পাকিস্তানে এখন নিষিদ্ধ ভারতীয় সিনেমা: আসলে ক্ষতি হচ্ছে কার?

পাকিস্তানে শাহরুখ খানের মতো ভারতীয় সিনেমা তারকারা খুবই জনপ্রিয় ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption পাকিস্তানে শাহরুখ খানের মতো ভারতীয় সিনেমা তারকারা খুবই জনপ্রিয়

কাশ্মীর নিয়ে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধাবস্থা তৈরি হবার ফলে পাকিস্তানের সাংস্কৃতিক জগতে অন্তত: একটা ক্ষেত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিক্রিয়া হয়েছে। পাকিস্তানের কর্তৃপক্ষ সেদেশে ভারতীয় সিনেমা ও টিভি চ্যানেলগুলোও বন্ধ করে দিয়েছে।

বিবিসির সংবাদদাতা ইলিয়াস খান আর শুমায়লা জাফরি রিপোর্ট করছেন, এটা হয়তো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে খুবই সহজ, কিন্তু একটা সন্দেহও দেখা দিয়েছে যে পাকিস্তানের কর্তৃপক্ষ ভুল জায়গায় আঘাত হেনেছে কিনা।

কারণটা হলো, ১৯৪৭ সাল থেকে ভারত আর পাকিস্তানের মধ্যে যতই শত্রুতা-বৈরিতা থাকুক, পাকিস্তানের মানুষের মধ্যে বলিউড-প্রীতি কিন্তু চিরকালই অটুট রয়ে গেছে।

কিন্তু ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে জঙ্গী হামলার জবাবে ভারত যখন পাকিস্তানের ভেতরে বিমান হামলা চালালো, এবং পাকিস্তান তার জবাবে ভারতের একটি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করলো - তখন পাকিস্তানের কর্তৃপক্ষ একটা বাড়তি পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে সেদেশে বলিউড ছবি প্রদর্শন বন্ধ করে দিল, যেমনটা আগেও অনেকবার হয়েছে।

তবে মনে রাখা দরকার - প্রথম নিষেধাজ্ঞা কিন্তু আরোপিত হয় ভারতেই।

কাশ্মীর আক্রমণের পর সর্বভারতীয় সিনে ওয়ার্কার্স সমিতি পাকিস্তানি অভিনেতা-কলাকুশলীদের বলিউডে কাজ করার ওপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। তার জবাবেই পাকিস্তানের পাল্টা ব্যবস্থা।

এর আগে ২০১৬ সালেও 'সার্জিক্যাল স্ট্রাইক' ঘটনাবলীর সময় পাকিস্তানের ফাওয়াদ খানের বলিউড ছবিতে অভিনয় নিষিদ্ধ করা হয়।

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption ভারতীয় সিনেমা দেখিয়ে পাকিস্তানের সিনেমা হলগুলো বিপুল পরিমাণ মুনাফা করে

পাকিস্তানের চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতি বলেছে, তারা বলিউড ছবি মুক্তি দেয়া নিষিদ্ধ করছে। মার্চ মাসে পাকিস্তানের সর্বোচ্চ আদালত আরেক কাঠি এগিয়ে এক রুলিং দিলেন যে পাকিস্তানের কোন টিভি চ্যানেলে কোন ভারতীয় 'কনটেন্ট' সম্প্রচার করা যাবে না। এর আওতায় পড়েছে ভারতীয় ফিল্ম, বিজ্ঞাপন এবং টিভি সিরিয়াল।

বলা বাহুল্য, এই পদক্ষেপ অনেকের সমর্থনও পেয়েছে - যারা মনে করেন, যে দেশ পাকিস্তানের ওপর যুদ্ধ চাপিয়ে দিচ্ছে, কী করে তাদের সিনেমা-নাটক পাকিস্তানে মুক্তি পেতে পারে?

কিন্তু এর একটা বিপরীত পক্ষও আছে। পাকিস্তানের মানুষের মধ্যে একটা বড় অংশ আছে - যারা মনে করে ভারতীয় সিনেমা-নাটকে তারা যে বিনোদন পান, তা এই নিষেধাজ্ঞা সমর্থন করার যে দেশাত্মবোধ - তার চেয়ে কম নয়।

যেমন 'ফিল্মের পোকা' আলি শিওয়ারি। ভারতের সিনেমা তাকে এতই অনুপ্রাণিত করেছে যে তিনি এখন চলচ্চিত্র অধ্যয়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

"আমি বড়ই হয়েছি শাহরুখ খান, সালমান খান, আর আমির খানের ছবি দেখে" - বলেন তিনি। তার কথা, এদের মত তারকা পেতে পাকিস্তানি সিনেমা ইন্ডাস্ট্রির এখনো বেশ কিছু দিন লাগবে।

এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, পাকিস্তানে ভারতীয় সিনেমা নিষিদ্ধ করলে দেশটির অর্থনীতিতেও একটা প্রতিক্রিয়া হবে।

