কাশ্মীরি ডাক্তারকে কলকাতা থেকে চলে যাওয়ার হুমকি

পুলওয়ামায় জঙ্গী হামলার প্রতিবাদে কলকাতায় বিক্ষোভ ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption পুলওয়ামায় জঙ্গী হামলার প্রতিবাদে কলকাতায় বিক্ষোভ

ভারত শাসিত কাশ্মীরের পুলওয়ামায় জঙ্গী হামলায় ৪০ জনেরও বেশি কেন্দ্রীয় নিরাপত্তারক্ষী নিহত হওয়ার পরে ভারতের নানা জায়গায় কাশ্মীরি মানুষদের হেনস্থা করার ঘটনা সামনে আসছে। একই সঙ্গে সামাজিক মাধ্যমেও পুলওয়ামার ঘটনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে অনেকেই কাশ্মীরের সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধেও ক্ষোভ উগরে দিচ্ছেন।

এরকমই একটা ঘটনা জানা গেছে কলকাতায়।

প্রায় ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে কলকাতায় বাসরত এক চিকিৎসক হেনস্থার শিকার হয়েছেন বলে পুলিশ জানিয়েছে।

তার নিরাপত্তার স্বার্থে ওই চিকিৎসকের নাম প্রকাশ করা হচ্ছে না এবং তিনি ফোনেও কথা বলছেন না।

অভিযোগ পেয়ে তার বাড়িতে নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছে সরকার।

"ওই চিকিৎসক আমাদের জানিয়েছেন যে তিনি বাজার সেরে ফেরার সময়ে কিছু লোক তাকে ঘিরে ধরে এবং হুমকি দেয় যে তাকে সন্তানদের নিয়ে নিজের রাজ্য কাশ্মীরে ফিরে যেতে হবে সত্বর,'' জানাচ্ছিলেন পশ্চিমবঙ্গ শিশু অধিকার সুরক্ষা কমিশনের সদস্য প্রসূন ভৌমিক।

''তার দুটি বাচ্চাই দক্ষিণ কলকাতার একটি নামকরা স্কুলে পড়ে। তাদেরও হেনস্থার শিকার হতে হয়েছে বলে অভিযোগ পেয়েছি আমরা। মূলত শিশু দুটিকে সুরক্ষিত রাখার দায়িত্ব আমাদের, তাই প্রশাসনকে যথাযথ নিরাপত্তার ব্যবস্থা নিতে বলি আমরা," মি: ভৌমিক জানান।

একই সঙ্গে চিকিৎসক সংগঠনগুলি এবং অন্যান্য নাগরিক সংগঠনও ওই চিকিৎসকের পাশে দাঁড়িয়েছে।

পুলওয়ামার ঘটনার পরে ভারতের নানা জায়গাতেই কাশ্মীরিদের হেনস্থার শিকার হতে হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।

বিবিসি বাংলায় আরও পড়তে পারেন:

কাশ্মীরের জের: নগ্ন করে জাতীয় পতাকা মুড়িয়ে প্যারেড

ভারতের নানা প্রান্তে কাশ্মীরিদের হেনস্থা, মারধর

কাশ্মীর নিয়ে ভারত আর পাকিস্তানের লড়াইয়ের কারণ কি?

ছবির কপিরাইট Hindusthan Times
Image caption জম্মুতে কাশ্মীরিদের গাড়ি ভাঙচুর করা হচ্ছে

কিন্তু পশ্চিমবঙ্গকে মনে করা হত যে সেখানে সব ধর্মের মধ্যে সম্প্রীতি রয়েছে, অন্য প্রদেশের মানুষকে এখানে হেনস্থার শিকার হতে হয় না, যদিও সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কয়েকটি সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা বা দাঙ্গার ঘটনাও হয়েছে এই রাজ্যে।

গত এক সপ্তাহে আড্ডা, আলোচনা বা সামাজিক মাধ্যম অথবা বাস্তবজীবনে দেখা যাচ্ছে অনেক সাধারণ পশ্চিমবঙ্গবাসীই তাদের ক্ষোভ উগরে দিচ্ছেন - সেটা জঙ্গী হামলার জন্য পাকিস্তানকে দায়ী করা দিয়ে শুরু হয়ে কখনও পৌঁছিয়ে যাচ্ছে মুসলিম বিদ্বেষে কখনও বা কাশ্মীরের মানুষের বিরুদ্ধে।

প্রসূন ভৌমিক বলছিলেন, "যারা ফেসবুকে এধরণের মন্তব্য লিখছে বা বলে বেড়াচ্ছে, তারা দেশপ্রেমী নয়, তারা দ্বেষপ্রেমী।"

জঙ্গী হামলার পরিপ্রেক্ষিতে মুসলমান বিদ্বেষ বা কাশ্মীরের মানুষদের হেনস্থার ঘটনায় খুব একটা বিস্মিত নন অধ্যাপিকা মীরাতুন নাহার।

