কাশ্মীর হামলা: শাবানা-সাচিন-সানিয়া মির্জাকে কেন এত গালিগালাজ?

ক্রিকেটার স্বামী শোয়েব মালিকের সঙ্গে টেনিস তারকা সানিয়া মির্জা ছবির কপিরাইট Mail Today
Image caption ক্রিকেটার স্বামী শোয়েব মালিকের সঙ্গে টেনিস তারকা সানিয়া মির্জা

ভারত-শাসিত কাশ্মীরের পুলওয়ামাতে ঠিক দশদিন আগে আত্মঘাতী হামলায় চল্লিশজনেরও বেশি আধা-সেনার মৃত্যুর পর ভারত জুড়ে যে পাকিস্তান-বিরোধী আওয়াজ উঠছে, তাতে গলা না-মেলানোর অভিযোগে এবার তোপের মুখে পড়ছেন সে দেশের অনেক সেলিব্রিটি বা তারকাই।

সোশ্যাল মিডিয়াতে এই ইস্যুতে তীব্র ট্রোলিংয়ের মুখে এর মধ্যেই বিবৃতি দিয়ে নিজের কৈফিয়ত দিয়েছেন টেনিস তারকা সানিয়া মির্জা - যার স্বামী শোয়েব মালিক একজন পাকিস্তানি ক্রিকেটার।

বলিউড অভিনেত্রী শাবানা আজমি ও তার স্বামী গীতিকার জাভেদ আখতার বাতিল করেছেন তাদের নির্ধারিত করাচি সফর। তার পরেও তাদের পেতে হচ্ছে দেশবিরোধীর তকমা।

এমন কী, বিশ্বকাপে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ম্যাচ বয়কট না-করার পরামর্শ দিয়ে ট্রোলিংয়ের কবলে পড়েছেন সাচিন টেন্ডুলকর পর্যন্ত।

ছবির কপিরাইট সানিয়া মির্জা/ইনস্টাগ্রাম
Image caption ট্রোলিং-য়ের জবাবে ইনস্টাগ্রামে সানিয়া মির্জার পোস্ট

পুলওয়ামাতে জঙ্গী হামলার ঠিক পরদিন একটি বিখ্যাত ব্র্যান্ডের ডিজাইনার পোশাকে নিজের ছবি ইনস্টাগ্রামে পোস্ট করেছিলেন ভারতীয় টেনিস তারকা সানিয়া মির্জা।

পাকিস্তানি ক্রিকেটার শোয়েব মালিককে বিয়ে করেছেন, শুধু এই কারণে তাকে প্রায়ই ভারতীয়দের তোপের মুখে পড়তে হয় - তবে সেদিন যেন সানিয়ার বিরুদ্ধে আক্রমণ সব সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিল।

'সারা ভারত যখন কাঁদছে', তখন সোশ্যাল মিডিয়াতে নিজের ছবি দেওয়ার জন্য ছাপার অযোগ্য ভাষায় গালিগালাজ করা হতে থাকে তাকে।

অবশেষে সেই জঙ্গী হামলার তিনদিনের মাথায় সেই ইনস্টাগ্রামেই একটি বিবৃতি দিয়ে সানিয়া পাল্টা প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন, তার মতো সেলিব্রিটিদেরই কেন বারবার নিজেদের দেশপ্রেম প্রমাণ করতে হবে, কিংবা ছাদের ওপর দাঁড়িয়ে চেঁচিয়ে সন্ত্রাসবাদের নিন্দা করতে হবে?

ছবির কপিরাইট Vittorio Zunino Celotto
Image caption অভিনেত্রী শাবানা আজমি

"একজন ভারতীয় হিসেবে আমি চিরকাল দেশের নিহত জওয়ানদের পাশে থাকব - কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়াতে সব সময় তা ঘোষণা করতে পারব না" - বিবৃতিতে সেটাও জানাতে ভোলেননি তিনি।

কিন্তু কোনও কোনও ভারতীয় সেলিব্রিটি যথেষ্ট জোরেশোরে পাকিস্তানের নিন্দা করছেন না, সোশ্যাল মিডিয়াতে এই আলোচনা দানা বাঁধতেও সময় লাগেনি।

অভিনেত্রী শাবানা আজমি ও তার স্বামী জাভেদ আখতারের যাওয়ার কথা ছিল করাচিতে একটি সাহিত্য সম্মেলনে, পুলওয়ামা হামলার পরদিনই তারা সেই সফর বাতিল করে দেন।

