নরেন্দ্র মোদী সরকারের আমলে অভিধানে ঢুকল যে ছ'টি নতুন শব্দ

নরেন্দ্র মোদী ছবির কপিরাইট Hindustan Times
Image caption নরেন্দ্র মোদী

ভারতে গত পাঁচ বছরে নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকারের আমলে এমন কতগুলো নতুন শব্দের আমদানি হয়েছে, যেগুলোর সঙ্গে আগে সে দেশের মানুষজনের কোনও পরিচয় ছিল না।

কিন্তু এখন 'আচ্ছে দিন', 'মিত্রোঁ' বা 'নোটবন্দী'-র মতো বিভিন্ন শব্দ সমাজের প্রায় সব শ্রেণীর মানুষই অহরহ ব্যবহার করছেন।

আবার গরু রক্ষার নামে ভারতে যারা মানুষ পিটিয়ে মারছেন, তাদেরকে বলা হচ্ছে 'গোরক্ষক'।

দুবছর আগে উরি-তে জঙ্গী হামলার পর পাকিস্তানে ভারত যে অভিযান চালিয়েছিল তার পর থেকে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে 'সার্জিক্যাল স্ট্রাইক'।

পাশাপাশি নরেন্দ্র মোদী বা বিজেপির অন্ধ অনুগামীদের ব্যঙ্গ করে বলা হচ্ছে 'ভক্ত্'। শব্দটাকে প্রায় গালিগালাজ বলেই ধরা হচ্ছে।

পর্যবেক্ষক ও বিশেষজ্ঞরা অবশ্য মনে করিয়ে দিচ্ছেন, অনেক সময়ই শব্দগুলো যে উদ্দেশ্য নিয়ে তৈরি, সাধারণ মানুষ কিন্তু তা ব্যবহার করছেন সম্পূর্ণ আলাদা অর্থে।

ভারতের সামাজিক ও রাজনৈতিক মানচিত্রে এই সব নতুন শব্দ কীভাবে জায়গা করে নিচ্ছে, এখানে তারই ছটি দৃষ্টান্ত ব্যাখ্যা করা হল।

মিত্রোঁ

পাঁচ বছর আগে নরেন্দ্র মোদী যখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী হন, তখন প্রায় নিয়ম করে প্রতিটি জনসভায় তিনি শ্রোতাদের সম্বোধন করতেন 'মিত্রোঁ' বলে, যার অর্থ বন্ধুরা।

এমন কী, ২০১৬তে যে ভাষণে তিনি দেশে পাঁচশো আর হাজার রুপির নোট বাতিল ঘোষণা করেন, তার শুরুতেও তিনি বলেছিলেন মিত্রোঁ।

ছবির কপিরাইট শশী থারুর/টুইটার
Image caption মিত্রোঁ নিয়ে কংগ্রেস নেতা শশী থারুরের টুইট

তখন থেকেই এই শব্দটি ভারতে হাসিঠাট্টা কিংবা ভয় দেখানোর অস্ত্রে পরিণত হয়েছে, কমেডিয়ানরা এই মিত্রোঁ, যার উচ্চারণ অনেকটা 'মিটরন'-এর মতো, তাকে তুলনা করছেন প্রোটন-নিউট্রনের মতোই নতুন কোনও আণবিক কণার সঙ্গে।

নরেন্দ্র মোদী আজকাল আর মিত্রোঁ তেমন একটা বলেনই না, কিন্তু শব্দটি প্রায় পাকাপাকিভাবে ঢুকে গেছে ভারতীয়দের অভিধানে।

কংগ্রেস নেতা শশী থারুর টুইট করেছিলেন, "একটি ছোট্ট মেয়ে বাবাকে জিজ্ঞেস করল, সব রূপকথাই কি 'ওয়ানস আপন আ টাইম' দিয়ে শুরু হয়?"

