বাসা বাড়ির অগ্নিকাণ্ড থেকে আপনি কতটা নিরাপদ?

রান্নাঘর ছবির কপিরাইট BBC BANGLA
Image caption রান্নাঘরে অগ্নিকাণ্ড ইদানিংকালে শহরাঞ্চলে একটি বড় উদ্বেগ হিসেবে দেখা দিয়েছে।

ময়মনসিংহের বাসিন্দা মনোয়ারা বেগম গত দুই মাস যাবত ঢাকা মেডিকেল কলেজের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন।

এক ভোরে রান্না করতে গিয়ে মাটির চুলা থেকে তাঁর শাড়িতে আগুন ধরে যায়।

"আমি তো খেয়াল করছি না। আমি তো মনে করছি চুলা দূরে। আমার কাপড় যে এতো দূরে চুলার কাছে গেছে এইডা খেয়াল করি নাই," বলছিলেন মনোয়ারা বেগম।

তাঁর কথায় পরিষ্কার যে চুলা থেকে তাঁর শাড়িতে আগুন লাগতে পারে - এ বিষয়টি কখনো চিন্তাতেই ছিল না।

কিন্তু হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে এখন সেটি নিয়েই আফসোস করছেন।

কিন্তু এরই মধ্যে আগুনে পুড়ে চরম মূল্য দিয়েছেন মনোয়ারা বেগম। কবে সুস্থ হয়ে উঠবেন তার কোন নিশ্চয়তা নেই।

এই বার্ন ইউনিটের আরেকটি ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন পাঁচ বছরের এক শিশু।

কুমিল্লা শহরে বাসার ছাদে খেলতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হন। কথা বলছিলাম শিশুটির মা আলিয়া আক্তারের সাথে।

"ছাদে খেলার সময় পাশে বিদ্যুতের খাম্বায় টিল মারছে। ঐ খাম্বা চাইর-পাঁচ হাতে দূরে ছিল। তখন ঐ টা বার্স্ট হইছে," বলছিলেন আলিয়া আক্তার।

ছবির কপিরাইট NurPhoto
Image caption অনেক বাড়ি অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকিতে আছে।

বাংলাদেশে সম্প্রতি চকবাজার এবং বনানী অগ্নিকাণ্ডে ৯০ জনের বেশি মানুষ মৃত্যুর ঘটনায় অগ্নি নিরাপত্তা নিয়ে সরকারি মহলে বেশ তোড়জোড় দেখা যাচ্ছে।

কিন্তু বসত বাড়িতে প্রতিনিয়ত নানা ধরণের অগ্নি দুর্ঘটনা অনেকের অজান্তেই থেকে যায়।

এসব দুর্ঘটনায় বেশি আহত কিংবা প্রাণহানি হচ্ছে নারী এবং শিশুদের। বসত বাড়িতে অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকিগুলো কোথায় এবং এনিয়ে মানুষ কতটা সচেতন?

ঢাকা মেডিকেলের বার্ন ইউনিটে সব সময় গড়ে সাড়ে পাঁচশোর বেশি আগুনে দগ্ধ রোগী চিকিৎসাধীন থাকে।

বিভিন্ন ওয়ার্ডে চিকিৎসকদের সাথে ঘুরে দেখা গেল এদের বেশিরভাগই নিজ বাসায় নানা ধরণের অগ্নিকাণ্ডে দগ্ধ হয়েছেন।

বার্ন ইউনিটের চিকিৎসক এবং সমন্বয়ক সামন্ত লাল সেন পরিসংখ্যান উদ্ধৃত করে বলছেন, একটু সচেতন থাকলেই তারা হতো দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পেতেন।

মি: সেন বলেন, "হাউজহোল্ড বার্ন বাংলাদেশে খুব বেশি। রান্না করার সময় শাড়িতে আগুন লাগলো, গরম পানিতে ঝলসে যাচ্ছে, ইলেকট্রিক বার্ন - এ ধরণের বার্ন এতো বেশি যেটা একটু সচেতনতা থাকলে এড়ানো যেতো।"

আমাদের হাসপাতালে আজ ৫৬৬ জন রোগী আছে, যাদের ৯৫ শতাংশই সচেতনতার অভাবে।"

আরো পড়ুন:

ঢাকার অবৈধ ভবনগুলো টিকে আছে কীভাবে

বনানী আগুন: ছবিতে উদ্ধার তৎপরতা

ফায়ার ব্রিগেড বা সার্ভিসের নাম 'দমকল' হল যেভাবে

ছবির কপিরাইট বিবিসি বাংলা
Image caption সামন্ত লাল সেন, চিকিৎসক, বার্ন ইউনিট, ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল।

বার্ন ইউনিটের চিকিৎসকদের কাছ থেকে জানা গেল, বসত বাড়িতে নানা ধরণের অগ্নিকাণ্ডে যারা সবচেয়ে বেশি হুমকির মুখে পড়ছে তারা হচ্ছে নারী এবং শিশুরা।

পর্যবেক্ষকরা বলছেন, বাড়িতে আগুনে দগ্ধ হবার ক্ষেত্রে বেশ কিছু বিষয় রয়েছে।

প্রথমত; রান্নার সময় কাপড়ে আগুন লাগা, গ্যাস লিকেজ হয়ে বিস্ফোরণ ঘটা, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম এবং শর্ট সার্কিট থেকে আগুন লাগা।

