বনানী অগ্নিকাণ্ড: কুণ্ডুলি পাকানো কালো ধোঁয়া আর দিনভর রুদ্ধশ্বাস অপেক্ষা

ছবির কপিরাইট MUNIR UZ ZAMAN
Image caption একজনকে উদ্ধার করে নিয়ে আসছেন কর্মীরা।

রাজধানীর অন্যতম অভিজাত এলাকা হিসেবে পরিচিত বনানীর বহুতল ভবন এফ আর টাওয়ারে আগুন লাগে দুপুর সাড়ে বারোটা থেকে একটার মধ্যে।

এরপর আগুন নিয়ন্ত্রণে ঘটনাস্থলে পৌঁছায় ফায়ার সার্ভিসের ১২টি ইউনিট।

আগুনের গুরুত্ব বুঝে পরে আরও ৫টি ইউনিট যোগ দিলে, মোট ১৭টি ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণ এবং ভেতর থেকে আটকে পড়া লোকজনকে বের করে আনার জন্য কয়েক ঘণ্টা ধরে চেষ্টা চালিয়ে যায়।

তারপরও এফ আর টাওয়ার এবং পাশের হোটেল সারিনার মাথার ওপর দিয়ে কুণ্ডুলি পাকানো কালো ধোঁয়া নজরে আসছিল বহুদূর থেকেও। একট সময় ঢাকা পড়ে যায় পাশের ছাদের ওপর বড় বড় করে ইংরেজি হরফে 'সারিনা' লেখাটি।

পানির স্বল্পতায় উদ্ধারকাজে ব্যাঘাত ঘটে

ঘটনাস্থল থেকে বিবিসি বাংলার আফরোজা নীলা জানান, পানির স্বল্পতার কারণে আগুন নিয়ন্ত্রণের কাজে ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের বেগ পেতে হচ্ছিল।

বারবার পানি ফুরিয়ে যাচ্ছিল। মাঝে মাঝেই পুরো এলাকাটি ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে যাচ্ছিল।

এরপর বিকেল চারটার দিকে বড় ক্রেনের সাহায্যে ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা উদ্ধার কাজ শুরু করেন।

উদ্ধারকাজে যোগ দেয় অন্য বাহিনীর সদস্যরা

দুই/তিন ঘণ্টা ধরে আগুন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা বিফলে গেলে উদ্ধার তৎপরতায় ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের পাশাপাশি বিভিন্ন বাহিনী কাজ শুরু করে।

২৩ তলা ভবনের ছাদের ওপর চক্কর দিতে শুরু করে বিমানবাহিনীর হেলিকপ্টার।

হেলিকপ্টার থেকে আগুন নেভাতে পানি ছোড়া হয়।

এরপর 'এয়ার-লিফট' পদ্ধতিতে ভবনের ছাদের ওপর আশ্রয় নেয়া মানুষদের হেলিকপ্টারে তুলে নিয়ে আসা হয়।

ছবির কপিরাইট বিবিসি বাংলা
Image caption এফ আর টাওয়ার এবং পাশের হোটেল সারিনার মাথার ওপর দিয়ে কুণ্ডুলি পাকানো কালো ধোঁয়া নজরে আসছিল বহুদূর থেকেও।

বাতাসে পোড়া গন্ধ আর অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন

আগুন লাগার খবর পেয়ে ভবনটির নিচে জড়ো হন বহু মানুষ।

তাদের মধ্যে ছিলেন- ভেতরে আটকা পড়া লোকজনের পরিচিত-স্বজন-বন্ধু, আশে-পাশের ভবন কিংবা বাজারের লোকজন, পথচারী, এবং উৎসুক মানুষ জন।

নিচে দাঁড়িয়ে থাকা এরকম প্রত্যক্ষদর্শী একজন বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, "ওপর থেকে কাগজ-পত্র উড়ে উড়ে নিচে ছড়িয়ে পড়তে দেখা যাচ্ছিল, আর বাতাসে ধোঁয়া আর একধরনের পোড়া গন্ধে নি:শ্বাস ভারী হয়ে আসছিল"।

রুদ্ধশ্বাস চার ঘণ্টা পর আগুন নিয়ন্ত্রণে

দুপুর একটার দিকে আগুন লাগার চার ঘণ্টা পরে তা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয় বিকেল পাঁচটা নাগাদ।

তবে তখনো বহুতল ওই ভবনটির ছাদের ওপর দিয়ে হালকা ধোঁয়া উড়তে দেখা যাচ্ছিল আশে-পাশের ভবন থেকে।

এরপর বিল্ডিং এর ভেতরে প্রবেশ করে উদ্ধারকারী দল ও বাহিনীগুলো।

উদ্ধারকাজ চলার সময় ঘটনাস্থলে যোগ দেয় স্বেচ্ছাসেবকরাও। মূলত, আশেপাশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা এসে যোগ দেয় সেখানে।

উৎসুক জনতা যেন উদ্ধারে ব্যাঘাত ঘটাতে না পারে সেজন্য তারা স্বেচ্ছায় এগিয়ে আসেন।

অনেককে দেখা যায় খাওয়ার পানির বোতল এনে তা বিতরণ করতে।

বিবিসি বাংলার আফরোজা নীলা ঘটনাস্থল থেকে জানান, একটা সময় ভবনটির ওপরের দিকের তলাগুলো থেকে বেশ কয়েকজনকে দেখা গেছে হাত নাড়ছেন।

বাড়ছে নিহতের সংখ্যা, আহত অনেকে

শুরুতে একজনের কথা জানা গেলেও নিহতের সংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়ছে।

