২১ বছর আগে নিখোঁজ হওয়ার পর মৃত ঘোষণা করা ব্যক্তিকে খুঁজে পেল ভারতের এক পরিবার

২১ বছর আগে মারা যাওয়া বাবাকে খুঁজে পেল ছেলে ছবির কপিরাইট Ambrarish Nag Biswas
Image caption ২১ বছর আগে মারা যাওয়া বাবাকে খুঁজে পেল ছেলে

অন্যদিনের মতোই বাড়ি থেকে কাজে বেরিয়েছিলেন রাজারাম বঙ্গিরওয়ার। কিন্তু অন্যদিন যেমন কাজের শেষে বাড়ি ফেরেন, ১৯৯৮ সালের সেই সন্ধ্যেতে আর বাড়ি ফেরেন নি তিনি।

মহারাষ্ট্রের বন দপ্তরের বন রক্ষীর কাজ করতেন মি. বঙ্গিরওয়ার।

চন্দ্রপুরা জেলার কোঠারি গ্রামের বাড়িতে স্ত্রী, তিন ছেলে, বড় দাদা এবং তার পরিবার - সবাইকে ফেলে নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিলেন তিনি।

অফিস, রেলস্টেশন, হাসপাতাল - কোনও জায়গাতেই খুঁজতে বাকি রাখে নি পরিবার।

কিন্তু রাজারাম বঙ্গিরওয়ারের আর কোনো খোঁজ মেলেনি।

আইন অনুযায়ী ১২ বছর পরে সরকারিভাবে তাঁকে মৃত ধরে নেওয়া হয়েছিল।

স্ত্রীও পেতে শুরু করেছিলেন বিধবা পেনশন।

কিন্তু ২১ বছর পরে সেই 'মৃত' রাজারাম বঙ্গিরওয়ারের সঙ্গেই দেখা হয়ে গেল তার ছোট ছেলে মুকেশের।

মহারাষ্ট্রের চন্দ্রপুরা জেলা থেকে বহু দূরে, পশ্চিমবঙ্গের কাকদ্বীপ হাসপাতালে।

আপনার ডিভাইস মিডিয়া প্লেব্যাক সমর্থন করে না
এককাপ চা, একটি সমুচা, একটি সিঙ্গারা, একটি চপ- ১০ টাকায় যেভাবে দেয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

"বাবাকে জড়িয়ে ধরে খুব কেঁদেছি। এ যে কী আনন্দ, বলে বোঝাতে পারব না। যাকে ভেবেছিলাম মারা গেছে, তাকেই জড়িয়ে ধরতে পারছি!" হাসপাতালে বাবার সঙ্গে ২১ বছর পরে নাটকীয়ভাবে দেখা হওয়ার পরে বিবিসি বাংলাকে জানাচ্ছিলেন রাজারামের ছোট ছেলে মুকেশ।

মহারাষ্ট্র পুলিশের দুই সদস্য আর একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সদস্যদের সঙ্গে মুকেশ বৃহস্পতিবার সকালে দক্ষিণ ২৪ পরগণার কাকদ্বীপ হাসপাতালে যান।

তিনি বলছিলেন, "বাবার স্মৃতি আমার খুব একটা মনে ছিল না। শুধু ছবিতে দেখেছিলাম। ঘরে একটা ছবি আছে বাবার, মালা দেওয়া হয়। আর মা, বড় দাদা, জ্যাঠাদের কাছে ওর কথা শুনেছিলাম। আমরা তো ধরেই নিয়েছিলাম যে উনি আর নেই। হঠাৎ করে যে ফিরে পাব, স্বপ্নেও ভাবি নি।"

রাজারাম বঙ্গিরওয়ারকে কয়েক দিন আগে অদ্ভুতভাবে খুঁজে পাওয়া গেছে হিন্দুদের কাছে পবিত্র তীর্থক্ষেত্র গঙ্গাসাগর মেলা চত্বরে।

বিবিসি বাংলায় আরও পড়ুন:

রিজার্ভ চুরির আগে চাকরি চেয়েছিল হ্যাকাররা

নদীকে 'জীবন্ত সত্তা' ঘোষণা - এর মানে কী?

