বিভেদের রাজনীতি ঠেকাতে জাসিন্ডা আরডার্ন কি হতে পারেন নতুন দৃষ্টান্ত?

জাসিন্ডা আরডার্ন ছবির কপিরাইট CHRISTCHURCH KENT KONSEYİ
Image caption জাসিন্ডা আরডার্ন

ক্রাইস্টচার্চে দুটি মসজিদে সন্ত্রাসী হামলায় ৫০ জন নিহত হবার ঘটনার পর নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জাসিন্ডা আরডার্ন এক সংকটপূর্ণ মুহূর্তে যে নেতৃত্বগুণ দেখিয়েছেন - তা বিপুলভাবে প্রশংসিত হয়েছে ।

"অনেক দিক দিয়েই এটা ছিল রাজনৈতিক নেতৃত্বের এক চমৎকার উদাহরণ" - বলছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং বিবিসির সাবেক সাংবাদিক রবিন লাস্টিগ।

তিনি বলছেন - "শুধু তার বক্তব্যের জন্য নয়, আসল কথাটা হলো: তিনি জাতির সেই মুহূর্তে কি প্রয়োজন সেটা উপলল্ধি করেছেন এবং এমনভাবে তাতে সাড়া দিয়েছেন যে তা এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।"

বিবিসি বাংলায় আরো পড়ুন:

বিশ্বব্যাপী বর্ণবাদ প্রতিহত করার আহ্বান আরডার্নের

জাসিন্ডা আরডের্ন: ভালবাসা দিয়ে 'হৃদয় জয়' করলেন যিনি

ছবির কপিরাইট EPA
Image caption ক্রাইস্টচার্চ আক্রমণের শিকারদের পরিবারের সাথে আরডার্ন

সারা বিশ্বের প্রশংসা পেয়েছেন জাসিন্ডা আরডার্ন

'নেতৃত্ব কাকে বলে তা দেখিয়ে দিয়েছেন তিনি" - বলেছেন অস্ট্রেলিয়ার এক ওয়েবসাইটে মন্তব্য করেন গ্রেস ব্যাক নামে একজন।

ওই আক্রমণের ভিডিও জনসভায় দেখিয়ে সমালোচিত হওয়া তুর্কি প্রেসিডেন্ট রেচেপ তায়েপ এরদোয়ান বলেছেন, মিসেস আরডার্নের সহমর্মিতা এক দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

ব্রিটিশ দৈনিক গার্ডিয়ানের কলামিস্ট সুজান মুর লেখেন, "সন্ত্রাস মানুষের ভিন্নতাকে নিশ্চিহ্ন করতে চায়, আর মিসেস আরডার্ন তাকে সম্মান দেখিয়েছেন এবং তার সাথে যুক্ত হতে চেয়েছেন।"

অস্ট্রেলিয়ান সংবাদ মাধ্যম বলেছে, জাসিন্ডা আরডার্ন একটিও ভুল পদক্ষেপ নেননি।

তিনি এমন ভাবে সঠিক কথাগুলো বলেছেন যা খুব নেতাই বলতে পেরেছেন।


'নেতা কাকে বলে দেখিয়েছেন তিনি'

জাসিন্ডা আরডার্নের বয়েস ৩৮। তিনি নিজেকে বলেন একজন সমাজবাদী গণতন্ত্রী বা সোশাল ডেমোক্র্যাট এবং প্রগতিশীল।

তিনি প্রধানমন্ত্রী হন ৩৭ বছর বয়েসে। তিনি একজন 'অজ্ঞেয়বাদী' বা এ্যাগনস্টিক - যারা ঈশ্বর আছেন কি নেই - তা জানতে চান না বা এ নিয়ে মাথা ঘামান না। তবে তিনি বড় হয়েছেন মরমোন খ্রীস্টান হিসেবে। তবে সমকামিতা সম্পর্কে এই চার্চের ধারণার সাথে একমত হতে না পেরে তিনি তা ত্যাগ করেছেন।

তিনি সন্তান জন্মের পর ৬ সপ্তাহের মাতৃ্ত্বকালীন ছুটি নিয়েছেন, প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পার্লামেন্টে শিশুকে স্তন্যপান করিয়েছেন। জাসিন্ডা আরডার্ন বিশ্বের প্রথম সরকার প্রধান যিনি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে তার শিশুসন্তানকে নিয়ে গিয়েছিলেন।

ছবির কপিরাইট Reuters
Image caption জাসিন্ডা আরডার্ন বিশ্বের প্রথম সরকার প্রধান যিনি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে তার শিশুসন্তানকে নিয়ে গিয়েছিলেন।

