শামীমা বেগম: কেবল এই ‘আইএস বধূ’কে নিয়েই ব্রিটেনে কেন এতো হইচই?

শামীমা বেগম
Image caption শামীমা বেগম ও তার সদ্যোজাত ছেলে সিরিয়ায় একটি শরণার্থী শিবিরে বাস করছেন

"আমি শুধু ক্ষমা চাইছি, যুক্তরাজ্যের কাছ থেকে," শামীমা বেগমের এই বক্তব্যের পরই ব্রিটেনে শুরু হয়েছে বিতর্ক।

ব্রিটিশ টিনএজার শামীমা বেগম এক সময় তাদের পূর্ব লন্ডনের বাড়ি থেকে পালিয়েছিলেন সিরিয়ায় তথাকথিত ইসলামিক স্টেটে যাওয়ার জন্য।

আর এখন তিনি বাড়ি ফিরতে চান।

মাত্র ১৯-বছর বয়সী শামীমা এরই মধ্যে তিন বাচ্চার জন্ম দিয়েছেন। সর্বশেষটির জন্ম হয়েছে কয়েকদিন আগে। তার আগের দুটো বাচ্চাই মারা গিয়েছে।

বিবিসিকে তিনি বলেছেন, সর্বশেষ হওয়া ছেলে শিশুটিই এখন তার কাছে সব চাইতে গুরুত্বপূর্ণ, এবং তাকে তিনি ব্রিটিশ মূল্যবোধ অনুযায়ী বড় করতে চান।

"স্কুলে পাঠানো, কাজ করা, যুক্তরাজ্যে ফিরে যাওয়া, সেখানে তো পরিবার রয়েছে," বলছিলেন শামীমা।

বিবিসি বাংলায় আরও পড়তে পারেন:

ব্রিটিশ নাগরিকত্ব হারাচ্ছেন 'আইএস বধূ' শামীমা বেগম

সিরিয়ায় ব্রিটিশ-বাংলাদেশী শামীমার সন্তান প্রসব

ট্রাম্প চান আইএস যোদ্ধাদের ফিরিয়ে নিক ইউরোপীয়রা

"আমার ছেলেকে আমি বড় করতে চাই, তাকে কুরআন পড়াতে চাই। তাকে নামাজ শিক্ষা দিতে চাই, এই সব আর কি। কিন্তু জিহাদ ... আমি ঠিক জানি না।"

আত্মানুসন্ধান

ব্রিটিশ সংবাদপত্র টাইমসের একজন সাংবাদিক শামীমা বেগমকে গত সপ্তাহে সিরিয়ায় খুঁজে পাওয়ার পর থেকেই যুক্তরাজ্যে তাকে নিয়ে বেশ আবেগপূর্ণ বিতর্ক শুরু হয়েছে।

আইএস-এর শক্তঘাঁটি বাগুজ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর থেকে তিনি একটি শরণার্থী শিবিরে ছিলেন।

ছবির কপিরাইট PA
Image caption ২০১৫ সালের শামীমা যখন ব্রিটেন ছাড়েন তখন তার বয়স ছিল ১৫

দু'জন স্কুল ছাত্রীর সঙ্গে তিনি যখন বাড়ি ছাড়েন, তখন তার বয়স মাত্র ১৫ বছর। বাবা-মাকে তারা বলেছিলেন যে কেবল ওই দিনের জন্য তারা বেড়াতে যাচ্ছেন শহরের বাইরে।

কিন্তু আদতে তারা বাক্সপ্যাটরা গুছিয়ে প্রথমে পালিয়ে যান তুরস্কে, পরে সেখান থেকে সিরিয়ার আইএস নিয়ন্ত্রিত এলাকায়।

সিসিটিভি ক্যামেরায় ধরা পড়ার কারণে তাদের বিষয়টি নিয়ে সে সময়ে ব্যাপক আলোচনা হয়। তবে ওই স্রোতে তারা একবোরেই নিঃসঙ্গ ছিলেন না।

বিশ্বের ৮০টি দেশ থেকে ৪০,০০০-র বেশি মানুষ ইরাক ও সিরিয়ায় আইএস নিয়ন্ত্রিত এলাকায় চলে গিয়েছিল ২০১৩ সালের এপ্রিল থেকে ২০১৮ সালের জুনের মধ্যবর্তী সময়কালে। এই তথ্য লন্ডন কিংস কলেজের ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর দ্যা স্টাডি অব র‍্যাডিক্যালাইজেশনের।

ব্রিটেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিবিসিকে জানিয়েছে, ৯০০-র বেশি ব্রিটিশ নাগরিক ইরাক-সিরিয়ায় আইএস-এ যোগ দিয়েছিলেন, তবে তাদের মধ্যে কমবেশী ৪০০ যুক্তরাজ্যে ফেরত এসেছেন।