শেষ খবর পর্যন্ত ১৯ জনের নিহত হওয়ার খবর নিশ্চিত হওয়া গেছে। ফায়ার সার্ভিসই খবর নিশ্চিত করে জানিয়েছে, এছাড়া আহত হয়েছে আরও ৭০ জন।

তবে আশঙ্কাজনক আছেন অনেকে।

এর আগে পুলিশ ও হাসপাতাল সূত্রে জানা গিয়েছিল সাতজনের নিহত হওয়ার খবর।

এদিকে ভবন থেকে বাঁচার চেষ্টায় কয়েকজনকে লাফ দিয়ে পড়তে দেখা গেছে। তাদের মধ্যে কারও কারও অবস্থা গুরুতর।

আরও পড়ুন:

বনানীর আগুন নিয়ন্ত্রণে দেরি হবার যে কারণ

বনানীর ভবন থেকে হাত নাড়ছিল অনেকে, নিহত ৭

'ভেতরে কেবল জীবন-মৃত্যুর তফাৎ, বেশি বলতে পারবো না'

ছবির কপিরাইট বিবিসি বাংলা
Image caption উদ্ধারকাজে যোগ দেয় সেনাবাহিনী

বেলা তিনটার দিকে প্রথম মই দিয়ে কয়েকজনকে বের করে আনতে দেখেন তিনি।

তাদের আট/নয়-তলা থেকে বের করে আনা হয়।

এরপর চারটা নাগাদ আরও ১৫ থেকে ২০ জনকে উদ্ধার করে আনা হয়।

এভাবে ধীরে ধীরে অনেককে বের করে আনা সম্ভব হয়।

বিবিসির সংবাদদাতারা জানান, ভবন থেকে বাঁচার চেষ্টায় চার/পাঁচজনকে লাফ দিয়ে পড়তে দেখা গেছে।

ছবির কপিরাইট বিবিসি বাংলা
Image caption আহত অনেককে অ্যাম্বুলেন্সে করে নিয়ে যাওয়া হয়

স্বজনের জন্য অপেক্ষা

ভবনের ভেতরে কোনও প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন এমন মানুষদের স্বজন-বন্ধু এবং পরিচিত জন।

তেমনই একজন মোহিত। তার ভাই অনুপম ভেতরে আটকা পড়েছেন বলে তাকে ফোনে জানানোর পর থেকে তিনি অপেক্ষায় দাড়িয়ে আছেন।

বিবিসিকে তিনি বলেন, "টেলিফোন করে আমার ভাই জানিয়েছে যে ১১তলায় অনুপম সহ ২০ থেকে ২২ জন আটকা পড়েছে, ধোঁয়ার জন্য তারা বেরোতে পারছে না"।

এরপর ভাইয়ের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় বলে জানান মোহিত।

তার মত আরও অনেককে দেখা যায় উদভ্রান্তের মতো অপেক্ষা করতে আর ছোটাছুটি করতে।

বেরিয়ে আসা একজনের বয়ানে: ভবনে যথেষ্ট অগ্নি নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিলনা

২৩তলা ভবনটিতে প্রতিদিন শত শত মানুষের আনাগোনা, কিন্তু সেখানকার অগ্নি নিরাপত্তা ব্যবস্থা সেভাবে ছিলনা, জানান কাশেম ড্রাইসেল নামক প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার শামীম রেজা খান।

ওই ভবনের ২১, ২২ ও ২৩ তলায় তাদের প্রতিষ্ঠান কাশেম গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের তিনটি অফিস।

অগ্নিকাণ্ডের সময় তিনিও ছিলেন ভবনটির একেবারে ওপরের তলা অর্থাৎ ২৩ তলায়।

বিবিসি বাংলা থেকে ফোন করার সঙ্গে সঙ্গে নিজের অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিচ্ছিলেন তিনি, "মৃত্যুর হাত থেকে এসেছি, একেবারে মৃত্যুর কাছাকাছি ছিলাম।

আমি ২৩ তলায় বসি। আমরা নিরাপদে বের হতে পেরেছি"।

মিস্টার খান জানান, "২৩ তলা ভবনটিতে বহু বড় বড় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের অফিস।

তিনটি লিফট দিয়ে বহু মানুষ ওঠানামা করে, আনুমানিক তিন হাজার লোকের প্রতিদিন আনাগোনা সেখানে।

কিন্তু ফায়ার এক্সিট নেই ভবনে। আর কোনও ফায়ার অ্যালার্ম বাজতে শোনেন নি"।

তিনি জানান, "পৌনে একটার দিকে যখন বুঝতে পারলাম আগুন লেগেছে, দেখলাম এত দ্রুত আগুনটা ছড়িয়ে পড়েছে...আমার অফিসের কর্মীরাসহ ছাদে চলে যাই এবং সেখান থেকে লাফিয়ে পাশের ভবনের ছাদে যাই।।

সাততলায় আগুন লাগে, সেখানে ছিল চারটা অফিস। এরপরই বিদ্যুৎ সংযোগ ও লিফট বন্ধ করে দেয়া হয়"।

সন্ধ্যার পর তার সাথে যখন কথা হচ্ছিল তিনি বলেন "শুনতে পাচ্ছি পুড়ে মারা গেছে অনেকে, তাদের এখন নামাচ্ছে"।

দিনভর গণমাধ্যমের খবর

দেশি-বিদেশী গণমাধ্যমে গুরুত্ব সহকারে উঠে আসে এ সংক্রান্ত খবর।

বাংলাদেশের টেলিভিশন চ্যানেলগুলো সরাসরি ঘটনার খবর ও ফুটেজ প্রচার করতে থাকে।

সেখানে রশি বা তার ধরে অনেককে নামার দৃশ্য দেখা যায়। এমনকি লাফিয়ে পড়ার দৃশ্যও প্রচার করা হয়।