কিন্তু এর পরও আর এক বলিউড তারকা কঙ্গনা রানাওয়াত পাকিস্তানের আমন্ত্রণ গ্রহণ করার জন্য তাদের প্রকাশ্যে দেশবিরোধী বলে আক্রমণ করতে ছাড়েননি।

ছবির কপিরাইট NurPhoto
Image caption কমেডিয়ান মল্লিকা দুয়া

বলিউডে তার চেয়ে অনেক সিনিয়র শাবানার নাম করে কঙ্গনা অভিযোগ করেন, "এরাই এতদিন 'ভারত তেরে টুকরো হোঙ্গে গ্যাং'-কে (অর্থাৎ যারা ভারত ভাঙার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত সেই চক্রকে) মদত দিয়ে এসেছেন!"

এরপর এ সপ্তাহে দিল্লির মৌলানা আজাদ কলেজের এক অনুষ্ঠানে শাবানা আজমিকে পুলওয়ামাতে নিহত সেনাদের শহীদ বলে শ্রদ্ধাঞ্জলি জানাতে দেখা যায়।

নিজের বাবা কাইফি আজমির লেখা বিখ্যাত গান 'অব তুমহারে হাওয়ালে ওয়াতন সাথিয়োঁ'-র পংক্তি গেয়ে তিনি জানিয়ে দেন এই লড়াইতে সারা দেশবাসী এক সাথেই আছে।

কিন্তু কেন এভাবে পুলওয়ামার ঘটনার সবাইকে শোক ও শ্রদ্ধা ঘোষণা করতেই হবে, নিজের পডকাস্টে এই অস্বস্তিকর প্রশ্নটাই তুলে এনেছেন জনপ্রিয় স্ট্যান্ড আপ কমেডিয়ান মল্লিকা দুয়া।

ছবির কপিরাইট SAJJAD HUSSAIN
Image caption সাচিন টেন্ডুলকর

মল্লিকার প্রশ্ন, "রোজ তো অনাহার-অবসাদ-মহামারী বা বেকারত্বর জ্বালাতেও কত লোক মারা যায়, কই তখন তো আমাদের জীবন স্বাভাবিক ছন্দেই চলতে থাকে।"

"আর এখন সারা দেশ কাঁদছে, তুমি কীভাবে হাসতে পারো এটা আবার কী ধরনের যুক্তি?"

এদিকে নীনা গুপ্তার মতো কোনও কোনও তারকা আবার সোশ্যাল মিডিয়াতে দেশপ্রেমের গান গেয়ে পোস্ট করছেন, তাতে হাজার হাজার 'লাইক' পড়ছে, বহু মানুষ সাধুবাদ জানাচ্ছেন তার 'সাহসে'র।

পাশাপাশি ভারতীয় ক্রিকেটের ঈশ্বর বলে যার পরিচিতি, সেই সচিন টেন্ডুলকরকে পর্যন্ত এখন এই ইস্যুতে আক্রমণের নিশানায়।

ছবির কপিরাইট SOPA Images
Image caption এই ইডেনের দেওয়াল থেকেই ইমরান খান-ওয়াসিম আক্রমদের ছবি সরানোর দাবি উঠেছে

কারণ তিনি শুধু বলেছিলেন বিশ্বকাপে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ম্যাচ বর্জন করে ভারতের দুটো পয়েন্ট খোয়ানো বুদ্ধিমানের কাজ হবে বলে তিনি মনে করেন না।

টেন্ডুলকরের এক সময়ের সতীর্থ ও সাবেক ভারতীয় অধিনায়ক সৌরভ গাঙ্গুলিও এই মন্তব্যকে কটাক্ষ করে বলেছেন, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে দুটো পয়েন্ট নয় - বিশ্বকাপ জেতাটাই বরং লক্ষ্য হওয়া উচিত।

কলকাতার আইকনিক ইডেন গার্ডেন্সের দেওয়াল থেকে ইমরান খানের ছবি নামিয়ে নেওয়ার দাবিও তারা বিবেচনা করছেন বলে জানিয়েছেন বর্তমানে ক্রিকেট প্রশাসক সৌরভ গাঙ্গুলি।

যে সব ঘটনাপ্রবাহ থেকে স্পষ্ট, ভারতে এখন পাকিস্তান-বিরোধিতা শুধু মনে মনে পুষে রাখলেই চলবে না - তা পরিষ্কারভাবে দেখাতেও হবে।