বনানী আগুন: বিবিসির একজন সাংবাদিকের চোখে

বনানী আগুন
Image caption প্রাণ বাঁচাতে ভবনটির গায়ে ঝোলানো দড়ি বেয়ে নেমে আসছিলেন যারা।

রাজধানী ঢাকার বনানীতে ভবনের শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের বহিরাংশের (আউটডোর ইউনিট) উপর দাঁড়িয়ে প্রবল বেগে হাত নাড়ছেন একজন।

বারো তলা বা চৌদ্দ তলার ওপরে হবে জায়গাটা। বারবার গোনার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হচ্ছিলাম। কারণ বারবার মনঃসংযোগ ব্যহত হচ্ছে।

চারপাশে অজস্র মানুষ। কেউ হাহাকার করছেন।

কেউবা উচ্চস্বরে সৃষ্টিকর্তাকে ডাকছেন। আবার কেউ কেউ দমকল কর্মীদের শাপশাপান্ত করছেন।

দমকল বাহিনীর যে দীর্ঘ ল্যাডারটির চূড়ায় বসে দুজন দমকলকর্মী পানি ছুড়ছিলেন তারা থেমে গেছেন।

সম্ভবত পানির সরবরাহ শেষ হয়ে গেছে। ল্যাডার এবার ওই ব্যক্তির কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা শুরু করলো।

অনেকক্ষণ চেষ্টার পর ল্যাডারটির চূড়া লোকটির ফুট দশেকের মধ্যে পৌঁছালো। দমকল কর্মীরা ইশারায় কিছু একটা দেখাচ্ছিলেন।

সম্ভবত ছাদ থেকে নেমে আসা দড়িগাছা ধরে ল্যাডারের কাছে পৌঁছাতে ইঙ্গিত করছিলেন লোকটিকে।

এরই মধ্যে ঘন কালো ধোঁয়ায় কয়েকবার ঢেকে গেছেন তারা। তাদের পাশে কয়েকটা কাঁচের জানালা হঠাৎ ঝুরঝুর করে ভেঙে পড়ল।

তারপর সেই জানালাগুলো দিয়ে বেরিয়ে এলো বেশ কয়েকজোড়া হাত।

অনেক দূরে দাঁড়িয়ে মোবাইল ফোনে ভিডিও করার চেষ্টা করছি।

মানুষগুলোর চেহারা ভালো বোঝা যাচ্ছে না। তবে পোশাক দেখে মনে হলো এদের মধ্যে জনাদুয়েক তরুণী আছেন।

এরাও হাত নেড়ে ল্যাডারটিকে ডাকাবার চেষ্টা করছিলো।

নিচ থেকে জনতা সমস্বরে দমকল বাহিনীকে উদ্দেশ্য করে চিৎকার করছে, 'ওদেরকে আনুন ওদেরকে আনুন'।

ল্যাডারের চূড়ায় বসা দমকলকর্মী দুজনকে দ্বিধান্বিত মনে হচ্ছে। এরই মধ্যে তাদের পানির সরবরাহ ফিরেছে।

তারা জানালার মানুষ এবং শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের উপর দাঁড়ানো মানুষটিকে আনবে, নাকি জানালা থেকে বলকে বলকে বেরিয়ে আসা আগুনের কুণ্ডলীর দিকে পানি ছুড়বে?

এরই মধ্যে জনাচারেক মানুষকে দেখলাম। ছাদ থেকে নেমে আসা রশি বেয়ে নেমে আসার চেষ্টা করছে।

এদের মধ্যে একজনের গায়ে সাদা পাঞ্জাবি, মাথায় সাদা টুপি।

আমার চারপাশের জনতা হৈ হৈ করে উঠলো। তারা সমস্বরে সৃষ্টিকর্তাকে ডাকছে।

এরই মধ্যে একটা হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটে গেল।

দড়ি বেয়ে যে চারজন নেমে আসছিলেন, তাদের একজনের হাত হঠাৎ দড়ি থেকে ছুটে গেলো। তিনি সশব্দে নিচে এসে পড়লেন।

চারপাশে জনতার মধ্যে একটা হাহাকারের ঢেউ বয়ে গেল।

আমি সেখান থেকে বেশ অনেকটা দূরে দাঁড়িয়ে আছি। পড়ে যাওয়া লোকটির ভাগ্যে কি ঘটলে জানিনা।

কয়েক মুহুর্ত পর আরো একজন পড়ে গেলেন। তার ভাগ্যে কি ঘটলো তাও জানিনা।

এখন রশি বেয়ে নেমে আসছেন দুজন। তারা অনেক চেষ্টা করে চার তলা কি পাঁচ তলায় নেমে এসে একটি কার্নিশের ওপর দাঁড়ালেন।

সহকর্মী তাফসীর বাবুর কাছে শুনছিলাম, আমি এখানে এসে পৌঁছানোর আগে এভাবে রশি বেয়ে নামতে গিয়ে উপর থেকে পড়ে গেছেন আরো তিনজন। তার চোখের সামেই।

রাস্তায় দাঁড়ানো জনতা তাদের নিয়ে আলাপ করছিলেন। অনেকেই এই তিনজনকে অ্যাম্বুলেন্সে তুলতে দেখেছেন।

তারা বলাবলি করছিলেন, এই মানুষগুলো রক্তে একেবারে ভেসে যাচ্ছিলেন। তাদেরকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে কুর্মিটোলা হাসপাতালে।

এরই মধ্যে মাথার উপর একটি হেলিকপ্টার চক্কর দিতে শুরু করেছে। এটির গায়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর লোগো অংকিত।

আরো পড়ুন:

‘দোস্ত, উপরে ওঠ! হেলিকপ্টার আইছে’

বনানী আগুন: ভবন থেকে হাত নাড়ছেন অনেকে

ভবনটির ভেতরে যারা আটকা পড়েছেন তাদের অনেকেই সম্ভবত ভবনের ছাদে উঠে গেছেন।

তাদের উদ্ধার করার জন্যই এই হেলিকপ্টারটি এসেছে সম্ভবত।

এটি বারবার ভবনের চারপাশে চক্বর খাচ্ছে। কিন্তু ছাদ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারছে না।

এরই মধ্যে আধা ঘণ্টার মতো পেরিয়ে গেছে।

জানালা দিয়ে যারা হাত নাড়ছিলেন তারা তখনও হাত নাড়ছেন।

এসির আউটডোর ইউনিটের উপর বসা মানুষটি তখনও অপেক্ষমাণ।

আর রশি বেয়ে নেমে আসা দুজন মানুষ তখনও কার্নিশের উপর বসা।

এই দুজন অপেক্ষাকৃত নিরাপদে আছেন।

পরের দিকে এদেরকে ফায়ার সার্ভিসের ল্যাডারে করে নামিয়ে আনতে দেখা যায় টেলিভিশনের সরাসরি সম্প্রচারিত ভিডিওতে।

কুর্মিটোলা হাসপাতালে একজন মারা গেছেন বলে নিশ্চিত করছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।