'বাইরে থেকে মার চিৎকার শুনতেছি আমরা...'

"গঙ্গাসাগর মেলায় একটা ব্যারিকেডের ধারে ঠাণ্ডায় কুঁকড়ে বসেছিলেন ওই বৃদ্ধ। গায়ে সেরকম কোনও শীত বস্ত্র নেই। আমরা চাদর-টাদর দিয়ে ঢাকা দিয়ে হাসপাতালে পৌঁছিয়ে দিই," বলছিলেন পশ্চিমবঙ্গ অ্যামেচার রেডিও অ্যাসোসিয়েশনের অম্বরীশ নাগ বিশ্বাস।

"তিনি অসংলগ্ন কথা বলছিলেন, ভাষাও বুঝতে পারছিলাম না আমরা। তারপরে হ্যাম রেডিওতে ওর গলার আওয়াজ ছড়িয়ে দিই। তারপরে জানা যায় যে তিনি মহারাষ্ট্রের মানুষ," মি. বিশ্বাস জানান।

চিকিৎসকদের মাধ্যমে রাজারাম বঙ্গিরওয়ারের কাছ থেকে যেটুকু তথ্য জানা যাচ্ছিল, তার ওপরে ভিত্তি করেই মহারাষ্ট্রে হ্যাম রেডিও অপারেটরদের মাধ্যমে খোঁজ চলতে থাকে কে এই ব্যক্তি।

শেষমেশ যখন গ্রামের নাম জানা যায়, সেখানে হাসপাতালে ভর্তি রাজারামের ছবি দেখানো হয় তার স্ত্রী, ছেলেদের।

"চাচা যখন নিখোঁজ হয়ে যান, তখন আমি ২২-২৩ বছরের। তার গলার আওয়াজ আমার মনে ছিল। প্রথমে যখন উনারা গলার আওয়াজ শোনালেন, তখনই আমার মনে হয় এটা চাচার গলা," জানাচ্ছিলেন মুকেশের সঙ্গে আসা তার চাচাতো বড়ভাই শেখর বঙ্গিরওয়ার।

তিনি বলেন, "কিন্তু ছবি দেখে চিনতেই পারি নি। আমার চাচী বলে চাচার পায়ে একটা কাটা দাগ ছিল - কিন্তু কোন পায়ে সেটা চাচীর মনে ছিল না। আর মাথায় একটা জরুলের কথাও চাচী বলে উনাদের।"

আপনার ডিভাইস মিডিয়া প্লেব্যাক সমর্থন করে না
ইলিয়াস কাঞ্চনের নি:সঙ্গ লড়াই

অম্বরীশ নাগ বিশ্বাস বলছিলেন, "যখন পরিচয় নিশ্চিত হয়, তখন ওর পরিবারের একটা ধন্দ ছিল। বাবা তো সরকারীভাবে মৃত। তিনি ফিরে এলে তার মায়ের বিধবা পেনশনের কী হবে, বাবা কোনও পেনশন পাবেন কী না। কিন্তু বন দপ্তর নিশ্চিত করেছে যে রাজারাম তার অবসর কালীন পেনশন আইন অনুযায়ীই পাবেন।"

পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পরেই পশ্চিমবঙ্গ সরকার মহারাষ্ট্র প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করে।

বৃহস্পতিবার সকালে সরকারী খাতায় 'মৃত' রাজারাম বঙ্গিরওয়ারকে ফিরে পেলেন তার ছেলে মুকেশ।

মুকেশ জানাচ্ছিলেন, "কীভাবে বাবা হারিয়ে গিয়েছিল, এত বছর কোথায় ছিল - সেটা এখনও জানি না।"

"ডাক্তাররা সেইসব জানতে চেয়ে উনাকে বেশি মানসিক চাপ দিতে মানা করেছেন। সেসব জানতেও চাই না। এখন শুধু অপেক্ষা করছি ২ তারিখ কখন ট্রেনে উঠব আর গ্রামে ফিরব, তার জন্যই।"

সম্পর্কিত বিষয়