ব্রিটেনে ফিরে আসা বেশিরভাগ যোদ্ধার বয়স ছিল ২০ থেকে ৩৫-এর মধ্যে, ফলে তাদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়াটা সহজ ছিল। কিন্তু শামীমা বেগমের বিষয়টি অনেককে আত্ম-অনুসন্ধানের দিকে ঠেলে দিয়েছে। এর সঙ্গে আইনের বিষয়টিও জড়িত। কারণ হলো, তার দাবি তিনি কোন অপরাধ করেননি।

শিকার না শিকারী

"শামীমা বেগম কি ঘটনার শিকার?" - ফিনান্সিয়াল টাইমসে এক নিবন্ধে এই প্রশ্ন তুলেছেন হার্ভার্ড কেনেডি স্কুলের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ক্যামিলা ক্যাভেন্ডিশ।

অনেকে তাই-ই মনে করেন। ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর সাবেক প্রধান জেনারেল রিচার্ড ড্যানাট স্কাই নিউজকে বলেন, অন্যদের চরমপন্থী হওয়া থেকে ঠেকাতে যুক্তরাজ্যের উচিত তাকে "অল্পস্বল্প অনুকম্পা" দেখানো।

তিনি বলেন, "সে যদি এখানে ফিরে আসতে না পারে, তাহলে সে কোথায় যাবে? জীবনের বাকী দিনগুলো তো সে আর একটি শরণার্থী শিবিরে কাটাতে পারে না।"

বিবিসির সাবেক একজন প্রেজেন্টার রবিন লাসটিগ তার বিষয়টিকে 'সহানুভূতি'র সঙ্গে দেখার জন্য বলেছেন। তাঁর মতে, শামীমা ছোটবেলায় হয়তো ঠিকমতো বেড়ে ওঠেননি।

ছবির কপিরাইট Met Police
Image caption ক্যামেরায় যেভাবে ধরা পড়েছিলেন স্কুল বালিকা

তিনটি স্কুলবালিকা যখন বাড়ি থেকে পালিয়েছিল, তখন তাদেরকে "ঝুঁকি নয় বরং অনেকটা পথহারা" বলেই মনে করা হয়েছিল - বলছিলেন মিজ ক্যাভেন্ডিশ।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতে, প্রথম দিকে যারা আইএস থেকে ফিরে এসেছেন, তাদের একটা বড় অংশকেই এখন আর জাতীয় নিরাপত্তার প্রতি হুমকি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে না।

তবে মিজ ক্যাভেন্ডিশ বলেন, দ্বিতীয় দফায় ফিরে আসারা "ব্যতিক্রম"।

"যারা যুদ্ধের একেবারে শেষ পর্যন্ত ছিলেন, তারা অনেক শক্ত। তারা ভালোভাবে পিছনের চিহ্ন মুছে ফেলেছেন।"

ব্রিটেনের বিদেশ বিষয়ক গোয়েন্দা সংস্থা এমআইসিক্স-এর প্রধান অ্যালেক্স ইয়ঙ্গার টেলিগ্রাফ সংবাদপত্রকে বলেন, আইএস-এর হয়ে যুদ্ধ করেছেন কিংবা সমর্থন করেছেন, এমন ব্রিটিশ নাগরিকদের নিয়ে তিনি "দারুণ উদ্বিগ্ন"।

তিনি বলেন, "অভিজ্ঞতা আমাদের বলছে যে একবার কেউ ওই পথে গেলে তিনি এমন সব কৌশল রপ্ত করেন আর যোগাযোগ গড়ে তোলেন, যা তাকে সম্ভাব্য বিপজ্জনক ব্যক্তি হিসেবে রূপান্তরিত করে।"

মিজ ক্যাভেন্ডিশ বলেন, শামীমা বেগম যদি এমনকি কোন অপরাধ করেও থাকেন, হয়তো সে ব্যাপারে খুবই অপ্রতুল প্রমাণ পাওয়া যাবে।

এ বিষয়ে শামীমা বেগম যেমনভাবে বিবিসিকে বলেছেন - "আমি সেখানে গেলাম, একজন গৃহবধূ হিসেবে বাড়িতে বসে রইলাম, তারা আমার যত্ন নিলো - এগুলো আসলে ঠিক তাদেরকে সাহায্য করা নয়। আমি তাদের বুলেটের খরচ যোগাইনি, তাদের প্রশিক্ষণ দেয়ার জন্যও আমি কোন পয়সা দেইনি।"

অনুশোচনা নেই

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption তথাকথিত ইসলামিক স্টেট গোষ্ঠী সিরিয়ায় খুব ছোট একটি এলাকায় আটকা পড়েছে

যা তিনি করেছেন, তা নিয়ে এখন পর্যন্ত শামীমা বেগম খুব কমই অনুশোচনা প্রকাশ করেছেন। তিনি এমনকি এমনও বলেছেন যে ময়লার ঝুড়িতে রাখা মানুষের কাটা মাথা দেখেও তার কোন ভাবান্তর হয়নি।

