চকবাজার অগ্নিকাণ্ড: আগুন ঠেকানোর সুযোগ ছিলো?

চকবাজারের আগুন ছবির কপিরাইট MUNIR UZ ZAMAN
Image caption চকবাজারে নিহত স্বজনদের আহাজারি।

বাংলাদেশে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা বললে প্রথমেই শিল্প প্রতিষ্ঠান কিংবা শহরের বাসাবাড়িতে আগুন লাগার ছবি মনে ভেসে ওঠে।

কিন্তু শহরের মতো গ্রামের বিভিন্ন স্থাপনায় নানা কারণে আগুন লাগে।

বহু মানুষ হতাহতও হয় কিন্তু সেই সব ঘটনা খবরে শিরোনাম হিসেবে উঠে আসে কমই।

গ্রামীণ জনগণের মধ্যে অগ্নি সচেতনতা বাড়াতে মোহাম্মদ আলী গাজী দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছেন।

তিনি 'অগ্নি প্রতিরোধ সংস্থা' নামে যশোরের একটি এনজিওর নির্বাহী পরিচালক।

সংস্থাটি মূলত আগুন সম্পর্কে গ্রামের মানুষকে সচেতন করতে কাজ করে।

বিবিসি বাংলাকে তিনি বলছেন, যদি কমিউনিটি ফায়ার সার্ভিস থাকতো তাহলে, তাহলে চকবাজারের আগুন মোকাবেলা করা সম্ভব হতো।

ছবিতে পুরনো ঢাকার চকবাজারের আগুন

প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনায় চকবাজারের আগুন

আগুন নেভাতে দমকলকর্মীদের জন্য উন্নত সব কৌশল

চকবাজার অগ্নিকাণ্ড: আগুন সম্পর্কে যা বলছে সরকার

আপনার ডিভাইস মিডিয়া প্লেব্যাক সমর্থন করে না
পুরনো ঢাকার অগ্নিকান্ড

গ্রামে সাধারণত দুর্ঘটনার ধরণ কেমন?

মোহাম্মদ আলী গাজী বলছেন, কয়েকটি অগ্নিকাণ্ডের জন্য পুরোপুরি দায়ী অসচেতনতা কিংবা অবজ্ঞা করা।

"গ্রামে সাধারণত দেখা যায় যে নারীরা রান্না করছেন বাচ্চাকে চুলার পাশে রেখে। দেখা যায় হুট করে বাচ্চার আগুন লেগে যায়। শীতকালে আগুন পোহানোর সময় কিংবা মশার কয়েল থেকে আগুন লেগে অনেক দুর্ঘটনা ঘটে"।

তিনি বলেন, আগে শর্ট সার্কিট তেমন ছিলোনা কিন্তু বিদ্যুতের সম্প্রসারণের পর এখন অনেক ক্ষতি হচ্ছে শর্ট সার্কিট থেকে।

"এছাড়া ধান সিদ্ধ করার সময় বা আলু পোড়ানোর সময় দুর্ঘটনা ঘটে। অনেকে আগুন বিশেষ করে মোমবাতি নিয়ে খেলা করা।"

মোহাম্মদ আলী গাজী বলছেন, গ্রামের মানুষ মোটেই সচেতন না। তার জরিপ অনুযায়ী, প্রতি বছর এক লাখ ৬০ হাজার মানুষ দুর্ঘটনা থেকে মারা যায়।

"জ্বলন্ত চুলা, জ্বলন্ত সিগারেট, গ্যাস সিলিন্ডার, বাজি পোড়ানো, আলোকসজ্জা, ইঞ্জিনের মিস ফায়ার অগ্নিকাণ্ডের প্রধান কারণগুলোর অন্যতম। অনেক সময় গ্রামে ঘুরে বেড়ানো মানসিক অসুস্থরা ব্যক্তিরাও আগুন লাগিয়ে দেন - এমন ঘটনাও ঘটছে।"