জাসিন্ডার কথা ও কাজ

জাসিন্ডা আরডার্ন মসজিদে আক্রমণের পর প্রথম সংবাদ সম্মেলনেই বলেছিলেন, "স্পষ্টতই একে এখন একটি সন্ত্রাসী আক্রমণ হিসেবেই শুধু বর্ণনা করা যেতে পারে।"

বিবিসির সাংবাদিক আশিথা নাগেশ বলছেন, "এ ঘটনাটিকে দ্রুত একটি 'সন্ত্রাসী আক্রমণ' বলে চিহ্নিত করে মিজ আরডার্ন দেখিযে দিয়েছেন যে তিনি এ ব্যাপারটি সম্পর্কে সচেতন যে আক্রমণকারী শ্বেতাঙ্গ হলে অনেকেই এ শব্দটি ব্যবহার করতে চান না, এমনকি যখন আক্রমণটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তখনো নয়।"

সেই আক্রমণে যারা নিহত হন - তারা ভারত, পাকিস্তান, মিশর, জর্ডন, সোমালিয়া - এরকম নানা দেশ থেকে আসা। কিন্তু আক্রমণের কয়েক ঘন্টা পরই জাসিন্ডা বলেন - 'যারা নিহত হয়েছে তারা আমরাই' - এবং তিনি শুধু যে নিউজিল্যান্ডের লোকদের উদ্দেশ্যেই এ কথা বলছিলেন তা নয়।

মি. লাস্টিগ বলছিলেন, ব্রাজিল, চীন, হাঙ্গেরি, ভারত বা তুরস্ক - এমন অনেক দেশ আছে যেখানে নেতারা এক সম্প্রদায়কে আরেকটির বিরুদ্ধে লাগিয়ে দেন।

কিন্তু জাসিন্ডা যখন বললেন 'দে আর আস' - তখন বিভেদ নয়, ঐক্যের ডাক দিয়েছেন।

তা ছাড়া হিজাব পরে, ঘটনায় নিহতদের পরিবারের সদস্যদের জড়িয়ে ধরে তিনি সহমর্মিতা দেখিয়েছেন তাও প্রশংসিত হয়েছে। ঘটনার পর পার্লামেন্টে জাসিন্ডা আরডার্ন তার বক্তব্য শুরু করেন ইসলামী স্বাগত জানানোর উক্তি 'আসসালামু আলাইকুম' বলে।

সব সফল নেতার মতই জাসিন্ডা আরডার্ন জানেন - একটি শব্দের শক্তি কত এবং তিনি সেগুলো ব্যবহার করেছেন ক্ষত সৃষ্টির জন্য নয়, বরং নিরাময়ের জন্য - বলছেন মি. লাস্টিগ।

এর ফলে যেসব নেতাকে 'দক্ষিণপন্থী স্ট্রংম্যান' বলে বর্ণনা করেন রাজনৈতিক ভাষ্যকারেরা - যেমন আমেরিকার ডোনাল্ড ট্রাম্প, হাঙ্গেরির ভিক্টর অরবান, বা ভারতের নরেন্দ্র মোদী - তাদের সাথে জাসিন্ডা আরডার্নের পার্থক্য কোথায় - তা সবার চোখে স্পষ্ট হয়েছে।

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption জাসিন্ডাম্যানিয়া কথাটা এখন সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে

ওই নেতাদের সবারই রাজনৈতিক কেরিয়ার গড়ে উঠেছে অনুদার মুসলিম-বিরোধী কথাবার্তার মধ্যে দিয়ে।

মি. লাস্টিগ বলছেন, 'অভিবাসীতে শহর ভরে যাচ্ছে' নিকাব-পরা মুসলিম মহিলাদের 'লেটারবক্স বা ব্যাংক ডাকাতের মতো দেখাচ্ছে' এরকম কথা জাসিন্ডা আরডার্নের মুখে শোনা যাচ্ছে না।

তা ছাড়া তিনি শুধু কথায় না কাজে বিশ্বাসী। তিনি নিউজিল্যান্ডের বন্দুক আইন কঠোর করা এবং বর্ণবাদ দূর করার কথা বলছেন।

নিউজিল্যান্ডের মানুষ এ জন্যই তার পাশে দাঁড়িয়েছে।

'জাসিন্ডাম্যানিয়া' এখন সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে, তবে বিশ্বের অন্য নেতাদের ওপরএর কতটা প্রভাব পড়ে তা এখনো দেখার বিষয়।

বিবিসি বাংলায় আরো পড়ুন :

বড় সমস্যা হয়ে উঠছে 'এন্টিবায়োটিকে কাজ না হওয়া'

চীন আর আমেরিকার মধ্যে কি যুদ্ধ বেধে যাবে?

কেন আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায়নি ২৫শে মার্চ গণহত্যা দিবস?