কাশ্মীরি মায়েরা কি আদৌ পারবেন জঙ্গী ছেলেদের সমাজের মূল ধারায় ফেরাতে?

চোদ্দ বছর বয়সে নিহত কাশ্মীরি জঙ্গী মুদাসির আহমেদ প্যারির জানাজায় তার মা ও অন্যান্যরা। শ্রীনগর, ডিসেম্বর ২০১৮ ছবির কপিরাইট TAUSEEF MUSTAFA
Image caption চোদ্দ বছর বয়সে নিহত কাশ্মীরি জঙ্গী মুদাসির আহমেদ প্যারির জানাজায় তার মা ও অন্যান্যরা। শ্রীনগর, ডিসেম্বর ২০১৮

ভারত-শাসিত কাশ্মীরের পুলওয়ামাতে বিধ্বংসী জঙ্গী হামলার পাঁচদিনের মাথায় আজ ভারতীয় সেনাবাহিনী ঘোষণা করেছে, কাশ্মীরের কোনও যুবক হাতে বন্দুক তুলে নিলে তাকে দেখামাত্র হত্যা করা হবে।

বিশেষত কাশ্মীরি মায়েদের প্রতি সেনাবাহিনী আজ বার্তা পাঠিয়েছে, তারা যেন তাদের ছেলেদের বন্দুক ছেড়ে মূল স্রোতে ফিরে আসার জন্য বোঝান।

ভারতে সামরিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, কাশ্মীরে জঙ্গীবাদের বিরুদ্ধে লড়াইতে জঙ্গীদের বাবা-মাকেও সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টাতেই এই পদক্ষেপ ।

তবে কাশ্মীরিরা নিজেরাই কিন্তু বিশ্বাস করছেন না এ ধরনের আবেদনে আদৌ কোনও কাজ হবে।

পুলওয়ামাতে গত বৃহস্পতিবারের আত্মঘাতী হামলায় চল্লিশজনেরও বেশি আধা-সেনা নিহত হওয়ার পর ভারতীয় সেনাবাহিনী এদিনই প্রথম প্রকাশ্যে মুখ খুলল।

ছবির কপিরাইট Hindustan Times
Image caption লে: জেনারেল কানওয়ালজিৎ সিং ধিঁলো

বিবিসি বাংলায় আরো পড়ুন:

বিশ্বের সেরা 'টয়লেট পেপার' পাকিস্তানের পতাকা?

কাশ্মীরে আধাসামরিক কনভয়ে বোমা হামলা, নিহত ৩৪

আর শ্রীনগরের সেই সাংবাদিক সম্মেলনে ফিফটিন কোরের কমান্ডার লে: জেনারেল কানওয়ালজিৎ সিং ধিলোঁ প্রচ্ছন্ন হুমকির সুরেই সতর্কবার্তা শুনিয়ে রাখলেন কাশ্মীরি জঙ্গীদের বাবা-মায়েদের।

লে: জেনারেল ধিলোঁ সেখানে বলেন, "কাশ্মীরি যুবকদের বাবা-মাদের, বিশেষত মায়েদের আমি একটা কথা বলতে চাই।"

"আমি জানি, কাশ্মীরি সমাজে মায়েদের ভূমিকা বিরাট।"

"তাই তাদেরই অনুরোধ জানাব, আপনাদের যে ছেলেরা সন্ত্রাসবাদের রাস্তায় গেছে তাদের আত্মসমর্পণ করে মূল ধারায় ফিরে আসতে বলুন।"

ছবির কপিরাইট NurPhoto
Image caption পুলওয়ামাতে জঙ্গী ডেরায় সেনা অভিযান। ফেব্রুয়ারি, ২০১৯

"নইলে কাশ্মীরে যে-ই হাতে বন্দুক তুলে নেবে আমরা কিন্তু তাদের নির্মূল করব - আর এটাই কাশ্মীরি মায়েদের প্রতি আমাদের বার্তা, আমাদের অনুরোধ।"

জঙ্গীরা বন্দুক ফেলে আত্মসমর্পণ করলে তারা ভাল প্যাকেজ পাবেন এবং সরকার তাদের সব রকম সহায়তা করবে, সেনা কর্মকর্তারা সে কথাও আজ মনে করিয়ে দিয়েছেন।

কিন্তু হাতে বন্দুক তুললেই মরতে হবে, এ কথা বলে ভারতীয় সেনা কি কাশ্মীরে নতুন কোনও কঠোরতর নীতির ইঙ্গিত দিচ্ছে?

