিছু সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

সে সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী মুখ্য সচিব নজিবুর রহমান।

সে সভায় ২০ দফা সুপারিশ করা হয়েছিল। এর মধ্য থেকে কয়েকটি সুপারিশ ছিল নিম্নরূপ

•ঢাকায় বাসচলাচলের সময় গাড়ির মূল দরজা বন্ধ রাখতে হবে

•নির্ধারিত বাস স্টপেজ ছাড়া যেখানে-সেখানে যাত্রী উঠা-নামা নিষিদ্ধ করা

•গণ-পরিবহনে দৃশ্যমান জায়গায় চালক এবং সহকারীর পরিচয় প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা

•সব মোটর সাইকেলে সর্বোচ্চ দুইজন আরোহী এবং হেলমেট পরা বাধ্যতামূলক

•ফুট ওভার ব্রিজ বা আন্ডার-পাসের আশপাশে রাস্তা পারাপার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা

•পথচারীদের চলাচলের সুবিধার জন্য ফুটপাত হকার-মুক্ত করা

•রুট পারমিট এবং ফিটনেস-বিহীন যানবাহনগুলোকে দ্রুত ধ্বংস করার সম্ভাব্যতা যাচাই

কিন্তু এসব নির্দেশনার কোন কিছুই বাস্তবায়ন হয়নি। শুধু একটি বিষয়ের ক্ষেত্রে দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে।

সেটি হচ্ছে মোটর সাইকেল আরোহীদের হেলমেট পরিধানের বিষয়টি। কিন্তু সেটি নিয়ে প্রশ্ন আছে। বিভিন্ন রাইড শেয়ারিং-এ মোটরসাইকেল আরোহীরা যে মানের হেলমেট ব্যবহার করছেন, দুর্ঘটনার সময় সেটি যাত্রীকে আদৌ সুরক্ষা দেবে কি না সেটি এক বড় প্রশ্ন।

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption পুলিশকে সহায়তা করতে গিয়ে স্কাউটরা বুঝতে পেরেছে পথচারীদের আইন মানানো বেশ কঠিন কাজ।

ছাত্র বিক্ষোভের সময় একটি বড় দাবি ছিল বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানোর কারণে কারো দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু হলে সংশ্লিষ্ট চালককে মৃত্যুদণ্ড দেবার বিধান রেখে আইন পাশ করতে হবে।

আন্দোলনের সময় সরকার তড়িঘড়ি করে সড়ক পরিবহন আইন সংসদে পাশ করার উদ্যোগ নেয় এবং পরে সেটি সংসদে পাশ হয়।

সে আইনে অবহেলা বা বেপরোয়া মোটরযান চালানোর কারণে প্রাণহানির দায়ে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড বা পাঁচ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।

ফিটনেস-বিহীন গাড়ি রাস্তায় চলাচল বন্ধ ও লাইসেন্স ছাড়া চালকরা গাড়ি চালাতে পারবেন না।

সে অবস্থার কোন পরিবর্তন হয়নি। বিভিন্ন সময় পুলিশ এবং বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) ভ্রমমাণ আদালত পরিচালনা করে।

তারা শুধু জরিমানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। ভ্রমমাণ আদালত জরিমানা করছে এবং ফিটনেস-বিহীন যানবাহন এবং লাইসেন্স-বিহীন চালক আবারো রাস্তায় ফিরে আসছে।

বিআরটিএ'র সড়ক নিরাপত্তা বিভাগের পরিচালক শেখ মাহবুব ই রাব্বানি দাবি করেন, সড়ক নিরাপত্তার বিধানের ক্ষেত্রে অগ্রগতি আছে।

তিনি বলেন, " ড্রাইভার প্রশিক্ষণ কার্যক্রম আমরা পরিচালনা করছি। পেশাদার লাইসেন্স নবায়নের ক্ষেত্রে আমরা বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছি। আমরা এরফোর্সমেন্ট কার্যক্রম জোরদার করেছি। আগে যেখানে পাঁচজন ম্যাজিস্ট্রেট ছিল, এখন আমাদের ১০জন ম্যাজিস্ট্রেট কাজ করতেছে। প্রতিদিন মোবাইল কোর্ট করতেছে। আমরা কয়েকশ ড্রাইভারকে জেলে দিয়েছি। শতশত গাড়ি ডাম্পিং স্টেশনে পাঠিয়েছি।"

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption আন্দোলনের পর শহরের বিভিন্ন রাস্তায় জেব্রাক্রসিং রং করা হয়।

