হিটলারের জন্মস্থানসহ বিশ্বের বিতর্কিত কিছু ঠিকানা

হিটলারের জন্মস্থান ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption অস্ট্রিয়ার কর্তৃপক্ষ হিটলার যেখানে জন্মেছিলেন সেই স্থান ভেঙে নিশ্চিহ্ণ করে দিতে চায়

অস্ট্রিয়ার সীমান্তবর্তী শহরে প্রধান একটা সড়কের ওপর ১৫ নম্বর সলসবার্গার ভরস্টার্ড ঠিকানার এই বাড়িটা সাধারণ চোখে সাদামাটা একটা বাড়ি।

কিন্তু পাশের রাস্তায় একটা পাথরে খোদাই কথাগুলো দেখলে সে ধারণা বদলে যেতে পারে।

জার্মান ভাষায় সেখানে ফ্যাসিবাদের শিকার লাখো লাখো মানুষের উল্লেখ আছে।

এই বাড়িতে ১৮৮৯ সালে জন্মেছিলেন অ্যাডল্ফ হিটলার যদিও সেকথা স্পষ্ট করে কোথাও উল্লেখ করা নেই ।

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption ১৫ শতাব্দীর সেন্ট স্টিফেন্স গির্জা যেখানে হিটলারের আনুষ্ঠানিক ধর্ম অভিষেক হয়।

আইনি লড়াই

হিটলারের জন্মদিন উদযাপন করতে এই বাড়িতে প্রতি বছর দলে দলে ভিড় জমান নব্য-নাৎসীরা।

২০১৬ সাল থেকে এই বাড়ির মালিক অস্ট্রিয়ার সরকার। সেসময় তারা তিন লাখ ৫০ হাজার ডলার মূল্যে এই বাড়িটি কিনেছিল এবং এটি ধ্বংস করে ফেলার ঘোষণা দিয়েছিল।

কিন্তু বাড়িটির পূর্বতন মালিক সরকারের বিরুদ্ধে মামলা করেন, যে মামলার এখনও নিষ্পত্তি হয় নি। এবছরের গোড়ার দিকে আদালত সরকারকে আরও ১৭ লক্ষ ডলার দেবার নির্দেশ দিয়ে বলেছিল বাড়িটির সঙ্গে যেহেতু ইতিহাস জড়িয়ে আছে, তাই ওই বাড়ির মূল্য এখন অনেক বেড়ে গেছে এবং সেই বিবেচনায় যে দামে সরকার এটি আগে কিনেছিল তার থেকে বাড়িটির বর্তমান মূল্য ১৭ লাখ ডলার বেশি।

তবে ঐতিহাসিক হলেও বির্তকিত বাড়ি একমাত্র হিটলারের জন্মস্থানই নয়। বিশ্বে একরকম বিতর্কিত আরও কিছু স্থাপনা আছে।

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption প্রেদাপ্পিওতে মুসোলিনির সমাধিতে অভিবাদন জানাচ্ছেন চরম ডানপন্থী এক সমর্থক।

ইটালির প্রেদাপ্পিওতে বেনিতো মুসোলিনির সমাধি

অস্ট্রিয়ার ব্রনাউ আম ইন শহরে হিটলারের জন্মস্থান যেমন নব্য-নাৎসীদের জন্য পূণ্যস্থান, তেমনি ইটালির ফ্যাসিবাদী নেতা বেনিতো মুসোলিনির সমাধিও তার ভক্তদের জন্য দর্শনীয় স্থান।

মুসোলিনির জন্মস্থান ইটালির উত্তরাঞ্চলে ছোট শহর প্রেদাপ্পিওতে প্রতি বছর তিনবার ভিড় করেন হাজার হাজার মানুষ।

সেখানে সবচেয়ে বড় দ্রষ্টব্য হল সান কাসিয়ানো কবরস্থানে মুসোলিনির সমাধিটি।

তার অনুগামীরা তার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে সেখানে যান তার জন্মদিনে (২৯শে জুলাই ১৮৮৩) এবং মৃত্যুদিনে (২৮শে এপ্রিল ১৯৪৫ উন্মত্ত জনতার হাতে তিনি প্রাণ হারান)। শুধু তাই নয়, ১৯২২ সালের অক্টোবরে যে গণ বিক্ষোভের মধ্যে দিয়ে মুসোলিনির ন্যাশানাল ফ্যাসিস্ট পার্টি ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়, তার বার্ষিকী স্মরণ করতেও প্রতিবছর সেখানে মানুষের সমাগম হয়।

জার্মানিতে নাৎসী যুগ স্মরণ করার ব্যাপারে যেমন কঠিন আইন কানুন আছে, ইটালিতে মুসোলিনির ব্যাপারে তেমনটা নেই। তারা মুসোলিনির স্মৃতিচারণের ব্যাপারে অনেকটাই উদার।

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption থাই সীমান্তের কাছে এক প্রত্যন্ত এলাকায় পল পটের কবর রয়েছে।

