ইটের বিকল্প হিসেবে ব্লক কতটা কার্যকর হবে?

প্রচলিত পন্থায় ইটভাটায় তৈরি পোড়া ইটের উৎপাদন ও ব্যবহারের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরেই সোচ্চার পরিবেশ বিষয়ক সংগঠন ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption প্রচলিত পন্থায় ইটভাটায় তৈরি পোড়া ইটের উৎপাদন ও ব্যবহারের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরেই সোচ্চার পরিবেশ বিষয়ক সংগঠনগুলো

বাংলাদেশে একাদশ জাতীয় সংসদের যাত্রা শুরুর পর প্রথম বিল উত্থাপিত হয়েছে রোববার।

'ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ)(সংশোধন) আইন, ২০১৯ শীর্ষক বিল-২০১৩' সংসদে উত্থাপন করেছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রী মো. শাহাব উদ্দিন।

পরে বিলটি পরীক্ষা করে পনের দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটিতে পাঠানো হয়।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু বিষয়ক মন্ত্রী মো: শাহাব উদ্দিন বিবিসি বাংলাকে বলেছেন বিলটি তাদের মূল উদ্দেশ্য ইটভাটা জনিত বায়ু দূষণ বন্ধ করা।

"এই যে ঢাকা শহরের বায়ু দূষণের প্রধান কারণই হলো বিপুল পরিমাণ ইট ভাটায় কাঠ ও কয়লার ব্যবহার। এ বিষয়টি আমরা বন্ধ করতে চাই। ব্লক বা অটো ব্রিকস ব্যবহার বাড়লে দূষণ বহুলাংশে কমে যাবে"।

তিনি বলেন, ইট তৈরি করা যাবে কিন্তু সেটি করতে হবে পরিবেশ বান্ধব মেশিনে যাতে করে ধোঁয়া উদগিরণ হয়ে বায়ু দূষণ করতে না পারে।

কিন্তু ব্লক তৈরিতে সিমেন্ট ব্যবহার বাড়বে যা থেকে দূষণ বাড়ার আশঙ্কা আছে। সেটি কিভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে এমন প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন যেই মাত্রায় ব্যবহার করলে পরিবেশ দূষণ হবেনা সেটি নিশ্চিত করে ব্লক তৈরির অনুমতি পাবে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো।

বাংলাদেশে পরিবেশবান্ধব ইট তৈরিতে বাধা কোথায়?

জলবায়ু পরিবর্তনে যেভাবে ভূমিকা রাখছে সিমেন্ট

ইটভাটাগুলোয় এত শিশুকিশোর কাজ করছে কেন?

সংসদে উত্থাপিত বিলে কী বলা হয়েছে?

সংসদে উত্থাপিত বিলের উদ্দেশ্য ও কারন সম্বলিত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি পরিবেশ ও জীব বৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও উন্নয়নের স্বার্থে ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপনের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপের লক্ষ্যে ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১৩ জারি করা হয় যেটি ২০১৪ সালের পহেলা জুলাই থেকে কার্যকর হয়েছে।

আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে ইটভাটা নির্মাণ এবং বিদ্যমান ইট ভাটাসমূহ আধুনিক প্রযুক্তিতে রূপান্তরের লক্ষ্যে আইনটি প্রণয়ন করা হয়েছে।

কিন্তু আইনের কিছু ধারায় কিছু বিধি-নিষেধ ও শর্ত থাকায় আইনটি প্রয়োগে সমস্যা দেখা দিয়েছে।

এছাড়া দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত কল্পে ফসলী জমির মাটি ব্যবহার বন্ধের লক্ষ্যে ইটের বিকল্প হিসেবে ব্লক ব্যবহার উৎসাহিত করতে বর্তমান আইনের কিছু ধারায় পরিবর্তন দরকার।

এটি হলে কৃষির জন্য অত্যন্ত দরকারি টপ সয়েল রক্ষা ছাড়াও ইটভাটা জনিত পরিবেশ দূষণ কমবে।

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption পুড়িয়ে ইট তৈরির জন্য ফসলি জমির উর্বর মাটি ব্যবহার করায় ক্ষতি হয় কৃষিজমির।

কত ইটভাটা আছে দেশে - মন্ত্রী কী বলছেন?