২০১২ সালে পুরনো ঢাকার নিমতলী অগ্নিকাণ্ডের পর বসত বাড়িতে অগ্নি সচেতনতা নিয়ে কাজ করছেন, পুরনো ঢাকার বাসিন্দা এবং বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের সদস্য ক্যামেলিয়া চৌধুরী।

তিনি বলছিলেন, অনেক বাড়িতে গৃহিণীরা অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকির মধ্যে থাকেন। কিন্তু অনেক সময় এসব ঝুঁকির কথা তারা অনুধাবনও করতে পারেন না।

ক্যামেলিয়া চৌধুরী বলেন, "অনেক জায়গায় আপনি দেখবেন যে বাইরে কাপড় শুকানোর কোন স্কোপ নেই তাদের। ফলে চুলার উপর কাপড় শুকাতে দেন তারা। তখনই একটা দুর্ঘটনার সম্ভাবনা থাকে।"

বসত বাড়িতে অগ্নিকান্ডের ঝুঁকি গুলো কোথায়?

বাংলাদেশে বসত বাড়িতে অগ্নিকান্ডের ঝুঁকি গুলো কোথায় রয়েছে সেটি বিভিন্ন সময় চিহ্নিত করেছে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স।

ছবির কপিরাইট Arterra
Image caption রান্নাঘরের চুলা থেকে অনেক সময় আগুনের সূত্রপাত হয়।

সংস্থাটির পরিচালক শাকিল নেওয়াজ বলেন, বাসা-বাড়িতে বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ঠিকমতো ব্যবহার না হলে বিপদ হতে পারে। তিনি বলেন, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ঠিক মতো দেখভাল করা হয়না এবং অনেক সময় নিম্ন মানের সরঞ্জাম ব্যবহার করা হয়।

রান্নাঘরে গ্যাস নি:সরণ থেকে হরহামেশাই অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

দমকল বাহিনী বলছে, বিভিন্ন সময় বসত বাড়িতে শর্টসার্কিটের মাধ্যমে অগ্নিকান্ডের সূত্রপাত হয়। এতে করে অনেক সময় দেখা যায়, সে বাসায় শর্ট সার্কিট হয়, সে বাসায় অগ্নিকাণ্ডে প্রাণহানিও হয়।

শর্ট সার্কিট কিভাবে হতে পারে?

বসত বাড়িতে শর্ট সার্কিট কিভাবে হতে পারে সেটি ব্যাখ্যা করছিলেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকট্রিক্যাল এন্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং-এর শিক্ষক আরিক সুবহানা।

ছবির কপিরাইট BBC BANGLA
Image caption আরিক সুবহানা, শিক্ষক, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়।

তিনি বলেন, "বিদ্যুৎ ব্যবহারের লোড যদি বেশি হয় এবং সে অনুযায়ী যদি মানসম্পন্ন ক্যাবল ব্যবহার না করা হয়, তাহলে শর্টসার্কিটের ঝুঁকি তৈরি হয়।"

বিদ্যুতের লোড অনুযায়ী যদি ক্যাবল ব্যবহার না করা হয়, তখন সেটি গরম হয়ে যায়। ফলে ধীরে-ধীরে ক্যাবলের উপরে প্লাস্টিকের আবরণ নষ্ট হয়ে দুটো ক্যাবল একত্রিত হয়ে যাবার সম্ভাবনা তৈরি হয়।

এতে শর্ট সার্কিট হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয় বলে উল্লেখ করেন আরিক সুবহানা।

শর্ট সার্কিট থেকে অগ্নিকাণ্ড যে মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে, সেটি অনেকে ভাবতেই পারেন না।

বাংলাদেশের অনেক বসত বাড়িতে বৈদ্যুতিক নিরাপত্তার বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়া হয়না বলে উল্লেখ করেন মিস সুবহানা।

তিনি বলেন, "এগুলো নিয়ে সচেতনতা একেবারেই দেখা যায় না। আমাদের বাসাবাড়িতে বিদ্যুতের অনেক সমস্যা দক্ষ মিস্ত্রি দিয়ে করা হয় না। অনেকে নিজেরাই সমস্যার সমাধান করার চেষ্টা করে।"

'আপনি অনেক ভয় দেখাচ্ছেন'

বসতবাড়িসহ বিভিন্ন জায়গায় অগ্নিকান্ডের বিষয়ে নানা ধরণের সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে দমকল বাহিনী।

সংস্থাটির অন্যতম পরিচালক শাকিল নেওয়াজ বলেন, সার্বিকভাবে অগ্নিকাণ্ডে নিয়ে কোন চিন্তাধারাই সাধারণ মানুষের মধ্যে নেই।

মি: নেওয়াজ বলেন, "আমি অনেক জায়গায় বক্তব্য দেই। লোকজন বলে, ৬৫ বছরে এ ধরণের কথা তো শুনলাম না । আপনি অনেক ভয় দেখাচ্ছেন।"

চিকিৎসক এবং দমকল বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, সাবধানতাই হচ্ছে অগ্নিকাণ্ড থেকে রক্ষা পাবার একমাত্র উপায়।

চিকিৎসকরা বলেন, এনিয়ে যদি সচেতনতা তৈরি না হয়, তাহলে আসছে দিনগুলোতে অগ্নিকান্ডের শিকার মানুষকে চিকিৎসা দেয়া বেশ কঠিন হয়ে যাবে।

আপনার ডিভাইস মিডিয়া প্লেব্যাক সমর্থন করে না
বনানী আগুন: কালো ধোঁয়া থেকে যেভাবে বাঁচলেন লামিয়া

সম্পর্কিত বিষয়