"পশ্চিমবঙ্গ সম্পর্কে বা আমাদের বাঙালিদের সম্পর্কে আমরা যে উচ্চ ধারণা পোষণ করে থাকি, সেটা অনেকদিন ধরেই টলোমলো হয়ে গেছে। যারা ওই হামলা চালালো, তাদের তো হাতের কাছে পাচ্ছে না মানুষ, কিন্তু এরকম একটা ঘটনা নিয়ে আবেগও তৈরি হয়েছে, ক্ষোভ জমেছে। তাই মূল চক্রীদের না পেয়ে সফট টার্গেটের ওপরে ক্ষোভ উগরে দিচ্ছেন অনেকে।"

''কাশ্মীরে ঘটনা হয়েছে, তাই নিরীহ কাশ্মীরিদের টার্গেট করা হচ্ছে, আর ধর্ম বিশ্বাসে যেহেতু তারা মুসলমান, তাই সাধারণ মুসলমানকেও হেনস্থা করা হচ্ছে। এইসব ঘটনাতেই বোঝা যায় যে আমরা তথাকথিত উচ্চশিক্ষিত বলে যারা দাবি করি, আমরাও সাম্প্রদায়িকতাকে মন থেকে সম্পূর্ণ মুছে ফেলতে পারি নি," বলছেন মীরাতুন নাহার।

সাড়ে তিন দশক ধরে যেখানে বামপন্থীরা ক্ষমতায় ছিল, সেখানকার মানুষের মন থেকে সাম্প্রদায়িকতা মুছে ফেলা গেল না কেন, এ প্রশ্নে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক বিমল শঙ্কর নন্দ বলছেন, "সাম্প্রদায়িকতার একটা বীজ পশ্চিমবঙ্গের মানুষের মনের মধ্যে থেকেই গেছে, কারণ দেশ ভাগ হয়েছিল ধর্মের ভিত্তিতেই। কিন্তু বামপন্থী আন্দোলনের কারণে সেই চিন্তাগুলো চাপা পড়েছিল, এই বিষয়গুলো সামনে আসত না খুব একটা।"

"কিন্তু ১৫-২০ বছরে ভারতে যা ঘটছে, তার একটা প্রভাব পশ্চিমবঙ্গেও পড়বে এটাই স্বাভাবিক - যেভাবে মৌলবাদ আর জঙ্গীবাদ বাড়ছে, তার সামনে মানুষের মনে অসহায়তা দেখা দিচ্ছে, আতঙ্ক দেখা দিচ্ছে। তার ফলেই ধর্মের আশ্রয় খুঁজছেন মানুষ।"

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption পুলওয়ামা জেলায় ১৪ই ফেব্রুয়ারি হওয়া হামলাটি ছিল কয়েক দশকের মধ্যে ভারতীয় বাহিনীর উপর হওয়া সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী আক্রমণ

কিন্তু কবি ও শিশু অধিকার সুরক্ষা কমিশনের সদস্য প্রসূন ভৌমিক মনে করেন, "হিন্দুত্ববাদীরা পরিকল্পনা করে এইসব আবেগ ছড়াচ্ছে। এর আগেও বেশ কয়েকবার এই চেষ্টা হয়েছে, আবারও দেশভক্তির নামে আবেগ ছড়িয়ে অশান্তি বাধানোর চেষ্টা হচ্ছে। এটা বর্গীহানার মতো ঘটনা।"

মীরাতুন নাহার আর বিমলশঙ্কর নন্দ, দুজনেই অবশ্য পশ্চিমবঙ্গের মানুষের মনে এই ধর্মীয় বিভাজন জন্ম নেওয়ার পিছনে কিছুটা দায়ী করলেন রাজ্য সরকারের ''তোষণের রাজনীতি''র।

"কোনও একটি বিশেষ ধর্মের মানুষদের উন্নতির জন্য সরকার অনেক পরিকল্পনা নিচ্ছে, খুবই ভাল কথা। কিন্তু সেটা যত বেশি প্রচার করা হবে, ততই অন্য সম্প্রদায়ের মানুষের মনে একটা ক্ষোভ জন্মাবে," বলছিলেন অধ্যাপক নন্দ।

তবে মি. ভৌমিকের মতে আশার কথা এটাই, যে ওই কাশ্মীরি চিকিৎসক মঙ্গলবার রাতে তাঁকে লিখিতভাবে জানিয়েছেন যে হুমকির মুখেও তিনি কলকাতা ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যাচ্ছেন না।

তিনি বলেছেন, এটাই তার শহর, তিনি এখানেই থাকবেন।

বিবিসি বাংলায় আরও পড়ুন:

‘আইএস বধূ’ শামীমা বেগমকে নিয়ে কেন এতো হইচই?

বিদেশিদের অভাবে বৈশ্বিক তকমা হারাচ্ছে বিশ্ব ইজতেমা?

বাংলাদেশে গ্যাসের মজুদ আর কতদিন থাকবে?