"পাকিস্তানের বক্স অফিসকে টিকিয়ে রাখার জন্য ভারতের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি খুবই গুরুত্বপূর্ণ" - বলছেন চলচ্চিত্র সাংবাদিক রাফাই মাহমুদ।

তিনি একটা হিসেব দিচ্ছেন যে পাকিস্তানে সিনেমা হল আছে প্রায় ১২০টি এবং প্রতিটি ছবি মোটামুটি দু'সপ্তাহ ধরে প্রদর্শিত হয়। সুতরাং একটা হলকে ব্যবসায় টিকে থাকতে হলে বছরে অন্তত ২৬টা ছবি দেখাতে হয়। কিন্তু পাকিস্তানের নিজস্ব যে চলচ্চিত্র শিল্প তাতে বছরে মাত্র ১২ থেকে ১৫টি ছবি তৈরি হয়।

বিবিসি বাংলায় আরো পড়ুন:

ভারত কি মুসলিমদেরও দেশ নয়? আলোচনায় 'মুল্ক'

ভারত-পাকিস্তান নিয়ে মন্তব্য করে বিপাকে কমেডিয়ান

'ছাদে উঠে চেঁচিয়ে বলতে পারব না দেশকে ভালবাসি'

রাফাই মাহমুদ বলছেন, পাকিস্তানে তৈরি ছবি বড় সংখ্যায় দর্শক টানতে পারে না।

আরেকজন সাংবাদিক হাসান জায়দী বলছেন, বাস্তবতা হচ্ছে এই যে পাকিস্তানের চলচ্চিত্র শিল্পের ৭০ ভাগ রাজস্বই আসে ভারতীয় সিনেমা প্রদর্শনের মাধ্যমে।

মি. জায়দী বলছেন, "ভারতীয় ছবির ওপর নিষেধাজ্ঞা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়, কারণ এখানকার ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি বলিউডকে ছাড়া টিকে থাকতে পারবে না।"

এর আগেও পাকিস্তানে বলিউডের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছে। সবচেয়ে দীর্ঘ নিষেধাজ্ঞা ছিল ১৯৬৫ থেকে ২০০৫ পর্যন্ত ৪০ বছর স্থায়ী। কিন্তু তা পাকিস্তানের চলচ্চিত্র শিল্পে ধস নামায়, শত শত সিনেমা হল পরিণত হয় শপিং মল বা বিয়ের অনুষ্ঠানস্থলে।

এ নিষেধাজ্ঞা উঠে যাবার পর পাকিস্তানে চলচ্চিত্র শিল্প আবার উঠে দাঁড়াতে শুরু করেছে।

"দর্শকরা এখন সিনেমা হলে ফিরে আসছে, পাকিস্তানি চলচ্চিত্র নির্মাতারা ছবি প্রযোজনায় আগ্রহী হচ্ছেন। তবে তাদের ছবিগুলো বাজেট বা তারকার খ্যাতির দিক থেকে বলিউডের সমান নয়।

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption পাকিস্তানের ফিল্মস্টার ফাওয়াদ খান ভারতেও জনপ্রিয়

তবে এটাও মনে রাখতে হবে, ভারতও সিনেমার ক্ষেত্রে পাকিস্তানের ওপর এরকম নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।

২০১৬ সালেও 'সার্জিক্যাল স্ট্রাইক' ঘটনাবলীর সময় পাকিস্তানের ফাওয়াদ খানের বলিউড ছবিতে অভিনয় নিষিদ্ধ করা হয়। ২০১৭ সালে পাকিস্তানি অভিনেত্রী মাহিরা খান ও ভারতের শাহরুখ খানের একটি ছবি উগ্র ডানপন্থী হিন্দু গোষ্ঠীগুলোর আপত্তির কারণে মুক্তি বিলম্তি হয়। পাকিস্তানে সেন্সর বোর্ডের আপত্তির কারণে ছবিটি প্রদর্শিতই হয় নি।

তাহলে সবশেষ এই নিষেধাজ্ঞা কতদিন চলবে?

পাকিস্তানি চলচ্চিত্র প্রযোজক নাদিম মান্ডভিওয়ালা বলছেন, তিনি আশা করেন এ নিষেধাজ্ঞা হবে সাময়িক এবং শুভবুদ্ধিরই জয় হবে।

তা ছাড়া আরো একটা কথা আছে।

এ যুগে সিনেমা হলে না গিয়েও নেটফ্লিক্সে, ইউটিউবে বা অন্য প্ল্যাটফর্মে বলিউড মুভি দেখা যায়। ফলে পাকিস্তানের এ নিষেধাজ্ঞা অনেকটাই প্রতীকী, এ দিয়ে আসলে কিছুই বন্ধ করা যাচ্ছে না।

আরো পড়ুন:

'সুষ্ঠু নির্বাচন হলে ছাত্রলীগ একটি পদও পাবে না' - নূর

ডাকসু নির্বাচন: যে সমীকরণে দাঁড়ালো এমন ফলাফল

ডাকসুতে ছাত্রলীগের শোভন পরাজিত, নুরুল ভিপি