কাম্বোডিয়ার সিয়াম রিপে পল পটের বাড়ি

কাম্পুচিয়া (১৯৭৬-এ নাম বদলের আগে কাম্বোডিয়ার নাম) কম্যুনিস্ট পার্টির নেতা পল পটের নেতৃত্বে ১৯৭০এর দশকে সংঘটিত হয়েছিল গণহত্যা। এবং তার জমানায় বাধ্যতামূলক শ্রমের কারণে বলা হয়ে থাকে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে প্রাণ হারিয়েছিল প্রায় ৩০ লাখ মানুষ ।

পল পট মারা যান ১৯৯৮ সালের এপ্রিল মাসে গৃহবন্দী থাকা অবস্থায়।

তার বাসভবন দর্শকদের জন্য উন্মুক্ত রয়েছে। সেইসঙ্গে যেখানে একরাশ টায়ার পুড়িয়ে তড়িঘড়ি তার শেষকৃত্য সারা হয়েছিল সেই স্থানটিও দর্শকদের জন্য খোলা।

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption গোরিতে স্টালিন যাদুঘর সাবেক সোভিয়েত স্বৈরশাসকের সমর্থকদের জন্য অবশ্য দ্রষ্টব্য।

স্তালিন যাদুঘর- গোরি, জর্জিয়া

জর্জিয়ার বিপ্লবী এবং সাবেক সোভিয়েত নেতা জোসেফ স্তালিনের মরদেহ তার সমাধি থেকে সরিয়ে ফেলার বলিষ্ঠ পদক্ষেপ অনুমোদন করেছিলেন ১৯৬১ সালে কম্যুনিস্ট নেতা নিকিতা ক্রুশ্চেভ। স্তালিনের মৃতদেহ শায়িত ছিল ভ্লাদিমির লেনিনের সমাধির পাশেই।

স্তালিনের স্বৈর সরকার ব্যাপক নিন্দা কুড়িয়েছিল গণ নিপীড়ন ও জাতিগত নিধনের দায়ে। লক্ষ লক্ষ মানুষের হত্যা এবং লাখো লাখো লোকের অনাহারে মৃত্যুর পেছনেও তার সরকারকেই দায়ী করা হয়। সেই স্তালিনের দেহাবশেষ এখন রয়েছে মস্কোয় ক্রেমলিন প্রাচীরের কাছে অজ্ঞাত এক কবরে।

কিন্তু স্তালিনের জন্মস্থানের কাহিনি একেবারেই আলাদা। তার জন্ম হয়েছিল জর্জিয়ার গোরি শহরে।

সাবেক স্বৈরশাসকের স্মৃতিতে ওই শহরে রয়েছে একটি যাদুঘর। ১৮৭৮ সালে যে বাড়িতে তিনি জন্মেছিলেন যাদুঘরটি তারই সংলগ্ন ভবনে। যে রাস্তার ওপর এই যাদুঘর তার নাম স্তালিন অ্যাভিনিউ।

ওই যাদুঘর স্তালিনের স্মৃতিতে উৎসর্গীকৃত একটি ভবন, যে স্তালিনের ব্যক্তিত্ব কয়েক দশক ধরে সোভিয়েত ইউনিয়নের ওপর প্রভাব বিস্তার করেছিল, যে স্তালিন ১৯২১ সালে রেড আর্মি নিয়ে তার নিজেরই জন্মভূমিতে রক্তাক্ত অভিযান চালিয়েছিলেন।

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption তিকরিতে আইএস বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সময় সাদ্দামের সমাধি গুঁড়িয়ে মাটিতে মিশিয়ে দেয়া হয়েছিল, কিন্তু স্থানীয়রা বলে তার মরদেহ আগেই সরিয়ে ফেলা হয়েছিল।

সাদ্দাম হুসেনের সমাধি- তিকরিত, ইরাক

ইরাকী স্বৈরশাসক সাদ্দাম হুসেনকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয় ২০০৩ সালের এপ্রিলে এবং তিন বছর পর তাকে ফাঁসি দেয়া হয়।

২০০৬ সালের ৩১শে ডিসেম্বর তার নিজের শহর তিকরিতে তাকে সমাধিস্থ করা হয়। তাকে এমন স্থানে সমাধিস্থ করা হয় যা কার্যত ছিল প্রতিপক্ষের হামলা থেকে সুরক্ষিত এলাকা। তিকরিত শিয়া অধ্যূষিত ইরাকে সুন্নি মুসলমানদের শক্ত ঘাঁটি।

কিন্তু ২০১৫ সালে বিবিসির খবরে বলা হয় ইরাকি বাহিনী, ইরান সমর্থিত শিয়া মিলিশিয়া এবং ইসলামিক স্টেট গোষ্ঠির মধ্যে সংঘাতের সময় ওই সমাধিস্থল একেবারে বিধ্বস্ত হয়ে গেছে।

তবে স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী ২০১৪ সালে আইএস ওই এলাকা দখল করার আগেই সাদ্দাম হুসেনের মৃতদেহ সেখান থেকে সরিয়ে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়।

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption স্পেনের গৃহযুদ্ধ থেকে বেঁচে যাওয়ার পর জেনারেল ফ্রাঙ্কোকে কবর দেয়া হয় ভ্যালি অফ দ্য ফলেন-এ।

