দিল্লির জামিয়া মিলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে বাতিল হল 'ইসলাম-বিরোধী' ফ্যাশন শো

দিল্লিতে জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়ার মূল প্রবেশপথ ছবির কপিরাইট গেটি ইমেজেস
Image caption দিল্লিতে জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়ার মূল প্রবেশপথ

ভারতের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অন্যতম, দিল্লির জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়াতে একদল ছাত্রের বাধায় একটি নির্ধারিত ফ্যাশন শো বাতিল করে দিতে হয়েছে।

জামিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং শাখাই তাদের প্রতিষ্ঠানে সাংস্কৃতিক উৎসবের অংশ হিসেবে ওই ফ্যাশন শো-র আয়োজন করেছিল।

কিন্তু ওই ধরনের অনুষ্ঠান 'ইসলাম-বিরোধী' এবং জামিয়ার সংস্কৃতির পরিপন্থী, এই যুক্তিতে ছাত্রদেরই একটি সংগঠন ফ্যাশন শো-র বিরুদ্ধে বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করে।

শেষ পর্যন্ত তাদের বাধার মুখে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অনুষ্ঠানের অনুমতি বাতিল করে দিতে বাধ্য হয়।

এই ঘটনায় জামিয়াতে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কতটুকু, যথারীতি তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

ছবির কপিরাইট তারজ-ই-লিবাস/ফেসবুক
Image caption জামিয়াতে সেই বিতর্কিত ফ্যাশন শো-র পোস্টার

জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়ার ফ্যাকাল্টি অব ইঞ্জিনিয়ারিং এ বছর তাদের যে বার্ষিক সাংস্কৃতিক উৎসবের আয়োজন করেছিল, তার নাম ছিল 'এক্সট্যাসি'।

ওই অনুষ্ঠানের অংশ ছিল 'তারজ-ই-লিবাস' নামে একটি ফ্যাশন শো তথা মডেলদের র‍্যাম্প ওয়াকিং - যাতে অংশ নিতে দিল্লির বহু কলেজের ছাত্রীরাই নাম লিখিয়েছিলেন।

তা ছাড়াও ছিল 'হাসিনো কি ক্যাসিনো' নামে একটি ডাইস গেম বা ছক্কা ছোঁড়ার খেলা।

কিন্তু 'স্টুডেন্টস অব জামিয়া' নামে ওই প্রতিষ্ঠানেরই একটি গোষ্ঠী মনে করছিল, এগুলো অশ্লীলতা বা জুয়াখেলাকে প্রশ্রয় দেওয়ারই নামান্তর - যা কিছুতেই জামিয়াতে মেনে নেওয়া সম্ভব নয়।

ছবির কপিরাইট স্টুডেন্টস অব জামিয়া/ফেসবুক
Image caption ফ্যাশন শো-র বিরুদ্ধে স্টুডেন্টস অব জামিয়ার প্রচার

স্টুডেন্টস অব জামিয়ার নেতা লুতফুর রহমান বিবিসিকে বলছিলেন, "আপনি যদি ফ্যাশন শো-র পোস্টারগুলো দেখেন তাহলে দেখবেন অক্ষরিক অর্থেই সবকিছু দেখা যাচ্ছে এমন পোশাকে মেয়েদের ছবি আছে তাতে।"

"আমরা একটি ছাত্র সংগঠন, কোনও রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক নেই, কিন্তু আমরা জামিযার আদর্শ রক্ষার জন্য কাজ করে থাকি - আমরা তো জামিয়াতে ক্যাসিনো বা র‍্যাম্প ওয়াকিং মানতে পারব না।"

"আমরা ওগুলোর বিরোধিতা করেছি, কারণ এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতারা কোন আদর্শ নিয়ে জামিয়া গড়ে তুলেছিলেন আর কেন জামিয়া দেশের আর পাঁচটা প্রতিষ্ঠানের চেয়ে আলাদা সেটা আমাদের মাথায় রাখতে হবে।"

