স্কুলে যৌন শিক্ষা: বাংলাদেশে ‘জেনারেশন ব্রেকথ্রু’ প্রকল্পের ক্লাসরুমে যা পড়ানো হচ্ছে

ক্লাসরুম
Image caption বাংলাদেশের সাড়ে তিনশ বিদ্যালয়ে গত ৫ বছর ধরে পড়ানো হচ্ছে একটি কোর্স, যেটি অনেকটা পশ্চিমা দেশগুলোর বিদ্যালয়ের সেক্স এডুকেশন বা যৌন শিক্ষা কোর্সের আদলে সাজানো।

বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতায় মাসিক, স্বপ্নদোষ, কনডম ইত্যাদি শব্দকে নিষিদ্ধ জ্ঞান করা হয়। কিন্তু ঢাকার বিমানবন্দরের কাছে আশকোনা এলাকার একটি বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা গেল শিক্ষার্থীরা ক্লাসরুমেই এসব শব্দ নিয়ে অবলীলায় আলোচনা করছে।

তারা বয়ঃসন্ধিকালীন এসব অবশ্যম্ভাবী ইস্যুগুলো সম্পর্কে জানছে। তারা শিখছে প্রজননস্বাস্থ্যের নানা দিক। যৌনবাহিত এবং যৌনাঙ্গবাহিত রোগ সম্পর্কে অবহিত হচ্ছে। শিখছে এসব রোগ থেকে দূরে থাকার উপায়।

এই প্রশিক্ষণের জন্য তারা সাহায্য নিচ্ছে নানা রকম কম্পিউটার গেম এবং লুডো ও মনোপলির মতো দুটি বোর্ড গেমের। সেই সঙ্গে ক্লাস লেকচার তো রয়েছেই।

আশকোনার এই বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের কিশোর কিশোরী কর্নারে আমি যেদিন যাই, সেদিন তাদের পড়ানো হচ্ছিল বাল্যবিবাহ নিয়ে। বাল্যবিবাহ নিরোধ নিয়ে শিশুরা একটি নাটিকার মহড়া করছে শিক্ষার্থীরা, আমাকে সেটিও তারা দেখালো।

এই বিদ্যালয়ের একটি বিশেষ শ্রেণীকক্ষে গত ৫ বছর ধরে এসব শিখছে বিদ্যালয়টি ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত ছাত্রছাত্রীরা।

বাংলাদেশ সরকারের 'জেনারেশন ব্রেকথ্রু' নামের একটি প্রকল্পের আওতায় এই শ্রেণীকক্ষটি তৈরি হয়েছে। কক্ষটির নাম দেয়া হয়েছে 'কিশোর কিশোরী কর্নার'। আর এখানে তারা পড়ছে 'জেমস' নামে একটি কোর্স যেটির পূর্ণরূপ দাঁড়ায় 'জেন্ডার ইকুয়িটি মুভমেন্ট ইন স্কুলস'।

কোর্সটি অনেকটা পশ্চিমা দেশগুলোর বিদ্যালয়ে পড়ানো সেক্স এডুকেশন বা যৌন শিক্ষার আদলে সাজানো।

যদিও সংশ্লিষ্টরা এই কোর্সকে যৌন শিক্ষা বলতে নারাজ।

নির্ভয়া ধর্ষণ: আলোচনার বাইরেই রয়ে গেলেন যে নারী

গোলান মালভূমি ইসরায়েলের: স্বীকৃতি দিলেন ট্রাম্প

ইরান বিপ্লবের পর কী হয়েছিল খোমেনির সহযোগীদের

ইতিহাসের সাক্ষী: খোমেনির লাশ নিয়ে মাতম

Image caption আমার জেমস ডায়েরি-ই হচ্ছে এই কোর্সের একমাত্র পাঠ্যপুস্তক।

এই কোর্সটি সাজানো হয়েছে 'আমার জেমস ডায়েরি' নামের একটি বই, সাতটি কম্পিউটার গেমস, দুটি বোর্ড গেম, একটি এনিমেশন ভিডিও আর একশোটি পর্বের রেডিও ধারাবাহিক দিয়ে।