বিবিসিকে তিনি জানিয়েছেন, "যুদ্ধের ভিডিও" - যার মধ্যে ছিলো শিরোশ্ছেদের মতো ঘটনা - দেখে তিনি আইএস-এ যোগ দিতে অংশত অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। আর ছিল পরিবারগুলোকে আইএস-এর দেয়া "চমৎকার জীবন"-এর ভিডিও।

মধ্যপ্রাচ্যে বিবিসির সংবাদদাতা কোয়েন্টিন সামারভিল বলছেন যে "সাক্ষাৎকারের পুরোটা সময় শামীমা বেগম ইসলামিক স্টেটের দর্শনের পক্ষাবলম্বন করে গেছেন"।

তিনি আরও বলেন, "আইএস-এর দ্বারা ইয়াজিদী নারীদের দাসত্ব, হত্যা ও ধর্ষণের বিষয়ে যখন তাকে জিজ্ঞেস করা হয়, তখন তার উত্তর ছিল 'শিয়ারাও ইরাকে একই কাজ করেছিল'।

আইএস যে হামলার দায়িত্ব স্বীকার করেছে, ২০১৭ সালের ম্যানচেস্টার অ্যারেনায়, সেই হামলায় ২২ জনের মৃত্যুর বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হলে শামীমা বেগম উত্তর দেন যে তিনি মনে করেন "নিরাপরাধ মানুষ মারার বিষয়টি ভুল"।

কিন্তু এও মনে করেন যে ওই ঘটনা ছিল "আইএস এলাকায় নারী ও শিশুদের হত্যার ঘটনার" এক ধরণের "প্রতিশোধ"।

নৈতিক টানাপোড়েন

ব্রিটিশ সরকার আগে থেকেই কঠিন এক আইনগত টানাপোড়নের মধ্যে ছিল। শামীমা বেগম জনসমক্ষে চলে আসার ঘটনা এ ক্ষেত্রে তাদের জন্য আরেকটি নৈতিক উপাদান যোগ করলো।

আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় যে কোন ব্রিটিশ নাগরিককে যুক্তরাজ্য দেশে ফিরতে দিতে বাধ্য, যদি না তিনি অন্য দেশের নাগরিকত্ব দাবি করেন।

কিন্তু ব্রিটেনের কোন কনস্যুলেট সিরিয়ায় নেই। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাজিদ জাভিদ বলেছেন একটি নিষিদ্ধ ঘোষিত সন্ত্রাসী গোষ্ঠীতে যোগদানকারী কোন ব্রিটিশ নাগরিককে সাহায্য করতে গিয়ে দেশটি অন্য কাউকে বিপদে ফেলবে না।

ছবির কপিরাইট Reuters
Image caption ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাজিদ জাভিদ

শামীমা বেগম যদি কোনভাবে একটি ব্রিটিশ কনস্যুলারে পৌঁছুতেও পারেন, তাহলে খুব সম্ভবত তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে, তাকে তদন্তের মুখোমুখি হতে হবে এবং ফিরে এলে হয়তো তার বিচারও হবে - যদিও এটা পরিস্কার নয় যে ঠিক কোন অভিযোগে এই বিচার হবে।

মি. জাভিদ বলেন, তিনি ১৩৫১ সালে প্রণীত একটি আইন সংশোধনের বিষয় বিবেচনা করছেন যাতে করে "যারা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত কিংবা সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন করায় অভিযুক্ত, তাদেরকে বিচারের মুখোমুখি করা যায়"।

পোস্টার গার্ল

শামীমা বেগম বলেছেন যে ব্রিটেনে যদি তাকে শিশু সন্তানসহ ফিরতে দেয়া হয়, তাহলে তিনি জেলে যেতেও রাজি।

চার বছর আগে তিনি যখন দেশ ছাড়েন, তখন তিনি আলোচনায় ছিলেন। আজ আবারও তিনি আলোচনায়।

কিন্তু তিনি বলেছেন যে তিনি কখনোই ইসলামিক স্টেটের "পোস্টার গার্ল" হতে চাননি, চাননি তার কর্মকাণ্ডকে গোষ্ঠীটির জন্য "প্রপাগান্ডা বিজয়" হিসেবে দেখা হোক।

বিবিসিকে তিনি বলেন, "আমি তো নিজেকে খবরে নিয়ে আসিনি"।

"পোস্টার গার্লের বিষয়টা আমার পছন্দেও ঘটেনি"।

বিবিসি বাংলায় আরও পড়তে পারেন:

ভারত-পাকিস্তান দ্বন্দ্ব বিশ্বের জন্য কত বড় হুমকি?

ক্যান্সার ও বয়স জনিত রোগের রহস্য সাদা রঙের হাঙ্গরের মধ্যে?

সড়ক দুর্ঘটনা ঠেকানোর কমিটিতে শাজাহান খান কেন?