ভ্যালি অফ দ্য ফলেন - স্পেন

যখন প্রায় বিশ বছর নির্মাণকাজ চলার পর ১৯৫৯ সালের পয়লা এপ্রিল ভ্যালি অফ দ্য ফলেন উদ্বোধন করা হল, তখন স্বৈরশাসক ফ্রাঙ্কো সেটাকে বর্ণনা করেছিলেন ১৯৩৬ থেকে ৩৯ সাল পর্যন্ত চলা স্পেনের গৃহযুদ্ধ শেষে প্রায়শ্চিত্ত ও আপোষের জাতীয় উদ্যোগের একটা প্রতীক হিসাবে।

কিন্তু মাদ্রিদের উপকণ্ঠে নির্মিত ওই সৌধ ১৯৭৫ সালে বিতর্কিত হয়ে উঠল যখন সেখানে তৈরি হল ফ্রাঙ্কোর স্মৃতিসৌধ। স্পেনের গৃহযুদ্ধে যারা বেঁচে গিয়েছিলেন তাদের মধ্যে শুধু ফ্রাঙ্কোরই স্মৃতিতে সেখানে সমাধি তৈরি হল।

এরপর থেকে ওই সৌধ শুধু ফ্যাসিস্ট নেতা ফ্রাঙ্কোর অনুসারীদের জন্য পূণ্যস্থান হয়ে উঠল। যদিও বর্তমান আইন অনুযায়ী সেখানে ফ্রাঙ্কোর সমর্থনে কোন জনসভা করা নিষিদ্ধ।

বহু বছর ধরে স্পেনের সরকার ফ্রাঙ্কোর দেহাবশেষ সেখান থেকে সরিয়ে কোথায় নিয়ে যাবে তার সমাধানে পৌঁছতে পারেনি।

গত সেপ্টেম্বর মাসে ওই ভ্যালি থেকে ফ্রাঙ্কোর দেহাবশেষ তুলে নেবার পদক্ষেপ সংসদ অনুমোদন করেছে, কিন্তু ওই পদক্ষেপ নিয়েও বিশাল মতভেদ রয়েছে।

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption ভক্তরা মেডেলিনের কাছে এস্কোবারের কবর দেখতে যান

পাবলো এস্কোবারের কবর - ইটাগুনি, কলম্বিয়া

পাবলো এস্কোবারকে বলা হয় সর্বকালের সবচেয়ে কুখ্যাত মাদকচক্রের নেতা যার জীবন নানা রহস্যে ঘেরা।

মেডেলিনের কাছে ইটাগুনিতে রয়েছে তার সমাধি। ১৯৯৩ সালে পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারান এস্কোবার।

কথিত আছে এস্কোবার আনুমানিক ৫ হাজার মানুষের প্রাণহানির জন্য দায়ী।

কিন্তু এরপরেও পাবলো এস্কোবারের ভক্তের সংখ্যা কম নয়। অনেকের কাছে তিনি একধরনের নায়ক।

তার জনপ্রিয়তা আরও বেড়েছে তার জীবন কাহিনি নিয়ে তৈরি ছবি "নারকোস" নেটফ্লিক্সে প্রদর্শিত হবার পর।

যেসব পর্যটক মেডেলিন বেড়াতে যায় তাদের জন্য সেখানে অন্যতম প্রধান আকর্ষণ এস্কোবারের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা স্থানগুলো ঘুরে দেখা।

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী ইউজিন টেরেব্লাঞ্চ তার খামারের এক সাবেক কর্মচারীর হাতে নিহত হন ২০১০ সালে

ইউজিন টেরেব্লাঞ্চের খামার- ভেন্টারসডর্ফ, দক্ষিণ আফ্রিকা

যখন ১৯৯০এর দশকের মাঝামাঝি দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী প্রশাসনের অবসান ঘটল, তখন দেশে কৃষ্ণাঙ্গ ও শ্বেতাঙ্গদের মধ্যে বিভেদ অবসানের বিরুদ্ধে সবচেয়ে সোচ্চার ছিলেন শ্বেতাঙ্গ কৃষক ইউজিন টেরেব্লাঞ্চ।

২০১০ সালে তারই এক সাবেক কর্মচারী তাকে কুপিয়ে হত্যা করে। তখন শ্বেতাঙ্গদের শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করতে যে এডাব্লিউবি পার্টির জন্ম হয় তার প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন ইউজিন এবংতার বর্ণবাদী আদর্শের ভিত্তিতেই গড়ে উঠেছিল সেই দল।

ভেন্টারসডর্ফ-এর উপকণ্ঠে ভিল্লানা নামে এক গ্রামে ইউজিনের খামারে নানাধরনের অপরাধ সংঘটিত হয়।

এরপর ২০১৪ সালে ভিল্লানাকে একটা ঐতিহ্যবাহী গ্রামের মর্যাদা দেবার জন্য যখন দক্ষিণ আফ্রিকার জাতীয় হেরিটেজ কাউন্সিলে প্রস্তাব পাঠানো হয়, কাউন্সিল তা প্রত্যাখান করে।