অভিযোগ জানা নেই, তবুও হাইকোর্টে জামিনের জন্য অসংখ্য মানুষের ভিড়

হাইকোর্ট ছবির কপিরাইট বিবিসি বাংলা
Image caption হাইকোর্ট থেকে জামিন নিতে আসা তিন ব্যক্তি।

বাংলাদেশের ঢাকায় প্রায় সপ্তাহ-খানেক ধরেই হাইকোর্ট প্রাঙ্গণে অন্যরকম একটি পরিবেশ। জামিনের জন্য শত-শত মানুষ আদালত প্রাঙ্গণে বসে আছেন। এরা এসেছেন দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে দলবদ্ধভাবে।

সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত এরা আদালত প্রাঙ্গণে বসে অপেক্ষা করছেন। দিন শেষে ফিরে যাচ্ছেন, পরেরদিন আবার আসছেন।

এদের একজন মো: মিলন মিয়া গত পাঁচদিন ধরে হাইকোর্ট প্রাঙ্গণে আসা-যাওয়ার মধ্যে আছেন। ৫৫ বছর বয়সী মিলন মিয়ার বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার মজলিসপুর ইউনিয়নের আনন্দপুর।

নির্বাচনের কয়েকদিন আগে একটি মামলায় তিনি অভিযুক্ত। তবে তাঁর বিরুদ্ধে কী অভিযোগ - সেটি সুস্পষ্টভাবে বলতে পারছেন না তিনি।

এ মামলায় মোট ২৪জনকে আসামী করা হয়েছে।

পেশায় বর্গাচাষী মিলন মিয়া এখনো পর্যন্ত মামলার জামিনের জন্য ঢাকায় আসা-যাওয়া বাবদ আট হাজার টাকা খরচ করেছেন তিনি। বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে ধার করে এই টাকার জোগান দিয়েছেন তিনি।

বিবিসি বাংলায় আরও পড়ুন:

রিজার্ভ চুরির আগে চাকরি চেয়েছিল হ্যাকাররা

নদীকে 'জীবন্ত সত্তা' ঘোষণা - এর মানে কী?

'বাইরে থেকে মার চিৎকার শুনতেছি আমরা...'

এই মামলায় অভিযুক্ত আরেকজন জানালেন, তাদের বিরুদ্ধে বোমাবাজির অভিযোগ আনা হয়েছে।

হাইকোর্ট প্রাঙ্গণে আরেকটি দলের সাথে দেখা হলো যারা ঝিনাইদহের কোর্ট চাঁদপুর থেকে এসেছেন হাইকোর্টে আগাম জামিনের জন্য। কথা বলছিলাম সে দলের একজন বৃদ্ধের সাথে যার বয়স প্রায় ৭০ বছর।

তিনি নিজের নাম প্রকাশ করতে চাইলেন না। তাঁর ধারণা মামলা নিয়ে সংবাদমাধ্যমে সাথে কথা বললে আরো মামলা হবে।

"আমি ওসব বুঝিনা রাজনীতি। আমি পাঁচ ওয়াক্ত আল্লাহু আকবর বলে নামাজ পড়ি। আমার কোন দল-ফল নেই। আমি কিছু বুঝিনা," বলছিলেন সে বৃদ্ধ।

আওয়ামী লীগের অফিস পোড়ানোর অভিযোগে যে মামলা দায়ের করা হয়েছে সেখানে তিনি অন্যতম অভিযুক্ত।

Image caption মো: মিলন মিয়া গত পাঁচদিন ধরে হাইকোর্ট প্রাঙ্গণে আসা-যাওয়ার মধ্যে আছেন

বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা বলেছে, বাংলাদেশে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে দেশের বিভিন্ন জায়গায় বহু মামলা হয়েছে, যেখানে গণহারে অনেক মানুষকে আসামী করা হয়েছে।

হাইকোর্ট যারা জামিনের জন্য এসেছেন তাদের অনেকেই বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতির সাথে জড়িত।

অনেকে আছেন যারা রাজনীতির সাথে জড়িত না হলেও বিএনপি-জামায়াতে ইসলামির প্রতি পরোক্ষ সমর্থন রয়েছে।

আবার এদের মধ্যে অনেকে আছেন যারা কোন রাজনীতির সাথে জড়িত নয়।

সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, পঙ্গু কিংবা শারীরিকভাবে অসমর্থ ব্যক্তির বিরুদ্ধে পুলিশের উপর হামলা কিংবা নাশকতার মামলা দায়ের করা হয়েছে।

আপনার ডিভাইস মিডিয়া প্লেব্যাক সমর্থন করে না
ইলিয়াস কাঞ্চনের নি:সঙ্গ লড়াই

ভুয়া মামলায় ক্ষতিপূরণ চাওয়ার ব্যবস্থা আছে?

বাংলাদেশের ফৌজদারি আইনে বলা আছে, কোন ব্যক্তিকে যদি মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করা হয়, তাহলে তিনি আদালতে সেটির প্রতিকার চাইতে পারবেন।

তবে আদালতে নির্দোষ প্রমাণিত হবার পর সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি ক্ষতিপূরণের মামলা দায়ের করতে পারবেন। এমটাই বলছেন সুপ্রিম কোর্টে আইনজীবী মনজিল মোরশেদ।

"সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি দুই ধরণের মামলা করতে পারবেন। একটি হলো ফৌজদারি আইনে মানহানির মামলা, আরেকটি হলো ক্ষতিপূরণ চেয়ে তিনি মামলা করতে পারবেন," বলছিলেন মি: মোরশেদ।

তবে এ ধরণের মামলার নজীর বাংলাদেশে বেশ বিরল। এর একটি কারণ হচ্ছে বিচারের ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রিতা।

Image caption মনজিল মোরশেদ

"যখন সে একটি মামলায় খালাস পায়, এটি হয়তো পাঁচ-দশ বছর লেগে যায়। তখন তাঁর আর স্পিরিট থাকেনা আবার গিয়ে পাঁচ-দশ বছর আরেকটি মামলার মধ্যে ঢুকে যাওয়া," বলছিলেন মি: মোরশেদ।

যখন একটি মামলায় যখন কয়েকশ ব্যক্তিকে আসামী করা, তখন সবার যে বিচার হবে এমন কোন কথা নেই।

পুলিশ যখন মামলার চার্জশীট দেয় তখন সেখানে অনেককে বাদ দেয়া হয়। কারণ কয়েকশ ব্যক্তিকে আসামী করতে হলে সবার নাম, ঠিকানা জোগাড় করে মামলার বিবরণে উল্লেখ করতে হবে। এটি বেশ কষ্টসাধ্য ব্যাপার।

ছবির কপিরাইট রাকিব হাসনাত
Image caption বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্ট

যখন আদালতে চার্জ গঠন করা হয় তখন অভিযুক্তের সংখ্যা আরো কমে যায়।

এভাবে দুটি ধাপে অভিযুক্তের সংখ্যা কমে আসে।

" এসব মামলার আল্টিমেট সমাপ্তি হয় বলে আমার ধারণা নাই। অনেক সময় দেখা যায় যে তদন্ত রিপোর্ট দুই বছরেও দিচ্ছে না। এক পর্যায়ে পুলিশ হয়তো এ ব্যাপারে কোন ইন্টারেস্ট দেখায় না," বলছিলেন আইনজীবী মনজিল মোরশেদ।

সম্পর্কিত বিষয়