"বাবা জবাব দিলেন, না, আজকাল রূপকথা শুরু হয় মিত্রোঁ দিয়ে!"

সাহিত্যিক নবনীতা দেবসেনও বিবিসিকে বলছিলেন, "আজকাল মিত্রোঁ শুনলে কেউ কিন্তু আর প্রিয় বন্ধুদের কথা ভাবে না, বরং চোখের সামনে মাঠভর্তি শ্রোতার ছবিই ভেসে ওঠে।"

আচ্ছে দিন

পাঁচ বছর আগে যে 'আচ্ছে দিন' বা সুদিন আনার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেছিল বিজেপি, সেই শব্দটিরও একই পরিণতি হয়েছে।

অল্ট নিউজের প্রধান প্রতীক সিনহা বলছিলেন, 'আচ্ছে দিনে'র মতো শব্দ বিজেপি ব্যবহার করেছিল একটা বিপণনের উদ্দেশ্য নিয়ে - যাতে শব্দটা মানুষের মনে গেঁথে যায়।

এই ইন্টারনেট আর হ্যাশট্যাগের যুগে এই শব্দগুলো ছড়িয়েওছিল ঝড়ের গতিতে।

ছবির কপিরাইট SEBASTIAN D'SOUZA
Image caption কৃষকদের দুর্দশার প্রসঙ্গ তুলে বিরোধীরা এখন বিজেপিকে বিদ্রূপ করছেন 'আচ্ছে দিন' নিয়ে

"কিন্তু আচ্ছে দিন শব্দটা বিজেপির জন্য পুরোপুরি ব্যাকফায়ার করেছে - যেমন বিজেপি নেতারা এখন আর মিটিং-মিছিলে আচ্ছে দিন কথাটা উচ্চারণ করারও সাহস পান না", বলছেন মি সিনহা।

চাকরি বা রুজিরোজগারের অভাব কিংবা অর্থনীতির যে কোনও সঙ্কটের কথা উঠলেই ভারতের মানুষ এখন ব্যঙ্গ করে বলেন, "এই তো এসেছে আচ্ছে দিন!"

মানুষের মুখে মুখে কথাটা ফিরলেও আসন্ন নির্বাচনের প্রচারে বিজেপি কিন্তু ভুলেও আর ''আচ্ছে দিনে''র কথা তুলতে চায় না।

নোটবন্দী

২০১৬-র নভেম্বরের এক সন্ধ্যায় নরেন্দ্র মোদী যখন নাটকীয়ভাবে দেশে পাঁচশো আর হাজার রুপির সব পুরনো নোট বাতিল ঘোষণা করেন, সেদিনই ভারতে জন্ম হয় একটি নতুন শব্দের - নোটবন্দী।

ইংরেজিতে যেটাকে বলা হয় 'ডিমনিটাইজেশন', হিন্দিতে তারই নামকরণ করা হল নোটবন্দী।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এর আগে কারেন্সি নোট বাতিল করা হলেও স্বাধীন ভারতে এই পদক্ষেপ ছিল প্রথমবারের মতো, ফলে হিন্দিতে এর আগে ডিমনিটাইজেশনের কোনও উপযুক্ত প্রতিশব্দ ছিল না।

ছবির কপিরাইট NurPhoto
Image caption নোটবন্দীর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। কলকাতা, ২০১৬

মোদী জমানায় সেই অভাবই শুধু মিটল না, টাকা তোলার জন্য এটিএমের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে প্রায় গোটা দেশ এই নোটবন্দীর ভাল-মন্দ নিয়ে প্রায় দুভাগই হয়ে গিয়েছিল বলা চলে।

একদল মনে করেছিলেন, কালো টাকার কারবারিদের মাজা ভেঙে দিতে এটি প্রধানমন্ত্রী মোদীর দারুণ সাহসী ও কুশলী মাস্টারস্ট্রোক।