বাংলাদেশের পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে পাওয়া তথ্য মতে, দেশে ইটভাটার সংখ্যা সাড়ে ছয় হাজারেরও বেশি।

পরিবেশ মন্ত্রী মো: শাহাব উদ্দিন বলছেন, এর বেশিরভাগই এখন উন্নত প্রযুক্তিতে ইট উৎপাদন করেন।

তার মতে, এখন আর ৩/৪শ ইটভাটা আছে যেগুলো বায়ু দূষণের জন্য দায়ী।

যদিও পরিবেশ বিষয়ক সংগঠনগুলো এ তথ্যের সাথে একমত নয়।

পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন বা পবার দাবি, ইটভাটার সংখ্যা দশ হাজারের কাছে যারা পরিবেশগত ছাড়পত্র আছে অর্ধেকেরও কম সংখ্যক ইটভাটার।

এ সংগঠনটির একটি রিপোর্ট থেকে জানা যাচ্ছে যে, তিন বছর আগেও ঢাকার বায়ুদূষণের ৫৮ শতাংশই ঘটিয়েছে আশ পাশের ইট ভাটাগুলো।

এসব ইট ভাটাগুলো বছরের পর বছর ধরে মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর বস্তুকণা ক্ষুদ্র বস্তুকণা ও ক্ষুদ্রাতি-ক্ষুদ্র বস্তুকণা বাড়াচ্ছে বাতাসে।

হাউস বিল্ডিং রিসার্চ ইন্সটিউটের কর্মকর্তারা বলছেন, ইটভাটা গুলোতে প্রতি বছর ২০ লাখ টন জ্বালানি কাঠ ও ২০ লাখ টন কয়লা পোড়ানো হয়।

তাদের হিসেবে এ থেকে বছরে গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণ হয় প্রায় নব্বই লাখ টন।

প্রতিষ্ঠানটির গবেষকরা মনে করেন, দেশে পোড়া ইটের কোনো প্রয়োজনই নেই, নদী থেকে ড্রেজিং করে যে বালু ও মাটি উত্তোলন হয় তা দিয়েই ইটের চাহিদা শতভাগ পূরণ করা সম্ভব।

ছবির কপিরাইট SHAHNAZ PARVEEN
Image caption প্রচলিত পদ্ধতির ইটভাটায় ব্যাপক বায়ুদূষণ হয়।

ইটের বদলে ব্লক - কী প্রভাব ফেলবে পরিবেশে?

প্রচলিত পন্থায় ইটভাটায় তৈরি পোড়া ইটের উৎপাদন ও ব্যবহারের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরেই সোচ্চার পরিবেশ বিষয়ক সংগঠন বেলা।

সংস্থাটির প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বিবিসি বাংলাকে বলেন, সরকারের একটি অঙ্গীকার ছিলো ২০২০ সালের মধ্যে পোড়া ইট শূণ্যের কোঠায় নামিয়ে আনা, কিন্তু সেটি সরকার পারেনি।

"ইটভাটায় কৃষিজমির উপরিভাগের উর্বর জমি ব্যবহার করা হয়। ফলে এসব ইটভাটার কারণে কৃষিজমি উর্বরতা হারাচ্ছে।"

তিনি বলেন, "আবার ইটভাটার ছাই ভস্ম ও ধোঁয়া আশেপাশের ফসল উৎপাদনের ক্ষতি করছে। তাছাড়া মানুষ হাঁপানি, চুলকানি কিংবা চোখ জ্বালাপোড়াসহ নানা সমস্যায় পড়ছে ইট পোড়ানোর কারণে"।