ক্লাসে পড়ানোর জন্য শিক্ষকদের দেয়া হয়েছে বিশেষ প্রশিক্ষণ।

দুই বছরের এই কোর্সে যোগ দিয়ে প্রতিটি শিক্ষার্থী যেসব বিষয় সম্পর্কে জানছে:

  • জেন্ডার সমতা
  • বাল্যবিবাহ
  • মাসিক রজঃস্রাব
  • স্বপ্নদোষ
  • বয়ঃসন্ধিকালীন শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন
  • শারীরিক ও যৌন সহিংসতা
  • যৌনবাহিত রোগ
  • জননাঙ্গবাহিত রোগ
Image caption কোর্সটিকে শিশুদের জন্য সহজবোধ্য করবার জন্য তৈরি করা হয়েছে সাতটি কম্পিউটার গেমস।

জেনারেশন ব্রেকথ্রু: কী আসলে?

কর্মকর্তারা বলছেন, বাংলাদেশে বিদ্যালয়গুলোতে যৌনশিক্ষা দেবার চেষ্টা বহু বছর থেকেই করা হচ্ছে, কিন্তু যৌন বিষয় নিয়ে সামাজিক ট্যাবুর কারণে এটা সফল করা যায়নি কখনো।

এমনকি পাঠ্যপুস্তকে যৌন শিক্ষা বিষয়ক অধ্যায় জুড়ে দেবার পরও দেখা গেছে শ্রেণীকক্ষে সেসব অধ্যায় শিক্ষকেরা পড়াচ্ছেন না। শিক্ষার্থীদেরকে বাড়িতে গিয়ে এসব অধ্যায় পড়বার পরামর্শ দিচ্ছেন তারা।

আর অনেক ক্ষেত্রেই দেখা গেছে অভিভাবকেরা বইয়ের সেসব অধ্যায় স্টাপলিং করে আটকে দিচ্ছে, যাতে অধ্যায়গুলো শিক্ষার্থীদের নজরে না পড়ে।

ফলে বিদেশী দাতাদের অর্থায়নে ২০১৪ সালে যখন ৫ বছর মেয়াদী জেনারেশন ব্রেকথ্রু প্রকল্পটি শুরু হয় বাংলাদেশের চারটি জেলার তিনশো ৫০টি বিদ্যালয়ে, তখন তারা এই ট্যাবুর বিষয়টি মাথায় রেখেছিলেন।

এই প্রকল্পের পরিচালক ড. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর হোসেন বলছেন, প্রকল্পটি শুরু করতে গিয়ে স্কুলগুলো থেকে বাধা আসবে বলে আশঙ্কা করেছিলেন তারা।

কিন্তু বাধা যতটুকু এসেছে তা ঢাকার বিদ্যালয়গুলো থেকে। মফস্বলের বিদ্যালয়গুলো থেকে কোন বাধা আসেনি।

Image caption চার জেলার সাড়ে তিনশ স্কুলে পাইলট আকারে চালানো হয় ৫ বছরের 'জেনারেশন ব্রেকথ্রু' প্রকল্প। এসব স্কুলের মধ্যে ছিল ৫০টি মাদ্রাসা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও।

শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা কোর্সটিকে স্বাভাবিকভাবেই গ্রহণ করেছে। এমনকি প্রকল্পে যে ৫০টি মাদ্রাসাকে যুক্ত করা হয়েছিল, সেখান থেকে এসেছিল অভূতপূর্ব ইতিবাচক সাড়া।

ড. হোসেন বলছেন, 'বাস্তবে দেখা গেল মাদ্রাসার শিক্ষক-শিক্ষার্থী-অভিভাবকেরা এ বিষয়ে অনেক অগ্রসর'।

সাফল্য এলো কি?