অন্য দিকে নোট বাতিলের ফলে চরম দুর্ভোগে পড়েছিলেন দেশের কোটি কোটি মানুষ, তারা অনেকেই নিজেদের রুটিরুজি বিপন্ন হওয়ার জন্য সরাসরি দায়ী করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী মোদীকে।

আজ প্রায় আড়াই বছর পরও সে বিতর্ক পুরোপুরি থামেনি। আর ভারতে অর্থনীতি নিয়ে যে কোনও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়ে গেছে সেই নোটবন্দী শব্দটি।

গোরক্ষক / মব লিঞ্চিং

ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে, বিশেষত হিন্দি বলয়ে, গত কয়েক বছরে গরু রক্ষার নামে কত লোককে যে পিটিয়ে মারা হয়েছে তার কোনও ইয়ত্তা নেই।

হাতে গোনা কয়েকটি রাজ্য বাদ দিলে প্রায় গোটা ভারতেই বিফ বা গরুর মাংস নিষিদ্ধ, আর সে সব রাজ্যেই বিশেষ করে রাস্তার মোড়ে মোড়ে পাহারাদারের ভূমিকায় দেখা গেছে হিন্দুত্ববাদী টহলদার বাহিনীকে।

অভিযোগ উঠেছে, গরু পাচার ঠেকানোর নামে তারা বেশির ভাগ সময় ভয় দেখিয়ে টাকা-পয়সা আদায়ের কাজেই ব্যস্ত থাকছে। টাকা না-পেলে মেরে ফেলা হচ্ছে খামারিদের, যাদের বেশির ভাগই মুসলিম।

ইংরেজিতে এই বাহিনীকেই বলা হচ্ছে 'কাউ ভিজিলান্টে', আর হিন্দিতে বলা হচ্ছে গোরক্ষক।

ছবির কপিরাইট Allison Joyce
Image caption রাজস্থানে একটি গোরক্ষক বাহিনীর টহল

"তবু মিত্রোঁ আর আচ্ছে দিন নিয়ে হাসাহাসি চলতে পারে, কিন্তু এই গোরক্ষক বা মব-লিঞ্চিংয়ের তাৎপর্য আসলে অনেক ভয়াবহ," বিবিসিকে বলছিলেন সিপিআইএমএল দলের সাধারণ সম্পাদক দীপঙ্কর ভট্টাচার্য।

"দেশের অনেক মানুষ এই শব্দগুলো শুনলে আতঙ্কে সিঁটিয়ে যাচ্ছে।"

"নইলে ভাবুন, জনতার সহিংসতা বা পিটুনিতে কাউকে মেরে ফেলার যে ইংরেজি শব্দ - সেই মব লিঞ্চিং কথাটা এখন গ্রামীণ ভারতের আনাচে-কানাচে, দেশের সবগুলো ভাষায় কীভাবে ঢুকে যেতে পারে?", প্রশ্ন তুলছেন তিনি।

ভারতের কিছু মানবাধিকার সংগঠন বলছে, ভারতের কিছু কিছু অঞ্চলে 'গোরক্ষক' এখন একটা পুরোদস্তুর পেশার নাম।

সার্জিক্যাল স্ট্রাইক

২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে ভারত-শাসিত কাশ্মীরের উরিতে জঙ্গী হামলার দশদিনের মাথায় নিয়ন্ত্রণরেখা পেরিয়ে পাকিস্তানে ঢুকে অভিযান চালানোর দাবি করেছিল ভারতীয় সেনাবাহিনী।

ভারতীয় সেনার তদানীন্তন ডিরেক্টর জেনারেল (মিলিটারি অপারেশনস) রণবীর সিং সে দিনই দিল্লিতে এক সাংবাদিক সম্মেলনে জানান, সামরিক বা বেসামরিক কোনও স্থাপনায় নয় - নির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে জঙ্গীদের লঞ্চপ্যাডগুলোতেই শুধু হামলা চালানো হয়েছে।