এসব কারণে প্রচলিত ইটভাটায় ইট তৈরির পরিবর্তে নির্মাণকাজে ব্লক ব্যবহারের উৎসাহিত করতেই বিল আনা হয়েছে বলে মনে করছেন রিজওয়ানা হাসান।

"তবে এক্ষেত্রে কাঁচামাল কি হয় - সেটি গুরুত্বপূর্ণ। সিমেন্ট ব্যবহার হলে তাতে খুব একটা লাভ হবেনা।"

"তবে আমদানিকৃত সিমেন্ট ব্যবহার করা যায় কারণ সেক্ষেত্রে সিমেন্ট অন্য দেশে উৎপাদন হবে। এছাড়া পাথর, নদীতে ড্রেজিং করে তোলা বালু বা মাটি, ককশিট-এসব কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা যায়"।

তিনি বলেন, সভ্য দেশগুলোতে নির্মাণকাজে এমন পোড়া ইট ব্যবহার করা হয়না পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েই।

Image caption বিশ্বব্যাপী নগরায়নে বড়ো ভূমিকা আছে কংক্রিটের।

রাস্তাঘাট বা বাড়ির দেয়ালে ইট দরকার আছে?

হাউজ এন্ড বিল্ডিং রিসার্চ ইন্সটিটিউটের সাবেক পরিচালক মোহাম্মদ আবু সাদেক বলছেন, রাস্তাঘাট বা ভবনের দেয়ালে পোড়া ইট ব্যবহারের আর কোনো প্রয়োজনই নেই। সব কাজই ব্লক দিয়ে করা সম্ভব।

তার মতে, ইট হলো মাটি পুড়িয়ে তৈরি করা আর আগুনে না পুড়িয়ে মাটি বালি বা সিমেন্ট বা অন্য কোনো ম্যাটারিয়াল দিয়ে হবে ব্লক। ইট তৈরির স্থান ইটভাটা আর ব্লক তৈরি হবে কারখানায়।

"হাউজ এন্ড বিল্ডিং রিসার্চ ইন্সটিটিউটে আমরা ব্লক তৈরি করেছি কাঁচামাল হিসেবে নদীর তলদেশের মাটি এবং বালু দিয়ে। সরকার যদি সিদ্ধান্ত নেয় ইট ব্যবহার কমাবো আর ব্লক বাড়াবো তাহলে নদীর তলদেশের মাটি দিয়েও সম্ভব"।

তিনি বলেন, প্রতি বছর নদীতে পলি আসে। ড্রেজিং করতে হয় প্রতিবছর। এগুলো নদীর তীরে রাখে।

"এ মাটি কাজে লাগিয়ে ব্লক তৈরি হবে। পর্যাপ্ত না হলে তখন সরকার বের করবে নদীর কোন জায়গার মাটি নেয়া যাবে আর কোন জায়গার মাটি নেয়া যাবেনা।"

"আর ব্লক করলে ইটের চেয়ে কম মাটির দরকার হবে। এখন বালু দিয়ে ইট হয়না কিন্তু তখন নদীর বালুর ব্লকই পড়ে বেশি হবে," তিনি বলেন।

তিনি বলেন, দেয়ালে ইটের বদলে অনেক বিকল্প আছে। রাস্তায় যেমন অনেক ইট লাগে কিন্তু সেটিও দরকার হবেনা।

"মাটির সাথে সিমেন্ট মিশিয়ে কমপ্যাক্ট করে আরও ভালো ও টেকসই জিনিস আমরা করা যায়।"

তিনি আরো বলেন, "কোনো উন্নত দেশেই পোড়ামাটি ব্যবহার হয়না। তাই আমরাও পারবো। আমাদের মানুষ বেশি ও কৃষিজমি কম। তাই কৃষিজমি যেনো নষ্ট না হয় সেজন্য আমাদের এ নীতিতে (পোড়া ইটের বদলে ব্লক) যাওয়া উচিত ছিলো আগে"।