প্রকল্পের মেয়াদের পাঁচ বছর শেষে এসে দেখা যে বিদ্যালয়গুলোতে এই বিষয়টি পড়ানো হচ্ছে সেখানকার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সুস্পষ্ট পার্থক্য দেখা যাচ্ছে যেসব বিদ্যালয়ে এই বিষয়টি পড়ানো হয়না, সেখানকার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে।

বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের এক ছাত্র আমাকে বলছিল, "আমার অন্যান্য স্কুলের যেসব বন্ধু আছে তারা এইসব শব্দ শুনলে অনেক লজ্জা পায়। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে আর এসব হয় না।"

অষ্টম শ্রেণীর একজন ছাত্রী বলছিল, "প্রথম প্রথম আমি নিজেও এইসব ব্যাপারে অনেক সংকীর্ণ ছিলাম। যেসব বিষয় আমি আমার মা কিংবা বন্ধুদেরকে বলতে পারতাম না, পরামর্শ চাইতে পারতাম না, এখন অবলীলায় তা পারি।"

Image caption প্রকল্পে যে ৫০টি মাদ্রাসাকে যুক্ত করা হয়েছিল, সেখান থেকে এসেছিল অভূতপূর্ব ইতিবাচক সাড়া।

'জেমস ক্লাস করবার পর আমরা অনেক বেশী ফ্রি হয়ে গেছি', বলছিল সপ্তম শ্রেণীর আরেক ছাত্রী।

যেসব শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে এই জেনারেশন ব্রেকথ্রুর ক্লাসরুমে পাঠানো হয়েছিল, তারাও শুরুর দিকে জড়সড় হয়ে থাকতেন।

"আমাদের নিজেদের ভেতরেই একটা জড়তা ছিল। সেই জড়তা কাটিয়ে উঠতে আমাদের কিন্তু সময় লেগেছে। সেক্স বিষয়ক কোন শব্দ আলোচনায় এলে বাচ্চার লজ্জা পেত," বলছিলেন বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা মঞ্জুয়ারা খাতুন।

কিন্তু এখন পরিস্থিতি পুরো উলটে গেছে, অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে আমাকে বললেন তিনি।

Image caption বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণীর একজন ছাত্রী বলছিল, 'প্রথম প্রথম আমি নিজেও এইসব ব্যাপারে অনেক সংকীর্ণ ছিলাম। যেসব বিষয় আমি আমার মা কিংবা বন্ধুদেরকে বলতে পারতাম না, পরামর্শ চাইতে পারতাম না, এখন অবলীলায় তা পারি।'

কোর্সটি পড়ানো কি বন্ধ হয়ে যাবে?

জেনারেশন ব্রেকথ্রু প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে ২০১৮ শেষ হওয়ার সাথে সাথেই। যদিও অনেক বিদ্যালয়ে কোর্সটি পড়ানো অব্যাহত আছে, বিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে দাতা সংস্থাগুলোর প্রতিনিধিদের যোগাযোগও বন্ধ হয়নি, কিন্তু কাগজে কলমে প্রকল্পটি শেষ।

তাহলে কি বিদ্যালয়গুলোতে যৌন শিক্ষা প্রদানের নতুন এই পদ্ধতিটি বন্ধ হয়ে যাবে?

ড. জাহাঙ্গীর হোসেন বলছেন, তারা অচিরেই প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায় শুরু করতে যাচ্ছেন। সেখানে বিদ্যমান সাড়ে তিনশো বিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত করা হবে আরো দুশোটি বিদ্যালয়।

আর পর্যায়ক্রমে এই কোর্সটিকে অবশ্যপাঠ্য করার পরিকল্পনা রয়েছে বাংলাদেশের সব বিদ্যালয়ে, অবশ্য এখন পর্যন্ত এর সবই রয়েছে আলোচনা পর্যায়ে।

আপনার ডিভাইস মিডিয়া প্লেব্যাক সমর্থন করে না
ক্লাসরুমে মনোপলির আদলে একটি বোর্ডগেমের মাধ্যমে বয়ঃসন্ধিকালীন নানা শারিরীক পরিবর্তন সম্পর্কে জানছে শিক্ষার্থীরা।