ছবির কপিরাইট Hindustan Times
Image caption ভারতের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পালিত হচ্ছে সার্জিক্যাল স্ট্রাইক দিবস

তিনি সেই হামলাকে 'সার্জিক্যাল স্ট্রাইক' বলে অভিহিত করেছিলেন, যে শব্দবন্ধটি এরপর সারা ভারতে অসম্ভব জনপ্রিয়তা পায়।

শুধু যুদ্ধ বা সংঘাতের পটভূমিতে নয়, যে কোনও জায়গায় গিয়ে খুব সূক্ষভাবে কোনও অভিযান বা হামলা চালানো বোঝাতেই সার্জিক্যাল স্ট্রাইক শব্দটি ব্যবহার করা শুরু করেন ভারতীয়রা।

নোটবন্দীর পক্ষে সওয়াল করতে গিয়ে ভারতের তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী মনোহর পারিক্কর যেমন বলেছিলেন, "এটা হল দেশের কালো টাকা, সন্ত্রাসবাদ কিংবা মাচক পাচারের অর্থের বিরুদ্ধে নরেন্দ্র মোদীর সার্জিক্যাল স্ট্রাইক!"

বামপন্থী রাজনীতিবিদ দীপঙ্কর ভট্টাচার্য আবার বলছেন, "আমি তো আবার হিন্দি বলয়ে লোকজনকে সার্জিক্যাল স্ট্রাইকের বদলে ফর্জিক্যাল স্ট্রাইক (জাল অভিযান) বলতেই বেশি শুনি!"

ভক্ত্

বাংলায় 'ভক্ত' বলতে যা বোঝায়, ভারতের নতুন রাজনৈতিক পরিভাষায় তার চেয়ে এই 'ভক্ত্' শব্দটার কনোটেশান বা ভাবার্থ একটু আলাদা।

ভারতে ভক্ত্ বলতে বোঝানো হয় নরেন্দ্র মোদী বা তার দল বিজেপির অন্ধ অনুগামীদের, যারা বিনা প্রশ্নে সব ইস্যুতে তাদের সমর্থন করে থাকেন।

ফেসবুক-টুইটার-হোয়াটসঅ্যাপের মতো সোশ্যাল মিডিয়াতে ভক্ত্ শব্দটা মোদী-অনুগামীদের বিরুদ্ধে প্রায় একটা গালিগালাজ হিসেবেই ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

ছবির কপিরাইট NARINDER NANU
Image caption বিজেপি তথা নরেন্দ্র মোদীর অন্ধ অনুগামীদেরই ডাকা হচ্ছে ভক্ত্ বলে

মিত্রোঁ বা সার্জিক্যাল স্ট্রাইকের চেয়ে ভক্ত্ শব্দটা একটু বেশি পুরনো - তবে তা প্রবলভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে গত পাঁচ বছরেই।

তবে এই শব্দটা হিন্দি বলয়ে যতটা জনপ্রিয়, বাঙালিদের মধ্যে ততটা ঢুকতে পারেনি বলেই বলছেন তৃণমূল কংগ্রেসের এমপি ও অভিনেত্রী শতাব্দী রায়।

তার কথায়, "দিল্লিতে যখন থাকি বা পার্লামেন্টে যাই তখন এই ভক্ত্-জাতীয় শব্দগুলো অনেক বেশি শুনি। পশ্চিমবঙ্গের গ্রামেগঞ্জে অবশ্য অতটা শুনি না - এখানে বরং দেখি বিজেপি জয় শ্রীরামের মতো স্লোগান জনপ্রিয় করতে চাইছে!"

কিন্তু বিজেপি যাকে বলছে 'মোদীর ভারত', সেখানে সমাজ ও রাজনীতির আলোচনায় নতুন এই শব্দগুলো যে মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে বিরাট জায়গা করে নিতে পরেছে তাতে কোনও সন্দেহ নেই।

সম্পর্কিত বিষয়