বনানী আগুন: উপযুক্ত অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা ছাড়া কী করে ১৮ তলা ভবনকে ২৩ তলা বানানো হলো?

এফ আর টাওয়ার থেকে একজনকে উদ্ধার করা হচ্ছে ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption এফ আর টাওয়ার থেকে একজনকে উদ্ধার করা হচ্ছে

বাংলাদেশে ঢাকার বনানীতে এফ আর টাওয়ারে অগ্নিকান্ডে ২৫ জনের মৃত্যুর পর এই ভবনটি নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।

অভিযোগ উঠছে, কীভাবে মূল নকশা পরিবর্তন করে ১৮ তলা ভবনকে ২৩ তলা বানানো হলো, কীভাবে উপযুক্ত অগ্নি-নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছাড়াই এতবড় একটি ভবনে শত শত লোককে কাজ করতে বসানো হলো?

দমকল কর্মকর্তারা বলছেন, ভবনটিতে সম্ভাব্য অগ্নিকান্ড থেকে পালানোর সিঁড়ি থাকলেও বিভিন্ন ফ্লোরে তা তালা মেরে বন্ধ করে রাখা ছিল।

এসব গলদ বা অনিয়মের ব্যাপারে কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি কেন, কর্তৃপক্ষের দিক থেকে তার সঠিক কোনো জবাবও মেলেনি।

ঘটনার পর পূর্তমন্ত্রী স ম রেজাইল করিম একে 'অবহেলাজনিত হত্যাকান্ড' বলে বর্ননা করেছেন, বলেছেন - অগ্নিনির্বাপনের যথাযথ ব্যবস্থা না থাকাসহ বিভিন্ন অনিয়ম আছে এমন ভবন চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেয়া হবে, ঢাকার সব বহুতল ভবন পরিদর্শনের কাজ শুরু করা হবে।

কিন্তু বার বার অভিযোগ উঠেছে, বড় কোনো ঘটনা ঘটলেই সরকার অনেক পদক্ষেপ নেয়ার কথা বলে, কিন্তু তা বাস্তবায়ন হয় না।

খোদ রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বা রাজউকের চেয়ারম্যান আব্দুর রহমানই তথ্য দিয়েছেন যে বনানীর ভবনটির ১৮ তলা করার নকশার অনুমোদন ছিল।কিন্তু নির্মাণ করা হয় ২৩ তলা।

বছর দেড়েক আগে দমকল বাহিনী নগরীর বহুতল ভবনের অগ্নিনির্বাপন ব্যবস্থার ওপর জরিপ চালিয়ে বেশ খারাপ চিত্রই পেয়েছিল। তারপরও কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption এত বড় একটি ভবনে অগ্নিনিরাপত্তার কোন উপযুক্ত ব্যবস্থা ছিল না।

এমনকি বনানীর ভবনটিকে নোটিশ দেয়ার পরও তারা সে অনুযায়ী কিছুই করেনি।

দমকল বাহিনীর প্রধান ব্রিগ্রেডিয়ার জেনারেল সাজ্জাদ হোসেন বলছিলেন, এখন আবার জরিপ করা হবে।

"সম্ভবত আজ থেকে দেড় বছর আগে একটা সার্ভে করা হয়েছিল। আমরা বিভিন্ন বিল্ডিংকে বিভিন্ন জোনে ভাগ করে সার্ভে করেছিলাম। এই ভবনটিও সার্ভের আওতায় ছিল। এদেরকে বলা হয়েছিল যে, অগ্নিনার্বাপণ ব্যবস্থার কমপ্লায়েন্সগুলো নিশ্চিত করতে। তারা তা করে নাই। বেশিরভাগ ভবনে নিরাপত্তা নিয়ে সেভাবে চিন্তা করে নাই। আমরা আবার নতুন করে সার্ভে করে বিচ্যূতি থাকলে তাদের নোটিশ করবো।"

চকবাজারের চুরিহাট্টা থেকে বনানী - অল্প সময়ের ব্যবধানে, ঢাকায় ভবনে অগ্নিকান্ডের জন্য অনেক লাশ গুণতে হলো। কোনো ঘটনা ঘটলেই পরিস্থিতি সামাল দেয়ার জন্য অনেক কথাই বলা হয়, কিন্তু বার বার প্রশ্ন উঠছে বাস্তবায়ন নিয়ে।

একটি বহুতল ভবনে কি কি নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকতে হবে, তার নিয়মকানুন অনেক আছে, কিন্তু সেগুলো কতটা মানা হচ্ছে, সেটা দেখভাল করার কেউ নেই। এটাই আসল সমস্যা, মনে করেন একজন স্থপতি সারেকা সাদাফ।

বিবিসি বাংলায় আরো পড়ুন:

বনানীর আগুন নিয়ন্ত্রণে দেরি হওয়ার যে কারণ

বনানীর ভবনটি নির্মাণে রাজউকের নকশা মানা হয়নি

বনানী আগুনে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ২৫জন

আগুন থেকে পালানোর সিঁড়ি ছিল তালাবন্ধ

বিবিসি বাংলাকে তিনি বলছিলেন, "ভবনের নকশা দমকল বাহিনী থেকে শুরু করে নয়টা বিভাগের অনুমোদনের পর রাজউক থেকে চূড়ান্ত অনুমোদন পায়। নিয়ম অনেক আছে। কিন্তু তার চর্চা নাই।"

"নকশা নেয়ার পর ভবনটি সে অনুযায়ী হচ্ছে কিনা বা পরে ভিতরে কোনো পরিবর্তন করা হলো কিনা- এসব দেখার কেউ নেই।"

রাজউকের চেয়ারম্যান আবদুর রহমান বলেছেন, নিয়মের ব্যত্যয় করা এত বহুতল ভবন রয়েছে, যে সেগুলোকে তারা ভেঙ্গে ফেলতে পারছেন না। আবার সেগুলোতে সংশোধনেরও উদ্যোগ নেয়া যাচ্ছে না।

পূর্তমন্ত্রী স ম রেজাউল করিম বলেছেন, এফ আর টাওয়ারের ব্যবস্থাপনায় অবহেলাজনিত কারণে ভয়াবহ অগ্নিকান্ড ঘটেছে বলে তিনি মনে করেন।

"আপাত অবস্থায় আমার নিকট প্রতীয়মান হয়েছে যে, দায়িত্ব অবহেলার কারণে এই মানুষগুলির জীবন গিয়েছে। কারও দায়িত্বের অবহেলার কারণে যদি কোনো মানুষের মৃত্যু হয়, সেটাকে দায়িত্বে অবহেলাজনিত কারণে হত্যাকান্ড হিসেবে গন্য করার সুযোগ রয়েছে। আমরা প্রাথমিক অনুসন্ধানের পরই আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।"

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption ঢাকায় অসংখ্য বহুতল ভবন গড়ে উঠেছে যেগুলোর অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

"এই মর্মান্তিক ঘটনার সাথে যারা সম্পৃক্ত, তারা কোনোভাবেই তাদের দায় এড়াতে পারে না।তাতে যদি রাজউকের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়, ভবন মালিক, ডেভেলপার-যাকেই সম্পৃক্ত পাওয়া যাবে, তাদের বিরুদ্ধে আমরা আইনগত ব্যবস্থা নেবো।"

বহুতল ভবনগুলো নিয়ম মেনে তৈরি হচ্ছে কিনা তার তদারকির কার্যকর কোন ব্যবস্থা যে নেই, এই বিষয়টিকে সরকারের সংশ্লিষ্টরাও একটা বড় কারণ হিসেবে দেখেন অনেকেই।

তবে পূর্তমন্ত্রী স ম রেজাউল করিম বলছিলেন, "২০০৮ সালের পূর্বে কার্যত প্রয়োগযোগ্য কোনো কোড বা বিধি ছিল না।আর এই ভবন নির্মাণের পর রাজউকের পক্ষ থেকে সেটা পরিদর্শন করে যখন দেখা যায়, সকল শর্ত পূরণ করেছে,তখনই তাদের অকোপেন্সী সার্টিফিকেট দেয়া হয়।এই সার্টিফিকেট নেয়ার অনেক পরে গিয়ে এই ব্যত্যয় ঘটে। ফলে একটি ভবন কার্যকর হয়ে যাওয়ার রাজউকের তা পরিদর্শনের সুযোগ থাকে না। তাছাড়া রাজউকের লোকবলও ততটা নেই।"

তাহলে সরকার শুধু বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়ার কথাই বলছে। তার বাস্তবায়ন নেই এবং সে জন্যে একের পর এক ঘটনা ঘটছে, সব চেষ্টাই ব্যর্থ হচ্ছে- এই অভিযোগও অনেকে তুলছেন।

এ ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে স ম রেজাউল করিম বলেছেন, "অতীতে কথা অনেক হয়েছে, ব্যবস্থা হয়নি। আমাদের এখন কাজ ব্যবস্থা গ্রহণ করার।"

তিনি আরও বলেছেন, "মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশ রয়েছে, আমরা সকল বহুতল ভবনকে পরিদর্শন করে কোন ভবনগুলোয় অনুমোদিত নকশার ব্যত্যয় ঘটেছে, কোন ভবনে অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা যথাযথ নাই - এগুলো চিহ্নিত করে আমরা আইনগত ব্যবস্থা নেবো।"

বিবিসি বাংলায় আরো খবর:

এই শতাব্দীর পর কি বিশ্বে মানবজাতি টিকে থাকবে

ভারতের যে সম্প্রদায়ে পতিতাবৃত্তিকে ঐতিহ্য ভাবা হয়

একাত্তরের যুদ্ধকে কোন চোখে দেখেছে বলিউড ?

সম্পর্কিত বিষয়