ছবির কপিরাইট Reuters
Image caption একটি আবাসিক ভবনে এমন আগুন

সমাধান ও কমিউনিটি ফায়ার সার্ভিস

মোহাম্মদ আলী গাজীর মতে, আগুন বা অগ্নিজনিত দুর্ঘটনা এড়াতে বাতাস, তাপ ও দাহ্য পদার্থ আলাদা রাখতে হবে।

"এগুলো এক হলেই অগ্নিকাণ্ড ঘটে। এগুলো যাতে এক জায়গায় না থাকে সেজন্য দরকার কমিউনিটি ফায়ার সার্ভিস।"

"যেমন অফিস আদালত মিল কারখানায় যারা কাজ করে তাদের মধ্যে বিভিন্ন পর্যায়ের লোক নিয়ে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। তাদের সমন্বয়ে এ ধরণের কমিউনিটি ফায়ার সার্ভিস হতে পারে।"

তার মতে, প্রশিক্ষণ থাকলে কমিউনিটি ফায়ার সার্ভিসের সাথে জড়িত লোকজনই অন্যদের বলতে পারবে যে গ্যাস আলাদা রাখেন, বয়লার আলাদা, প্লাস্টিক আলাদা রাখেন, চুলা যেনো জ্বালানো না থাকে।

"অগ্নিকাণ্ড ঘটলে প্রাথমিক পদক্ষেপ তারা নিতে পারবে আর সাথে সাথে ফায়ার সার্ভিসকে খবর দেবে এবং প্রয়োজনে তারা এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনবে।"

চকবাজারের আগুনও ঠেকানো যেতো?

মোহাম্মদ আলী গাজীর বিশ্বাস কমিউনিটি ফায়ার সার্ভিস সক্রিয় থাকলে চকবাজারের এই আগুন আগেই ঠেকানো যেতো।

"এতো বড় দুর্ঘটনা বা এতো মানুষের মৃত্যু হতোনা। কমিউনিটি ফায়ার সার্ভিস থাকলে তারাই তিনটি জিনিস আলাদা রাখতে উদ্বুদ্ধ করতো। তারাই বাড়ির মালিকদের নিয়ে দাহ্য পদার্থ আলাদা রাখার ব্যবস্থা করতো।"

তিনি বলেন, কমিউনিটি ফায়ার সার্ভিসে সব ধরনের লোক থাকতে হবে এবং ফায়ার সার্ভিস তাদের প্রশিক্ষণ দিবে। আর সরকার বা দাতা সংস্থা আর্থিক সহায়তা দিতে পারে।

ছবির কপিরাইট NURPHOTO
Image caption আগুন নেভানোর চেষ্টা

ফায়ার লাইসেন্স: নিরাপত্তার পাশাপাশি রাজস্ব আয়

ঢাকাসহ সারা দেশে ব্যবসা করার জন্য বা দোকান পাটের জন্য সিটি কর্পোরেশন বা পৌরসভা বা এ ধরণের প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে লাইসেন্স নিতে হয়।

মোহাম্মদ আলী গাজী বলছেন, ট্রেড লাইসেন্সের সাথে ফায়ার লাইসেন্স নেয়ারও নিয়ম করা উচিত।

"এতে করে দোকান পাট বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে অগ্নি নির্বাপক ব্যবস্থা যেমন থাকবে তেমনি বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আয় হবে সরকারের। বাংলাদেশে ফায়ার লাইসেন্সে অনিয়ম অনেক। এ অনিয়মও দূর করতে হবে।"

তিনি বলেন, একদিকে কমিউনিটি ফায়ার সার্ভিস অন্যদিকে ফায়ার লাইসেন্স- এ দুটি ব্যবস্থা করতে পারলে ভয়াবহ আগুনের সম্ভাবনা কমে আসবে অনেকখানি।

আরো পড়ুন:

ভয়াবহ আগুনে নিহত ৭৮, স্বজনরা লাশ পাবেন কিভাবে?

চকবাজার অগ্নিকাণ্ড: হতাশা, ক্ষোভ আর যত সুপারিশ

আপনার ডিভাইস মিডিয়া প্লেব্যাক সমর্থন করে না
পুরনো ঢাকার চকবাজারে ভয়াবহ আগুনের দৃশ্য

সম্পর্কিত বিষয়