শনিবার বিকেলে ওই সংগঠনের মাত্র ডজনখানেক ছাত্র প্ল্যাকার্ড নিয়ে বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করেন, তাদের বাধাতেই শেষ পর্যন্ত ভেস্তে যায় ফ্যাশন শো-র আয়োজন।

ছবির কপিরাইট গেটি ইমেজেস
Image caption জামিয়াতে ছাত্রছাত্রীদের ক্যান্টিন। ফাইল ছবি

নিরাপত্তার যুক্তিতে জামিয়া কর্তৃপক্ষও প্রত্যাহার করে নেন তাদের অনুমতি।

স্টুডেন্টস অব জামিয়া যদিও দাবি করছে তাদের প্রতিবাদ শান্তিপূর্ণ ছিল, ফ্যাশন শো-র আয়োজকদের তরফে আলিজা কিন্তু বিবিসিকে বলছিলেন তাদের নোংরা ভাষায় ভয় দেখানো হয়েছে ও শাসানি দেওয়া হয়েছে।

আলিজা বলছিলেন, "আমাদের ফ্যাশন শো-র মূল থিম ছিল সমাজসেবা। এরপরও কিন্তু অনুষ্ঠানের আগের রাতে আমাদের ফোন করে হুমকি দেওয়া হয়, বলা হয় শো বাতিল না-করলে জোর করে বন্ধ করে দেওয়া হবে।"

"কিন্তু যেহেতু রেজিস্ট্রার ও প্রোক্টরের অনুমতি ছিল, তাই আমরা শো বাতিল করিনি। কিন্তু সেদিন ওরা পরিস্থিতি তৈরি করল যে অনুষ্ঠান ক্যানসেল করা ছাড়া কোনও উপায় ছিল না।"

ছবির কপিরাইট গেটি ইমেজেস
Image caption জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া

"জামিয়ার নাম ডুবল গোটা ঘটনায় - কিন্তু আমি নিজে একজন মুসলিম নারী হিসেবে বলতে পারি আমরা ইসলাম-বিরোধী কিছুই করিনি, শুধু কিছু লোকের সেকেলে মানসিকতায় অনুষ্ঠানটা করা গেল না!"

জামিয়ার মুখপাত্র আহমেদ আজিম গোটা ঘটনা নিয়ে কোনও মন্তব্য করতে অস্বীকার করেছেন।

ফ্যাশন শো বাতিল হওয়ার ঘটনা জামিয়ার প্রগতিশীল পরিবেশ নিয়ে কী বার্তা দেবে, এই প্রশ্নের জবাবে জামিয়ার শিক্ষক ইউনিয়নের নেত্রী, অধ্যাপিকা মনীষা শেঠিও কিছুটা পাশ-কাটানো জবাব দিচ্ছেন।

প্রফেসর শেঠি বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, "ফ্যাশন শো হয়তো আগে হয়নি - তবে জামিয়াতে নাচ, গানের নানা প্রতিযোগিতা তো সব সময়ই হচ্ছে।"

ছবির কপিরাইট স্টুডেন্টস অব জামিয়া/ফেসবুক
Image caption স্টুডেন্টস অব জামিয়ার আর একটি প্ল্যাকার্ড

"কেউ হয়তো কখনও নানা প্রশ্নও তুলেছেন, কিন্তু জামিয়াতে আন্ত: বিশ্ববিদ্যালয় লোকগান, লোকনৃত্যের কম্পিটিশন কখনও আটকে থাকেনি।"

"আমরা তো আর মঙ্গলগ্রহে নই, এই দিল্লিতেই আরও একটা প্রতিষ্ঠান। কারও কিছুতে আপত্তি থাকবে, কারও থাকবে না - একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে তো সব রকমের মতই থাকতে পারে, তাই না?", বলছেন তিনি।

ভারতের যে হাতেগোনা দু-চারটি কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে ইসলাম বা মুসলিম শব্দটি আছে, জামিয়া তার অন্যতম।

ভারতের মুসলিম সমাজের প্রতিনিধিত্বমূলক এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফ্যাশন শো বাতিলের ঘটনা কিন্তু নতুন করে সহিষ্ণুতার বিতর্ককেই উসকে দিচ্ছে।