দিল্লিতে ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড কনফ্লিক্ট স্টাডিজের প্রধান এবং সাবেক মেজর জেনারেল দীপঙ্কর ব্যানার্জি কাশ্মীরে বহু দিন ডিভিশনাল কমান্ডের নেতৃত্বে ছিলেন - তিনি অবশ্য ঠিক সেরকমটা মনে করেন না।

ছবির কপিরাইট Oval Observer Foundation
Image caption সাবেক মেজর জেনারেল দীপঙ্কর ব্যানার্জি

তিনি বলছেন, "এটাকে আমি ঠিক মানবিকতা-বিরোধী পদক্ষেপ বলব না, বরং বলব এটা একটা খুব জোরালো পরামর্শ।"

"কারণ ছেলে-মেয়ে যদি র‍্যাডিক্যালাইজড হয়ে যায় তাহলে তার দায়দায়িত্ব বাবা-মাকে অবশ্যই কিছুটা নিতে হয়।"

"তারা যদি এখন বন্দুক নিয়ে দেশের বিরুদ্ধে লড়াই করতে নামে তাহলে নিজেদের তারা কত বড় বিপদ আর ঝুঁকির মুখে ফেলে দিচ্ছে, সেটা বাবা-মার পক্ষেই সবচেয়ে ভালভাবে বোঝানো সম্ভব।"

"কাশ্মীরে ভারতীয় সেনার বরাবরের নীতি হল উইনিং হার্টস অ্যান্ড মাইন্ডস অব পিপল। কিন্তু অনেক সময় যখন আর্মির বিরুদ্ধে বড়সড় হামলা হয়ে যায় তখন হয়তো এই নীতি সব সময় বজায় রাখা যায় না।"

ছবির কপিরাইট Yawar Nazir
Image caption নিহত জঙ্গী বুরহান ওয়ানি ছিলেন কাশ্মরে বহু যুবকের রোল মডেল

"তবু সার্বিকভাবে কাশ্মীরি যুবকদের মন জয় করাটাই কিন্তু সামরিক অভিযানের মূল লক্ষ্য থেকে যায় - আর সেটা এখনও থাকবে বলেই আমার বিশ্বাস", বলছিলেন ভারতীয় সেনাবাহিনীর সাবেক এই কর্মকর্তা।

কিন্তু কাশ্মীরি যুবকদের মন জয় করার জন্য ভারতীয় সেনার যে বড্ড দেরি হয়ে গেছে - এমন কী সেটা যে কাশ্মীরি মায়েদেরও সাধ্যের বাইরে - তা বলতে এতটুকুও দ্বিধা নেই শ্রীনগরে কাশ্মীর ইউনিভার্সিটির প্রবীণ অধ্যাপক হামিদা নাঈম বানোর।

প্রফেসর বানো বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, "এতদিন যেন ভারতীয় সেনা কাশ্মীরি যুবকদের মারছিল না! রোজ তারা শত শত যুবক ও কিশোরকে হত্যা করছে, জীবন্ত জ্বালিয়ে দিচ্ছে।"

"আর কেউ তাদের কিছু বলার আগেই কাশ্মীরি মায়েরা তো কবে থেকেই তাদের ছেলেদের ফিরে আসতে বলছেন, কাঁদতে কাঁদতে সোশ্যাল মিডিয়াতে ভিডিও মেসেজ পাঠাচ্ছেন - কিন্তু তারপরও তারা ফিরছে কই?"

ছবির কপিরাইট Lamaakan
Image caption অধ্যাপক হামিদা নাঈম বানো

"আসলে কোনও বাবা-মাই তো হাসিমুখে ছেলেদের জঙ্গীবাদের রাস্তায় ঠেলে দেন না - কাশ্মীরে নির্যাতনের চেহারা দেখে হতাশ ও ক্ষুব্ধ হয়ে তারা নিজেরাই হাতে বন্দুক তুলে নেয়।"

পুলওয়ামার ঘটনার পর ভারতীয় সেনাবাহিনী যে বেশ চাপের মুখে আছে তাতে কোনও সন্দেহ নেই - আর এই মুহুর্তে জঙ্গীবাদের মোকাবেলায় তারা বন্দুকের ভয়কে যেমন কাজে লাগাতে চাইছে, তেমনি ব্যবহার করতে চাইছে মায়ের ভালবাসাও।

কিন্তু জঙ্গীবাদের পথে পা-বাড়ানো কাশ্মীরি তরুণরা এখন ভয় বা ভালবাসা, দুয়েরই অনেক ঊর্ধ্বে - অন্তত তেমনটাই বিশ্বাস করেন সেখানকার বহু মানুষ।

বিবিসি বাংলায় আরো খবর:

হাসপাতাল থেকে ৩১ টা মানব ভ্রূণ ডাস্টবিনে গেল কীভাবে?

কোমায় থাকা কিশোরী জেগে দেখে সে নিজেই মেয়ের মা!

জামায়াতের নতুন দলের নামে 'ইসলাম' বাদ পড়তে পারে