পথচারীরা যাতে রাস্তা পার হবার সময় নিয়ম মেনে চলে সেজন্য শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রোভার স্কাউটরা ট্রাফিক পুলিশের সহযোগী হিসেবে কাজ করছে।

কিন্তু তাতে কোন পরিবর্তন আসেনি। বরং পথচারীরা তাদের বেপরোয়া মনোভাব বজায় রেখেই রাস্তা পার হচ্ছেন।

বাস ব্যবস্থাপনায় কোন সুশৃঙ্খলটা দেখা যাচ্ছে না। প্রচুর অভিযান চললেও পরিস্থিতির কোন উন্নতি হচ্ছে না বলে মনে করেন সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে গবেষক ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শামসুল আলম।

তিনি মনে করেন, গণ-পরিবহনে শৃঙ্খলা আনার জন্য যে ধরণের উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন সেটির কোন অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না।

অধ্যাপক আলম বলেন, "আমাদের দিক নির্দেশনার কমতি ছিল না। পুলিশেরও কিন্তু অ্যাওয়ারনেস প্রোগ্রাম-এর কমতি দেখিনি, হাজার-হাজার মামলারও কমতি দেখিনি... কিন্তু সিস্টেম কারেকশন করার জন্য যে প্রয়োজনীয় উদ্যোগগুলি ছিল, সেগুলো না হওয়ার ফলে এতো উদ্যোগের পরেও আমরা দৃশ্যমান কোন সুশৃঙ্খল পরিবেশ আমরা লক্ষ্য করছি না।"

সড়কে বিশৃঙ্খলার জন্য মোটরযান শ্রমিকদের পাশাপাশি মালিক পক্ষকেও অনেকে দায়ী করেন।

কারণ, ফিটনেস-বিহীন গাড়ি চালানো, অপ্রাপ্ত বয়স্ক এবং অদক্ষ চালক নিয়োগ এবং চুক্তি-ভিত্তিক গাড়ি চালানোকে বিশৃঙ্খলার জন্য দায়ী করা হয়।

ছাত্র বিক্ষোভের সময় মালিকদের পক্ষ থেকে কিছু প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল।

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption সরকার যখন নতুন সড়ক পরিবহন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেয় তখন শ্রমিকরা সেটির প্রতিবাদ করে।

মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সমিতির অন্যতম নেতা এনায়েত উল্লাহ বলেন, এর মধ্যে কয়েকটি বিষয় তারা বাস্তবায়ন করছেন।

এর মধ্যে অন্যতম হলো ঢাকা শহরের ভেতরে মালিকরা যাতে শ্রমিকদের মাধ্যমে চুক্তি-ভিত্তিক গাড়ি না চালায়। ফলে বিভিন্ন বাসের মধ্যে প্রতিযোগিতার বিষয়টি থাকবে না।

কিন্তু এটি বাস্তবায়ন গিয়ে মালিক-পক্ষ বিপাকে পড়েছে বলে মি: এনায়েত উল্লাহ দাবি করেন।

তিনি বলেন, মালিকরা যাতে টিকিট কাউন্টার বসিয়ে টিকিট বিক্রির মাধ্যমে বাস চালাতে পারেন সে ব্যবস্থা করা দরকার। কিন্তু টিকিট কাউন্টার দেবার মতো জায়গা নেই বলে তিনি উল্লেখ করেন।

মি: এনায়েত উল্লাহ বলেন, " আমরা সিটি কর্পোরেশনকে চিঠি দিয়েছি যে আপনারা কাউন্টার দেবার ব্যবস্থা করেন। অথবা জায়গা দিয়ে দেন মালিকরা কাউন্টার করবে। অথবা আপনারা কাউন্টার করে দেন মালিকরা ভাড়া পরিশোধ করবে।"

টিকিট বিক্রির ব্যবস্থা করে না দিলে মালিকরা আবারো চুক্তি-ভিত্তিক গাড়ি চালানোর দিকে ঝুঁকে পড়বে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

মালিক-পক্ষ স্বীকার করছে যে অধিকাংশ চালকের কোন লাইসেন্স নেই কিংবা তারা অপ্রাপ্ত বয়স্ক। কিন্তু এর কোন সমাধান-সূত্র তারা বের করতে পারছেন না।

" আমাদের দেশে এখনো ১৬ থেকে ১৮ লক্ষ চালকের অভাব। সেক্ষেত্রে মালিকদের পক্ষে ভালো-খারাপ চালক বাছাই করাও কিন্তু সমস্যা," বলেন মি: এনায়েত উল্লাহ।